রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ১৬। অনুবাদে অর্ণব রায়
মূলনাথের বিশাল বিশাল খোলা মাঠ, সুন্দর ব্যবস্থাপনা আর যত্নে বড় করা ভেড়ার পালের জন্য অন্ততঃ মটনের ব্যাপারে সে কারোর ওপর নির্ভরশীল নয়। খাবার লোকেরও কখনো অভাব হয় না। কিন্তু গোমাংস বস্তুটি নিয়ে আবার অন্য ধরণের সমস্যার উদ্ভব হয়। আর এই সমস্যা মূলনাথ আর চন্দননগর বা চুঁচুড়া, এই ধরনের কলকাতা ঘেঁসা ছোট জনপদেই বেশী দেখা যায়। হিন্দু জনবসতির মাঝে, বিশেষ করে কারখানার উচ্চপদের কর্মচারীরা যদি অধিকাংশই ব্রাহ্মন হয়, যতই নীলকর সাহেবের সাথে তাদের ভালো সম্পর্ক থাকুক না কেন, তাদের মাঝখানে একটা ষাঁড় জবাই করা, খুব কম করে বললেও, অন্ততঃ অপমানজনক তো হবেই। তার ওপর এলাকার জমিদার যদি কুলীন ব্রাহ্মন হন, তাহলে এই অপমানের মাত্রা যতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি বলে, ব্যাপারটা যতই আনন্দের হোক, বন্ধ করে দেওয়াই ভালো।
আর মাছের কথা যদি বলতে হয়, এখানে কলকাতার বাজারের মত তোপসে, ভেটকি বা ইলিশ মাছের মত সূক্ষ্ম স্বাদের মাছ হয়ত পাওয়া যায় না, কিন্তু যেখানে বড় বড় চৌবাচ্চা আছে সেখানে নানারকম মাছ চাষ করাই যায়। তার ওপর রয়েছে এখানকার হ্রদ, সেখান থেকে নানারকম ছোট মাছের সরবরাহ আসে। বিশেষ করে এখানে কুরসুলা বলে এক ধরণের ছোট ছোট মাছ পাওয়া যায়, সে অতি সুস্বাদু। কিন্তু বছরের এই ঋতুটা মাছ, যা কিনা ভারতীয় ব্রেকফাস্টের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেই মাছ পাওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে খারাপ সময়। এখন নদীর জল নেমে গেছে। কোনও কোনও নদী একেবারে শুকিয়ে গেছে। শুধু এখানে নয়, অন্যখানেও। যদিও এখন নদীতে কুমীর-কামটের সংখ্যা কম (তোমরা জানো এখানকার নদীগুলো কুমীর-কামটে ভর্তি)। ঠিক যে কারনে তারা তাদের স্বাভাবিক শিকারভূমি থেকে সরে গেছে, মাছেরাও তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান থেকে সরে গেছে— জলের অভাব।
জলখাবার খাওয়া হলে খবরের কাগজের খবর নিয়ে একটুক্ষণ আলোচনা হল। এই কাগজ কলকাতা থেকে পরের দিন সকাল এগারোটা নাগার এসে পৌঁছোয়। আর তারপরেই ভর সকালবেলা কারখানার দিকটায় সবকিছু রাতের মত নিঃস্তব্ধ হয়ে গেল। সকালবেলা দুটো তিনটে ঘোড়ায় চড়ে কুড়ি মাইল, এমনকি সম্ভবতঃ তিরিশ মাইল (আর এমন ঘোরাঘুরি আজ নতুন কিছু নয়, রোজই হয়) ঘুরে আসার পরে তীব্র ক্লান্তি আসবেই। আর এই ক্লান্তি কাটিয়ে পরবর্তী কাজগুলোর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হলে অন্ততঃ ঘন্টাখানেকের বিশ্রাম না নিলে চলে না। বিশেষ করে যাদের মাথার কাজ করতে হয়, কলম চালাতে হয়।
বিশ্রাম নেওয়া হলে আমরা আবার একবার সুন্দর বাগানটার মধ্যে দিকে কারখানার দিকে গেলাম। প্রথমবার যখন এই কারখানাটা দেখতে এসেছিলাম, তখন একটা দৃশ্য দেখে যারপরনাই অবাক আর সন্তুষ্ট হয়েছিলাম। অফিস সংলগ্ন লম্বা ঘরটায় ঢুকলে দেখা যাবে খানিকটা অংশ পার্টিশান দিয়ে আলাদা করা আছে। একে ‘ড্রাইং রুম’ বলে। এই ঘরটার কী কাজ ক্রমে ক্রমে বুঝতে পারবে। এই ঘরটার দেওয়ালেই বড় বড় ম্যাপ ও অন্যান্য শিক্ষার সরঞ্জাম টাঙানো আছে। এখানে ঢুকেই আমি শুনতে পেলাম একটা ব্যস্ত স্কুলঘরের গুনগুন শব্দ। মোটামুটি ষাটজন ভদ্রসভ্য দেখতে বালক, তারা আশেপাশের উচ্চশ্রেনীর দেশীয় পরিবার থেকে আসছে, তারা এখানে ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ করছে। শিক্ষার মান যদিও কলকাতার বড় বড় বিদ্যালয়গুলির মত নয়। আমার বন্ধুটি যে এরকম কাজ করতে ভালোবাসে যাতে নিজেরও ভালো লাগে, লোকেরও উপকার হয়, এই স্কুল তার উদাহরণ। ছয় বছরের কিছু বেশী সময় ধরে এই স্কুল চলছে। আর এই স্কুল দৈনন্দিন খরচাপাতি ও অন্যান্য সমস্ত ব্যাপারের জন্য সম্পুর্ণভাবে মিঃ এফ-এর সাহায্য ও উৎসাহের ওপর নির্ভরশীল। ছয় বছর ধরে চলে এই স্কুল এখন একটি সফল স্কুল হওয়ার জন্য সম্পুর্ণ তৈরি । জেনারেল অ্যাসেম্বলি ইন্সটিটুশনের একজন চালাক চতুর প্রাক্তন ছাত্রকে এখানে শিক্ষক হিসেবে আনা হয়েছে। তাকে মাসে ষাট টাকা বেতন দেওয়া হয়। বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে তাকে একখানা থাকার জায়গাও দেওয়া হয়েছে। একবার তো স্কুলের ছাত্রসংখ্যা একশো ছাড়িয়ে গেছিল।

স্কুলঘর
কিন্তু হায়, এমন সুন্দর ও ফলপ্রসূ ক্ষেত্রটির ওপরেও অভিশাপ নেমে এল। আমি এর আগেও চিঠিতে বারবার যে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাঘাতের কথা বলেছি, তা সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে দিল। খোদ হাসপাতালটিকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি আসতে লাগল। যদিও হাসপাতাল এই আঘাত সহ্য করে টিকে গেল। স্কুলটি কোথাও থেকে কোনওরকম সাহায্য না পেয়ে বন্ধ হয়ে গেল। (এখানে সিপাহী বিদ্রোহের কথা বলা হচ্ছে) আর এর প্রতিষ্ঠাতার দানের প্রকল্পটিও চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেল। কিন্তু আমার দেখে অত্যন্ত আনন্দ হচ্ছে, যে অদম্য আত্মবল নিয়ে এই স্কুল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সেই আত্মশক্তিতেই একে আবার পুনর্জীবন দেওয়ার কাজ চলছে। দুর্ভাগ্যক্রমে, স্কুলের শিক্ষক ফিরে এলেই স্কুলের অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জোগান পুনরায় চালু হয়ে যায় না। তবে ছোট করে শুরু তো করা যায়। আর একটা প্রভাবশালী মন আর চোখের সামনে একটা ভালো উদাহরণ কী না করতে পারে! ইতিমধ্যেই জনা তিরিশ ছাত্র ফিরে এসেছে। আমাদের বন্ধু ডঃ দীননাথ ধর নিজের থেকে দুঘন্টা শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি কাজটার মূল উদ্দেশ্যটাকে ধরতে পেরেছেন। তার যত প্রশংসা করা যায়, কম। তার কাজের পুরস্কার সোনারূপোর চেয়ে অনেক বেশী কিছু।
স্কুলঘরে আধঘন্টা কাটিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম। আমাদের গৃহকর্তা বন্ধুকে অফিসের বিকেলের দিকের কাজগুলো করার জন্য ওখানেই রেখে এলাম। উনি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাঁকে এখন বাংলা আর ইংরেজীতে মোটা মোটা চিঠি লিখে বিকেলের ডাকে বিভিন্ন জায়গায় তার এজেন্ট ও সহকারীদের পাঠাতে হবে। প্রায় সমপরিমান চিঠি ইতিমধ্যে এখানে তার সহকারীরা তৈরি করে রেখেছে। এসব চিঠি যাবে বিভিন্ন জমিদার, গোমস্তা ও নানা দেশীয় কর্মচারীদের কাছে। এই সমস্ত চিঠির বয়ান পড়ে তার সহকারীরা তাকে দিয়ে সই করাবে। এই সুযোগে আমিও একটু বলে নিই বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে একজন প্ল্যান্টারকে কী কী দায়িত্ব পালন করতে হয়। এটা সংক্ষেপেই বলা হয়ে যাবে কেননা পুরোটা জুড়েই টাকাপয়সা আর হিসাবপত্তরের গল্প। আমি এর মধ্যে কোনও মজা পাই না। আমি অবশ্য খেয়াল করে দেখেছি, সারাবছরে যেটুকু ছুটি একজন প্ল্যান্টার পায়, তা এই বছরের এই সময়েই। ব্যবসার কাজের সঙ্গে ফুর্তি মেশাতে এই সময় সে কলকাতার যায়। সম্ভবতঃ এদিক ওদিক ম্যানেজ করে সে খ্রিসমাসের সময় বা নিউ ইয়ার ডিনারের সময় পৌঁছোতে পারে। তখন তার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়। এর মধ্যে সে কলকাতার সমাজে তার কারখানার সারা বছরে কী উৎপাদন হয়েছে, তা দেখাতে পারে। ইতিমধ্যেই তার কারখানায় উৎপাদিত প্রোডাক্ট তার আসার আগেই কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এখানে সে সেগুলো ভালো দামে বিক্রি করার ব্যবস্থা করে। এই সুযোগে সে অন্যান্য ব্যবসা সংক্রান্ত ও ব্যাক্তিগত কাজকর্মও সেরে ফেলতে চেষ্টা করে। পাওনাদারদের দেনা মিটিয়ে দেয়, এজেন্টদের সঙ্গে গত বছর ও সামনের বছরের হিসাবপত্র ঠিক করে নেয়। এইসব সেরে সে তার কারখানাতে ফিরে আসে। এখানে এসে সে রায়তদের গত বছরের হিসাব মেটতে আর আগামী বছরের চাষের জন্য অগ্রিম দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
(ক্রমশ)
