হাফ প্যাডেলের কাল । পর্ব ১১। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

ডি ইউ এস টি ডাস্ট। মানে ধুলো। ডাস্টার মানে যা দিয়ে ধুলো ঝাড়া হয়, ঝাড়ন। এমনই লেখা আছে ডিকশনেরিতে। ঝাড়ন জানে না বালক। ধুলো ঝাঁটা দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। ঝাঁটাকেই তাহলে বইয়ের ভাষায় ঝাড়ন বলতে হয়। অতএব ডাস্টার মানে ঝাঁটা। ঝাঁটা অনেক রকমের হয়। একরকমের গাছ হয় গাঁয়ের আদাড়েপাদাড়ে। সেগুলো কেটে রোদে শুকোতে হয়। শুকিয়ে গেলে তাদের নাম হয় খ্যাংরা কাঠি। খ্যাংরা কাঠির ঝাঁটা দিয়ে গোয়াল পরিষ্কার হয়। তাল পাতার শির কেটে তালপাতার ঝাঁটা হয়। খেজুর গাছের পাতা দিয়েও হতে পারে। এগুলো দিয়ে মাটির উঠোন আর মেঝে ঝাঁট দেওয়া হয় আর সানের মেঝে হলে কাশ ফুলের ঝাঁটা লাগে। ইস্কুলের ব্ল্যাকবোর্ড ঝাঁট দিতে তাহলে ডাস্টার নামের ঝাঁটা লাগে। বালক ভেবে রাখে ঝাঁটার কথাগুলোও লিখে রাখবে সে কোনো একটা খাতায়।

প্রথমেই যে স্যার ক্লাস ফাইভের সি সেকশনে আসেন তাঁর নাম দুঃখহরণ। ধুতি আর আর কালো রঙের ফুলহাতা জামা। বালকের চাইতে বড়োজোর চার আঙুল লম্বা তিনি। রোগাপাতলা গা, গায়ের রঙ কালো, আস্তে আস্তে কথা বলেন। প্রথমে আসেন বলে তিনি হলেন ক্লাস টিচার। ক্লাস টিচার এসেই একটা খাতা খুলবেন। তারপর রোল নম্বর হাঁকবেন। ওয়ান, টু, থ্রি – থ্রি বললেই বালক উঠে দাঁড়িয়ে ‘প্রেজেন্ট স্যার’ বলবে। ‘ইয়েস স্যার’ বললেও চলবে। সেসব শুনে খাতায় দাগ মারবেন স্যার। কোনো রোল নম্বর যদি উঠে না দাঁড়ায় তাহলে সেই নম্বরের পাশে ঢ্যাঁড়া মারবেন। বালক ভেবে অবাক হয় এসব কেমন করে যে সবাই শিখে গেল! কেউ শিখিয়ে দেয়নি, অথচ সবাই শিখে গেছে। ক্লাস টিচারের এই কাজের নাম ‘রোল কল’।

দুঃখহরণ স্যার প্রথম ক্লাসে মানে ফার্স্ট পিরিয়ডে ইংরাজি পড়ান। পড়ান মানে প্রত্যেককেই বই থেকে খানিকটা পড়তে বলেন আর সেটার মানে বলতে বলেন। যে পারে তাকে বসতে বলেন; যে পারে না, তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেন। স্যার নিজেও সারাক্ষণ টেবিলে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েই থাকেন। টেবিলের পিছনে যে বসার জন্যে একটা চেয়ার আছে সেটা বোধহয় তিনি ভুলে যান। এই স্যার আরও একবার আসবেন ইতিহাস পড়াতে টিফিনের পর ফিফথ পিরিয়ডে। ইতিহাস পড়ানো ইংরাজির মতোই। বই দেখে দেখে পর পর সবাই পড়বে। কেবল মানে বলার দরকার নেই।

বালক প্রতিদিন বাঁ দিকের সারিতে প্রথম বেঞ্চিতে বসে। পড়ায় ভুল করে না। কারো সঙ্গে কথাও বলে না। সে দুঃখহরণবাবুকে নিয়ে খুব ভাবে। মনে হয় তিনি খুব ভিতু আর দুঃখী। গরিব তো নিশ্চয়ই। একটাই জামা রোজ পরে আসেন। ধুতি একটাই কিনা বোঝা যায় না, কারণ সব ধুতি একই রকমের দেখতে। বালকের নিজের ইস্কুলে পরার দুটো করে সাদা জামা, খাকি প্যান্ট ছাড়াও বাড়িতে অন্য রকম দুটো প্যান্ট দুটো জামা আছে। স্যার হয়েও দুঃখহরণের অতগুলো পোশাক নেই। বালকরা অবশ্য গাঁয়ে বড়লোক, সবাই বলে তাদের অনেক জমি আছে। দুর্গাপুরে গোস্বামীবাবু বড়লোক নাকি গরিব লোক, সঠিক জানে না বালক। তবে ডিভিসির অন্য বাবুদের কথা শুনে মনে হয়, এখন না হলেও শিগগিরই তিনি উঁচু জায়গায় চলে যাবেন। শহরের ভাষায় উঁচু জায়গা মানেই বোধহয় বড়লোক হওয়া। দুঃখহরণবাবুকে নিয়ে তাই বড়ো চিন্তায় থাকে বালক। ইস্কুল থেকে সেই যে একটা প্রসপেক্টাস পেয়েছিলেন গোস্বামীবাবু, তার মধ্যে দুটো পাতা জুড়ে সব স্যারদের নাম আর নামের পরে তাদের লেখাপড়ার হিসাব দেওয়া ছিল। সেটা পড়েও দেখেছে বালক। দুঃখহরণবাবুর নাম সকলের শেষে, লেখাপড়ার হিসাবেও তিনি সবচেয়ে গরিব। হেডস্যারের যেখানে লাইন ভর্তি লেখাপড়া, তিনবার এম এ, তাঁর সঙ্গে বি টি, আরও যেন কী কী। দুঃখহরণবাবুর সেখানে এম নাই, বি নাই, শুধু একটা আই, মানে আই এ। গোস্বামীবাবু বলেছেন, আই এ, বি এ-র চাইতে কম। বি এ, এম এ-র চাইতে কম। দুঃখহরণবাবুর সবই কম। তাই তিনি ক্লাস সিক্সের উপরে যেতে পারেন না। ফাইভ আর সিক্সের ক্লাসে ক্লাসে তাঁর দিন কাটে।

অন্য স্যাররা সকলের নাম জিজ্ঞেস করেন, পড়া ছাড়াও দু-চারটে অন্য রকম কথা বলেন। বকেন, মারেনও কখনো কখনো, হাত দিয়ে, ডাস্টার দিয়েও। কান মলে দেন ইচ্ছে হলে। দুঃখহরণ স্যার সেসব কিছুই করেন না। মনে হয় না, তিনি কোনও ছেলের নাম জানেন। দুষ্টু ছেলেগুলো ইংরাজি পড়ার মানে বলতে না পারলেও সামান্য ক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বসে পড়ে। তিনি বোধহয় দেখতেও পান না। মানে বলেও কেউ দাঁড়িয়ে থাকে আবার না বলেও কেউ বসে পড়ে আর মিটিমিটি হাসতে থাকে। সেটা একটা মজার খেলা বলে মনে হয়। বালকের হাসি পায়, আবার দুঃখহরণবাবুকে অগ্রাহ্য করে সেই মজাটা তৈরি হচ্ছে বলে খারাপও লাগে।

চার পিরিয়ডের পরে টিফিনের ঘণ্টা বাজে। বালক টিফিন কৌটো খুলে রুটি, আলুভাজা আর গুড় খায়। দুঃখহরণ বাবু টিফিনে কী খাচ্ছেন ভাবতে থাকে। টিফিনের সময় ছেলেরা কেউ ছোটাছুটি করে, কেউ কেউ দল বেঁধে গল্প, হাসি, খুনসুটি করে সময় কাটায়। ইস্কুলের পাঁচিলের ধারে ঠেলায় করে খাবার বিক্রি করে চার পাঁচ জন লোক। বাদাম, বাদামচাক, চানাচুর, ঝালমুড়ি, কুলের আচার, আরও সব কী কী যেন। বালক সেদিকে যায় না। তার পকেটে একটা পয়সাও থাকে না। ছোটদের হাতে পয়সা দিতে নেই। সেরকমই সে শুনে আসছে সেই কবে থেকে। কিন্তু শহরের নিয়ম সেরকম নয়। কারণ অনেক ছেলেই পকেটে দু-চার পয়সা নিয়ে আসে আর সেই খাবার কিনে খায়। সেসব খাবারে বালকের লোভ নেই, তার লোভ খেলায়। দেশ থেকে এসে অব্দি খেলাটাই বন্ধ হয়ে গেছে তার। ইস্কুলে খেলার মাঠ আছে। কিন্তু খেলা হয় বিকেলে। তখন তাদের নিয়ে যেতে ডিভিসির বাস এসে যায়। পিছনের মাঠে বল পেটানোর শব্দে পা সুড়সুড় করে তার। তাই করতে করতেই বাসে উঠতে হয়।

বাড়ি ফিরে নিজের আবিষ্কার করা খেলাই অগত্যা খেলতে হয় বালককে। সেসব খেলার বেশির ভাগই পড়ার সময় খেলতে হয় তাকে। গোস্বামীবাবু কিংবা আশালতা, কেউই টের পায় না বালকের খেলা। কারণ, সে খেলাটা চলে খাতা আর পেন দিয়ে। যেমন, ডিকশনেরি খেলা। আর একটা খেলার নাম পরীক্ষা খেলা। ইংরাজি আর বাংলা দুটো বই নিয়েই সেই খেলা হতে পারে। বালক হয়তো তার ইংরাজি বইয়ের একটা রচনা খুলল, দুটো বা তিনটা পাতা। এবার তার খেলার খাতায় প্রতিটি লাইনের প্রথম অক্ষর লিখল। কোন অক্ষর মোট কতবার লাইনের প্রথমে এল সেই রচনায় – সেটাই হলো খেলা। ইংরাজিতে বেশির ভাগ সময় ‘টি’ ফার্স্ট হয়। বালক নিজে অবশ্য ‘এ’-র সাপোর্টার। কিন্তু ‘এ’ খুব কমই ফার্স্ট হতে পারে, বেশির ভাগ সময়ই সে সেকেন্ড হয়। সেই তুলনায় বাংলায় ভালো কম্পিটিশন চলে। ‘অ’, ‘আ’, ‘ক’, ‘ব’, ‘স’ – যে কেউ যেকোনো রচনায় ফার্স্ট হয়ে যেতে পারে।

(ক্রমশ)

অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
লেখক | + posts

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার আগরবাঁধ গ্রামে জন্ম। সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে এখন পূর্ণ সময়ের লেখক, সম্পাদক এবং তন্নিষ্ঠ পাঠক। বিচিত্র বিষয়ে সন্ধিৎসার স্মারক তাঁর লেখা স্মৃতিগদ্য, গল্প ও উপন্যাস। এর আগে আমাদের ওয়েবপোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিগদ্য 'স্মরচিহ্ন'। যা পরবর্তীতে বই হয়ে প্রকাশিত হয়েছে একপর্ণিকা প্রকাশনী থেকে। এছাড়া গত বছরে তাঁর সম্পাদনায় সুপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে 'বাঙালির পথঘাটের খাওয়া-দাওয়া'। এ বছর কলকাতা বইমেলায় সুপ্রকাশ থেকেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই 'গরিলার ঘরকন্না'।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed