সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ১৫। বরুণদেব

গত পর্বের পর

কীলেরি ছিলেন খোলা মনের মানুষ। সাহসী। তাঁকে ঘিরে নানা কাহিনী।

সে সময় থালাসেরির কোর্টচত্ত্বর ঝোপঝাড়ে ভর্তি। থালাসেরি-কান্নুর রাস্তা চলে গিয়েছে এই ঝোপজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। সূর্যাস্তের পর কেউ সে রাস্তা দিয়ে যেত না, বিশ্বাস, ঐ ঝোপের মধ্যে থাকে এক শয়তান। একা পেলে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে পথিকের ওপর। কীলেরি ঠিক করলেন, তিনি একাই যাবেন সে রাস্তায়। সকলে নিষেধ করল। কীলেরি শুনলেন না। একটা লাঠি নিয়ে এগোলেন। অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে লোকজনকে বললেন- শয়তানটা রাস্তায় পড়ে আছে, যাও দেখে এসো। লোকজন ছুটে গিয়ে দেখল, রাস্তায় পড়ে আছে একটা প্রমাণ সাইজের বনবিড়াল।

উদারমনা, সমস্ত রকমের কুসংস্কার ও বর্বর আচার অনুষ্ঠানের বিরোধী কীলেরিকে মানুষ শ্রদ্ধার চোখে দেখলেও, জাতপাত বিধ্বস্ত ভারতে তাঁর নিজের জাতের গোঁড়া লোকেদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন অপমান, দেখেছিলেন রক্তচক্ষু। জাতপাতদীর্ণ ভারতীয় সমাজে কীলেরি তাঁর মেয়ে কল্যাণীর  বিয়ে দিতে পারেন নি। তাঁর অপরাধ, তিনি  বিয়ে করেছিলেন নিচু জাতে। মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্রাহ্ম হলেন।  সে সময় মালাবারে ব্রাহ্মদের সংখ্যা খুব কম। সে সমাজ থেকে মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র পেলেন না। দুবছর পর খ্রীস্টান ধর্ম নিলেন। নাম নিলেন করুণাকরন। কল্যাণীর বিয়ে হলো থালাসেরির মিশন হাইস্কুলের ক্লার্ক উইলিয়ামের সঙ্গে। ইতিহাস সাক্ষী, যুগে যুগে হিন্দুদের ধর্মান্তরণ যত না তরবারিতে তার থেকেও বেশি জাতপাত অস্পৃশতা রক্তচক্ষুর হিন্দু-আগুনে। নিজ ধর্মের ঘৃণা বিদ্বেষের বর্জ্য থেকে বাঁচতে। জাতের নামে সে বজ্জাতি কীলেরির মতো ভারতীয় সার্কাসকে পথ দেখানো জ্যোতিষ্ককেও রেয়াত করেনি।

পঞ্চাশ বছর মিশন হাইস্কুলে কাটিয়ে ৭৯ বছর বয়সে কীলেরি অবসর গ্রহণ করেন। অবসর নেন নি তাঁর সার্কাস ট্রেনিং ইন্সটিটিউট থেকে। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত কাজ করে গিয়েছেন, তৈরী করেছেন অসংখ্য শিষ্য, তারা বিশ্বমঞ্চে গুরুকে তুলে ধরেছে, তুলে ধরেছে ভারতের সার্কাস ইতিহাসের এক সংগ্রামী আলোকিত অধ্যায়কে।

সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯। ইন্সটিটিউটে যাবার জন্য তৈরী হচ্ছিলেন কীলেরি। হার্ট অ্যাটাক। এক সপ্তাহ পর ভারতীয় সার্কাস থেকে ঝরে পড়ল এক নক্ষত্র। কীলেরিকে  সমাহিত করা হলো থালাসেরির কাছে নেট্টুরে। সমাধিতে লেখা হলো-

‘Sacred to the loving memory of Keeleri Karunakaran (Prof: Keeleri Kunhikkannan), father of Indian Circus who spent his lifetime in the service of the poor and needy. He died as he lived everyone’s friend until God called him home on 11-9-1939 aged 84.’

পরবর্তীকালে সমাধিটি জীর্ণ হলে, সেটি মেরামত করে গুরুপ্রণাম করেন মিসেস এন্ড মিস্টার কল্লন গোপালান, গ্রেট রেমন সার্কাসের মালিক।

কীলেরির মৃত্যুর পর তাঁর সার্কাস ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাঁর শিষ্য এম কে রমন। পরশুরাম সার্কাস, ছত্রের গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস, বিভিন্ন সার্কাস দলে খেলা দেখিয়ে নিজের দল ‘স্টার অফ ইন্ডিয়া’ শুরু করেন রমন।  রমন ছিলেন একঅসাধারণ বারপ্লেয়ার। বিভিন্ন ধরেনের খেলার সাথে দেখাতেন বারের খেলা। সেই সময়ের বিখ্যাত বারপ্লেয়ার বাংলার রমন মুখার্জী থালাসেরিতে তাঁর খেলা দেখে তাঁকে অভিনন্দন জানাতে দু’বার ভাবেন নি। ১৯২৯এর দিকে সার্কাসের তাঁবুকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এলেন থালাসেরিতে, গুরু কীলেরির বাড়ির কাছেই বাড়ি করলেন। কীলেরির সার্কাস ইন্সটিটিউটের দায়িত্ব তুলে নিলেন কাঁধে। ৩১ শে অক্টোবর ১৯৫৯ সালে রমনের মৃত্যু হলে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র বিশ্বনাথন ‘কীলেরি কুনহিকান্নান টিচার এন্ড এম কে রমন মেমোরিয়াল সার্কাস এন্ড জিমন্যাস্টিকস ট্রেনিং সেন্টার’ নামে রেজিস্ট্রেশন করেন সে প্রতিষ্ঠান। তিনিই ছিলেন সেক্রেটারি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচিয়ে রাখার সে প্রচেষ্টা সফল হয় নি। হঠাৎ মৃত্যুর করাল ছায়া নেমে আসে। বিশ্বনাথনের মৃত্যুর পর  সেই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান, ভারতীয় সার্কাসের একের পর এক শিল্পীর জন্মস্থান, স্মৃতি নিয়ে এক ইট কাঠ পাথরের বাড়ি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একা।

——————————————————————–

প্রথম মালোয়ালি সার্কাস হোয়াইটওয়ে সার্কাসের পরবর্তীতে দ্বিতীয় মালোয়ালি সার্কাস উঠে আসে কীলেরি কুনহিকান্নানের শিষ্য কল্লন গোপালনের হাত ধরে।

মাত্র দশ বছর বয়সে কীলেরির সার্কাস ইন্সটিটিউটে শিক্ষানবীশ  হিসেবে যোগ দেওয়া কল্লন গোপালন  হাতের সমস্যার জন্য হরাইজন্টাল বারের খেলায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করতে পারছিলেন না। গুরু কীলেরির পরামর্শে জাগলিং, ফুট অ্যাক্রোব্যাট, ফোরহেড পোল, শোল্ডার পোলের মতো খেলায় প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন। ষোলো বছর বয়সে নিজের দল তৈরী করে যোগ দেন অন্ধ্রপ্রদেশের ইয়াকানাথ মূর্তির দলে। আরও চার বছর পর বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে যাত্রা শুরু করা গুলশান আনোয়ারের বোম্বে জি এ সার্কাসে। কিন্তু সেখানে বেতন অনিয়মিত। কিছু দিনের মধ্যে সে তাঁবু ছেড়ে দিয়ে  মধ্যপ্রদেশের রাতলামের মহারাজা শ্রীমন্থ সজ্জন সিং এর কাছে থেকে ২টি ঘোড়া ও কিছু অর্থ সাহায্য নিয়ে শুরু করলেন নিজের সার্কাসদল। গুরু কীলেরি নাম দিলেন গ্রেট রেমণ্ড সার্কাস। ১৯২৪ সালে রাতলমের রাজপ্রাসাদের নিকটবর্তী মাঠে উদ্বোধন হলো সার্কাসের, উদ্বোধন করলেন মহারাজা সজ্জন সিং। সার্কাসের সামনের গেটে মূল প্রবেশপথের কাঠের সাইনবোর্ডে ভুলক্রমে Raymond এর d বাদ পড়ে গেল,  লেখা হলো Raymon, সার্কাসের নাম ওটাই রয়ে  গেল । কমলা সার্কাসের আগে পর্যন্ত এই গ্রেট রেমন সার্কাস ছিল এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম।

গ্রেট রেমনের তাঁবু আশ্রয় দিয়েছিল এক উদ্বাস্তুকে। ১৯৪৭ এর দেশভাগের দাঙ্গায় বাবা-মা, আত্মীয় স্বজনদের হারিয়ে অনাথ হয়ে যাওয়া পাঞ্জাবের ফিরোজপুরের সাধু। সেই অনাথ বালকবেলাকে গ্রেট রেমন শুধু আশ্রয়ই দেয় নি, শিল্পী করে তুলেছিল, জীবন দিয়েছিল। মাহারাষ্ট্রের সাইক্লিস্ট রাজারামের সহাকারী হিসেবে আশ্রয় পেল সেই বালকবেলা। রাজারাম তাকে খেলা শেখালেন। গ্রেট রেমনের শিল্পী করে তুললেন। ১৯৯০ সালে হার্ট অ্যাটাকে মারা যাবার আগে পর্যন্ত হারকিউলিয়ান, গ্রেট ইস্টার্ণ, জেমিনি, যমুনা, মহারাজা সার্কাস – একের পর সার্কাসের তাঁবুতে গ্লোব অফ ডেথে মোটর সাইকেলের স্টান্ট, ফ্লাইং ট্রাপিজের খেলা দেখিয়ে বিশিষ্ট সার্কাসশিল্পীর সম্মান পেয়েছিলেন সাধু।

গ্রেট রেমন ছাড়াও একধিক সার্কাস কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় গোপালনের উদ্যোগে। বিশ শতকের চারের দশকে হার্মান সার্কাস এমনই এক সার্কাস। ১৯৫০ সালে হার্মান সার্কাসের নতুন নামকরণ করলেন- জনতা সার্কাস। ভাইয়ের হাতে জনতা সার্কাসের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে  লেগে গেলেন  সার্কাস ট্রেনিং ইন্সটিটিউট খোলার কাজে। গুরু কীলেরির পথে হাঁটতে চাইলেন। নাগপুরের কাছে চক্রধারা অঞ্চলে জমি কিনলেন, ইন্সটিটউটের বাড়ি বানালেন, কিন্তু সরকারের অসহযোগিতায় তাঁর স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। ফিরে গেলেন সার্কাসের তাঁবুতে। নতুন করে শুরু করলেন বন্ধ হয়ে যাওয়া গ্রেট রেমন সার্কাস। ১৯৫৬-য় ফ্রান্স থেকে শিল্পী নিয়ে এলেন গোপালন তাঁর গ্রেট রেমন সার্কাসে। সে দলে ছিল একটি ঘোড়া। ভূপালে গ্রেট রেমনের তাঁবু থেকে সেই ঘোড়াটি একদিন পালিয়ে গেল। তাঁবু থেকে বহুদূরের একটি গ্রামের গ্রামবাসীরা  ঘোড়াটিকে ধরে এনে দিয়ে গেল তাঁবুতে। ফরাসী শিল্পীরা গ্রামবাসীদের প্রশংশায় পঞ্চমুখ। এক বছর গ্রেট রেমনে খেলা দেখিয়ে ফিরে গেল তারা নিজেদের দেশে। ততদিনে তাদের খেলা অন্য সার্কাসদলগুলি নিজেদের তাঁবুতে দেখাতে শুরু করেছে। সারা জীবন ধরে  মহালক্ষ্মী , ন্যাশনাল, ভারত, অমর, অসংখ্য সার্কাসের সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে থাকা গোপালন সার্কাসের রিঙে অনেক নতুন নতুন খেলার আবির্ভাব ঘটিয়েছেন।  সার্কাস থেকে অবসর নিয়ে জীবনের শেষ দু’বছর থালাসেরিতে কাটালেন। ১৯৭৪ সালে হার্ট অ্যাটাকে চলে গেলেন প্রফেসর কীলেরির এই শিষ্য।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply