সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ২৭। বরুণদেব
আত্মীয়দের একরাশ বিরক্তিভাজন হয়ে প্রিয়নাথ তাঁর সার্কাসদল নিয়ে কলকাতা ছেড়ে গেলেন বিদেশ ভ্রমণে, সামান্য কিছু অর্থের সঞ্চয় নিয়ে। বিদেশে গিয়ে পড়লেন দুর্ভোগে। অর্থাভাব। লাঞ্ছনা। খবর পৌছাল পিতা মনোমোহনের কাছে। সে যাত্রায় বিপদ থেকে উদ্ধার করে ছেলেকে ঘরে ফেরালেন মনোমোহন, পিতার পরামর্শ, আর ও পথ নয়।
প্রিয়নাথ অনড়। দ্বিগুণ উৎসাহে আবার দল তৈরী করলেন। আবার বেড়িয়ে পড়লেন। ১৮৮৮-র ডিসেম্বরে রংপুরের তাজহাট রাজবাড়িতে খেলা দেখালেন। কথা ছিল দু’রাতের আসর, রাজা গোবিন্দলাল রায়ের অনুরোধে দু’রাত পেরিয়ে আরও কয়েক রাত। উচ্ছ্বসিত রাজা গোবিন্দলাল প্রাপ্য পারিশ্রমিক ছাড়াও দিলেন পঁচিশ জোড়া শাল। সে সার্কাস দেখে উল্লসিত রংপুরের কাকিনার রাজা মহিমারঞ্জন রায়চৌধুরী। প্রিয়নাথের সার্কাস তাঁর কাছে হয়ে উঠল এক প্রাতিষ্ঠান, জাতীয় গৌরব। লিখলেন-
‘আই হোপ অল নোবেলমেন এন্ড জেন্টেলমেন উইল হেল্প দেয়ার কজ অ্যাজ আই কন্সিডার অ্যান ইন্সটিটিউশন ফর দ্য ডিসপ্লে অফ জিম্ন্যাস্টিক্স এন্ড ইকুয়েস্ট্রিয়ান ফিটস ইন আ ন্যাশনাল গ্লোরি।‘
প্রিয়নাথের সার্কাসদলকে বাংলার জমিদাররা আমন্ত্রণ করতে লাগলেন। খেলা দেখে খুশি হয়ে চুক্তি অনুযায়ী অর্থ ছাড়াও নানান জিনিসপত্র, ঘোড়া ও অন্যান্য জন্তুজানোয়ার উপহার দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করতে লাগলেন। গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল বাংলা ছাড়িয়ে অন্যান্য প্রদেশেও। ত্রিপুরার মহারাজ, রেওয়ার মহারাজ, কাশির রাজা, কাশ্মীরের মহারাজ আমন্ত্রণ জানালেন প্রিয়নাথকে। ঝালওয়ারের মহারাজা রাণা ঝালিম সিং বাহাদুর, ময়মনসিংহের মহারাজা সূর্যকান্ত চৌধুরী বাঘ ও হাতি উপহার দিলেন সার্কাসদলকে। এইসব জমিদার, রাজারা একাধিকবার একাধিক জন্তু জানোয়ার বা অন্যান্য উপহার সামগ্রী, অর্থ দিয়ে প্রিয়নাথের সার্কাস দলের পৃষ্টপোষকতা করলেন। সঙ্গে দিলেন প্রশংসাপত্র।
মনোমোহনের মেজ ছেলে মতিলাল বসু। সাহিত্যমোদী, সঙ্গীত রসিক। এবং তেজিয়ান ও স্পষ্টবাদী। ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে সহযোগী বা কর্মচারীদের সঙ্গে ব্যবহারে প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার তাঁর অভিধানে ছিল না। ফলে যৌবনে কয়েকটি ব্যবসায় হাত লাগিয়েও ডাঁহা ফেল। তবে তিনি টাকাকড়ি ও হিসাবপত্রের বিষয়ে সদা সতর্ক। ভাই প্রিয়নাথ আবার উল্টো মেরুর বাসিন্দা। পরিশ্রমী, কর্মকুশলী, সকলের সঙ্গে মিষ্টি ব্যবহার, দৃঢ়চেতা, জনপ্রিয়। কিন্তু খরচ বা হিসাবপত্রের ব্যাপারে অমনোযোগী। মনোমোহন বুঝলেন, প্রিয়নাথকে কিছুতেই সার্কাস থেকে ফেরানো যাবে না। এটাও বুঝতে পারলেন, সার্কাসের মতো বিপুল কর্মদ্যোগে দল পরিচালনার বিপুল দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে প্রিয়নাথ বেশ বেসামালও। মনোমোহন বললেন, প্রিয়নাথের সার্কাসে মতিলালও যোগ দিক। মতিলাল অর্থকড়ি, হিসাব নিকাশের দিকটা দেখলে প্রিয়নাথ অনেকটা ভারমুক্ত হয়ে সার্কাসের শৈল্পিক দিকটায় ও দল পরিচালনায় মনোনিবেশ করতে পারবে। দুই ভাইয়েরই ব্যবস্থাটা মনে ধরল। মতিলাল দেখতে শুরু করলেন সার্কাসের বৈষয়িক দিক আর প্রিয়নাথ নতুন উদ্যমে সার্কাসের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, শিল্পী, তাদের প্রশিক্ষণ, তাঁবু ও অন্যান্য সরঞ্জাম, জন্তু জানোয়ার সংগ্রহ ও তাদের প্রশিক্ষণে নজর দিলেন। বিজ্ঞাপন বা ইঙ্গ ও দেশীয় রাজপুরুষদের সাথে যোগাযোগ করে প্রদর্শনী পরিচালনার দিকটাও যেমন দেখলেন, তেমনি নতুন নতুন খেলার উদ্ভাবন ও পরিকল্পনায় মনোনিবেশ করলেন। দুই ভাইয়ের এই যৌথ প্রচেষ্টার ফলে গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস উন্নতির শিখরে পৌঁছাল। দুই ভাইয়ের মধ্যে ভাঙনও ধরেছে কয়েকবার। আর তাঁরা মিলিত হয়েছেন যখন, তখন সার্কাসের সাফল্য চূড়া স্পর্শ করেছে।
কলকাতার বাইরে পাড়ি দিয়ে প্রিয়নাথের সার্কাস উত্তরে কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে মহিশুর, পশ্চিমে গুজরাটের ভাবনগর, জামনগর, জুনাগড়, বরদা থেকে পূর্ব বঙ্গের কুচবিহার, এইসব অঞ্চলের রাজা মহারাজাদের আগ্রহে ও উৎসাহে এমন এমন জায়গায় তাঁবু ফেলেছে যেখানে সার্কাস কখনও পৌঁছায়নি। বাংলার বাইরে এই বাঙালি দলের সাফল্যের কথা সংবাদপত্রগুলিতে ফলাও করে ছাপা হলো। কলকাতায় আগ্রহ বাড়ল প্রিয়নাথের সার্কাসের। ১৮৯৯ এর নভেম্বরে গড়ের মাঠে তাঁবু পড়ল প্রিয়নাথের সার্কাসের। কর্পুরতলার মহারাজা, কুচবিহারের রাজা, বর্ধমানের মহারাজা ও আরও অনেক সম্ভ্রান্ত ধনীরা বাড়িয়ে দিলেন সাহায্য ও সহযোগিতার হাত। ঘোড়সওয়ারের খেলা, জিমন্যাস্টিক্স, বীর বাদলচন্দ্রের দুটো বাঘের সঙ্গে মল্লযুদ্ধ, মুগ্ধ করল দর্শকদের।
কলকাতা জয় করে সার্কাস পাড়ি দিল সিংহল। সেখান থেকে ফিরে দ্বিতীয়বারের জন্য ১৯০০-১৯০১ এ ময়দানে পড়ল তাঁবু। এবার পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে মহিশুরের রাজা। খেলা দেখে মুগ্ধ হলেন বাংলার লেফটন্যান্ট গভর্নর স্যার জন উডবার্ন।
কলকাতা থেকে রেঙ্গুন। সেখান থেকে পিনাং, সিঙ্গাপুর, যবদ্বীপ। সেসব দেশে প্রভূত সমাদর পেলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন সেসব দেশের নতুন নতুন জীবজন্তু। তাঁবু নিয়ে ফিরে এলেন কলকাতা ময়দানে ১৯০১-২ এ। এবার অন্যান্য পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে বাংলার প্রধান বিচারপতি। ইন্ডিয়ান মিরর লিখল- ‘প্রফেসর বোস হ্যাজ মেড আ প্রমিসিং স্টার্ট এন্ড ইট ইজ টু বি ফারভেন্টলি হোপড দ্যাট হিস প্যাট্রিয়টিক এফোর্টস অ্যাট ওয়াইপিং আউট দ্য আনজাস্ট স্টেন অফ ফিজিকাল কাওয়ার্ডিস, কাস্ট অন দ্য বেঙ্গলি কমুউনিটি, উইল বি অ্যাম্পলি অ্যাপ্রিসিয়েটেড অ্যান্ড সাবস্টান্সিয়ালি সাপোর্টেড’।
এরপর ব্রহ্মদেশ, মালয় উপদ্বীপ, জাভা, সুমাত্রার নগরে নগরে। ১৯১১-১২ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছরের শীতের কলকাতার অবশ্য গন্তব্য ছিল প্রিয়নাথের গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের তাঁবু। এবং প্রতিবার তাঁর সার্কাসের পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে এসেছেন দেশীয় রাজারা ও বড়োলাটরা, সমাজের সম্ভ্রান্ত ও ধনী পরিবারগুলি।
১৯০৫ সাল। ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিল। গর্জে উঠল দেশ। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে প্রবল দেশাত্মবোধের বন্যা। প্রিয়নাথের সার্কাস হয়ে উঠল সেই দেশাত্মবোধের এক প্রতীক। বাঙালির গর্ব। পথে ঘাটে মাঠে গেরস্থর উঠোনে মুখে মুখে ফিরতে লাগল সার্কাসদলের কথা। কাতারে কাতারে লোক তাঁবু ভরাতে লাগল। এই জোয়ারে বিদেশী সার্কাসদলগুলি যারা এতদিন কলকাতার সার্কাস সংস্কৃতিতে রাজত্ব করত, তাঁবু গোটাতে বাধ্য হলো কলকাতা থেকে। কলকাতায় গড়ের মাঠে হার্মস্টন সাহেবের সার্কাসের মতো বৃহৎ ইউরোপিয়ান সার্কাসের নাকের ডগায় তিন মাস ধরে পরপর তিন-চার বছর প্রিয়নাথ সার্কাস দেখিয়েছেন।প্রিয়নাথের সার্কাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে হার্মস্টন সার্কাস তাঁবু গুটিয়ে জাহাজে উঠে পড়তে বাধ্য হলো।
গড়ের মাঠে বোসের সার্কাস-তাঁবু শুধু খেলা দেখিয়ে দর্শককে মজিয়ে রাখত না, নিছক বিনোদন বা শারীরিক কসরত ও সাহসিকতার প্রদর্শন ছিল না, সে তাঁবু পরিণত হয়েছিল জাতীয় মেলায়। দেশমাতৃকার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, জাতীয়তাবোধের উচ্চারণ প্রতি শোয়ে। প্রিয়নাথ বোস ওজস্বিনী ভাষায় গুরুগম্ভীর স্বরে দেশপ্রেমের বক্তৃতা দিতেন। দর্শক মণ্ডলীর কাছে আবেদন রাখতেন স্বদেশ ব্রতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। গোটা তাঁবু জুড়ে ধ্বনিত হতো ‘বন্দেমাতরম’। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রিয়নাথ পেয়েছিলেন সাহিত্যের ছোঁয়া। কলম ধরলেন সার্কাসের গান ও নৃত্যের জন্য- ‘ভারত সন্তান সব/ জাগরে আজগ আজ,/ যুক্ত আঁখি মুক্ত কর/ আর কেন কাল ব্যাজ!/ উন্নতি চাওরে যদি/ বিনা ব্যায়াম মহানিধি/ স্বর্গাদপি গরীয়সী দেশ ভস্ম/ হয় আজ!’
দেশবরেণ্য নেতারা আসতেন বোসের সার্কাস দেখতে। এসেছিলেন লালা লাজপত রাও। প্রিয়নাথ সার্কাসের তাঁবুতে সম্বর্ধনা জানালেন তাঁকে- ‘আও লালা লাজ্পত্ হৃদয় কি ধন্,/ ভারত্ কি দোস্ত্ তোম্ ভারত্-ভূষণ।‘
স্বদেশী যুগের মন্ত্রগুরু ‘বেঙ্গলী’-র সম্পাদকীয় কলমে ১৯০৮ সালে লেখা হলো- ‘হোয়েন হাউএভার দ্য ফ্যাক্ট দ্যাট দ্য প্রফেসর ইজ আওয়ার ওন, আ বেঙ্গলি অফ অল বেঙ্গলিজ হু ইজ ভিনডিকেটিং বেঙ্গল’স কজ বিফোর দ্য আইজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড ইন দ্য ফিল্ড অফ অ্যাথলেটিক্স, ইকুয়েস্ট্রিয়ানিজম, এনিমল ট্রেনিং এণ্ড অ্যাক্রোবাটিক পারফরমেন্সেস, ইজ টেকেন ইন্টু কনসিডারেশন, উই ডু নট নো ইফ এনি ইন্ডিয়ান উইথ আ ট্রু ফায়ার অফ প্যাট্রিয়টিজিম গ্লোইং ইন হিস বসম অট টু ফেল টু লেন্ড হিস সাপোর্ট টু প্রফেসর বোস’।
(ক্রমশ)
