সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ১৬। বরুণদেব
শুধু ভারতে নয়, গোটা সার্কাসবিশ্বে কীলেরি একজন শ্রদ্ধার ব্যক্তি। যাঁদের জন্য ভারতের সীমা ছাড়িয়ে কীলেরির নাম ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁদের একজন কান্নান বোম্বায়ো। ৩০শে মে ১৯০৭ এ থালাসেরির এক কৃষক পরিবারে জন্ম কান্নানের। সাত বছর বয়সে কীলেরি কান্নানকে নিজের ট্রেনিং ইন্সটিউটে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেন। কান্নান যখন দশ বছর, শেশাপ্পা সার্কাসের থালাসেরি ক্যাম্পে যোগ দেন ট্রুপ মেম্বার হিসেবে। কাকা কীলেরি কুনহিকান্নান(জুনিয়র) হোয়াইট ওয়ে সার্কাস খুললে সেখানে যোগ দেন বাউন্সিং রোপ আর্টিস্ট হিসেবে ।
ছত্রের সার্কাসের ট্রুপ লিডার হিসাবে কেরিয়ার শুরু করা কীলেরি কুনহিক্কান্নান (জুনিয়র) প্রথম মালোয়ালি যিনি বিদেশ থেকে আনা কিছু বন্য প্রাণী, নানারকম সাজসরঞ্জাম, ইটালি বেলজিয়ামের ট্রুপ, চিনের শিল্পীদের নিয়ে এক গ্ল্যামারাস সার্কাস খুলেছিলেন, ১৯২২এ, কেরালার ত্রিচুরে, – হোয়াইট ওয়ে সার্কাস। সার্কাস চালাতেন পুরোপুরি ইউরোপিয়ান স্টাইলে। ভাইপো কান্নান ধীরে ধীরে সে সার্কাসের দৈনন্দিন বিষয়গুলিও দেখভাল করতে শুরু করেন। হোয়াইট ওয়ে সার্কাস বার্মা, সিঙ্গাপুর, মালাক্কা, শ্রীলঙ্কা ও সমগ্র ভারত ঘুরলেও, কখনো তাঁদের নিজের শহর থালাসেরিতে আসে নি।হোয়াইট ওয়ে সার্কাস ইউরোপীয় সার্কাসের সমকক্ষ হয়ে উঠেছিল মূলতঃ কান্নানের জন্যই। ১৯২৮ সালে সে সার্কাস শ্রীলঙ্কায় গেলে কান্নানের জীবন অন্যদিকে বাঁক নেয়। হোয়াইট ওয়ে সার্কাসে ছিল এক ইটালিয়ান ট্রুপ। ট্রুপলিডারের মেয়ে ফিলোমেনা। প্রেমে পড়লেন কান্নান। সেই ইটালিয়ান ট্রুপটি বারটাম মিলস সার্কাসের মতো প্রথম সারির ইউরোপিয়ান সার্কাসের আমন্ত্রণে পাড়ি দিলো লন্ডনে। ফিলোমেনাকে ছাড়া কান্নান জীবন কাটাতে পারবেন না। চেপে বসলেন এক পণ্যবাহী জাহাজে। ততদিনে বাউন্সিং রোপে কান্নানের অসাধারণ ক্রীড়াকৌশলের কথা পৌঁছে গিয়েছে বারট্রাম মিলস সার্কাসের কাছে। লন্ডনে তাঁকে সাদরে গ্রহণ করলেন সার্কাস কর্তৃপক্ষ। ঐ সময়ে ‘বম্বে’ নামটা ‘ইণ্ডিয়া’ নামের থেকেও জনপ্রিয়। বারট্রাম মিলস পরিচয় করালেন কান্নানের – ‘কান্নান বোম্বায়ো’। ঐ নামেই স্বনামধন্য হয়ে গেলেন। বারট্রাম মিলসের রিঙে কান্নানের অভিষেক হলো রাজকীয়ভাবে, হাতির পিঠে চেপে, দুপাশে ছ জন করে নৃত্যরত মেয়ে।
আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় নি কান্নানকে। গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, আমেরিকা বিস্মিত হয়ে গেল কান্নানের খেলা দেখে। বাকিমহাম প্যালেসের রয়্যাল ফ্যামিলি কান্নানের খেলা দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বার্লিনে অ্যাডলফ হিটলার দেখতে এলেন । খেলা দেখে বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন বিশ্বত্রাস হিটলার। খেলাশেষে পরীক্ষা করে দেখলেন কান্নানের জুতো। না, জুতোয় কোনো কারিকুরি নেই। কান্নানকে অটোগ্রাফ দিলেন- ইউ আর দ্য জাম্পিং ডেভিল অফ ইণ্ডিয়া।
আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, ইটালির সম্রাট মুসোলিনি, গ্রেট ব্রিটেনের রাজা ষষ্ঠ জর্জ, কান্নানে মুগ্ধ হওয়া সেলিব্রিটিদের লিস্টটা লম্বা। কান্নানের বেতন সপ্তাহে চারশো ডলার, সেই সময়ের ভারতীয় মুদ্রায় চার হাজার।
১৯৩২এর ১৯ সেপ্টেম্বর নিউ জার্সিতে কান্নান ও ফিলোমেনার চার হাত এক হলো। তিন বছরের মধ্যে এলো সন্তান। ছেলের যখন তিন বছর বয়স, কান্নান প্রশিক্ষণ দিতে লাগলেন ছেলেকে। সুখী সুন্দর এক সার্কাস-পরিবার। সে সুখী পরিবার ভেঙে যেতে সময় লাগল আর চারটে বছর।
কান্নান স্বপ্ন দেখতেন ভারতে ফিরে গিয়ে নিজের সার্কাস দল খুলবেন। বারট্রাম মিলস সার্কাসের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দিয়ে ভারতে ফেরার উদোগ নিলেন। গেলেন ইটালি, শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে দেখা করতে। ইটালি থেকে সংগ্রহ করলেন সার্কাসের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, তাঁবু। স্ত্রী পুত্রকে নিয়ে রওনা দিলেন ভারতের উদ্দেশ্যে। তাঁকে বিদায় জানাতে বন্দরে এলেন ইটালির সম্রাট মুসোলিনি। জাহাজ যখন এথেন্স বন্দরের কাছাকাছি, কান্নান অসুস্থ হয়ে পড়লেন। নিমোনিয়া। জাহাজ এথেন্স বন্দরে পৌঁছানোর আগেই সব শেষ। ১৮ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৩৯, বত্রিশ বছর বয়সে চিরঘুমের দেশে চলে গেলেন কান্নান। জাহাজের ক্যাপ্টেন বুঝেছিলেন, যাঁকে স্বয়ং মুসোলিনি বিদায় জানাতে বন্দরে হাজির হন, তিনি সামান্য মানুষ নন। ক্যাপ্টেন কান্নানের মৃত্যুসংবাদ পাঠালেন মুসোলিনিকে। মুসোলিনির বার্তা এসে পৌঁছাল, কান্নানের স্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী যেন তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। বোম্বের শবরী শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হলো। ভারতে সার্কাস খোলার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। কান্নানের স্ত্রী ও ছেলে থালাসেরিতে এসে কান্নানের আত্মীয়দের সাথে দেখা করলেন, দেখা করলেন কান্নানের গুরু কীলেরির সঙ্গেও। দু’সপ্তাহ পর ফিরে গেলেন ইতালি। প্রিয় শিষ্যের মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেন প্রফেসর কীলেরি। সাত মাসের মধ্যে তিনিও চলে গেলেন। শেষ হলো ভারতীয় সার্কাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের।
——————————————————————————-
সার্কাসবিশ্বে প্রভুত্ব করা ইউরোপীয় সার্কাসকে কান্নান বোম্বায়োর মতোই বিস্মিত করেছিলেন আর এক ভারতীয়। গঙ্গারাম ধোত্রে বা দামু ধোত্রে।মহারাষ্ট্রের পুণেতে জন্ম। দশ বছর বয়সে শেলারস ইন্টারন্যাশনাল সার্কাসে হাতেখড়ি।
বিশ শতকের সূচনা পর্বে সদাশিব রাওয়ের এন কার্লেকর গ্র্যাণ্ড সার্কাস আর্থিক সঙ্কটে পড়লে সার্কাসের পরিচালনায় সদাশিব রাও নিয়ে এলেন আরও দুই অংশীদারকে,ঐ সার্কাসেরই কর্মী – শঙ্কর রাও আর তুকারাম গনপথ শেলার। ১৯১২ সালে সদাশিব রাওয়ের মৃত্যুতে ভেঙে গেল কার্লেকর গ্র্যাণ্ড সার্কাস। গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে শঙ্কর রাও নিজের অংশটুকু নিয়ে কার্লেকর গ্র্যাণ্ড সার্কাস নামে দল চালু রাখলেও অপর অংশীদার, শেলার তাঁর অংশটুকু নিয়ে চালু করলেন নতুন দল- শেলারস ইন্টারন্যাশনাল সার্কাস। গুজরাতের বরোদায় রোমান অ্যাম্পিথিয়েটারের আদলে স্থায়ী সার্কাস থিয়েটার তৈরী করলেন। দর্শক গ্রহণ করল না। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে শেলারস গ্রেট রয়্যাল সার্কাস নাম দিয়ে ভ্রাম্যমান তাঁবুর জীবনে ফিরে গেলেন গনপথ শেলার।
এই গনপথ শেলার ছিলেন দামু ধোত্রের কাকা। কাকার শেলারস ইন্টারন্যাশনাল সার্কাসে সাইক্লিং এর খেলা দেখাতেন দামু। কিন্তু প্রশংসা জুটল না। ছেড়ে দিলেন সাইক্লিং। তেরো বছর বয়সে বন্যজন্তুর প্রশিক্ষণে তালিম নিতে লাগলেন। চার বছরের মধ্যে ভারতীয় সার্কাস তাঁকে চিনল এক দুর্দান্ত পশু প্রশিক্ষক হিসেবে। রিঙে তাদের নিয়ে দুধর্ষ খেলা দেখাতেন। শেলারস ছেড়ে দিয়ে ১৯২৬এ কলকাতায় এস কে গুহর গ্রেট রিংলিং সার্কাসে যোগ দিলেন। তারপর আসাম ডায়মন্ড সার্কাস, এশিয়াটিক সার্কাস, অলিম্পিক সার্কাস, আরও বেশ কয়েকটি সার্কাসে। ১৯৩০ এর দ্বিতীয় ভাগে ধোত্রে চিঠি পাঠালেন কান্নান বোম্বায়োকে। কান্নান তখন আমেরিকার বিখ্যাত রিংলিং ব্রাদ্রাস এন্ড বারনাম এন্ড বেইলিতে। উদ্দেশ্য বিশ্ববিখ্যাত সে সার্কাসে যোগ দেওয়া। কিন্তু কান্নানের অনুরোধে কান দিলেন না কর্তৃপক্ষ।
ফ্রান্সের আলফ্রেড কোর্ট ছিলেন সেই সময়ের এক বিখ্যাত পশু প্রশিক্ষক। আমেরিকা ও ইউরোপে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ধোত্রে তাঁকে চিঠি পাঠালেন কলকাতায় নোঙর করা এক মার্চেন্ট জাহাজের ক্যাপ্টেনের হাত দিয়ে। সঙ্গে পাঠালেন জীবজন্তুকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর কিছু ছবি। আলফ্রেড সন্তুষ্ট হয়ে ডেকে পাঠালেন। ১৯৩৮এ বোম্বে থেকে ফ্রান্সের জাহাজে চেপে পড়লেন ধোত্রে। আলফ্রেডের কাছে তালিম নিয়ে এক বছর অলিম্পিয়াতে বার্ট্রাম মিলস সার্কাসে, তারপর লণ্ডনে ব্ল্যাক পুল টাওয়ার সার্কাসে। সে সার্কাসে দামু পনেরোটা বন্য পশু নিয়ে খেলা দেখাতেন। একটি তুষার চিতাবাঘকে গলায় মাফলারের মতো জড়িয়ে রাখতেন।
ইউরোপের আকাশে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। আলফ্রেড তাঁর দলবল ও জন্তুজানোয়ার নিয়ে ইউরোপ ছাড়ার পরিকল্পনা করলেন। ধোত্রে তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন। এবার আমেরিকার সেই বিখ্যাত সার্কাস রিংলিং ব্রাদার্স এন্ড বারনাম অ্যান্ড বেইলেতে, যেখানে আবেদন করেও সাড়া পাননি একদিন। দামু আমেরিকায় রয়ে গেলেন টানা দশ বছর। এর মধ্যে ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ তিন বছর সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন। যুদ্ধ থামল। ১৯৫০ এ আলফ্রেডের সঙ্গে ফিরলেন ফ্রান্সে। ফ্রান্সে তখন মরক্কোর মুস্তাফা অমর তাঁর চার ভাইয়ের সঙ্গে খুলেছেন অমর সার্কাস। আলফ্রেড ও দামু যোগ দিলেন। কিছুদিন পর আলফ্রেড তাঁর সব বন্য জন্তুকে অমর সার্কাসে বিক্রি করে দিলেন। ওদিকে দামু ধোত্রেও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ১৯৫৩ সালে দামু ফিরলেন ভারতে । আর তাঁবুর জীবনে ফিরলেন না। কুড়ি বছরের অবসর জীবন। ১৯৭৩ এর ২৩শে জানুয়ারি পুণেতে চলে গেলেন। দামুর বন্যজন্তুদের তালিম দেওয়ার পদ্ধতি ছিল বিস্ময়কর। রিচার্ড টাপলিঙ্গার তাঁর বই ‘ডক্টর’-এ দামু ধোত্রের জন্তুজানোয়ারদের তালিম দেওয়ার অভিনব পদ্ধতির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন দামুর অভিনব প্রশিক্ষণ পদ্ধতির। ধোত্রের কাছে বন্য জন্তুরা ছিল নিজের বাচ্চার মতো। তিনি তাদের তালিম দেওয়ার আগে খাঁচার সামনে দীর্ঘ দীর্ঘ সময় কাটাতেন, হাঁটতেন, তাদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাদের বুঝতেন। তাদের মন থেকে ভয় দূর করাটাই প্রথম কাজ। তালিম দিতে গিয়ে একাধিকবার গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। ধোত্রে বলতেন, এ সমস্ত দুর্ঘটনা তখনই আসে যখন প্রশিক্ষক অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়ে, জন্তুজানোয়ারের স্বভাবটাই বন্য, তাদের বুঝতে হয়, ভালোবাসতে হয়,তারা ভীত হলে তবেই আক্রমণ করে।ধোত্রের পড়াশোনা খুব বেশি ছিল না কিন্তু জন্তুজানোয়ারের মানসিক জগত ও আচারআচরণ সম্বন্ধে তাঁর অগাধ জ্ঞান। সেই জ্ঞান অর্জন কেতাবী নয়, নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে।
(ক্রমশ)
