সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ১৯। বরুণদেব

গত পর্বের পর

‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।‘ যুদ্ধ-আমোদী হাল্লারাজার উল্লোম্ফনে বা ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল মোচনে অথবা পররাষ্ট্রের সীমান্ত লক্ষ্মণরেখা লঙ্ঘনে, দখলতন্ত্র বা বিদ্রোহের ট্রাপিজের খেলা থেকে কামান দাগা হলে, চিরকাল উলুখাগড়ারা যুদ্ধের কোল্যাটারাল ড্যামেজ হয়। ফ্যাসিস্ট থেকে সোস্যালিস্ট,সকল শিবিরের বিনোদনের করতালিতে প্রাণিত শিল্পকলা-মানচিত্রের প্রান্তিক শিল্প সার্কাসের প্রাণভোমরা যে প্রান্তিক উলুখাগড়ারা, তাদের টিকে থাকা ও যাপনের নিত্য সংগ্রাম বারে বারে যুদ্ধের গোলায় থেমে গিয়েছে। বারুদের সালফারীয় বিষবায়ুতে  হাপর টেনেছে। সে গোলাবারুদের নাম বিশ্বযুদ্ধ হোক, চৈনিক আগ্রাসন হোক অথবা অক্টোবর বিপ্লব, ফল ভুগেছে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সার্কাস।

প্রফেসর ইজাকো তাঁর রাশিয়ান সার্কাস নিয়ে দু দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়ার শহরে শহরে ঘুরে উত্তর ভারতে এলেন। ইতিমধ্যে অক্টোবর বিপ্লবের পর রাশিয়া সার্কাসকে জাতীয়করণ করে দিলো।ইজাকো আর দেশে ফিরলেন না। উত্তর ভারতে ইজাকোর সার্কাস তাঁবু গোটালো। সেই সময়েই আর এক বিদেশি কার্লসন্স বিভিন্ন ভারতীয় সার্কাসে মোটোরবাইকের খেলা দেখিয়ে বেড়াতেন। তিনি শুরু করলেন নিজের  সার্কাস  – কার্লসন্স আমেরিকান সার্কাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রসব করেছে আর্থনৈতিক মন্দা। সেই মন্দার শিকার হলো কার্লসন্স সার্কাস,ভারতের মাটিতে শুরু, ভারতের মাটিতেই শেষ।

ম্যাঙ্গালোরের রামচন্দ্র রাও। পড়াশোনা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ম্যাঙ্গালোরে পরশুরাম সার্কাস দেখে উৎসাহিত হয়ে জেনারাল ম্যানেজারের পদে যোগ দিলেন পরশুরাম লায়ন সার্কাসে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপ্লবীদের আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া পরশুরাম রাওয়ের পরশুরাম লায়ন সার্কাস ভারতের প্রাচীনতম বিখ্যাত সার্কাসদলগুলির মধ্যে একটি। এ সার্কাসের বিশেষত্ব ছিল, একসঙ্গে সাতটি সিংহ নিয়ে রিঙে খেলা দেখানো। লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের মন্তব্য, এ সার্কাসের নাম হওয়া উচিত ‘পরশুরাম লায়ন সার্কাস’।

সে সার্কাসে একজন মহিলা শিল্পী ছিলেন, অন্ধ্রপ্রদেশের রুগমা বাঈ।  রামচন্দ্র রাও প্রেমে পড়লেন, বিয়ে করলেন। রুগমা বাঈ তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী।  স্বামীর উৎসাহে অন্ধ্রপ্রদেশে শুরু করলেন রুগমা বাঈ সার্কাস। ১৯৩৭ সালে বৃটিশ সরকার বার্মাকে ব্রিটিশ-ভারত থেকে ছিন্ন করে দিয়ে পৃথক দেশ করার কথা ঘোষণা করল। রুগমা বাঈ সার্কাস তখন রেঙ্গুনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে। রুগমা বাঈ ঠিক করলেন, রেঙ্গুনকেই তিনি তাঁর সার্কাসের সদর দপ্তর করবেন। রেঙ্গুনে তৈরী করবেন এক স্থায়ী সার্কাস-থিয়েটার। ১৯৩৯-এর পয়লা সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করল। শুরু হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানি ও ইটালি বাদে বাকি ইউরোপীয় দেশগুলি মিত্র বাহিনী গড়ে তুললে জার্মানি, ফ্রান্স, ইটালির সার্কাসদলগুলি একে একে বন্ধ হয়ে গেল। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশে দেশে। জাপান জার্মানির সঙ্গে যোগ দিলো। আজাদ হিন্দ বাহিনী  জাপানী বাহিনীর সাথে বার্মার ব্রিটিশ দুর্গগুলি আক্রমণ করল। জাপান ও আজাদ হিন্দ বাহিনী দখল নিল বার্মার। কিন্তু পরের বছর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ব্রিটেন ব্যাপক বোমা ফেলতে লাগল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রচণ্ড অভিঘাত নেমে এলো রুগমা বাঈ সার্কাসের ওপর। একদিকে প্রচুর আর্থিক ক্ষতি অন্যদিকে স্বজনহারা হলেন রুগমা বাঈ। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে রুগমা বাঈয়ের স্বামী ও কন্যা খুন হলেন। বোম্বিং শুরু হলে সার্কাসের বেশিরভাগ কর্মী ফিরে গেল ভারতে। বোম থেকে রেহাই পেল না রুগমা বাঈ সার্কাসের তাঁবু। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা পড়ল বেশ কিছু জীবজন্তু, যারা আহত হলো, গুলি করে মেরে দেওয়া হলো। সারাজীবন বিলাসিতায় কাটানো রুগমা বাঈ রাতারাতি কপর্দকশূন্য হয়ে গেলেন। বার্মা ছেড়ে পালানো ছাড়া আর কোনো উপায় রইল না। এদিকে ভারতে ফেরার জন্য কোনো পরিবহণ নেই। জাহাজ পরিসেবা নেই, নেই অন্য কোনো যানবাহন। শুরু হলো হাঁটা। রুগমা বাঈ তাঁর দলের পি সি অচুথান, মাত্তানকোট কুনহিরমন ও তার ভাই ১৪ বছরের শঙ্কু, দামোদরন ও অবশিষ্ট কয়েকজনকে নিয়ে  ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটা শুরু করলেন। খাবার নেই, পানীয় জল নেই, বনের ফলমূল পাতা, ঝর্নার জল, পথে কোনো গ্রাম পড়লে ভিক্ষে করা, এগিয়ে চলল রুগমা বাঈয়ের সার্কাসদল। বার্মা থেকে ভারতের পথে সেদিন আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনা, বার্মার সরকারী অফিসগুলির কর্মচারী, ব্যবসায়ী, পরিযায়ী শ্রমিক,সাধারণ মানুষ, আতঙ্কের এক লং মার্চ।

সার্কাস দলের সদস্য শঙ্কু হঠাৎ করে অপ্রকৃতিস্থ ব্যবহার করতে লাগল। হঠাৎ হঠাৎ সে পিছন ফিরে দৌড়াতে লাগল। তার দাদা কুনহিরমন তাকে ফিরিয়ে আনে বার বার। দিনের পর দিন। সার্কাস দলের গতি রুদ্ধ হতে লাগল । সন্দেহ দেখা দিলো, এইভাবে চলতে লাগলে তারা আর ভারতে ফিরতে পারবে কিনা। শেষ পর্যন্ত শঙ্কুর দাদা কুনহিরমন সিদ্ধান্ত নিলেন। শঙ্কুকে ছেড়ে দিলেন নিয়তির হাতে। চেয়ে চেয়ে দেখলেন তাঁর ভাই পিছন ফিরে ছুটতে ছুটতে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হারিয়ে গেল। যুদ্ধ অথবা সার্কাসের শহীদ।

রুগমা বাঈ ফিরলেন কলকাতায়। হিন্দ লায়ন সার্কাসে যোগ দিলেন, যে সার্কাসের পার্টনাররা একদিন তাঁর সার্কাসের কর্মী ছিলেন। দুবছর পর আবার সার্কাস খুললেন পি সি অচুথানের সঙ্গে, সে সার্কাস বেশিদিন টিকল না। বৃদ্ধ বয়সে আশ্রয় নিলেন কান্নুরে অচুথানের বাড়িতে। ১৯৬২-তে চলে গেলেন যখন,  ততদিনে স্বাধীন ভারতে আর এক যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে।

সিঙ্গাপুরের কয়েকজন ব্যবসায়ীর উৎসাহে বালাকৃষ্ণন বা বালাজীর গ্রেট ইস্টার্ন সার্কাস প্রথমবার তাঁবু ফেলল সিঙ্গাপুরে। ভালো ব্যবসা হলো। পরের ক্যাম্প কুয়ালালামপুর, মালয়শিয়ার রাজধানী। সেখানেও সাফল্য এলো। সময়টা ১৯৬২-র দিকে। আকসাই চিন ও অরুণাচল প্রদেশের দখল নিতে চিন আক্রমণ করে বসল ভারতকে। গ্রেট ইস্টার্ন সার্কাস তখন থাইল্যান্ডে। থাইল্যান্ডের জনবসতিতে চিনাদের আধিপত্য। তারা বয়কট করল ভারতীয় সার্কাস। প্রভূত আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলো বালাজীর সার্কাস। থাই সরকারকে ট্যাক্স মেটাতে পারল না। দেশ থেকে সার্কাস দলকে তাড়িয়ে দিলো থাইল্যান্ড সরকার। জীবজন্তু, তাঁবু, সারজসরঞ্জাম নিয়ে পুরো দলটা মালয়শিয়ায় ঢুকে পড়ল। মালয়শিয়া ও থাইল্যান্ডের সীমান্ত স্টেশন ‘আলোর সেতার’ (Alor Setar)।  অনুপ্রবেশকারীদের গ্রেপ্তার করল মালয়শিয়ার পুলিশ। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে আটকে রইল দল। এক ভারতীয় এগিয়ে এলেন, যাঁর শিকড় কান্নুরে,  থাইল্যান্ডের মেয়েকে বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন। তিনি সাধ্যমতো খাবার ওষুধ দিয়ে সাহায্য করলেন। শেষে থাইল্যান্ডের ভারতীয় হাইকমিশনের উদ্যোগে মুক্তি মিলল মালয়শিয়ার পুলিশের হাত থেকে।

বালাজী আবার সার্কাস শুরু করলেন। মালয়শিয়ার কয়েকটা শহরে প্রদর্শনী চলল। কিন্তু এবার অর্থ এলো না। মালাক্কায় এসে সার্কাস দল অনাথ হয়ে গেল। ভারতীয় পার্লামেন্টে বিরোধী নেতা এ কে গোপালন  সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।  কয়েক মাস পর এক পণ্যবাহী জাহাজে মাদ্রাজে ফিরল সার্কাসদলের সদস্যরা। মাদ্রাজে ইমিগ্রেশন দপ্তরের অফিসাররা সার্কাসদলের সব সদস্যকে বাড়ি যাবার ট্রেন টিকিট দিলেন, দিন প্রতি দু’টাকা হিসাবে রাহাখরচও। বালাজী থামলেন না। আবার শুরু করলেন। এবার তামিলনাড়ু  অন্ধ্রপ্রদেশে ঘুরলেন সার্কাস নিয়ে। চার বছর পর আবার বিদেশে যাবার উদ্যোগ। গালফ দেশগুলি থেকে স্পনসর জুটল। প্রথমদিকে সফলতা এলেও কয়েক বছর পর প্রদর্শনী বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলেন। দলের লোকজন নিয়ে জুড়ে গেলেন জার্মানির ভিয়েনা সার্কাসদলের সঙ্গে। ভিয়েনা সার্কাস যখন ফিরে গেল নিজের দেশে, বালাজীকে দিয়ে গেল তাঁবু,সাজসরঞ্জাম যাতে তিনি আবার নতুন করে সার্কাসদল চালু করতে পারেন । বালাজী আর সে পথে গেলেন না। ১৯৭৮য় সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে প্রতেককে ভারতে ফেরত পাঠালেন। বিংশ শতাব্দীর পাঁচ ও ছয়ের দশকের গ্রেট ইস্টার্ন সার্কাসের তাঁবুর আলো নিভে গেল চিরতরে।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply