হাফ প্যাডেলের কাল । পর্ব ১০। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

সাদার সঙ্গে আকাশ-রঙ মেশানো ডিভিসির স্কুল-বাস কুমীরের মতো লম্বা। তার পেটের ভেতর অগাধ জায়গা। আদ্ধেক আসন ফাঁকাই থাকে। বাসের ভিতর দিব্যি ছোটাছুটি করা চলে। বালক সামনের দিকের একটা সিটে বসে চুপ করে সব দেখে যায় খালি।

একটা মাত্র বাস ডিভিসির। হরসু মার্কেটের দিক থেকে আসে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা খাকি প্যান্ট সাদা জামা দেখলেই থেমে যায়। তাকে কুড়িয়ে নিয়ে আবার ছুটতে শুরু করে। এইচ টাইপ, ডিভিসি কলোনির শেষ প্রান্তে। গোস্বামীবাবুর কোয়ার্টার আবার এইচ টাইপের শেষ লাইনে। তারপরেই বেঁটে শালবন। বিজলি বাতির শহরেও বনের ধারে বালকের বাস। কোয়ার্টার থেকে বেরোলেই একটা সরু কালো চকচকে রাস্তা। সে রাস্তা ধরে বাঁ দিকে ঠিক পঞ্চাশ বার পা ফেললেই সরু গিয়ে চওড়া রাস্তায় হারিয়ে গেছে। সেই রাস্তার পাশে একটা খাকি প্যান্ট সাদা জামা হয়ে দাঁড়িয়ে যায় বালক। বাঁ দিকে তাকিয়ে থাকে। এখান থেকে রাস্তাটা ক্রমশ উঁচু হতে হতে একসময় হারিয়ে যায়। সেই সবচে উঁচু জায়গাটায় আর একটা খাকি-সাদা দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ স্পষ্ট দেখা না গেলেও বালক জানে সেটা ভোলা। একটু পরেই ভ্যাঁপ ভ্যাঁপ করে ভোঁতা আওয়াজ ভেসে আসে। ঠিক তক্ষুনি ডিভিসি-বাসের মুখটা যেন গর্ত থেকে উঁকি মারে। তারপর পুরোটা উঠে আসে। দাঁড়িয়ে যায় ভোলার কাছে। দরজা খুলে নেমে দাঁড়ায় কালো প্যান্ট সবুজ জামা। সবাই তাকে লিটন কাকু বলে ডাকে। তার কাজ সব সাদা-খাকিকে তুলে নেওয়া আর নামিয়ে দেওয়া। ভোলাকে তুলে নিতেই বালক পা ঠুকতে শুরু করে। এবার তার পালা। বালকের কাছে এসে বাস একবার ভ্যাঁপ ভ্যাঁপ করে। এই আওয়াজটাকে বলে হর্ন। ডিভিসির হর্ন একটা রবারের বেলুন, ড্রাইভারের সুদর্শন চক্রের মতো হ্যান্ডেলের পাশে লাগানো আছে। সেটাকে হ্যান্ডেল না বলে স্টিয়ারিং বলতে হয়। ড্রাইভার বেলুনটাকে ছোটো ছোটো ঘুষি মারে আর সে ভ্যাঁপ ভ্যাঁপ করে ওঠে। সাদা-খাকিরা হাসতে থাকে। কারণ ডিএসপি বাসের হর্ন বাজলে লোকেরা চমকে ওঠে, কানের ভেতর দিয়ে সেটা মাথার মধ্যে সেঁধিয়ে যায়। আর এই হর্নের আওয়াজকে কেউ পাত্তাই দেয় না। ডিএসপির বাসের সবই ভালো। লম্বায় খাটো হলে কি হয়, অনেক জোরে দৌড়য়। ঘন নীল রঙ। নরম গদির সিট, বসলেই যেন শরীরটা তার ভেতরে ডুবে যায়। ডিভিসির সিট শক্ত শক্ত। বাস নাচলে লাগে। যেখানে লাগে সে জায়গাটার নাম বালক উচ্চারণ করতে পারে না। কারণ তার বাবা অনেকদিন আগেই বলে দিয়েছেন সেটা খারাপ কথা, বলতে নেই। গাঁয়ের লোকেরা অবশ্য হামেশাই বলে, শহরের সাদা-খাকিরাও দিব্যি বলছে খারাপ কথাটা।

ডিএসপির বাস দেখেছে বালক, চড়েনি কখনো। কিন্তু ইস্কুল যেতে যেতে রোজই শুনতে হয় সেই বাস কতো ভালো আর এই বাস কতো খারাপ। ডিএসপির বাসে কীকরে চেপেছে তারা ভেবে অবাক হয় বালক। ডিভিসির ছেলেকে তো তারা নেয় না বাসে। কিন্তু বালক সে কথা জানতে চায় না তাদের কাছে। কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে তবেই সে কথা বলে। নইলে সকলের কথা শুনে যায় খালি। একদিন ভোলা তার পাশে বসে চুপিচুপি বলেছিল, অনেক দূর যেতে হলে ডিএসপি পারবে না ডিভিসিকে। ডিভিসির স্পিড তুলতে সময় লাগে, তাই ফাঁকা রাস্তা পেলে ডিএসপিকে মেরে দিয়ে বেরিয়ে যাবে।

ভোলা কেমন করে সেটা জানল ভেবে আশ্চর্য হয় বালক কিন্তু সেসব কিছু জানতে না চেয়ে সে ‘মেরে দিয়ে বেরিয়ে যাবে’ শব্দগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। কতো কিছু যে সে শিখছে – স্কুলটা তো শেখার জায়গা বটেই, যে-বাস তাকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে সেও তাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিচ্ছে।

সবশেষে বাসে চাপে বালক। সে চেপে গেলে বাস আর দাঁড়ায় না কোথাও। সিটে বসে চুপচাপ ডাইনে বাঁয়ে দেখতে থাকে বালক। ডান দিকে বেঁটে বন, বাঁ দিকে ডিএসপির কোয়ার্টার। এখান থেকে রাস্তা আবার উঁচুতে উঠছে। এটাকে চড়াই বলে। চড়াইয়ের মাথায় আর একটা চওড়া পিচ রাস্তা বাঁ দিকের ডিএসপি কলোনি থেকে বেরিয়ে তাদের রাস্তাটাকে ভেদ করে ডানদিকের জঙ্গলে ঢুকে গেছে। এটাকে চৌরাস্তার মোড় বলে। রাস্তা এবার ঢালু হয়ে নামতে শুরু করেছে। এখন ডান বাঁ – দুদিকেই এবড়োখেবড়ো খোলা মাঠ। এখান থেকে রাস্তার উপর পিচ নাই। সাদা সাদা নুড়িপাথরের রাস্তায় নাচতে নাচতে বাস চলেছে। খানিক গিয়েই রাস্তাটা বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে অন্য একটা চওড়া পিচ রাস্তায় উঠে গিয়ে শেষ হলো। এই রাস্তার দুদিকে রকমারি দোকান বাজার। এটাই সেই বেনাচিতি বাজার। এখানেই ডিভিসির বাবুরা সবাই জিনিসপত্তর কেনাকাটা করতে আসেন। রাস্তায় খুব ভিড়। আস্তে আস্তে বাস চলে। ড্রাইভার ঘন ঘন বেলুনে ঘুষি মারে। রাস্তার লোক তেমন গ্রাহ্যি করে না। এই রাস্তায় গাড়িও চলছে অনেক রকম। তাদের পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে তাদের বাসের। কখনো কখনো দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। আরও খানিক এগোতে ভিড় খানিক পাতলা হল। দোকান বাজার কমতে লাগল। বাস একটু জোরে ছুটল। ডান দিকে তাকাতেই বিশাল গেট। গেটের মাথায় লেখা আছে ‘ভিরিঙ্গি ত্রৈলোক্যনাথ ইন্সটিটিউশন’। বাস গেট ঘেঁসে দাঁড়িয়ে পড়ে। লাফ দিয়ে নামে লিটন কাকু। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বাস থেকে নেমে গেটের ভিতর সেঁধিয়ে যাওয়া সাদা-খাকিদের গুনতে থাকে এক, দুই তিন…। সেকশন সি, রোল নম্বর তিন-ও বাস থেকে নামে, গেট দিয়ে ঢুকে খানিক হেঁটে গিয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়ে।

ইস্কুলের পশ্চিম প্রান্তে যে সারি সারি ঘর তার শেষ ঘরটা পঞ্চম শ্রেণি, সি সেকশন। সেই ঘরের ভেতরে দু সারি করে বেঞ্চি পাতা। আর দরজা দিয়ে ঢুকলেই দেওয়াল ঘেঁসে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। দেওয়ালে ঝোলানো আছে একটা কাঠের বেশ বড়সড় কালো রঙের বোর্ড। সেটির নাম ব্ল্যাকবোর্ড। আর আছে একটা বড়ো টেবিল, টেবিলের পিছনে দেওয়াল ঘেঁসে একটা চেয়ার। টেবিলের উপরে একটা ছোটোমতন কাঠের টুকরো আছে। সেটার বাইরের দিক সবুজ রঙ করা আর ভেতরের দিকে খসখসে একটা পাতলা গদি মতো সাঁটানো। এটার নাম ডাস্টার। স্যাররা ক্লাসে আসার সময় পকেটে করে চকখড়ি নিয়ে আসেন। এই চকখড়ি গাঁয়ের ডুমো ডুমো খড়ি নয়। মোটা পেন্সিলের মতো দেখতে। তাই তাকে খড়ি বাদ দিয়ে শুধু চক বলতে হয়। কোনো কোনো স্যার চক দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখেন। ক্লাসের সবাই যাতে দেখতে পায়। অঙ্কের ক্লাসে বেশি লেখালেখি হয়। অনেক সময় অঙ্কস্যার কোনো ছেলেকে ডেকে বোর্ডে একটা অঙ্ক দিয়ে সেখানেই সেটা কষে দেখাতে বলেন। ক্লাস শেষ হলে ডাস্টার দিয়ে বোর্ডের লেখা মুছে দিতে হয়। ডাস্টার সব ছেলেই বলে কিন্তু মনে হয় কেউ তার মানে জানে না। বালক যাকে যাকে জিজ্ঞেস করেছে কেউ বলতে পারেনি। স্যারকে জিজ্ঞেস করতে ভরসা হয়নি। তখন তার মনে পড়েছে, কোনো কঠিন ইংরাজি শব্দের মানে না জানলে গোস্বামীবাবু একটা ইট-রঙের মলাট দেওয়া মোটা বই বের করে সেটা জেনে নেন। বালক একদিন নিজেই সেটা বইয়ের তাক থেকে নামাল। প্রথম পৃষ্ঠা খুলতেই বড়ো বড়ো করে লেখা ‘ইংলিশ টু বেঙ্গলি ডিকশনেরি’ বাই এ টি দেভ। ডিকশনেরি শব্দটা সে বানান করে করে উচ্চারণ করেছে। ঠিক না ভুল এখনও জানে না। বইটার পাতা উলটাতে উলটাতে আর একটা চমৎকার শেখা হলো তার। বইটার মধ্যে যেকোনো শব্দ চট করে খুঁজে পাওয়ার একটা ব্যবস্থা আছে। শব্দগুলো সব এ থেকে শুরু করে পর পর গিয়ে জেডে শেষ হয়েছে। এই শেখা বালকের কাছে এখন একটা মজার খেলা। ইংরাজি শিখতে শুরু করার সময় থেকেই সে চেনা মানুষের নাম ইংরাজি বানানে লেখার চেষ্টা করত। এখন সেগুলো সহজেই করতে পারে। ডিকশনেরি দেখার পর থেকেই এখন সমস্ত চেনা নামগুলো এই কায়দায় সাজানো তার কাছে এক মজার খেলা। একটা ছোটো খাতা তৈরি করেছে সে নিজেই। তার ইংরাজি বাংলা খাতা তৈরির জন্যে এক দিস্তা লাইন টানা আর অঙ্ক খাতার জন্যে এক দিস্তা সাদা কাগজ এনে দেন গোস্বামীবাবু। সে নিজেই সেগুলোকে ছুঁচ-সুতো দিয়ে সেলাই করে মলাট লাগিয়ে নেয়। এই শেখাটা পাঠশালাতেই হয়েছিল বালকের। ছোটো খাতাটার কথা গোস্বামীবাবু জানেন না। খাতাটার মলাটে নাম লিখেছে ‘নামের ডিকশনেরি’।

(ক্রমশ)

অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
লেখক | + posts

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার আগরবাঁধ গ্রামে জন্ম। সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে এখন পূর্ণ সময়ের লেখক, সম্পাদক এবং তন্নিষ্ঠ পাঠক। বিচিত্র বিষয়ে সন্ধিৎসার স্মারক তাঁর লেখা স্মৃতিগদ্য, গল্প ও উপন্যাস। এর আগে আমাদের ওয়েবপোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিগদ্য 'স্মরচিহ্ন'। যা পরবর্তীতে বই হয়ে প্রকাশিত হয়েছে একপর্ণিকা প্রকাশনী থেকে। এছাড়া গত বছরে তাঁর সম্পাদনায় সুপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে 'বাঙালির পথঘাটের খাওয়া-দাওয়া'। এ বছর কলকাতা বইমেলায় সুপ্রকাশ থেকেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই 'গরিলার ঘরকন্না'।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed