সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ১৮। বরুণদেব

গত পর্বের পর

বিশ্ব সার্কাসের এরিনায় যে দু’টি সার্কাস ভারতীয় সার্কাসের বিজয়কেতন উড়িয়েছিল সে দুটি হলো- গ্রেট রয়্যাল সার্কাস আর কমলা সার্কাস।

মহারাষ্ট্রের রত্নগিরির কাছে এক গ্রামে ১৯১৬ সালে জন্ম গ্রেট রয়্যাল সার্কাসের মালিক প্রফেসর নারায়ণ রাও ওয়ালাওয়াকরের। শৈশবেই পিতৃ-মাতৃহীন। এগারো বছর বয়সে বাধ্য হয়ে আশ্রয় সার্কাসের তাঁবুতে। ১৯০৯ সালে চালু হওয়া মধুস্কর সার্কাসের শিকারখানায়, যেখানে বন্য জন্তুদের রাখা হয়, পাশপাশি কাজ পড়ে সার্কাসের রসুইখানায়। একসময় হয়ে গেলেন রিংবয়। অবসর সময়ে সিনিয়রদের কাছে তালিম নেওয়া।  আঠারো বছর বয়সে ফ্লাইং ট্রাপিজ আর্টিস্ট। পাশাপাশি পশু প্রশিক্ষক। রিঙে দেখাতেন বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ের খেলা। মধুস্কর সার্কাসে বেতন বাড়ছিল না। গুরু সিথারাম পন্থের  সঙ্গে ১৬ বছর কাটিয়ে গুরুর সঙ্গ ছাড়লেন।  এক ট্রুপ তৈরী করে সার্কাসে সার্কাসে ঘুরলেন। ঘুরলেন গোটা ভারত। ১৯৪৬ সালে মধুস্কর সার্কাসের মালিকের মৃত্যু হলে গুরু সিথারাম পন্থ শিষ্যকে ডেকে নিলেন। দুজনে মিলে সার্কাস চালাতে লাগলেন।  নতুন নাম দিলেন- গ্রেট রয়্যাল সার্কাস। তাঁদের পরিচলানায় গ্রেট রেমনের মতো প্রথম সারির সার্কাসের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠল এ সার্কাস। এবার লক্ষ্য বিদেশ সফর।১৯৬২ সালে বিদেশ সফরের তোড়জোড় শুরু হলো যখন, গুরু সিথারাম পন্থের হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু। সার্কাসের তাঁবু  তখন বম্বের মেরিন ড্রাইভে। এই অকস্মাৎ বজ্রপাতেও সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটলেন না নারায়ণ রাও। সেই বছরই বিদেশে দিলেন পাড়ি।

প্রথমে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে, তারপর সোমালিল্যাণ্ড, ইথিওপিয়া। আদ্দিস আবাবায় ইথিওপিয়ার সম্রাট হাইলি সালাসির ভূয়সী প্রশংসা পেল সার্কাস। সাতটা সিংহ শাবক উপহার দিলেন সম্রাট। পাঁচ মাসের জন্য সার্কাস পাড়ি দিলো সুদানে। সুদান থেকে কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, বেইরুট, সিরিয়া, জর্ডন, কুয়েত। প্রত্যেক জায়াগায় ভূয়সী প্রশংসা, প্রচুর অর্থাগম। এবার পূর্ব আফ্রিকার কেনিয়া, উগাণ্ডা, তানজানিয়া, মরিশাস। জাহাজ ভাড়া করে, এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং বিমান ভাড়া করে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে, ভারতের সার্কাস ইতিহাসে রেকর্ড তৈরী করে গ্রেট রয়্যাল। পৌঁছাল সিঙ্গাপুর। সেখান থেকে মালয়শিয়ার শহরে শহরে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘুরল। ১৯৬৯-এ ইন্দোনেশিয়া। ১৯৭০-৭১-এ প্রথম ভারতীয় সার্কাস হিসাবে যোগ দিলো জাকার্তা মেলায়। প্রায় দুই দশক ধরে বর্হিবিশ্বে ভারতীয় সার্কাসের প্রতিনিধিত্ব করেছে গ্রেট রয়্যাল। তাঁবুতে সার্কাসের পতাকার পাশে পতপত করে উড়েছে ভারতের জাতীয় পতাকা।

প্রফেসর নারায়ণ রাও ছিলেন খুব দয়ালু মানুষ। দীন দরিদ্রের জন্য টাকা খরচ করে গিয়েছেন যেমন, তেমনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও দান করে গিয়েছেন অকাতরে। ১৯৮৩-র সেপ্টেম্বরে ভারতীয় সার্কাসের এই কিংবদন্তীর মৃত্যু হলে সার্কাসের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাঁর ছেলে।

গ্রেট রয়্যালের আগে বর্হিবিশ্বে ভারতীয় সার্কাসের বিজয়রথ ছুটিয়েছিল প্রফেসর দামোদরনের কমলা সার্কাস।

কান্নুরের মন্দন টিচার ছিলেন একজন দক্ষ সার্কাসশিল্পী ও ট্রুপ লিডার। তাঁর ভাই কুমারন টিচার কেরালার কাসারগোদ অঞ্চলে ‘ভারত রিফাইন্ড সার্কাস’ নামে একটা ছোট্ট সার্কাস খোলেন। কিছুদিনের মধ্যে দল পরিচালনার ভার তুলে দেন ভাই মন্দনের হাতে। মন্দন নতুন নাম দেন- দ্য গ্রেট মন্দন গ্র্যান্ড ভ্যারাইটি শো। কিছুদিনের মধ্যে আর্থিক সমস্যায় পড়ল সে সার্কাস। কান্নুরের এক হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত জিমন্যাস্টিক্স প্রশিক্ষক কৃষ্ণান টিচার ছিলেন প্রফেসর কীলেরির ছাত্র। মন্দন তাঁর স্মরণাপন্ন হলেন। কৃষ্ণান ছিলেন মন্দনের সার্কাস শিক্ষাগুরুও। কৃষ্ণান কিনে নিলেন সার্কাসটা। নতুন নাম হলো- সাউথ ইন্ডিয়ান লেডিস সার্কাস। লেডিস শব্দটি স্রেফ নেমসেক। মহিলা শিল্পীদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার জন্য। সার্কাসে মহিলাদের পাশাপাশি অনেক পুরুষ শিল্পীও ছিলেন। সাউথ ইন্ডিয়ান লেডিস সার্কাস দক্ষিণ ভারত ছেড়ে বেরোয়নি।  ১৯৩৮ সালে কৃষ্ণানের মৃত্যু হলে তাঁর ছেলে দামোদরন দায়িত্ব নিলেন দলের। ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়াশোনা করা  দামোদরন ভারতের সার্কাস ইতিহাসে প্রথম কলেজ পড়ুয়া সার্কাস উদ্যোক্তা। শিক্ষিত ভারতীয়রা সার্কাসকে পেশা হিসাবে খুব একটা গ্রহণ করেনি।  দামোদরনের সার্কাসের রোল মডেল ছিল ইউরোপিয়ান ও আমেরিকান সার্কাসগুলি।

১৯৪৩ এ মাদ্রাজের জেমিনি স্টুডিওর এস এস ভাসান যোগাযোগ করেন দামোদরনের সঙ্গে, উদ্দেশ্য,  একটি ফিচার ফিল্ম বানানো। দামোদরনের সার্কাস তাঁবুতে সেই ফিল্মের শুটিং হলো। এই তামিল ছবি ‘চন্দ্রলেখা’ ভারতীয় সার্কাসের পটভূমিকায় প্রথম ছবি।  দামোদরনের বেশ কিছু টাকা উপার্জন হলো সেখান থেকে। সেই টাকা দিয়ে তিনি বিদেশে তাঁর সার্কাসকে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করলেন, সার্কাসের নতুন নাম দিলেন, তাঁর সদ্যোজাত মেয়ের নামে –  কমলা সার্কাস। কমলা সার্কাস দেড় বছর ধরে ঘুরল শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শহরে শহরে।  ধীরে ধীরে ভারতের এক বিখ্যাত সার্কাস হয়ে উঠল, হয়ে উঠল এশিয়ার বৃহত্তম সার্কাস। আমেরিকার রিংলিং ব্রাদার্স এন্ড বারনাম এন্ড ব্রেইলির পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সার্কাস হিসেবে প্রশংসা পেল। একটানা দশ বছর ধরে সিঙ্গাপুর, মালয়, মালাক্কা, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, বোর্নিও, হংকং, সাঙ্ঘাই, ব্যাঙ্কক, রেঙ্গুন  ঘোরার রেকর্ড করল। এই দশ বছরের মধ্যে সার্কাসে সদস্য সংখ্যা হয়ে গেল পাঁচশো জন।

প্রফেসর দামোদরন লাখ লাখ টাকা বিভিন্ন চ্যারিটিতে দান করেছেন। স্কুলের জন্য, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য, স্টেডিয়ামের জন্য। তিরিশ বছরের সার্কাস জীবনে শ’য়ে শ’য়ে পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর মতো ছিল, সার্কাস নিছক বিনোদন নয়, বরং শারীরিক সংস্কৃতির শিল্প।  তিনি বলতেন, আমি চাই আমার সার্কাসের প্রত্যেক শিল্পীর আমার মতোই নাম ছড়াক। বলতেন, আমি চাই আমার অর্জিত প্রত্যেক টাকা সার্কাস শিল্পের জন্য খরচ হোক। ভারতীয় সার্কাসের উন্নতির জন্য একসময় থালাসেরির কাছে কাদিরুরে সার্কাস কলেজ স্থাপনের জন্য পরিকল্পনা করলেন। কলেজের জন্য দুটো বাড়ি তৈরী হলো, সাজসরঞ্জাম এলো। এই সময়েই পড়লেন আর্থিক সমসায় । শরীরও  সাথ দিলো না। দামোদরন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সারকারের কাছে বারবার আবেদন নিবেদন করলেন তাঁর স্বপ্নের সেই কলেজ চালু করার জন্য। সে আবেদন নিবেদন বিফলে গেল।  ১৯৬৬-র ১৪ই এপ্রিল কিডনির অসুখে ভুগে চলে গেলেন।  তাঁর মৃত্যুর পর কলেজের বাড়ি দু’টিও বিক্রি হয়ে গেল। একটি সার্কাসীয় স্বপ্নের অপমৃত্যু।

দামোদরনের মৃত্যুর পর কমলা সার্কাসের দায়িত্ব নিলেন তাঁর বড়ো ছেলে রবি। নাম দিলেন জুপিটার সার্কাস। বাবার মতো সুনাম নিয়ে চালাতে পারলেন না। বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি, সার্কাস-কলেজের জমি বাড়ি একে একে সব বিক্রি করে দিয়ে দশ বছর চালালেন। ১৯৭৬ সালে মধ্যপ্রদেশের বিণায় তাঁবু পড়ল যখন, ততদিনে ঋণে ঋণে জর্জরিত। সাহায্য করার কেউ নেই। এক রাতে রবি ও তাঁর পার্টনাররা তাঁবু ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। সার্কাসকর্মী, শিল্পী সকলে পড়লেন বিপদে। উপোস করা ছাড়া উপায় নেই। স্থানীয় মানুষ অর্থ সাহায্য করে তাদের বাড়ি পাঠাল। প্রায় শ’খানেক কর্মী, বেশিরভাগই থালাসেরির, শূন্য পকেটে বাড়ি ফিরল।  মধ্যপ্রদেশের বনদপ্তর বন্যপ্রাণীগুলিকে হেফাজতে নিল। দেশে তখন জরুরি অবস্থা চলছে। সার্কাস মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া বেতন  আদায় করার জন্য সার্কাসশিল্পীরা কান্নুরের ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরের দ্বারস্থ হলেন।  নোটিশ গেল  সার্কাস কর্তৃপক্ষের কাছে। কর্তৃপক্ষ কালেক্টরের কাছে হাজির হয়ে সময় চাইলেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেও টাকা জোগাড় হলো না। এর মধ্যে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হয়েছে। কালেকটরের ক্ষমতাও ততদিনে এ ব্যাপারে আর নেই। জুপিটার সার্কাসের ম্যানেজার ভাস্করন ও টেলার কাম টেন্ট মেকার রাঘবন সাংবাদিক ও লেখক শ্রীধরন চম্পদের কাছে সাহায্য চাইলেন। শ্রীধরন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে দরবার করলেন। প্রত্যেকে তাঁদের সমর্থন জানালেন। সার্কাসকর্মীরা এবার ধরলেন গান্ধীজির পথ। কাদিরুরে রবিন্দ্রনের বাড়ির বারান্দায় এক সকালে ধর্নায় বসে গেলেন। সে ধর্নায় কোনো রাজনৈতিক পতাকা নেই, স্লোগান নেই। ঘন্টা খানেকের মধ্যে রবিন্দ্রন আলোচনায় বসলেন।

ঐ গ্রামের কাছাকাছি এক কাজুবাদামের বাগান ছিল রবিন্দ্রন আর তাঁর বোনেদের। একটা কমিটি করে সেই কমিটির হাতে কাজুবাদাম চাষের অধিকার দেওয়া হলো। মালিক, সার্কাসকর্মী ও মধ্যস্থতাকারী- প্রত্যেক পক্ষ থেকে দু’জন করে নিয়ে ছ’জনের কমিটি হলো। সেই বাগান থেকে কাজু সংগৃহীত হলো। সেই কাজু বাজারে বিক্রি হলো। সেই টাকা থেকে কর্মী ও শিল্পীদের বেতন হলো। আর কমলা সার্কাস সার্কাস ইতিহাসের এক অধ্যায় হয়ে হারিয়ে গেল চিরতরে।

ঋণে জর্জরিত হওয়া সার্কাস ব্যবসার বিধিলিপি। আর্থিক ঝুঁকিকে সঙ্গী করে বছরের পর বছর পথ চলা। একদিন ঋণে ডুবে গিয়ে চিরদিনের জন্য তাঁবু গুটিয়ে নেওয়া। সে সার্কাস ছোটো হতে পারে, বড়ো হতে পারে, সার্কাস জগতের নক্ষত্র হতে পারে। সার্কাসের সমাপ্তির শোকগাথা একই সুরে বাঁধা। সে সুর বিয়োগান্তক তো বটেই, কখনো কখনো শিউরে ওঠার মতো, যেমন, আপ্পু সার্কাস।

১৯৮০ সালে দিল্লীতে বসেছিল নবম এশিয়ান গেমসের আসর। ম্যাসকট –  আপ্পু, এক ছোট্ট হাতি। জনমানসে এই প্রতীকটি নিয়ে সেদিন প্রবল উন্মাদনা। এই ‘আপ্পু’ নামের সুযোগটা নিল অ্যাপোলো সার্কাস। তাদের সার্কাসে একটা ঘর বানিয়ে সেখানে রাখল একটা বাচ্ছা হাতি। নাম দিলো – ‘আপ্পু কা ঘর’। প্রচার করল, এশিয়ান গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য গেমস কর্তৃপক্ষ এই বাচ্ছা হাতিটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছে অ্যাপোলো সার্কাসকে । বিশ্ব জুড়ে খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। পরে বোঝা গেল, কর্তৃপক্ষ তাদের সার্কাসের প্রচারের জন্য এই ভুয়ো খবর ছড়িয়েছে। এশিয়ান গেমসের বাজারে নতুন নতুন সার্কাস উঠে এলো এই ‘আপ্পু’ নামটি ব্যবহার করে। নেপালের কিছু শিল্পী নিয়ে একটা ছোট্ট সার্কাস , গ্রেট আপ্পু সার্কাস, এমনই একটি। কেরালার কান্নুর জেলার এক জ্যোতিষী কান্নান এই সার্কাসটা কিনে নিলেন। কান্নান সপরিবার থাকতেন ব্যাঙ্গালোরে। সার্কাস চালাতে গিয়ে আর্থিক দূরবস্থায় পড়লেন। ঋণ নিলেন সার্কাসেরই এক ম্যানেজার প্রভাকরনের কাছে। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও ঋণ শোধ করতে পারলেন না। বারবার প্রভাকরন তাগাদা দিতে থাকেলন, কান্নান কান দিলেন না তাতে। একদিন প্রভাকরন মরিয়া হয়ে চলে গেলেন কান্নানের বাড়িতে। হাতে এক ক্যান পেট্রল। কথা কাটাকাটি হলো। কান্নান টাকা দিলেন না, কবে দেবেন কিছুই বললেন না। ক্রুদ্ধ প্রভাকরন পেট্রল ছুড়ে দিলেন কান্নানের গায়ে। দেশলাই জ্বালালেন। মুহূর্তের মধ্যে সারা ঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাদ গেলেন না প্রভাকরন নিজেও। কান্নানের মেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাবাকে বাঁচাতে। হাসপাতালে মৃত্যু হলো সকলের– কান্নান, প্রভাকরন, কান্নানের মেয়ের। এবং গ্রেট আপ্পু সার্কাসেরও।

ভারতীয় সার্কাসের ইতিকথায় পারস্পরিক রেষারেষি ও অন্তর্দ্বন্দ্বে বারে বারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দুই দলের কর্ণধাররা। আবার সমঝোতাতেও এসেছেন।

দক্ষিণ মালাবারের এক প্রান্তিক গ্রাম পল্লিপুরাম। ১৯০৯ সালে সেই গ্রামে জন্ম কে এস মেননের। হাইস্কুলে পড়তে পড়তে পড়াশোনা ছেড়ে যোগ দিলেন রেমন সার্কাসে। বিজ্ঞাপনের কাজ। কয়েক বছর পর সার্কাসের তাঁবু ছেড়ে রেলের শ্রমিক। সে কাজে মন বসল না। মন পড়েছিল ফেলে আসা সেই সার্কাসের তাঁবুতে। প্রফেসর গোপালনের সঙ্গে দেখা করে আবার গ্রেট রেমনে ঢুকলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসাবে। বাকি জীবন আর সার্কাসের তাঁবু ছাড়েন নি। ন্যাশনাল, গ্রেট ইস্টার্ন, গ্রেট ওরিয়েন্টাল। জেমিনি  ও হোয়াইটওয়ে সার্কাসে ছিলেন নির্দেশক হয়ে, বহিষ্কৃতও হলেন। এই সময় তিনি হোয়াইটওয়ে সার্কাসের প্রখ্যাত সাইক্লিস্ট পাপ্পুর নির্দেশক ও প্রশিক্ষকও ছিলেন।  পাপ্পুকে হোয়াইটওয়ে সার্কাসের মালিকানা থেকে হটিয়ে দিয়ে সিজ করে দিলেন সার্কাস। তারপর সেই সার্কাসই নতুন নামে চালু করলেন- গ্রেট জেমিনি সার্কাস। গ্রেট জেমিনি ও জেমিনি এই দুই সার্কাসের মধ্যে ফারাকটা বুঝতে পারত না সাধারণ দর্শক। কিছুদিন পর কে শ্রীধরন, কে বালান ও সুদর্শন লিজে নিয়ে নেন গ্রেট জেমিনি। হাওড়ায় তাঁবু পড়ল দুটি সার্কাসের। প্রফেসর গোপালনের গ্রেট রেমন সার্কাস। আর মেননের গ্রেট জেমিনি সার্কাস। প্রতিযোগিতায় পেরে উঠল না গ্রেট জেমিনি। সে সার্কাস থেকে বেশিরভাগ শিল্পী চলে গেল গ্রেট রেমনে। রাতারাতি বাকিদের নিয়ে মেনন চলে গেলেন আসামে। সেখান থেকে ফিরে গ্রেট রেমনের সঙ্গে সমঝোতা করে প্রফেসর গোপালনের সঙ্গে চালু করলেন এক নতুন সার্কাস- রিজেন্ট সার্কাস। এক সময় মেনন রিজেন্ট সার্কাসের নাম বদলে দিলেন জনতা সার্কাস। দু’বছর পর পার্টনারশিপ তুলে নিয়ে চালু করলেন এক নতুন সার্কাস- ভারত সার্কাস। মেননের নেতৃত্বে ভারত সার্কাস প্রথম সারির  সার্কাসদল হয়ে গেল । ১৯৭৮ এ কোয়েম্বাটুরে মেননের মৃত্যু হলে সার্কাসের দায়িত্বে এলেন তাঁর ছেলে মোহন। ১৯৮০তে এক পথ দুর্ঘটনায় মোহনের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু। সার্কাসের দায়িত্ব নিলেন শ্রীমতী কল্যাণী মেনন ও তাঁর মেয়ে গীতা। কোয়েম্বাটুর ক্যাম্পে ভারত সার্কাসের কর্মীরা স্ট্রাইক ঘোষণা করল। চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল ভারত সার্কাস।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply