রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ১৪। অনুবাদে অর্ণব রায়
তামাক চাষও এই মূলনাথে প্রচুর পরিমানে হয়। এছাড়া রয়েছে হলুদ গাছ আর লঙ্কা গাছ। ছোট ছোট লঙ্কা গাছের নরম নরম ডালগুলো থেকে পুরোপুরি বড় হয়ে যাওয়া লঙ্কাগুলো বড় বড় লকেটের মত ঝুলছে। জাস্ট কেটে নিলেই হয়। সত্যি বলতে কি, তামাক গাছ থেকে তামাক পাতা কাটার কাজ শুরুও হয়ে গেছে। আমাদের কাছে তার প্রমানও আছে। গ্রামবাসীরা গাছ থেকে পাতাগুলো তুলে আমাদের বাড়ির চৌহদ্দিতে পার্কের মাঠের ওপর শুকোতে দিয়ে গেছে। পাতাগুলোকে নিরাপদে রাখার জন্য অবশ্যই। তারা তাদের মালিকের মন জানে। তারা জানে, এই লোকটাকে নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করা যায়।

তামাক গাছ

লংকা

তামাক গাছের ফুল

হলুদ
যে ঘোড়াগুলোর পিঠে আমরা ছিলাম, তারা এতক্ষণ এই ঝলমলে পরিবেশে চারপাশের বাতাস শুঁকছিল। এক জায়গায় আটকে থেকে থেকে এবার তারা অধৈর্য্য হয়ে পড়েছিল। তাই আমরা দুলকি চালে ঘোড়া ছেড়ে দিলাম। ঘোড়া চলতে শুরু করলে আমরা মোটামুটি কুড়ি ইঞ্চি চওড়া সরু পায়ে চলা পথের গোলোকধাঁধার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললাম। এই পথগুলোই দুপাশের ক্ষেতগুলোকে একটার থেকে আর একটাকে আলাদা করেছে। চারপাশে বিভিন্ন রকম ফসলের ক্ষেত। কোনওটাতে পাকা তামাক, কোথাও সোনালী সরষে, কোথাও অড়হড় ডালের ক্ষেত, এই ডাল এখানকার লোক খুব খায়। এছাড়াও ডজন ডজন বিভিন্ন রকমের ক্ষেত রয়েছে। কোনওটায় সবে চাষ দেওয়া হয়েছে, কোনওটায় তিল বোনা হয়েছে। তিল এক ধরণের তৈলবীজ, অগাস্ট মাসে বোনা হয় নভেম্বর মাসে কাটা হয়।

তিলের গাছ
এখন ফসল কেটে নেওয়া হয়েছে। এখানে আমাদের গোমস্তার সঙ্গে দেখা হল। সে কোনও এক আলাদা শর্টকাট রাস্তা ধরে এখানে এসে পৌঁছেছে। জমির যে সমস্যার কথা সে বলছিল সেটা ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সমাধান হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কিছু দরিদ্র চাষীর অভাব অভিযোগের কথাও শুনে নেওয়া হল (চাষীদের অভাব অভিযোগ শোনার জন্য এখানকার কর্তৃপক্ষ সবসময় তৈরি )। তাদের অভাব অভিযোগ হয় এখানে দাঁড়িয়ে তক্ষুনি তক্ষুনি সমাধান করে দেওয়া হল, নয়ত তাদের পরে অফিসে আসতে বলা হল। এসব সেরে আমরা আবার দুলকি চালে হ্রদের উত্তর দিকে রওনা দিলাম। এখানেই হ্রদের পাড়ে আমার চোখে পড়ল কিছু কুটির আর বাঁশঝাড়। একটা ছোট্ট সুন্দর দেখতে গ্রাম। আর এখানেই আমি অবাক হয়ে দেখলাম, এখানে আসার পর এই প্রথমবার, একটা লম্বা স্কুলবাড়ির মত দেখতে কুটির থেকে শখানেক ছোট ছোট কালো কালো বাচ্চা বেরিয়ে আসছে, তাদের হাতে কলম আর তালপাতা, সামনে সবার আগে গুরুমশাই। তারা সাহেবকে দেখে সেলাম করতে বেরিয়ে এসেছে। সাহেব শুধু তাদের মালিক নয়, তাদের বন্ধু ও পৃষ্টপোষকও বটে।
আমার এখানকার গৃহকর্তাটি যতদূর বুঝলাম, অন্ততঃ তার চারপাশের লোকেদের দয়ামায়া দেখানোর ব্যাপারে খানিকটা ‘রজার ডে কভারলি’-র (৩) মত চরিত্র। সে বিশ্বাস করে, যখন দুজন মানুষের মধ্যে প্রভুভৃত্যের সম্পর্ক থাকে, তখন তাদের মধ্যে মাইনের বাইরেও কিছু অলিখিত চুক্তি থাকে। কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব উচ্চস্থানে অবস্থিত ব্যাক্তিটিকে নিতে হয়, কিছু অতিরিক্ত সাহায্য নিম্নস্থানের ব্যাক্তিটিকে করতে হয়। সে বিশ্বাস করে, দৈব ইচ্ছা তাকে যে এখানে বসিয়েছে, তা শুধু নীল উৎপাদন করার জন্য নয়, তার একটা বিবেক আছে আর তার থেকে সামাজিকভাবে নীচে অবস্থান করা লোকেদের সাহায্য করাটা সে শুধুমাত্র নিজের কর্তব্য মনে করে না, এটা করে যে চুড়ান্ত আনন্দও পায়। এই একটু আগে যে আমরা স্কুলের সামনে ছোট বাচ্চাদের জমায়েত দেখলাম, সেই স্কুলও ইনিই করে দিয়েছেন। এখানকার কারখানায় যে সমস্ত শ্রমিক কাজ করে, তাদের সন্তানদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য। এই ছোট মানুষগুলোর লেখাপড়া শেখার ক্ষমতা যথেষ্ট। আর এদের মুখের খুশির ভাব দেখে যদি বিচার করতে হয়, তাহলে বলতে হয় এরা লেখাপড়া শিখতে গিয়ে আনন্দও কম পাচ্ছে না।
এবার আমরা বাড়ির দিকে এগোলাম। বাড়ির পেছনের দিকের মাঠ দিয়ে, অর্থাৎ হ্রদের উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে প্রবেশ করলে প্রথমেই একটা খড়ে ছাওয়া দেহাতী দেখতে ইঁট আর কাঠের বানানো একটা আস্তাবলখানা চোখে পড়বে। আস্তাবলের ভেতরে দুদিকে দুসারি ঘোড়া রাখার কুঠুরি রয়েছে। সংখ্যায় মোট ষোলটা। তার মধ্যে এখন ছখানা কুঠুরি দখল হয়ে আছে।

আস্তাবল
এখানে একবার ঢুকে ঘোড়াগুলোকে ভালো করে দেখে, তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে, গায়ে চাপড় মেরে আদর টাদর করে আমরা পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলাম। নদীর ধার ধার ছায়াঢাকা পথ ধরে মোটামুটি পঞ্চাশ গজ এগিয়ে গেলে একটা ইঁট আর পাথরের বেশ বড়সড় মজবুত বাড়ি পাওয়া যাবে। তার মাথাটা পুরু করে খড়ে ছাওয়া, ঘরে খুব সুন্দর আলো বাতাস খেলে। এটা মূলনাথ হাসপাতালের পুরুষ বিভাগ।

হাসপাতাল, পুরুষ বিভাগ
এই বাড়িটি এই গৃহের কর্তা ১৮৪২ সালে বানিয়ে দিয়েছেন, অংশতঃ নিজের খরচেই। বাড়িটা বানানো হয়ে গেলে তিনি সরকারের কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন করেন। সরকার হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করতে সম্মত হয়। কিন্তু তারা মিঃ এফ— কে শর্ত দেয় যে তাঁকে গ্যারান্টি দিতে হবে যে তিনি বাকী সমস্ত খরচ তিনি দেবেন, এমনকি একজন দেশীয় সহকারী সার্জেন যিনি থাকবেন, তার মাইনের অর্ধাংশও তিনিই দেবেন। মাইনের বাকী অর্ধাংশ দেবে সরকার। মিঃ এফ— এই সমস্ত শর্তে রাজী হয়ে যান। তারপর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করা হয় না। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে মাসে একশ টাকা মাইনে দিয়ে (পরে তা বেড়ে দেড়শ হয়) একজন সহকারী সার্জেনকে আনা হয়। মাননীয় কোম্পানী বাহাদুর হাসপাতালকে ওষুধপত্র আর সার্জিকাল যন্ত্রপাতি দেয়। হাসপাতালের দরজা দরিদ্র মানুষদের জন্য খুলে যায়। শুধুমাত্র মূলনাথের অন্তর্গত এলাকাতেই দুই লক্ষ চাষী রয়েছে! আর যদি আমি তোমাদের বলি যে এখান থেকে সবচেয়ে কাছের হাসপাতাল হল একদিকে কলকাতা, বাহান্ন মাইল দক্ষিনে, অন্যদিকে কৃষ্ণনগর, বত্রিশ মাইল উত্তরে, সুতরাং বুঝতেই পারছ, এই হাসপাতাল খোলাটা মূলনাথ আর তার আশেপাশের এলাকার মানুষজনের কাছে কী পরিমান আশির্বাদ হয়ে এসেছিল!
হাসপাতালের পুরুষ বিভাগে চব্বিশটি বেড রয়েছে। সবকটিই প্রায় সবসময় ভর্তি থাকে। আশেপাশের পরিবেশ অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর হওয়া সত্ত্বেও যে রোগগুলো এখানকার দরিদ্র মানুষদের মধ্যে, বিশেষ করে চাষীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি করে দেখা যায় সেগুলি হল, জ্বর, প্লীহা আর আমাশা। রোদে-জলে ঘুরে বেড়ানো, দারিদ্র্য, খাদ্য-বস্ত্র–বাসস্থানের অভাব, এগুলিকেই মোটামুটি এই সমস্ত রোগের প্রাথমিক কারণ হিসেবে শনাক্ত করা যায়। তার ওপর এরা শুরুর দিকের লক্ষণগুলি মূর্খের মত অবহেলা করে (একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে কলেরায় যত লোক মরে তার অর্ধেকের বেশী মরে এই অবহেলা করার জন্য), বিশেষ করে ডাক্তারের কাছে আসতে মারাত্মক দেরী করে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, যতক্ষণ না তাদের শরীরের গড়বড়ের মাত্রা আশঙ্কাজনক হয়ে যায়, ততক্ষণ তাদের পাত্তা পাওয়া যায় না। এইসব কারনেই হাসপাতালে এক একটা রোগী একেবারে মারাত্মক শোচনীয় অবস্থায় আসে। এখানে সার্জিকাল কেসও আসে। নিয়মিত এবং যথেষ্ট পরিমানেই আসে। এই বিভাগে যে ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত ডাক্তারবাবুটি রয়েছেন, তার ওপর দেশী লোকেদের অগাধ বিশ্বাস ও বিস্ময় রয়েছে।
লেখকের টীকা
৩। রজার ডে কভারলিঃ জোসেফ অ্যাডিসন (১৬৭২-১৭১৯) ও রিচার্ড স্টিলের (১৬৭১-১৭২৯) সৃষ্ট চরিত্র। গ্রাম্য ব্রিটিশ ভদ্রলোক। দয়ালু, নীতিবান, চরিত্রবান। লোকের উপকার করতে ভালোবাসেন। কিছুটা ক্ষ্যাপাটে।
(ক্রমশ)
