হাফ প্যাডেলের কাল । পর্ব ১৫। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

(গত পর্বের পর)

গোস্বামীবাবু বেশ ছিলেন গোস্বামীবাবুর মতন, বালকের হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা এগিয়ে আসতেই তিনি দাদা হয়ে উঠতে লাগলেন। তাঁর অফটাইম আড্ডায় কম দিয়ে বালকের পিছনে বেশি দিতে লাগলেন। ইংরাজি বাংলা মোটেই নয়, ভূগোল বিজ্ঞান একটু একটু, অঙ্ক বেশি বেশি। অঙ্ক করাতে করাতে খালি বকাবকি। বালক ভুল করলেই জিভটাকে উল্টে তালুতে লাগিয়ে চটাস চটাস আওয়াজ। যেন চাপড় মারছেন বালকের পিঠে। একদিন সত্যি সত্যি হাত পড়ল কানে চাপড় পড়ল পিঠে। পড়া বাদে অন্য কারণে।

শনিবার। ফোর্থ পিরিয়ড হয়ে গেলেই ইস্কুল ছুটি। বালক শুনল ইস্কুলের মাঠে ফুটবল ম্যাচ আছে আজ। নাইন টেন আর ইলেভেন মিলিয়ে দুটো দল, সায়েন্স ভার্সেস আর্টস। বালক পিঠে ব্যাগ নিয়ে মাঠের ধারে বসে পড়ল। খেলা দেখেনি কতদিন, আজ দেখতেই হবে। ডিভিসির বাস খাকি প্যান্ট সাদা জামাদের নিয়ে চলে গেল। ভোলাও উঠে গেল বাসে। যাক – বালক চিনে গেছে রাস্তা, খেলা শেষ হলে হেঁটে হেঁটে চলে যাবে ঠিক।

ডিভিসির বাস চলে গেল। অর্দ্ধু কই? আশালতা ভয় পাচ্ছেন, আশালতা রেগে যাচ্ছেন। গোস্বামীবাবু মর্নিং ডিউটি থেকে এখনও ফেরেননি। কার কাছে যাবেন, কার কাছে ছুটবেন তিনি? তেওয়ারিবাবুও অফিসে। কিছু বিপদ যদি হয়ে থাকে! পরের ছেলের দায়িত্ব নিয়ে সারা জীবনের মতো দায়ি হলেন নাকি!

গোস্বামীবাবু ফিরলেন বেলা তিনটের সময়। আশালতা মুখ কালো করে বসে আছেন বারান্দায়। তার অবস্থা দেখে দুয়ে দুয়ে চার করতে দেরি হল না। ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে নিয়েছেন বুবুরানি দিব্যি ঘুমাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলেন, –আজ তো শনিবার। অর্দ্ধু ফেরেনি?

আশালতা যেন বোবা, কোনো কথা নেই মুখে। এবার ভয় পেলেন গোস্বামীবাবুও। কিছু খারাপ খবর আসেনি তো? অ্যাকসিডেন্ট? বাস? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, –ইস্কুলের বাস আসেনি? বলবে তো কিছু?

–বাস চলে গেছে। নামেনি তোমার ভাই।

গোস্বামীবাবু আর ঘরে ঢুকলেন না। কোনো কথা বললেন না। বারান্দা থেকে সাইকেলটা নামিয়ে উঠে বসলেন সিটে।

খেলা দেখতে দেখতে পা সুড়সুড় করছে বালকের। সেই যে কবে ভালুকখুন্যার জঙ্গলের ধারে সাঁওতালপাড়ার মাঠে বল খেলেছিল, তারপরে আর চোখেই দেখেনি ফুটবল। ইস্কুলের ছেলেগুলো ভালো খেলছে, না কি তাদের দেশের ছেলেগুলো ভালো খেলে তুলনা করার চেষ্টা করছিল। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। হঠাৎ মাথায় এলো, বাস তো চলে গেছে, সে না হয় হেঁটেই চলে যাবে কিন্তু দাদা তো ফিরে যাবেন তিনটের সময়। বালক আসেনি দেখে রেগে যাবেন নির্ঘাত। সেই সবে খেলায় হাফ টাইম হয়েছে। উঠে পড়ল বালক। দাদা ফেরার আগেই সে যদি ফিরে যেতে পারে তাহলে কেউ জানবেই না তার খেলা দেখার কথা।

বেশ ফুর্তি মনে হাঁটছে বালক। দেখতে দেখতে বেনাচিতি বাজার। বাজারে ভিড় নেই বেশি। রাস্তার বাঁ ধার ঘেঁষে হাঁটছে সে। এইখানটায় রাস্তাটা খুব সরু। দোকানগুলো রাস্তার দিকে এগিয়ে এসেছে। দুটো মোটরগাড়ি দুদিক থেকে এলে একটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। গাড়ি এলে বালকও দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এই করতে করতে ফুরিয়ে এল বেনাচিতি বাজার। এবার বাঁ দিকে ঘুরে নুড়িপাথরের রাস্তায় পা দেয় বালক। আর গাড়ি ঘোড়া নেই। ফাঁকা রাস্তায় আপন মনে হাঁটা। রাস্তা এবার ডানদিকে দিকে ঘুরে উঁচুর দিকে উঠছে। চড়াইয়ের মাথায় উঠলেই চৌরাস্তার মোড়। সেখান থেকে পিচ রাস্তা শুরু হবে। একটা সাইকেল আসছে উলটো দিক থেকে। আনমনে সাইকেলটা দেখেছে বালক কিন্তু সাইকেলের উপরে লোকটার দিকে তাকায়নি। বালকের কাছে এসেই থেমে গেল সাইকেল। বালক দেখে সাইকেল থেকে নামছেন দাদা। থমথম করছে তাঁর মুখ। বালককে হেঁটে আসতে দেখে একটা স্বস্তি ফুটেছিল তাঁর চোখে। সেটা দেখেনি বালক। কিন্তু সাইকেল থেকে নামতে নামতেই স্বস্তিটা লুকিয়ে ফেলেছেন তিনি। বালক দেখছে তাঁর থমথমে  মুখ। সাইকেলে স্ট্যান্ড দিয়ে এগিয়ে এলেন তিনি। বালক দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধারে।

–কোথায় ছিলি?

–ইস্কুলে।

–ইস্কুল তো কখন ছুটি হয়ে গেছে। বাস গিয়েছিল তো।

–খেলা দেখছিলাম।

–খেলা? দেখাচ্ছি খেলা –

দাদা এগিয়ে এসে বাঁ হাতে বালকের ডান কান ধরে মাথা টেনে নামিয়েই দুম দুম করে ডান হাত দিয়ে পিঠে বসিয়ে দিলেন দুটো সজোর থাবড়া।

কানে বা পিঠে ব্যথা তেমন লাগেনি। তবু বুকের মধ্যে থেকে কেমন একটা কষ্ট উঠে এসে দলা পাকিয়ে গলায় আটকে গেল। অপমানের কষ্ট। অপরাধ করেছে বলে কষ্ট। বিনা অপরাধে শাস্তি পেলে কষ্ট না হয়ে ক্রোধ হতো। ক্রোধ মানে রাগ, পালটা আঘাত করার ইচ্ছা। এই অনুভবগুলো এখন সে নিজেই খুব বুঝতে পারে। সাইকেলে উঠে দাদা বললেন, –কেরিয়ারে ওঠ।

পিছনের কেরিয়ারে উঠে বসল বালক। সাইকেল চলছে। দাদা পিছনে মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, –আজ তো টিফিন নিয়ে যাসনি। খাওয়া হয়নি তো কিছু।

এতক্ষণ কষ্টের যে-দলাটা গলায় আটকে ছিল এইবার সেটা গলে গিয়ে দরদর করে নামতে লাগল চোখ দিয়ে।

(ক্রমশ)

অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
লেখক | + posts

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার আগরবাঁধ গ্রামে জন্ম। সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে এখন পূর্ণ সময়ের লেখক, সম্পাদক এবং তন্নিষ্ঠ পাঠক। বিচিত্র বিষয়ে সন্ধিৎসার স্মারক তাঁর লেখা স্মৃতিগদ্য, গল্প ও উপন্যাস। এর আগে আমাদের ওয়েবপোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিগদ্য 'স্মরচিহ্ন'। যা পরবর্তীতে বই হয়ে প্রকাশিত হয়েছে একপর্ণিকা প্রকাশনী থেকে। এছাড়া গত বছরে তাঁর সম্পাদনায় সুপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে 'বাঙালির পথঘাটের খাওয়া-দাওয়া'। এ বছর কলকাতা বইমেলায় সুপ্রকাশ থেকেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই 'গরিলার ঘরকন্না'।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed