সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ১৭। বরুণদেব
প্রফেসর কীলেরির আর এক শিষ্য থালাসেরির সি কে আম্বু। থালাসেরির থিরুভাঙ্গাদ অঞ্চলের বাসিন্দা, কীলেরির প্রশিক্ষণকেন্দ্রে হাতেখড়ি। কীলেরির ইন্সটিটিউট থেকে বেরিয়ে থালাসেরির নিকটবর্তী গ্রামগুলি থেকে বেশ কিছু সার্কাসের মহিলা ও পুরুষ শিল্পীদের নিয়ে একটি ট্রুপ গঠন করলেন। ১৯১৭ সালে তাঁর ট্রুপ নিয়ে ম্যাঙ্গালোরে শেশাপ্পা সার্কাসে যোগ দিলেন । সেখান থেকে পরশুরাম লায়ন সার্কাস। ১৯৩০-র শুরুর দিকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিবাদের কারণে আম্বুর ট্রুপকে সার্কাস থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। বলা হলো, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দলবল নিয়ে তাঁবু ছেড়ে চলে যাও। আম্বু নাগপুর আদালতের দ্বারস্থ হলে আদালত সার্কাস কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিলো সমস্যা সমাধানের। আম্বু শপথ নিলেন, জীবনে আর কোনো সার্কাসে তিনি কাজ নেবেন না, নিজের সার্কাস খুলবেন।
১৯৩২ সালে মহারাষ্ট্রের আকোলার কাছে কাটোল অঞ্চলে শুরু করলেন ছোট্ট একটা সার্কাস- গ্র্যান্ড ফেয়ারি সার্কাস। সার্কাসের নামকরণ করলেন আম্বুর গুরু প্রফেসর কীলেরি। খুব কম সময়ের মধ্যে এই সার্কাস ভারতে খ্যাতি লাভ করল। রোপ ড্যান্স, ল্যাডার ব্যালান্স, সাইকেল স্টান্ট, অয়্যার ড্যান্সের মতো পুরুষপ্রধান খেলাগুলিতে মহিলা শিল্পীদের নিয়ে এলেন আম্বু। এইসব খেলায় মহিলা শিল্পীরা জনপ্রিয় হলো, তৈরী হলো এক পরম্পরা। ভারতীয় সার্কাসে প্রথম মহিলা রোপ ড্যান্সার হলেন আম্বুর শিষ্যা থাত্তারী লক্ষ্মী। সার্কাসের রিঙকে এক সৃজনশীল শিল্পকলায় পরিণত করলেন আম্বু, নিয়ে এলেন ভারতীয় ধ্রুপদী ঘরানার নৃত্য। অন্য সার্কাসগুলিও তাঁকে অনুসরণ করল। ৬৮ বছর বয়সে ১৯৫৮ সালে অম্বু মারা গেলেন যখন, সার্কাসের দায়িত্ব নিলেন তাঁর ভাইপো কে ভি রমন ও কুনহিরামান। কয়েক বছর পর সার্কাস যখন আর্থিক দূরাবস্থায় পড়ল, কুনহিরামান সার্কাস ছেড়ে তাঁর গ্রামে ফিরে গিয়ে কৃষিকাজ নিয়ে থাকলেন। রমন দ্বিধাগ্রস্থ ছিলেন সার্কাস চালাবেন নাকি বন্ধ করে দেবেন। এর মধ্যে এক সার্কাসকর্মী আদালতে গেলেন বকেয়া বেতনের জন্য। রমন কিছুতেই ঋণের হাত থেকে রেহাই পেলেন না। শেষ পর্যন্ত ১৯৮২ তে রাজস্থানে তাঁবু গোটাল গ্র্যান্ড ফেয়ারি সার্কাস ।
প্রফেসর কীলেরি এতই জনপ্রিয় ছিলেন যে তাঁর নাম করে তাঁবুতে দর্শক টানার চেষ্টাও হয়েছে। ১৯৩০ এর দিকে গ্র্যাণ্ড ‘কেরালা সার্কাস’-এর ব্যানারে একটি সার্কাস খোলেন ও কে আপ্পা। হ্যান্ডবিলে লেখা হয় – এই সার্কাসের প্রত্যেক শিল্পী কীলেরির ছাত্রছাত্রী । লেখা হয় – এক পূর্ণবয়স্ক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সাথে লড়াই দেখানো হবে। এই সার্কাস খুব বেশিদিন চলল না। তাঁবু ছেড়ে সার্কাসে সার্কাসে বাঘ ভাড়া দেবার ব্যবসায় নেমে পড়লেন ও কে আপ্পা।
ভারতীয় সার্কাসের স্বর্ণযুগে ভারতীয় সার্কাসকে শাসন করত মালোয়ালিরা। ১৯৬০এর প্রথম দিকে ভারতে বাহান্নটা বড়ো সার্কাস, এর মধ্যে বিয়াল্লিশটি মালোয়ালিদের মালিকানায়। নব্বই শতাংশের বেশি সার্কাসশিল্পী, ম্যানেজার মালোয়ালি। মালাবার অঞ্চলের শ’য়ে শ’য়ে ছেলেমেয়ে সার্কাসের তাঁবুতে খাবার আশ্রয় অর্থই শুধু পায় নি, খুঁজে পেয়েছিল আত্মপরিচয়। বড়ো সার্কাসদলের পাশাপাশি উঠে এসেছে বহু ছোটো ছোটো সার্কাস। এরকমই একটি সার্কাস কিট্টুনি সার্কাস। কিট্টুনি কখনো তাঁর সার্কাসকে বড়ো সার্কাস হতে দেন নি। তিনি নিজেই মালিক কাম ম্যানেজার। কাউণ্টারে বসে টিকিট বিক্রি করছেন। আবার তিনি নিজেই সার্কাসের প্রধান শিল্পী। ধূসর-কালো কোট,ঢোলা প্যান্ট,মাথায় টুপি, চার্লি চ্যাপলিনের মতো সাজ। ছোরার খেলা দেখাচ্ছেন রিঙে, আবার ভাল্লুক বাঁদরদের নিয়ে হাজির হচ্ছেন দর্শকদের সামনে। দরকার পড়লে নিজেই পেট্রোম্যাক্সে আলো জ্বালাচ্ছেন। তিনি তাঁর ছোট্ট সার্কাস নিয়ে বছরভর ঘুরে বেড়াচ্ছেন মালাবার ও দক্ষিণ কর্ণাটকের শহরে শহরে। এই ছোট্ট সার্কাসটিই প্রেরণা জোগালো এক চতুর্থ শ্রেণির বালককে। মুরকোথ ভেংগাকান্দি শঙ্করন। সেই বালকটি একদিন হয়ে উঠল ভারতীয় সার্কাসের এক কিংবদন্তী।
কান্নুরের কাছে চেরুকুন্নুতে ১৯২৪ এর ১৩ জুন জন্ম শঙ্করনের। বাবা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। কিট্টুনির সার্কাস দেখার দু’বছর পর ১৯৩৭ সালে ভর্তি হলেন প্রফেসর কীলেরির সার্কাস ইন্সটিটিউটে। এর কয়েক বছর পরই কীলেরির মৃত্যু। ট্রেনিং শেষ করতে পারলেন না শঙ্করন। সপ্তম শ্রেণিতে স্কুলের পাট চুকিয়ে ১৯৪০-এ দাদার সঙ্গে থালাসেরি শহরে একটা ছোট্ট ব্যবসা শুরু করলেন। ব্যবসা সফল হলো না। সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। মালাবারের ছেলেরা দলে দলে যোগ দিচ্ছে মিলিটারিতে। ১৯৪২-এ শঙ্করনও সেই পথে পা বাড়ালেন। মাদ্রাজে ছ’মাসের প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ করে এলাহাবাদ, অয়্যারলেস অপারেটের কোর্সের ট্রেনিং। কোর্স শেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে পোস্টিং। চার বছর পর মিলিটারি সার্ভিস থেকে অবসর নিয়ে ফিরে গেলেন সেই সার্কাস ইন্সটিটিউটে। কীলেরির মৃত্যুর পর এম কে রমন সে ইন্সটিটিউটের দায়িত্বে। সেখানে হরাইজেন্টাল বার ও ফ্লাইং ট্রাপিজে দক্ষ শিল্পী হয়ে উঠলেন শঙ্করণ। সার্কাসযাত্রা শুরু কোচিনে এক ছোট্ট সার্কাস থেকে। কয়েক মাস থাকলেন,তারপর আরও কয়েকটা ছোটোখাটো সার্কাস। পরের বছর ডাক পেলেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সার্কাসে। সেখানে দেড় বছর কাটিয়ে গেলেন গ্রেট রেমন সার্কাসে। নাগপুরের কাছে বাটাপারায় এক প্রচন্ড ঝড়ে তাঁবু তছনছ হয়ে গেল। সার্কাসের প্রত্যেক কর্মীর কাছে নির্দেশ এলো তাঁবু সেলাইয়ের। মেনে নিতে পারলেন না শঙ্করন। বেরিয়ে গেলেন গ্রেট রেমন ছেড়ে। যোগ দিলেন গ্রেট বম্বে সার্কাসে। গ্রেট বম্বে তখন ছোটো এক সার্কাস।
গ্রেট রেমনে থাকাকালীন শঙ্করনের কাছে খবর এলো, গুজরাটের একটা সার্কাস কোম্পানি বিক্রি আছে। দু’টি পোলের সার্কাস, দুটো সিংহ, একটা হাতি আর কিছু সার্কাসীয় সাজসরঞ্জাম, ছোট্ট সার্কাস- বিজয় সার্কাস। শঙ্করন তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী সহদেবনকে পাঠালেন দরদাম করতে। দাম দিলেন পাঁচ হাজার টাকা। মালিক এই দামে রাজি নয়। শঙ্করন যখন গ্রেট বম্বে সার্কাসে চলে এলেন, আবার পাঠালেন সেই বন্ধুকে। এবার দাম দিলেন ছ’হাজার টাকা। চুক্তিপত্র হলো, এক হাজার টাকা অগ্রিম, দু’হাজার টাকা সার্কাসের জন্তু জানোয়ার সাজসরঞ্জাম পাঠানো হলে, বাকি তিন হাজার টাকা তিন মাস পর। শঙ্করন ও তাঁর বন্ধু সহদেবনের যৌথ অংশীদারিত্বে এলো জেমিনি সার্কাস। যুক্ত হলেন সাইক্লিস্ট ও ফ্লাইং ট্রাপিজ শিল্পী টি কে কুনহিকান্নান। এই তিন তরুণ তুর্কীর চেষ্টায় স্বল্প সময়ের মধ্যে জেমিনি সার্কাস ভারতীয় সার্কাসের জগতে স্বনামধন্য হয়ে ওঠে। ১৫ই অগস্ট,১৯৫১-য় গুজরাটের বিল্লিমোরিয়ায় পথ চলা শুরু। পাঁচ বছরের মধ্যে জেমিনি সার্কাস ভারতের বিখ্যাত সার্কাস হয়ে উঠল। এতটাই বিখ্যাত যে ১৯৫৮-য় দিল্লীর লাল কেল্লায় তাঁবু পড়লে সার্কাস দেখতে এলেন জহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধী, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, ভি কে কৃষ্ণ মেনন, সুশীলা নায়ার, ডঃ জাকির হুসেন, ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ। বিভিন্ন সময়ে জেমিনি সার্কাসের তাঁবুতে খেলা দেখতে এসেছেন মার্টিন লুথার কিং, মাউন্টব্যাটন, দলাই লামা ও আরও বিশিষ্ট ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিবর্গ। শঙ্করণের এই জেমিনি সার্কাস হয়ে উঠেছিল ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের এক সেতু। সহদেবনের মৃত্যুর পর চূড়ান্ত সঙ্কটে পড়ে জেমিনি সার্কাস। শঙ্করনের দুই পুত্রের প্রচেষ্টায় কৌলিন্য আসে ফিরে। ১৯৭৭ সালে শঙ্করন অমর সার্কাসের প্রতিষ্ঠাতা কে পি হেমরাজ ও ন্যাশনাল সার্কাসের প্রতিষ্ঠাতা টি পি নারায়ননকে নিয়ে নতুন সার্কাস দল খোলেন – জেমিনি ইন্টারন্যাশনাল। লক্ষ্য, বিদেশে প্রদর্শনী। দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ কেনিয়া, জাম্বিয়া, তানজানিয়ায় প্রদর্শনীর উদ্যোগ নেওয়া হলো। কিন্তু আঞ্চলিক প্রশাসনের অসহযোগিতায় ফিরে এলো দল। বিদেশে সাফল্য না এলেও দেশে জেমিনি প্রথম সারির সার্কাস হয়ে ওঠে, সার্কাস দুনিয়ায় শঙ্করন বিখ্যাতই হয়ে গিয়েছিলেন জেমিনি শঙ্করন নামে।
(ক্রমশ)
