সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ১৪। বরুণদেব
সেদিন ছত্রের গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের দর্শকাসনে বসে নিবিড়ভাবে খেলা দেখতে দেখতে কীলেরি বুঝতে পারলেন, ছত্রের দলে বন্য জীবজন্তুর সংখ্যাই বেশি, অ্যাক্রোব্যাটের সংখ্যা খুব কম। মহিলা শিল্পী বলতে একমাত্র ছত্রের স্ত্রী, যিনি সিঙ্গল ট্রাপিজ, অ্যাক্রোব্যাটের খেলা দেখাচ্ছেন আবার হাতির পিঠে চেপে সিংহের পাশে চলতে চলতে ‘ভারতমাতা’-র আইটেম দেখাচ্ছেন।
শো শেষ হলে কীলেরি দেখা করলেন বিষ্ণুপন্থের সঙ্গে।দু’জনেই একমত, যে কোনো শিল্পকলাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে দরকার প্রশিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান। ভারতে সার্কাসের মতো এক শিল্পকলার সেই পরিকাঠামো নেই। হাত মেলালেন বিষ্ণুপন্থ ও কীলেরি। থালেসেরিতে বাড়ির কাছে প্লাম্বিতে ১৮৮৮-তে শুরু হলো কীলেরির ‘অল ইন্ডিয়া সার্কাস ট্রেনিং হলো’। এক বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। হরাইজন্টাল বার, রোমান রিংস, আয়রন বল প্লে, ফুট জাগলিং, ফুট অ্যাক্রোবাট, লুজ অয়্যার ডান্স, ফ্রগ অ্যাক্ট , নানারকম সার্কাসীয় খেলার তালিম। তালিম শেষে সফল শিক্ষার্থীরা যোগ দেবে ছত্রের গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাসে। দুবছরের মধ্যে তৈরী হয়ে গেল প্রথম দল। কীলেরি ছত্রেকে জানালেন, তাঁর শিষ্যরা সার্কাসে যোগ দেবার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু যাঁর জন্য এই কর্মযজ্ঞ, তিনি সাড়া দিলেন না আর। নীরব রইলেন বিষ্ণুপন্থ। হতাশ কীলেরি বন্ধ করে দিলেন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবার দরজা খুলল সেই সার্কাস ট্রেনিং স্কুল। খুলল কীলেরির শিষ্যদের জন্যই।
বিষ্ণুপন্থের নীরবতায় হতাশ কীলেরি তাঁর সার্কাস ট্রেনিং স্কুল বন্ধ করে দিলে তাঁর ছাত্ররা কাজের খোঁজে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেল। এমনই একজন ছাত্র পারিয়ালি কান্নান। সার্কাস ট্রেনিং স্কুলের বন্ধ দরজা থেকে চলে গেলেন কোঝিকোড়ের এক করাতকলে। কোঝিকোড়ে এলো এক বায়োস্কোপ কোম্পানি। কার্নিভাল বসল। স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রর পাশাপাশি নৃত্য, নাটক, জুয়া , নানারকম শারীরিক কসরতের প্রদর্শনী। কান্নান সে কার্নিভালে কীলেরির সার্কাস ট্রেনিং স্কুলে শেখা হরাইজন্টাল বার, টাম্বলিং সমারসল্ট, ফিজিকাল ফিটস,ল্যাডার ব্যাল্যান্স, নানারকম সার্কাসীয় খেলা দেখালেন। সঙ্গে ছিল ঐ স্কুলেরই কয়েকজন বন্ধু। তৈরী হয়ে গেল কান্নানের ট্রুপ। ঐ বায়োস্কোপ কোম্পানির সাথে ঘুরে বেড়াল এই ট্রুপ। দেড় বছর পর তারা ফিরল থালাসেরিতে। কান্নান স্বপ্ন দেখতেন – তিনি নিজে সার্কাস দল খুলবেন। মনের সে কথা খুলে বললেন তাঁর গুরুকে।কীলেরি সার্কাস বিষয়ে উপদেশ পরামর্শ দিলেন, তাঁবু ও প্রয়োজনীয় কিছু সাজসরঞ্জামও কিনে দিলেন। কিন্তু একটা সার্কাসদলের মূল চালিকাশক্তি যারা, সেই সার্কাসশিল্পীরা তো তেমন নেই! কান্নানদের সর্নিবন্ধ অনুরোধে সাড়া দিলেন কীলেরি। খুলে গেল সেই পুরনো ট্রেনিং স্কুল। পুরনো ছাত্ররা ফিরে এলো, এলো নতুনরাও। এলো দু’টি মেয়ে, পাঁচ বছরের যশোদা আর মাধবী। মাধবী মাঝপ্থে ট্রেনিং ছেড়ে দিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল! যশোদা শিখে ফেলল সার্কাসের খেলাগুলি। স্মৃতিতে থাকা সার্কাসের খেলাগুলিকে ঘষামাজা করে শেখাতে লাগলেন কীলেরি। শেখালেন মার্শাল আর্ট কালারি। এই সার্কাস ট্রেনিং স্কুলটি ছিল সম্পূর্ণ অবৈতনিক। শিক্ষানবিশদের মিলত খাবারদাবার, আশ্রয়, পোশাক-আশাক। মেয়েদের মাথা গোঁজার জন্য কীলেরির এক দূঃসম্পর্কের আত্মীয় খুলে দিলেন বাড়ির দরজা।
তিন বছর পর কান্নানের স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেল। থালাসেরির চিরাক্কারার ধানজমিতে উদ্বোধন হলো কান্নানের সার্কাস-পারিয়ালি মালাবার গ্র্যাণ্ড সার্কাস। ২০ শে ফেব্রুয়ারি, ১৯০৪, উদ্বোধন করলেন প্রফেসর কীলেরি। কোনো বন্যপ্রাণী নেই, জাঁকজমক নেই, সুপ্রশিক্ষিত শিল্পীরা খেলা দেখালেন। আত্মপ্রকাশ হলো ভারতের প্রথম মালোয়ালি মহিলা সার্কাসশিল্পী যশোদার। কান্নানের স্বপ্ন সার্থক হলো। সার্থক হলো কীলেরির স্বপ্ন, পরিশ্রম। কীলেরির মনে বিষ্ণুপন্থ ছত্রের ওপর জমে থাকা অভিমান ভুলিয়ে দিলো দর্শকদের করতালি।।
কান্নান কেরালার বিভিন্ন শহরে নিয়ে গেলেন তাঁর সার্কাস। জনপ্রিয় হলো। লাভের টাকা উঠে আসতে লাগল। সেখান থেকে গেলেন তামিলনাড়ু। কিন্তু চ্যালেঞ্জে ফেলে দিলো মহারাষ্ট্রের দলগুলি।
বিষ্ণুপন্থের দেখানো পথ ধরে ইতিমধ্যে কার্লেকার’স গ্র্যাণ্ড, পরশুরামের মতো বেশ কয়েকটি সার্কাসদল উঠে এসেছে মহারাষ্ট্রে। জনপ্রিয় হয়েছে। ভারতীয় সার্কাসের চাহিদা তৈরী হয়েছে বাজারে। ছত্রের সার্কাসের পশুপ্রশিক্ষক পরশুরাম রাও মালি খুলে ফেলেছেন একটা ছোট্ট সার্কাস। ছত্রের সার্কাসের আর এক পশুপ্রশিক্ষক ভেঙ্কিট রাও দেভল খুলে ফেললেন দেভল সার্কাস। ক্ষণস্থায়ী ভোঁসলে সার্কাস, দক্ষিণপুর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে টুর করে এলো। এইসব সার্কাসদলগুলি এক প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ তৈরী করল। এইসব সার্কাসের পরিচালকদের প্রায় সকলেই ছিলেন পশু প্রশিক্ষক। ফলে তাঁদের সার্কাসে বন্য জন্তু জানোয়ারই বেশি। প্রশিক্ষকের অভাবে মহারষ্ট্রের সেইসব সার্কাসদলগুলিতে ভারতীয় সার্কাসশিল্পী খুব একটা ছিল না। তারা বিদেশি শিল্পী ও পাশাপাশি নানা জীবজন্তু আনতে লাগল সার্কাসে। জাঁকজমকের সেসব বিশাল সার্কাসীয় আয়োজনের বিপরীতে দাঁড়াতে পারল না কান্নানের সার্কাস। ১৯০৬-এ তামিলনাড়ুর কুম্বাকোনামে নিভে গেল কান্নানের স্বপ্নের সার্কাসদীপ। ফিরে গেলেন থালাসারিতে। সেই পর্বে কীলেরির কিছু শিষ্য চেষ্টা করেন তাঁদের নিজেদের সার্কাস চালাতে, কিন্তু সে প্রচেষ্টাও মুখ থুবড়ে পড়ে।
মুখ থুবড়ে পড়ে নি কীলেরির প্রচেষ্টা। কীলেরির ট্রেনিং স্কুল থেকে বেড়িয়ে বিভিন্ন সার্কাস দলে যোগ দিতে শুরু করল শিষ্যকুল। তারা যোগ দিত গ্রুপে, তাদের একজন নেতা থাকত, সে গ্রুপের সকল সদস্য ও সদস্যার দায়িত্ব নিত। ভারতীয় সার্কাসে এই মালোয়ালি শিল্পীরা প্রবেশ করলে ভারতীয় সার্কাসশিল্প সমৃদ্ধশালী হলো, জনপ্রিয় হয়ে উঠল। কীলেরির উদ্ভাবনী শক্তির জন্য নতুন নতুন আইটেম যোগ হতে থাকল সার্কাসে।মহারাষ্ট্রের সার্কাসদলগুলির মালিকরা আকৃষ্ট হলেন মালোয়ালি শিল্পীদের নৈপুণ্য দেখে। বিশ শতকের প্রথম ও দ্বিতীয় দশকে থালাসেরি ও কান্নুর থেকে উঠে আসা প্রচুর মহিলা ও পুরুষ শিল্পী মহারাষ্ট্রের সার্কাস দলগুলি আলো করে রাখেন। এইসব পুরুষ শিল্পীদের মধ্যে দু’একজন ছাড়া প্রায় সকলেই পরের দিকে নিজেদের নামে সার্কাস দল খোলেন। তাঁরা ছিলেন কীলেরির সার্কাস ইন্সটিটিউটের ফসল। ভারতীয় সার্কাস বিশ্ব-সার্কাস মানচিত্রে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল মূলতঃ কীলেরির সার্কাস ইন্সটিটিউটের জন্য। নিদারুণ দারিদ্র্যের জীবন কাটানো উত্তর মালাবারে্র নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছে না ছিল প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ, না ছিল যাপন যুদ্ধে টিকে থাকার মতো কোনো জীবিকার সন্ধান। সে সময়ের ভারতবর্ষে পরিবার পরিকল্পনারও অভাব। সেই প্রান্তিক মালোয়ালি পরিবারগুলি সার্কাসকে আঁকড়ে ধরে তার বাঁচতে চাইল। তাদেরও যে স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে, আছে করতালির অভিনন্দন পাওয়ার ক্ষমতা, সার্কাস তাদের বোঝালো। সার্কাস হয়ে উঠল তাদের রুটিরুজি, ভদ্রভাবে বাঁচার তাঁবু। পরিবারের ভরনপোষণ করতে পারার দিশা দেখাল। দর্শকদের হাততালি, উচ্ছ্বাস, বাহবা, সার্কাসের অ্যাডভেঞ্চার আকর্ষণ করতে লাগল শ’য়ে শ’য়ে পরিবারকে। তারা এসে ভিড় করল কীলেরির ইন্সটিটিউটে। এমন একসময় এলো, যখন সার্কাসে কাজ করে সাধারণ সরকারী কর্মচারীদের থেকেও বেশি রোজগার করা গেল। থালাসেরি ও কান্নুরের পরিবারগুলি মুক্তি পেল দারিদ্র্য অসাম্য নিয়ে টিকে থাকার জীবন থেকে। এ সব অঞ্চলে সার্কাস হয়ে উঠল এক সংস্কৃতি, হয়ে উঠল সামাজিক মর্যাদা। এমনকি থালাসেরি ও কান্নুরের বহু মহিলা শিল্পী সার্কাস এরিনায় পুরুষ প্রাধান্যের অবসান ঘটাল। সার্কাস নিছক বিনোদন নয় ভারতের মাটিতে, এক সামাজিক উত্তরণের পথ। আর এই সামাজিক উত্তরণের পথ দেখাল কীলেরির সার্কাস ট্রেনিং স্কুল। আজীবন কীলেরি সেই স্কুল চালিয়ে গিয়েছেন। সারা বিশ্ব চিনেছে কীলেরিকে। কিন্তু তার আগে আর এক বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছে।
বিষ্ণুপন্থ ছত্রের মৃত্যুর পর গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস এলো থালাসেরিতে। সেই থালাসেরি যেখানে ভারতীয় সার্কাসের সূচনা পর্বে বিষ্ণুপন্থ আর কীলেরির সাক্ষাৎ পর্ব জন্ম দিয়েছিল কীলেরির সার্কাস ট্রেনিং ইন্সটিউটের। গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের পরিচালক এখন বিষ্ণুপন্থের ভাই কাশীনাথ ছত্রে। কাশীনাথ দেখা করলেন কীলেরির সঙ্গে। একদিন তাঁর দাদা বিষ্ণুপন্থ কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কথা দিয়েও কীলেরির শিষ্যদের জন্য গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের দরজা খুলে দেন নি। আজ সেই গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাসের জন্য কীলেরির শিষ্যদের চেয়ে বসলেন কাশীনাথ। কীলেরির ইন্সটিটিউটের যশোদা, গোবিন্দন, কুনহানবু-রা গুরুর আশীর্বাদ নিয়ে থালাসেরি ক্যাম্পে গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাসের এরিনায় যোগ দিলেন। সময় সম্পূর্ণ করল এক বৃত্ত।
(ক্রমশ)
