হাফ প্যাডেলের কাল । পর্ব ১২। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

বুবু এখন বছর পেরিয়ে গেছে। বেশ টুরটুর করে হেঁটে বেড়ায়, আছাড় খেয়ে কাঁদেও। আশালতা বলেন, বড্ডো জ্বালাতনে হয়েছে। বালকের তেমন মনে হয় না। খুব ভাব হয়েছে দুজনের। বালকের পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করে। ইস্কুল ছুটির পর বালক বাড়ি ফিরলেই তার ডান হাতের মাঝের আঙুলটা ধরে ফেলবে। তার মানে – রাস্তায় চলো, কোলে নয়, আমি হাঁটতে পারি। বালক তাকে জুতো পরায়। খালি পা দেখলে আশালতা রেগে যাবেন। কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে দুজনে সরু রাস্তাটায় দিব্যি হাঁটে গল্প করতে করতে। বুবু এখনও বাংলা ইংরাজি কিছুই বলতে পারে না। তার ভাষা অন্যরকম। বালক শিখে গেছে তার ভাষা। যেমন, বালক তাকে বলল, –বুবুচি সোনা, বল তো, আশালতা রাগি। বুবু বলল, — মা গীঃগীঃ। শেষ গীঃ-টা খুব জোরে বলবে বুবু। তখন তার মুখ থেকে থুতু ছিটকে আসবে। বলা হলেই খিলখিল করে হাসবে। আবার বলবে আবার হাসবে। সে যে বালকের কথার মানে বুঝেছে তার প্রমাণ তার এই হাসি। বালক তখন তাকে কোলে তুলে নেবে, চুমু খাবে। সে কোলে থাকবে না কিছুতেই, পিছলে নেমে যাবে। সবাই দেখুক সেও হাঁটতে পারে। বালক জানে কোয়ার্টারে ফিরে বুবু আশালতাকেও এই কথাটা বলবে আর হাসবে। আশালতা কিছু না বুঝেই বোকার মতন হাসবেন আর বুবুকে কোলে নিয়ে বালকের মতোই তাকে চুমু খাবেন, আদর করবেন। বুবু কথাটা বলেই চলবে যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ কথাটার দিকে মন দেবে।

আর কী আশ্চর্যের কথা এই বুবুবুড়িটাই বালককে একদিন একটা নতুন খেলা শিখিয়ে দিল! ইস্কুল থেকে ফিরেছে বালক। এখন একটু একটু করে গরম পড়তে শুরু করেছে। বিকেল থেকেই বনের হাওয়া এসে কোয়ার্টারের বারান্দায় দোল খায়। খুব মিষ্টি হাওয়া। গোস্বামী বাবু ডে-ডিউটিতে যাওয়ার সময় সাইকেলটাকে বারান্দায় বের করে রেখে গেছেন। বালক জানে, ইস্কুল থেকে ফিরে একমুঠো জুট দিয়ে সাইকেলটাকে মুছতে হবে। তারপরে পেনে কালি ভরার ড্রপারে এক রকমের তেল ভরে ফোঁটা ফোঁটা করে চেন আর প্যাডেলের খাঁজে খাঁজে দিতে হবে। আশালতার নিয়ম মেনে ইস্কুলের জামা-প্যান্ট ছেড়েছে বালক, বাথরুমে গিয়ে হাতপাও ধুয়েছে। তারপর সাইকেল মোছার সরঞ্জাম নিয়ে বারান্দায় এসে দেখে পিছনের স্ট্যান্ডের উপর সাইকেল দাঁড়িয়ে আছে আর বুবুবুড়ি সাইকেলের প্যাডেলটাকে একহাতে ধরে ঘোরানোর চেষ্টা করছে। ছোটো হাতে কি আর অত জোর থাকে! বালক তাড়াতাড়ি এসে বুবুকে কোলে নিয়ে সাইকেলের পাশে বসে হাত দিয়ে সজোরে প্যাডেল ঘোরাতে থাকে। স্ট্যান্ডের মাঝখানে ঝুলে থাকা পিছনের চাকা বাঁইবাঁই করে ঘুরতে থাকে। বুবু ঠোঁট ফুলিয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচায়। মানে তার প্যাডেল বালক কেন ঘোরাবে! তাড়াতাড়ি করে উপরে নীচে ঘুরতে থাকা প্যাডেলে বালক বুবুবুড়ির হাত চেপে ধরে। নিমেষে হাসি ফোটে তার মুখে। চাকা ঘোরার হালকা ঘর্ঘর আওয়াজ নকল করে ঠোঁট কাঁপিয়ে সেও আওয়াজ করতে থাকে। করতে করতেই কার হাতের যে টান লাগল প্যাডেলের গায়ে, স্ট্যান্ডের পা হড়কে সাইকেল পড়ল তাদের গায়ে। ভয় পেয়ে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে বুবু। বালক কীকরে সাইকেলের তলা থেকে বেরোবে বুঝতে না পেরে বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।

সাইকেলের তীক্ষ্ণ ঝনঝন শব্দে ভয় পেয়ে ছুটে এসেছেন আশালতা। এসে দেখেন বারান্দার মেঝেতে বালক শুয়ে আছে, তার উপরে বুবু, তার উপরে সাইকেল শুয়ে আছে। বুবুর কান্নায় ভয় পেয়ে তিনিও তেওয়ারিবাবুর কোয়ার্টারের দিকে মুখ করে চিলচিৎকার জুড়লেন। তেওয়ারিবাবু সেইমাত্র অফিস থেকে ফিরেছেন। তার সাইকেল এখনও বারান্দার হাওয়া খাচ্ছে। জামার আদ্ধেকটা খুলেছেন, আদ্ধেকটা পিঠে ঝুলছে। সেই নিয়েই ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এক লাফে গোস্বামীবাবুর বারান্দায় উঠলেন। তাঁকে দেখে চিৎকার ভুলে আশালতার মুখ এখন কাঁদোকাঁদো। তেওয়ারিবাবু দেখছেন সাইকেলের তিন রডওলা ত্রিভুজের পেটের মধ্যেই কুকুরকুণ্ডলী হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চুপচাপ শুয়ে আছে বালক। শিশুটি তার গলা আঁকড়ে ধরে কেঁদে যাচ্ছে। তিনি তাদের গা বাঁচিয়ে সাইকেলটা তুলে একপাশে দাঁড় করালেন। আশালতা এগিয়ে এসে বালকের গলা থেকে ছাড়িয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে তার হাত পা মাথা ভালো করে দেখছেন। রক্ত কি দেখা যাচ্ছে কোথাও। বালক উঠে বসেছে। তেওয়ারিবাবু বললেন, –মেয়ের কোথাও লাগেনি তো বৌদি?

মেয়ে তখন কান্না ভুলে সাইকেলের প্যাডেলের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। এই খেলাটা আবার খেলবে। আশালতা তাকে বকছেন, — খু-উ ব দুষ্টু হয়েছো!

বালক উঠে দাঁড়িয়েছে। তেওয়ারিবাবু তাকে জিজ্ঞেস করছেন, –তোর লাগেনি তো?

বালক উত্তর দেবে কি – লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই আছে। খেলার শুরুটা ভালো ছিল, শেষটাও তেমন মন্দ কিছু নয়। সমস্যা শুধু বড়োদের নিয়ে।

এক ঘরের কোয়ার্টারে তিন তিনটে বিছানা। একদিকের দেওয়াল ঘেঁষে তক্তপোশের উপরে আশালতা-বুবুবুড়ি, অন্যদিকের দেওয়াল ঘেঁষে দড়ির খাটে বালক আর মাঝখানে মেঝেতে পাতা বিছানায় গোস্বামীবাবু। সেদিন রাতে অন্ধকার ঘরে ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যেতে যেতে বালক আবছা শোনে আশালতা বিকেলের সাইকেল খেলার কথা বলে যাচ্ছেন গোস্বামীবাবুকে আর বলার ফাঁকে ফাঁকে কুলকুল করে হেসে চলেছেন দুজনে। বালকের ঝিমিয়ে-আসা মাথাও বুঝে নেয়, তার রান্না করে খাওয়ানোর প্রথম গল্পটির সঙ্গে সাইকেল-খেলার দ্বিতীয় গল্পটিও আজ আশালতার আঁচলে বাঁধা পড়ল।

অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
লেখক | + posts

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার আগরবাঁধ গ্রামে জন্ম। সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে এখন পূর্ণ সময়ের লেখক, সম্পাদক এবং তন্নিষ্ঠ পাঠক। বিচিত্র বিষয়ে সন্ধিৎসার স্মারক তাঁর লেখা স্মৃতিগদ্য, গল্প ও উপন্যাস। এর আগে আমাদের ওয়েবপোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিগদ্য 'স্মরচিহ্ন'। যা পরবর্তীতে বই হয়ে প্রকাশিত হয়েছে একপর্ণিকা প্রকাশনী থেকে। এছাড়া গত বছরে তাঁর সম্পাদনায় সুপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে 'বাঙালির পথঘাটের খাওয়া-দাওয়া'। এ বছর কলকাতা বইমেলায় সুপ্রকাশ থেকেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই 'গরিলার ঘরকন্না'।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed