রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ১৫। অনুবাদে অর্ণব রায়
পুরুষ বিভাগের থেকে মোটামুটি কুড়ি ইয়ার্ড দূরে রয়েছে হাসপাতালের মহিলা বিভাগ। তার একেবারে এক কোনে একটা পর্দা দিয়ে ঘেরা জায়গায় বসেন অত্যন্ত যোগ্য ও দক্ষ ডাক্তার, ডঃ দীননাথ ধর। এনার সঙ্গে আমাদের সাধারণত ওনার সকালের রাউন্ডের সময় দেখা হয়। ওই পর্দা ঘেরা জায়গায় তার একখানা ছোট্ট ল্যাবরেটারি, একখানা ডাক্তারি টেবিল, কিছু বই, যন্ত্রপাতি আর তার ডাক্তারির কাজে লাগে এরকম কিছু জিনিসপত্র রয়েছে।

হাসপাতাল, স্ত্রী বিভাগ
ডাঃ দীননাথ ধর কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ছিলেন। কিছুদিন নেটিভ অ্যাসিস্টেন্ট সার্জন হিসেবে ভাঁটি অঞ্চলে কাজ করেছেন। একজন শিক্ষিত দেশীয় ভদ্রলোক কেমন হওয়া উচিৎ, তার এক অতি উত্তম নমুনা এই লোকটি। ভদ্রলোক এখনো খ্রীস্টান হননি, তবে আমার ধারণা ইনি তার থেকে খুব বেশী দূরে নেই। যদি না তার সামাজিক অবস্থান তাকে বাধা দেয়। এরকম পরিস্থিতিতে এটিই তার মত অধিকাংশ শিক্ষিত হিন্দুর পায়ের শৃঙ্খল হয়ে দাঁড়ায়। এখনও পর্যন্ত তার সঠিক বিচারবুদ্ধি ও অধিকাংশ বিষয়ে তার আলোকপ্রাপ্ত দৃষ্টিভঙ্গী তাকে তার গোঁড়া বন্ধুদের আহত না করেও তার পিতৃপুরুষদের ধর্মের ত্রুটি ও কুসংস্কারগুলি খোলা মনে দেখতে সাহায্য করছে। অন্ততঃ তাঁর নিজের জীবনযাপনে ধর্মের অনাবশ্যক আড়ম্বরগুলি তিনি এড়িয়ে যেতে পেরেছেন। আমার বিশ্বাস, এটিই সেই মধ্যম পন্থা যেটি কলকাতার শিক্ষিত ভদ্রলোকরা অবলম্বন করে থাকেন। একজন হিন্দু খ্রীস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হলে তাকে কী পরিমান অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, তা খুব কম লোকই কল্পনা করতে পারবে। সে একই সঙ্গে হয়ে ওঠে আঘাতকারী ও আহত। তার ওপর যদি তার মনটা হয় নরম, তাহলে তার যন্ত্রণা ও দুর্দশা হাজারগুন বেড়ে যায়। তার বৃদ্ধ পিতামাতার কাছে সে হয়ে ওঠে মারাত্মক রকম ধর্মত্যাগী। তার ক্রুদ্ধ ও ঈর্ষাকাতর আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবদের হাতে তার লাঞ্ছনার শেষ থাকে না।

ডঃ দীননাথ ধর
এবার হাসপাতালের দুই বিভাগে রোগীদের মুখে আরাম ও উৎসাহের অভিব্যাক্তি দেখে নিয়ে আমরা ফ্যাক্টরির দিকে পা বাড়ালাম। আমার সঙ্গীর বাংলা ভাষার (এই অঞ্চলের চাষী মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত আঞ্চলিক ভাষা বাংলা) ওপর দখল থাকার জন্য উনি ওদের কথাবার্তা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারছিলেন। এখানে আমরা মিঃ এফ-কে ছেড়ে দিলাম। অফিসে তার অনেক কাজ জমেছিল। অফিসের কাছে বেশ কিছু কর্মচারী ও অন্যান্য লোক দাঁড়িয়েছিল। তাকে ওখানে ছেড়ে আমি বাড়ির দিকে এগোলাম। সেখান থেকে আমার স্কেচ করার খাতাটা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মাঠে গিয়ে ঘাসের ওপর বসলাম। সূর্যের আলো এখন নরম। তাই সামান্য একখানা সাদা টুপি মাথায় দিয়ে আমি সেখানে বেলা এগারোটা পর্যন্ত বসে থাকতে পারলাম। ফেরার পথে আমি আবার গিয়ে আমার গৃহকর্তার সাথে অফিসে গিয়ে দেখা করলাম। সেখান থেকে একটু এগিয়ে গিয়ে একবার বেকারি-তে ঢুঁ মেরে (ধরে নিতে পারো এই ধরণের সাংসারিক প্রয়োজনগুলো বাড়ির মধ্যেই মেটানোর ব্যবস্থা আছে) সেখানকার দক্ষ কারিগরটিকে বলে এলাম, বেলা একটার মধ্যে আমাদের কিছু হট রোল বা ওই ধরণের খাবার দিতে। এইসব বলে টলে আমরা বাগানে এলাম। বাগানে ঢুকে আমরা যেদিকে রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় সবজি ফলানোর চেষ্টা করা হয়েছে, বিশেষ করে খাস ইউরোপের সবজিগুলোর চাষ কতোটা সফল হল সেটা দেখতে এগিয়ে গেলাম। আলু, বাঁধাকপি, ফুলকপি— মানে যে সমস্ত সবজি একটা সাধারণ ব্রিটিশ রান্নাঘরে সবসময় লাগে, এখানে চমৎকার ফলেছে, বেড়েও উঠছে। কিন্তু এ কী! হে ভগবান! এ কী সব্বোনাশ! পাজি হরিণগুলো, তাদের একলা নিরিবিলি একটেরে থাকার কথা, সে সব ভুলে গিয়ে, ছয় সাত ফুট উঁচু বেড়া ডিঙিয়ে গতরাতে বাগানে ঢুকে যত মটর গাছ মাটি থেকে মাথা তুলেছিল ছিল সবকটাকে ধ্বংস করেছে। অবশ্যই এর ব্যবস্থাও আছে, বেড়াগুলোকে সারাতে হবে আর উঁচুও করতে হবে। আর পরের বার এই দুষ্টু অনুপ্রবেশকারীর জন্য কিছু শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে— যদি তাকে ধরা যায়!

রান্নাঘর
এবার আমরা বাড়িতে এসে স্নানটান করে জামাকাপড় পড়ে ব্রেকফাস্টের জন্য তৈরি হলাম। হ্যাঁ, মফঃস্বলে রুটিন এরকম ভাবেই চলে। এই ভর দুপুরবেলা (এখন বেলা একটা বাজে) মোটামুটি ভদ্রস্থ এই খাবারকে চাইলে ‘ব্রেকফাস্ট’ বলতে পারো। তবে এই মফঃস্বলে একজন প্ল্যান্টারের ভাগ্যে জোটে এটাই জোটে। সত্যি কথা বলতে কি, একজন প্ল্যান্টারের যা রুটিন, তাতে এর আগে কিছু খেলে সহ্যও হবে না। সকাল হতে না হতে সে ঘোড়ায় চড়ে বসে, আর থাকে বেলা দশটা এগারোটা বারোটা পর্যন্ত। ওই সকাল পাঁচটা ছ’টা নাগাদ এককাপ ভালো চা বা কফি, সাথে সামান্য কিছু টোস্ট বা মাখন-রুটি ছাড়া পেটে কিছু সহ্যও হবে না কেননা এর পরে ঘোড়ার পিঠে পনেরো কুড়ি মাইল যাওয়া আসা করার আছে। এত কিছুর পরে কি ভারতীয় ব্রেকফাস্ট খাওয়া যায়। দশটার মধ্যে পাঁচটা ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে একজন প্ল্যান্টারের ব্রেকফাস্টটি একটি ছোট টিফিন বা সামান্য ডিনারের আকার নিয়েছে। তার সাথে কিছু বাস বা অলসপ মদ (৪) অথবা পিকো বা শুসং চা (৫)। শেষোক্ত জিনিসটি অবশ্য কোনও ভদ্রমহিলা এলে তবেই বানানো হয়।
ইংল্যান্ডে একজন চাষীর জীবনে যেভাবে প্রতিদিনের জিনিসের প্রয়োজন মেটে, এখানে একজন প্ল্যান্টারের জীবনও তেমনি। গবাদি পশু, হাঁস-মুরগী ইত্যাদি বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই রাখা থাকে। প্রচুর পরিমানে সবজি চাষ হয়। মাঝে মাঝে চাকরকে শহরে পাঠানো হয়। যে সমস্ত জিনিস মাটি থেকে পাওয়া সম্ভব নয়, বা কিছু জিনিস যা এদেশে পাওয়াই যায় না, সে সমস্ত জিনিস সে শহর থেকে নিয়ে আসে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে ব্যাবস্থাপনার অভাব বা সুবিধের অভাব অন্য যে কোনও কারনেই হোক, বিশেষ করে যেখানে অবিবাহিত অ্যাসিস্ট্যান্ট প্ল্যান্টাররা কোনওমতে আউট ফ্যাক্টরিতে মাথা গুঁজে থাকে, সেখানে পশুসম্পদ বলতে শুধু হাঁস আর মুরগীই থাকে। সেগুলিই তাদের একমাত্র আমিষ খাবার। আর সে সমস্ত হাঁস মুরগী দেশি চাকরদের হাতে পড়ে এমন এমন উপাদেয় পদে পরিনত হয় যে প্ল্যান্টাররা মজা করে বলে দিনেমানে দেখা হলে তারা মুরগীগুলোর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না!
এর চেয়েও বড় সমস্যা এখানে রয়েছে। একজন মানুষ একা একটা গোটা ভেড়া খেতে পারে না। আর এখানে বছরের বারো মাসের মধ্যে আট মাস গরম আবহাওয়া। এই আবহাওয়ায় মাংস এক দিনের বেশী থাকে না। ফলে একজন মানুষের একবার বা দুবার খাওয়ার জন্য একটা গোটা পশু বধ করা বিলাসিতার চুড়ান্ত হয়ে যায়। বেঁচে যাওয়া মাংস যে গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়ে, তাও হবে না। একমাত্র অন্ত্যজ শ্রেনীর ঝাড়ুদার ছাড়া কোনও চাষী বা প্রজা সে মাংস স্পর্শও করবে না। ফলে বেঁচে যাওয়া মাংস আক্ষরিক অর্থেই কুকুরদের খাওয়াতে হয়। এই সমস্যা মেটানোর জন্য কিছু প্ল্যান্টাররা সিভিল লাইনের কাছে বাস করে অথবা কয়েকজন প্ল্যান্টার মিলে কাছাকাছি বসবাস করে। তারা একসাথে যাকে বলে ‘মিট ক্লাব’ বা ‘মাংস ক্লাব’ বলে ক্লাব গঠন করে। ফলে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ভেড়া বা অন্য কিছু যখন কাটা হয়, মাংসটা এই ‘মিট ক্লাব’-এর সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হয়।
(ক্রমশ)
টীকা
৪। বাস বা অলসপ মদঃ অষ্টাদশ শতকের বিখ্যাত ব্রিটিশ মদ তৈরীর দুই কোম্পানী। এরা মূলত পেল এইল তৈরী করত।
