হাফ প্যাডেলের কাল । পর্ব ১৪। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

গত পর্বের পর

পালবাবুর বিয়েতে – না বিয়ে নয়, আশালতা বলেছেন ওটাকে বৌভাত বলে – গোস্বামীবাবুর বাড়ির সকলের নেমন্তন্ন। কিন্তু তেওয়ারিবাবুরা বাদ। বালক ভাবে, শহরে কেমন সব অবাক করা ভাগাভাগি থাকে। গাঁয়ে এসব নেই। গাঁয়ে কিছু হলে, হয় সগ্রাম নেমন্তন্ন, নয় তো সব ঘরের একজন করে নেমন্তন্ন পাবে। সগ্রাম মানে, গ্রামের সব ঘরের সব্বাই খেতে যাবে। এমনকি, কারোর বাড়িতে সেসময় কোনো কুটুমবাটুম এসে থাকলে, তাদেরও নেমন্তন্ন। তবে সেখানে বিয়ে হলে গাঁয়ের কেউ নেমন্তন্ন পায় না। বরের সঙ্গে যেসব বরযাত্রী আসে, তারাই কেবল তিনবেলা নেমন্তন্ন খেয়ে বাড়ি ফেরে। বিয়ের রাতে একবেলা আর বাসি বিয়ের দিনে দু-বেলা। গাঁয়ের লোকের নেমন্তন্ন খালি পৈতাবাড়ি আর শ্রাদ্ধবাড়ি। লুচি, ডালতরকারি, বুটের লাড্ডু আর বোঁদে। বরযাত্রীদের জন্যে মাছ-মাংস করতে হয় কিন্তু বালকের গাঁয়ের বামুনপাড়ার পুরুষ মানুষরা কেউ মাছ-মাংস খায় না।
পালবাবুর এফ টাইপ কোয়ার্টার। গোস্বামীবাবুকে জি টাইপ কোয়ার্টার অ্যালট করা হয়েছে। অ্যালট মানে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও সেই কোয়ার্টারে যাওয়া হয়নি। পরের মাসে যাওয়া হবে, আশালতা বলেছেন। জি টাইপ বড় কোয়ার্টার, দুটো শোয়ার ঘর, বড়ো একটা খাওয়ার ঘর, কিন্তু এফ টাইপ তার থেকেও বড়ো। অনেক ঘর আর সামনে কতোখানি ঘাসে ঢাকা খালি জায়গা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সেখানে ম্যারাপ বেঁধে টেবিল চেয়ার পেতে খাওয়ার জায়গা। বালক কখনো চেয়ারে বসে টেবিলের উপর থালা রেখে খায়নি। তাঁদের গাঁয়ের নেমন্তন্ন বাড়িতে মাঠের মতো বিশাল উঠোনে গোবর লেপে ঝাঁট দিয়ে খাওয়ার জায়গা। সেখানে সবাই সারি দিয়ে খেতে বসে। শালপাতার থালায় এক একজন লোক এসে কেউ লুচি, কেউ ডাল, কেউ তরকারি, আর যা যা থাকে একে একে দিয়ে যায়। এখানে সবই অন্যরকম। তার উপরে গোস্বামীবাবু আর বালক নিরামিষ খায় বলে তাদের দুজনের জন্যে একটা আলাদা টেবিলে কাঁসার থালায় লুচি আর বাটিতে আলাদা করে রান্না করা তরকারি, রসগোল্লা, পানতুয়া, সন্দেশ খেতে দেওয়া হয়েছে। পালবাবু নিজে তাদের টেবিলের সামনে একটা চেয়ার নিয়ে বসে আছেন। পালবাবু গোস্বামীবাবুর চাইতে এক ধাপ উঁচু চাকরি করেন, তাও তাঁকে কেন এতো খাতির করছেন – ভাবছে বালক। বোধ হয় অন্য সবার মতো পালবাবুও গোস্বামীবাবুকে গুণের মানুষ বলে মনে করেন।
খুব সাবধানে আস্তে আস্তে খাচ্ছে বালক। ভয়ে আছে উঁচু টেবিল থেকে খাবার নিয়ে মুখে ভরতে গিয়ে নিজের গায়ে না পড়ে যায়। একটু দূরে আশালতা বুবুবুড়িকে কোলে নিয়ে খাচ্ছেন। আশালতা মেয়ে বলে মাছমাংসডিম খাওয়ার নিয়ম আছে। তাঁর বাপের বাড়ির ছেলেদেরও খাওয়ার নিয়ম আছে, কেবল বালকের গাঁয়ের বামুন ছেলেদের খাওয়ার নিয়ম নেই। এসব কথা খেতে খেতে গোস্বামীবাবু পালবাবুকে বলছেন আর পালবাবু ‘কী আশ্চর্য কি আশ্চর্য’ বলে যাচ্ছেন। পালবাবুর এই ‘আশ্চর্য’ কেমন খুশি খুশি, অথচ পালবাবুর বুড়ো বয়সে বিয়েতে আশালতার ‘আশ্চর্য’ কেমন রাগ রাগ। বালক ভাবে, বাড়ি ফিরে তার খাতায় লিখবে, – অবাক দু’রকমের, একটা খুশির অবাক আর একটা না-খুশির অবাক।
খুশি অখুশি ছাড়াও যে অন্য রকমের অবাক হওয়া আছে সেটা বালক জেনে গেল একটু পরেই। খাওয়া হতেই একজন এসে পালবাবুকে বলল, –চলো চলো, বউ বসেছে, তোমাকেও বসতে হবে পাশে। সবাই অপেক্ষা করছে।
আশালতা এসে গোস্বামীবাবুকে ফিসফিস করে বললেন, –বউ দেখে তার হাতে গিফট দিতে হয়।
আশালতার হাতে একটা ব্যাগ, তার মধ্যে ঝলমলে কাগজের একটা প্যাকেট, প্যাকেটের মধ্যে কী আছে বালক জানে না। দাদা-বৌদির পিছন পিছন সে-ও গিয়ে একটা বড়ো ঘরে ঢুকে পড়ল। ঢুকতেই নাকে এলো সুন্দর একটা গন্ধ। ঘরের শেষ প্রান্তে রঙিন শতরঞ্চি পাতা একটা নিচু তক্তার উপরে সিংহাসনের মতো একটা চেয়ার। তার উপরেই বসে আছে বালকের সেই অন্য রকমের অবাক। অবিকল বালকের গাঁয়ের দুর্গা ঠাকুর! মানুষও তাহলে ঠাকুরের মতো দেখতে হয়! হুমগড়ের গোপাল ছুতার কি এই বউটিকে দেখেই তাদের গাঁয়ের ঠাকুর গড়ে?
এই ঘরে খুব ভিড়। একজন একজন গিয়ে দুর্গা ঠাকুরের হাতে একটা করে জিনিস দিচ্ছে আর তিনি হাতজোড় করে সেটা নিয়ে পাশে নামিয়ে রাখছেন। পাশে একটা ছোটো চেয়ারে পালবাবু কেমন কাঁচুমাচু মুখে বসে আছেন। বালকের একটু খারাপ লাগছে। পালবাবু যদি এখন কথা বলতেন তাহলে খুব ভাল হতো। কোনো কোনো মানুষ কথা বলতে শুরু করলেই সুন্দর হয়ে ওঠে। তার গলার স্বরে, না কি মুখের ভঙ্গিতে – কোথায় যে তার সুন্দরতা লুকিয়ে থাকে কে জানে! বালকের খাতায় লেখা হবে – কেউ দেখতে সুন্দর হয়, কেউ শুনতে সুন্দর হয়।
আশালতা সেসব জানেন না মনে হয়। ফেরার পথে গজগজ করেই চলেছেন – ইস এতো সুন্দর মেয়েটাকে কেলে, বুড়ো বরের গলায় ঝুলিয়ে দিল! বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা!
হীরা মুক্তা পান্না। মুক্তার বোন যদি পান্না হয়, তাহলে সেই পান্নাকে নিয়ে আর এক কাণ্ড হয়ে গেল বালকের চোখের সামনে। বউভাতের পরের পরের দিন। বিকেলবেলায় পালবাবু পান্না আর তার মাকে সঙ্গে নিয়ে বালকদের কোয়ার্টারের পাশের সরু রাস্তাটায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁরা জঙ্গল দেখতে এসেছেন। দেখতে পেয়ে গোস্বামীবাবু তড়িঘড়ি করে প্যান্টসার্ট পরে ‘ঘরে আসুন ঘরে আসুন’ বলতে বলতে তাঁদের থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তেওয়ারিবাবুও ঘর থেকে বেরিয়ে তাঁদের সঙ্গে গল্প জুড়েছেন।
তাই দেখে তেওয়ারি বউদি চলে এলেন আশালতার কাছে। দুজনে মিলে কপাটের আড়াল থেকে তাঁদের দেখছেন। আশালতা বললেন, –বুড়িটা পালবাবুর শাউড়ি, আর মেয়েটা শালি।
মঞ্জু বলছেন, –শালিটাও তো দেখতে খুব সুন্দর।
বালকও তাই ভাবছে। মুক্তা যদি দুর্গা ঠাকুর হয়, পান্না তাহলে সরস্বতী। কিন্তু বউয়ের বোনকে কি ‘শালি’ বলতে হয়? শালি তো একটা গালাগালি। বাবার বারণ আছে বলে বালক কখনও উচ্চারণ করে না। তাদের গাঁয়ের বাগাল ছেলেরা বেয়াড়া গরুকে বলে – শালি এমন ঢ্যামনা, যত ঘাসই খাক ঠিক যেয়ে গিরস্থর আবাদে মুখ দিবেক।
পান্না বোধ হয় কথা বলতে খুব ভালবাসে। তেওয়ারিবাবুও তাই। যেকোনো লোক দেখলেই তিনি গল্প করতে লেগে যান। পালবাবু পান্নার মাকে নিয়ে একটু এগিয়ে জঙ্গলের ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। আর পান্নার সঙ্গে তেওয়ারিবাবুর কথা হচ্ছে, হাসাহাসিও হচ্ছে। তেওয়ারিবাবু খুব লোক হাসাতে পারেন, বালক জানে। গোস্বামীবাবু এই দলের ঠিক মাঝখানে আটকা পড়ে গেছেন। পালবাবুর দিকে এগোবেন না কি পান্নার দিকে, ঠিক করতে পারছেন না বোধয়।
গোস্বামীবাবুর কোয়ার্টারে কপাটের আড়াল থেকে বেরিয়ে বারান্দায় পা দিয়েছেন মঞ্জুবৌদি আর আশালতা। তাদের পেছনেই আছে বালক। মঞ্জু বলছেন, –দেখছো আশা, সুন্দরী মেয়ে দেখে তোমার দাদার রস কেমন উথলে উঠছে!
মঞ্জু বৌদির ফরসা মুখটা কেমন লাল হয়ে গেছে কিন্তু তিনি হাসছেন। হাসছেন আশাও। বালক এমন জটিল দৃশ্য দেখেনি কখনও। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখে গোস্বামীবাবু এক পা এক পা করে পান্না-তেওয়ারিবাবুর দিকে এগোচ্ছেন। আশালতার হাসি বেড়ে যাচ্ছে। বলছেন, — দেখো দেখো মঞ্জুদি, উনিও আর থাকতে পারলেন না –
গোস্বামীবাবু পান্নার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বললেন। এদিকে বারান্দায় আশালতা হাসতে হাসতে মঞ্জুদির গায়ে গড়িয়ে পড়লেন। তাঁর চোখে জল এসে গেছে।
এইসব রহস্যময় হাসাহাসি, চোখের জল দেখতে দেখতে বালক একটু একটু করে বড়ো হয়ে যাচ্ছে।

(ক্রমশ)

+ posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed