হাফ প্যাডেলের কাল । পর্ব ১৩। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

(আগের পর্বের পর)

যখনই আড্ডা বসুক, গোস্বামীবাবুর সঙ্গে পালবাবু আর বিশ্বাসবাবু থাকবেনই থাকবেন। বিশ্বাসবাবু ফর্সা, পালবাবু কালো। বিশ্বাসবাবু একটু লম্বা, পালবাবু একটু বেঁটে। বিশ্বাসবাবুর ছোটো টাক, পালবাবুর বড়ো টাক। দুই বাবুই রোগা, তারই মধ্যে বিশ্বাসবাবুর ছোটোমতো একটা ভুঁড়ি আছে। গোস্বামীবাবুর সঙ্গে এই দুজনের কোনো মিলই নেই। গোস্বামীবাবু ফর্সা নন, কালোও নন। লম্বাও নন, বেঁটেও নন। মোটাও নন, রোগাও নন। তাঁর একমাথা ঘন কোঁকড়ানো চুল, তাঁর কোনো ভুঁড়িও নেই। গোস্বামীবাবুর বয়স সবচেয়ে কম, পালবাবুর বয়স সবচেয়ে বেশি। আড্ডায় সবচেয়ে কম কথা বলেন পালবাবু। কিন্তু যখন বলেন তখন এতো সুন্দর বলেন যে সকলকে মন দিয়ে শুনতেই হয়।

এতসব কথা চোখে দেখে আর কানে শুনে জেনেছে বালক। কিন্তু আড্ডার মাঝে তার কিছু কথা বলার ইচ্ছে হলেও বলতে পারে না। কারণ তাহলে আশালতা খুব রেগে যাবেন। বড়োদের মাঝখানে ছোটরা কথা বললে সেটাকে অসভ্যতা বলে।

গোস্বামীবাবুর যেদিন নাইট ডিউটি থাকে না, সেদিন রাত্রে শোয়ার পরে একটা ছোটো আড্ডা হয়। সেখানে খালি গোস্বামীবাবু আর আশালতা কথা বলতে পারবেন। একদিন সেই ছোটো আড্ডায় গোস্বামীবাবু বললেন, –জানো, পালবাবুর বিয়ে ঠিক হয়েছে।

তাই শুনে আশালতা শোয়া ছেড়ে তড়াক করে উঠে বসলেন। –পালবাবু! পালবাবুর বিয়ে কি গো, এই বুড়ো বয়সে! কে মেয়ে দেবে ওকে?

গোস্বামীবাবু বললেন, –ওদের একটু বেশি বয়সেই বিয়ে হয়। ছেলেরা চাকরিবাকরি করে টাকাপয়সা জমিয়ে তবে বিয়ে করে। পালবাবুর বয়সটা অবশ্য একটু বেশিই হয়ে গেল।

–একটু কি গো, চল্লিশ বছর বয়সে বিয়ে করতে আমি কাউকেই দেখিনি। মেয়েটার বয়স কত?

–কত আর হবে – বাইশ তেইশ।

অন্ধকার হলেও বালক বুঝতে পারে, আশালতা গালে হাত দিয়েছেন। অবাক করা কথা শুনলেই তিনি গালে হাত দেন।  বললেন, – মেয়েও তো ধাড়ি। আমাদের সমাজ হলে কী হতো!

গোস্বামীবাবু বললেন, –আর বোলো না তো আমাদের সমাজের কথা! ছেলের গোঁফ গজালো তো বাপ ছুটলেন তার বউ খুঁজতে। মেয়ের বয়স তেরো চোদ্দ হলেই মায়ের চোখের ঘুম গেল, কবে তাকে বিদায় করা যাবে। না লেখাপড়ার চিন্তা, না নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চিন্তা।

গোস্বামীবাবুর গলায় রাগ ফুটছে। তাঁর মুখে এসব কথা হামেশাই শুনতে পায় বালক। জমির চাষের উপর তার ভরসা নাই। এমনকি মাস্টারির উপরও নাই। তার ঝোঁক কলকারখানার দিকে। বলছেন, –তোমার বাবা জামশেদপুরের স্টিল প্ল্যান্টে চাকরি করেও তোমাকে স্কুল ছাড়িয়ে বিয়ে দিয়ে দিলেন পনের বছর বয়সে!

আশালতা হাসছেন, –না হলে তোমাকে পেতাম কী করে শুনি! বসে থাকতে আমি কবে বিদ্যেধরি হবো –

–আমার সঙ্গে না হতো তো কারো না কারো সঙ্গে হতই।

–থামো তো তুমি, যার সঙ্গে যার লেখা আছে তার সঙ্গেই হবে। বাবুও তো তোমার সাততাড়াতাড়ি সম্বন্ধ করলেন। তখনও তুমি কলেজ পাশ করোনি।

গোস্বামীবাবু বললেন, –তা হলে কি হবে বিয়ে তো হলো বি এসসি পাশ করে মাস্টারি পাওয়ার পর। তখন আমার একুশ বছর বয়স হয়ে গেছে। অ্যাডাল্ট।

আশালতা ডিগবাজি দিয়ে পালবাবুর কাছে ফিরে গেলেন, –চল্লিশ বছর বয়সে চব্বিশ বছরের মেয়েকে বিয়ে করা কি ঠিক হচ্ছে পালবাবুর?

গোস্বামীবাবু পালবাবুর দলের লোক। তিনি আশালতার কথাটাকে লিফট করে গাঁয়ে পাঠিয়ে দিলেন, –হুনুমানদাদা যে পঞ্চাশ বছর বয়সে মেয়ের বাবাকে জমি লিখে দিয়ে তার ষোল বছরের মেয়েটাকে বিয়ে করে আনল।

–কী করবে বলো, প্রথম পক্ষে তো পরপর ছ’টা মেয়ে। বংশ রাখার চেষ্টা করবে না লোকে?

–তাই বলে একটা বউ থাকতে থাকতে আবার একটা বিয়ে করবে। তাছাড়া এ পক্ষেও তো আবার মেয়েই হতে পারে। এজন্যেই তো বলি মেয়েদেরও ভালো করে লেখাপড়া শেখা দরকার। নর নারী পত্রিকাগুলো যে নিয়ে আসি, পড় না?

বালক ঘুমকে আর আটকে রাখতে পারছে না। নর নারী পত্রিকার মধ্যে কিছু একটা রহস্য আছে। দাদা সেগুলো অন্য বইয়ের মধ্যে রাখেন না। জামাকাপড় রাখার ট্রাঙ্কের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। তবে কি তার মধ্যে ছেলে মেয়ে হওয়ার কথা লেখা থাকে?

ভোরবেলায় গোস্বামীবাবু মর্নিং ডিউটি করতে সেজেগুজে তিন বাটিওয়ালা টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে ডিভিসির বাসে উঠে পড়লেন। সেই কোন রাত থেকে আধো ঘুমের মধ্যে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা ছ্যাকছোঁক আওয়াজ শুনেছে বালক। আশালতার রান্না সারা, বুবুবুড়ির ঘুম থেকে উঠতে দেরি আছে। আশালতা বারান্দায় বেরিয়ে হাঁক দিলেন, –মঞ্জুদি, ও মঞ্জুদি –

বালক বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। সে জানে তেওয়ারিবাবুর বউ এখন উঠোনে কয়লার উনুনে আঁচ দিয়ে তামাকু দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে এদিক ওদিক ঘুরছেন আর পুচ পুচ করে লাল লাল থুতু ফেলছেন। বালকের গাঁয়ে সবাই কাঠের কয়লা দিয়ে দাঁত মাজে। তামাকু দিয়ে মানুষকে দাঁত মাজতে এই প্রথম দেখল সে। তামাক মানে দোক্তাপাতা। গাঁয়ের লোকে সেটা ভেজে আরও কী কী সব মিশিয়ে পানের সঙ্গে খায়। বালকের মা-ও খান। তাঁর গায়ের কাছে গেলেই দোক্তাভাজার গন্ধ পায় সে। আরও যখন ছোটো ছিল তখন এই গন্ধটাকেই সে মায়ের গন্ধ ভাবত। কিন্তু এই তামাকু মানে দোক্তা নয়। গুড়ের মতো দেখতে লাল চ্যাটচ্যাটে, একটা ছোটো টিনের কৌটায় ভরা থাকে।

বালক পায়খানায় বসে বসেই শুনতে পায় আশালতা আর তার মঞ্জুদির কথাবার্তা। কাল রাতের ছোটো আড্ডার কথাগুলোই আশালতা বলছেন, তবে কখনো কখনো গোস্বামীবাবুর কথাগুলো নিজের কথা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। যেমন, মেয়েদের লেখাপড়া শেখানো খুব ভালো কাজ, তাছাড়া কোনো বউয়ের ছেলে না হয়ে মেয়ে হলে তার কোনো দোষ নেই। কিন্তু একটা ব্যাপারে দুজনেই একমত যে পালবাবুর বুড়ো বয়সে বিয়ে করাটা খুব অন্যায় কাজ হচ্ছে।

(ক্রমশ)

অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
লেখক | + posts

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার আগরবাঁধ গ্রামে জন্ম। সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে এখন পূর্ণ সময়ের লেখক, সম্পাদক এবং তন্নিষ্ঠ পাঠক। বিচিত্র বিষয়ে সন্ধিৎসার স্মারক তাঁর লেখা স্মৃতিগদ্য, গল্প ও উপন্যাস। এর আগে আমাদের ওয়েবপোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিগদ্য 'স্মরচিহ্ন'। যা পরবর্তীতে বই হয়ে প্রকাশিত হয়েছে একপর্ণিকা প্রকাশনী থেকে। এছাড়া গত বছরে তাঁর সম্পাদনায় সুপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে 'বাঙালির পথঘাটের খাওয়া-দাওয়া'। এ বছর কলকাতা বইমেলায় সুপ্রকাশ থেকেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই 'গরিলার ঘরকন্না'।

1 thought on “হাফ প্যাডেলের কাল । পর্ব ১৩। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed