সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ২০। বরুণদেব

গত পর্বের পর

জাতপাতদীর্ণ ভারতবর্ষের প্রান্তিক সামজের নারী, উচ্চবর্ণের দয়া দাক্ষিণ্যে এঁটোকাঁটায় লালসার চাদর বালিশে টিকে থাকতে থাকতে, নিজেদের নারীজন্মে গোটা সমাজের পাপ বহন করতে করতে যুগের পর যুগ কাটিয়েছে। ধান ক্ষেতের জল কাদা, পুকুর পাড়ের এঁটো বাসন বাসি কাপড়জামা, হাট বাজারের সব্জির ঝুড়ি, এই প্রান্তিক নারীদের যা হোক করে বাঁচার খড়কুটো জুগিয়েছে, সম্মান দেয় নি। তাদের জল-ন্যাতা হাতে বাবুদের ঘরদোর, মন্দির মসজিদের দালান, সিঁড়ি ঝকঝকে চকচকে হয়ে গেলেও, তাদের জীবনের ঘরের কোণের ধুলো কাদা মাটি সাফ হয় নি কখনো। সমাজের সেবাদাসী হতে হতে, হাতবদল আর রাতবদলের অন্ধকারে মুখ ঢাকতে ঢাকতে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হারিয়ে গিয়েছে স্বপ্ন, যাপনের সংগ্রামে হারিয়েছে অধিকার, নারীজীবন। সেইসব প্রান্তিক নারীদের সার্কাসের তাঁবু দিয়েছে পাকস্থলির রসদ, পারিবারের ভরণপোষণের জোগান। দিয়েছে প্রতিষ্ঠা, সম্মান, আত্মবিশ্বাস। আর দিয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা।

ভারতের প্রথম সার্কাস বিষ্ণুপন্থ ছত্রের গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের প্রথম মহিলা শিল্পী ছিলেন ছত্রের স্ত্রী আভুদাবাঈ পারুলেলকার, ট্রাপিজশিল্পী ও হাতির পিঠে চেপে তিনিই সার্কাসতাঁবুতে প্রথম ‘ভারতমাতা’। নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটানো উত্তর মালাবারের প্রান্তিক সমাজের মেয়েদের সার্কাসের তাঁবুতে ভদ্রভাবে বাঁচার রাস্তা দেখিয়েছিল কীলেরি কুনহিকরনের সার্কাস ট্রেনিং ইন্সটিউট। কীলেরির শিষ্যা যশোদা প্রথম মালোয়ালি মহিলা সার্কাসশিল্পী। দক্ষিণ কেরালা থেকে অসংখ্য মহিলা শিল্পী সার্কাসকে আশ্রয় করে বেঁচেছিল। ভেনাস সার্কাস ও নিউ গ্র্যান্ড সার্কাসে অনেক মুসলিম মহিলা সার্কাসে যোগ দেন।

সদ্য স্বাধীন ভারতে  উত্তর মালাবারের নিম্নবিত্ত পরিবারের অবস্থা দুঃসহনীয় হয়ে ওঠে। মুদ্রাস্ফিতি, চাকরিবাকরির অপ্রতুলতা, অশিক্ষা, সেইসঙ্গে পরিবার পরিকল্পনার অভাব। গরীব পরিবারগুলির ছেলেমেয়েদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া, বস্ত্র তুলে দেওয়ার মতো সংস্থান নেই। থালাসেরি ও কান্নুর থেকে  ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরাও দলে দলে ভিড় জমাল সার্কাসের তাঁবুতে তাঁবুতে। তাদের তালিম দেওয়া হতো তাঁবুতে। অবসরপ্রাপ্ত বয়স্ক শিল্পীরা নিতেন সে তালিমের ভার। সেইসব শিক্ষকদের বলা হতো ওস্তাদ। ১৯৮০-র বছরগুলিতে পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির প্রান্তিক সামাজ থেকে প্রচুর মেয়ে সার্কাসে যোগ দেয়। পুরুষতান্ত্রিক সার্কাস সমাজে মহিলা শিল্পীরা পুরুষদের পিছনে ফেলে সার্কাসে সার্কাসে বিজ্ঞাপনের প্রধান মুখ হয়ে উঠেছিলেন। যে থালেসরি ও কান্নুর অঞ্চল থেকে ভারতের সার্কাসশিল্পীরা উঠে এসেছিল কীলেরি ও তাঁর শিষ্যদের প্রচেষ্টায়, সেই দুটি অঞ্চলের বহু মহিলা শিল্পী সার্কাস এরিনায় পুরুষ প্রাধান্যের অবসান ঘটায়। মহিলা শিল্পীরাই হয়ে ওঠে সার্কাসের হৃৎস্পন্দন।

গ্রেট ইস্টার্ন সার্কাসের মালিক পি শঙ্করন ১১ই নভম্বর, ১৯৪৭ এ পাটনার কাছে দানাপুরে আরও একটি সার্কাস খোলেন – গ্রেট ওরিয়েন্টাল সার্কাস। ছয়ের দশকে, পি শঙ্করণের আত্মীয়, কে কে অচুথানের পরিচালনায়  এই সার্কাস নাম ছড়াল। এই সার্কাসের তাঁবুতে জন্ম নেওয়া বন্য পশুগুলি অন্যান্য সার্কাসে বিক্রি করা হতো। মানুষ হিসেবে, মালিক হিসেবে অচুথান ছিলেন দয়ালু। তাঁর সার্কাসের মহিলা শিল্পীরা  ছিল ভীষণ গরীব, নিজেদের ঘরবাড়ি বলতে কিছু ছিল না। অচুথান তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন- জমি কিনতে, বাড়ি বানাতে।

ভারতীয় সার্কাসের শুরুর বছরগুলোয় সার্কাস মালিকরা মহিলা শিল্পীদের কোনো দায়িত্ব নিত না। তাদের দায়িত্ব ছিল  ট্রুপ লিডারদের ওপর। কোনো মহিলা সুপারভাইজারও  থাকত না। এই প্রথা পরিবর্তন করলেন বাবাসাহেব ভেঙ্কট রাও দেভাল তাঁর দেভাল সার্কাসে। ১৮৯৫ সালে মহারাষ্ট্র-কর্ণাটকের সীমান্তে মহীশাল গ্রাম থেকে পথ চলা শুরু। দেভাল সার্কাস মহারাষ্ট্রের পঞ্চম সার্কাস। দেভাল ছিলেন ছত্রের সার্কাসের পশু প্রশিক্ষক। দেভালের উদ্যোগে সার্কাস হয়ে ওঠে নারীর সামাজিক উত্তরণের মঞ্চ।

ধর্মীয় আচার ও সংস্কারের নামে পুরোহিততন্ত্র যেদিন নারীকে পণ্য করে বাজারকে নামিয়ে এনেছিল মন্দির প্রাঙ্গণে, সেদিন মন্দিরকে ঘিরে নৃত্যগীত-সাধনা-আরাধনার শিল্পকলা চর্চা, নিষ্পাপ তপস্যা আর রইল না। বৈষম্যমূলক আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় লোকাচারের প্রশ্রয়ে এক সময়ের সম্মানিত দেবদাসী প্রথা গণিকাবৃত্তি হয়ে গেল, যে প্রথার বলী নিম্ন বর্ণের দরিদ্র শ্রেণি। ধর্মের আচার মিশিয়ে সমাজে কুসংস্কারগুলি পরিবেশনের পিছনে থাকে সুপরিকল্পিত প্রয়াস। অশিক্ষা ও দারিদ্র সেখানে অনুঘটক মাত্র। বহু প্রাচীনকাল থেকেই  দেবদাসীপ্রথা ভারতীয় ভূখণ্ডে সুপ্রচলিত। রামগড় পর্বতের যোগীমারা গুহার গায়ে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর সুতানুকা লিপি দেবদাসী প্রথার খবর দেয়। কালের চলনে হিন্দু রাজ্যগুলি একে একে বিলুপ্ত হয়ে মুসলিম শাসনের বা ইউরোপীয় উপনিবেশের যুগ এলেও, মন্দিরগুলিকে ঘিরে পুরোহিততন্ত্রের এই কুপ্রথা বিলুপ্ত হয় নি। চন্দনসুবাসী রাজন্যভোগ্যা ও পুরোহিতভোগ্যার সরণী বেয়ে গোড়ের মালার গণভোগ্যার অন্ধগলির গণিকাবৃত্তির বাজারে, ধর্মের ভাঁড়ামি দিয়ে মুনাফা অর্জন করেছে ব্রাহ্মণ্যবাদ, বিংশ শতাব্দীতেও। ডঃ মুথুলক্ষ্মী রেড্ডির নেতৃত্বে  দেবদাসী প্রথা উচ্ছেদের সংগ্রামের ফলে মাদ্রাজ বিধানসভায় আইন প্রণয়ন হতে হতে ১৯২৯ সাল এসে গেল।

আর্যত্বের ফুল মালা ধূপ ধুনোয় লোকদেবীর আর্যীকরণের ফসল দ্রাবিড়ী দেবী ইয়েলেম্মার মন্দিরে মন্দিরে দেবদাসী প্রথা। নিম্নবর্ণের পরিবারে অনেকগুলি মেয়ে থাকলে তাদের মধ্যে একজনকে শৈশবে ইয়েলেম্মার মন্দিরে দেবদাসীত্বের জন্য উৎসর্গ করা এক ধর্মীয় অনুশাসনের নামাবলী জড়ানো ক্রীতদাসী প্রথা। অনেক সময় সন্তানহীন দম্পতি মানত করে বসে, কন্যা সন্তান জন্মালে তাকে দেবীর কাছে উৎসর্গ করা হবে। পুরোহিততন্ত্রের ছত্রছায়ায় মন্দির থেকে বেশ্যালয়ের পথে ধর্মের শান্তিজল ছিটিয়ে দালাল থেকে পুরোহিত, আর্থিক মোক্ষলাভ,সকলেরই।

ভেঙ্কট রাও দেভালের গ্রাম মহিশালে ছিল এক প্রাচীন মন্দির। দেবী ইয়েলেম্মার মন্দির। সেখানে ছিল দেবদাসী প্রথা। গরীব বাবামা-রা তাঁদের কন্যা সন্তানদের মধ্যে একজনকে দিয়ে আসতেন সেই মন্দিরে। তাদের তখন শৈশব। দেবদাসী হয়ে উঠত সেই মেয়েরা। বাবা মা আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে তাদের আর কোনো সংস্রব থাকত না। তারা থাকত মন্দিরে। বেশির ভাগ দেবদাসীকে বন্যপ্রাণীদের মতোই  বিক্রি করে দেওয়া হতো। যাঁরা থেকে যেতেন মন্দিরে, তাঁদের রাতগুলো হাতবদল হতে হতে বৃদ্ধ বয়সে এসে দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে, রোগভোগকে আলিঙ্গন করে ‘দেবদাসী’র অলঙ্কার পড়ে, নারীজন্মের পাপ বইতে বইতে একদিন শেষ হয়ে যেত। আর যে সব যুবতী দেবদাসীরা মন্দির অপেক্ষা বাজারে বেশি মূল্যবান, বম্বে মাদ্রাজ কলকাতার বেশ্যালয়ে বিক্রি হয়ে যেতেন।

বাবাসাহেব দেভাল এইসব মেয়েদের সামাজিক জীবনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হলেন। সার্কাসের জীবন দিলো সেই সামাজিক জীবন। তাঁর গ্রামের সেই মন্দিরের দেবদাসীদের কিনে নিলেন। সমাজ বাধা দিলো। বাধা দিলো ধর্ম। দেভালকে থামানো গেল না। তিনি তো মূল্য দিয়ে কিনে নিচ্ছেন বাচ্ছা মেয়েদের, মন্দির-বাবাদের কাঞ্চনমূল্য পেলেই তো হলো!

এতদিন সার্কাসব্যবসার যে ধারা, মালিকরা মেয়েদের দায়িত্ব নেবে না, তাকে  ভেঙে দিয়ে দেভাল দায়িত্ব নিলেন এইসব মেয়েদের। তাদের আশ্রয় দিলেন। খাবার দিলেন। ওষুধপথ্যি পোশাকআশাক শিক্ষা দিলেন। দিলেন নিরাপত্তা। সার্কাসের নানা খেলা শেখালেন তাদের। মন্দিরের সেই দেবদাসীরা হয়ে উঠল  দেভাল সার্কাসের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী।  তারা বেতন পেল। ঘড় বাঁধল সার্কাসের বা সার্কাসের বাইরের পছন্দের পুরুষের সঙ্গে। সার্কাসে এইসব মেয়েদের নাম হয়ে গেল ‘কোম্পানি গার্লস’। ভারতীয় সার্কাস জগতে ‘কোম্পানী গার্লস’-এর সেই শুরু।

১৯২০ সালে দেভালের মৃত্যু হলে তাঁর দু’ভাই সার্কাসের দায়িত্ব নিয়ে সার্কাসের নাম দিলেন- দেভাল ব্রাদার্স সার্কাস। তাঁরা সে সার্কাস চালাতে পারলেন না। দু’ বছর পর দায়িত্বে এলেন দেভালের দুই ভাইপো- বন্ধপন্থ ও বিনায়ক রাও। এঁরা ছিলেন মূলতঃ সার্কাসশিল্পী। এঁরাও চালাতে পারলেন না। কয়েক বছর পর সার্কাস বন্ধ করে দিয়ে যোগ দিলেন থারাবাঈ সার্কাসে। উদ্দেশ্য, দেভাল সার্কাস আবার নতুন করে চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি জোগাড়। এবার তাঁরা সফল হলেন। কয়েক বছর পর  থারাবাঈ সার্কাস ছেড়ে দিয়ে নতুন করে গড়লেন দেভাল সার্কাস।

স্বাধীন ভারতের প্রথম রাজনৈতিক হত্যা ১৯৪৮এ। মহাত্মা গান্ধী। দেভাল সার্কাস তখন পুণেতে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক নাথুরাম গডসের কার্তুজ  সেদিন শুধু গান্ধীজিরই প্রাণ নেয় নি, প্রান্তিক সমাজের নারীদের উত্তরণের সার্কাস, দেভাল সার্কাসরেও প্রাণ নিয়েছিল।  নাথুরাম গডসে ছিলেন মহারাষ্ট্রর চিতপবন ব্রাহ্মণ। দেভালও ছিলেন চিতপাবন ব্রাহ্মণ। শুধুমাত্র এই সাদৃশ্যের জন্য ক্রুদ্ধ জনতা দেভাল সার্কাসের তাঁবুতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুণেতে দেভালের বাড়িও রেহাই পায় নি জনতার আক্রমণের হাত থেকে। এই তাণ্ডবের পর বন্ধপন্থ ও বিনায়ক রাও সার্কাস ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে বলিউডের জগতে পা বাড়ান। প্রান্তিক সমাজের নারীর সামাজিক উত্তরণের জয়গাথা নিয়ে দেভাল সার্কাসের তাঁবু চিতাভস্ম হয়ে ভারতীয় সার্কাসের ইতিহাসে তার নাভিকুণ্ডলী রেখে যায়, যাকে অবহেলার বিসর্জন দিলে নাথুরাম গডসেদের হাত ধরে ভগবান ও শয়তান আসন বদলাবদলি করে।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply