রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ১৩। অনুবাদে অর্ণব রায়
কারখানার কাছে, হ্রদের চওড়া দিকটা ধরে ইঁটের থামের লম্বা সারি দেখা যাবে। এই বাড়ি আর ফ্যাক্টরি যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন এই ইঁটের থামগুলোর মাথায় জল বহনের কাঠের চওড়া পাইপ বা অ্যাকোয়াডাক্ট বসানো ছিল। যাতে করে এর মধ্যে দিয়ে নদীর জল সরাসরি নির্মানক্ষেত্রে এনে ফেলা যায়। আরও দূরে গিয়ে, যেখানে সরু ভূভাগ হ্রদের থেকে নদীকে আলাদা করছে, তার ওপর দিয়েও চলে গেছে। জিনিসটা দেখতে আপাতদৃষ্টিতে খুবই সহজ সরল একটা ব্যাপার মনে হতে পারে, কিন্তু এর দীর্ঘ বিস্তার, ক্রমে দূর হতে হতে সরু হয়ে দৃষ্টির সীমার বাইরে চলে যাওয়া, হ্রদের শান্ত নীল জলে তার প্রতিচ্ছবি, হ্রদের কিনারা ধরে সাদা সাদা বকগুলোর ডানাবিস্তার আর মাঝে মাঝে টুপ করে মাছের জন্য ডুব দেওয়া, পশ্চাদপটে অপার হরিদ্রাভার অপরূপ বিস্তারের ক্রমশ ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া, আর ওপরে ভারতের নীল আকাশ— ছবির মত সুন্দর বলতে যদি কিছু বোঝায়, তা এই। কালি আর কলমে লিখে এই সৌন্দর্য্যের ছায়ামাত্র আমি তোমাদের কাছে পাঠাতে পারি।

হ্রদ ও জলপ্রণালী (অ্যাকোয়াডাক্ট)
হ্রদের দুই দিকে যেখানে বছরের এই সময়ে জল একেবারে শুকিয়ে যায়, এই অ্যাকোয়াডাক্টটিকে রেখে দেওয়া হয়েছে। এই অ্যাকোয়াডাক্টটির শেষ মাথায় একটি বিস্ময়কর কাঠামো গাছপালার ছায়ায় আর বাগানের ঘন ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে— একটি চাইনিজ পাম্প (১)। এই যন্ত্রটি সামগ্রিক দৃশ্যটিকে আরও মনোরম করে তুলেছে।
বাড়ির ঠিক পেছনদিকে এখুনি যে বাগানটার কথা বললাম, দুইদিকে যতদূর দেখা যায়, তার বিস্তার। শান্ত হ্রদটির উত্তর দিকের সীমা বাগানের শেষপ্রান্তে এসে মিশেছে। তাতে বাগানের সৌন্দর্য্য আরও বহুগুন বেড়েছে। বাগানটা মোটামুটি চার পাঁচ একর জায়গা নিয়ে রয়েছে। বাগানে সমস্ত রকমের ভালো ভালো গাছ, বিরল প্রজাতির গুল্ম আর বাছাই করা লতা ও ফুল রয়েছে। এই সমস্ত কিছু একজন মানুষের সুরূচির পরিচয় দেয়। সামান্য বাগান ভালোবাসা থেকে শুরু করে সেই ভালোবাসায় বাগানে একখানা গ্রিনহাউস লাগানো পর্যন্ত সে মানুষ যেতে পারে। সৌভাগ্যক্রমে, ওঁর এই প্রচেষ্টায় উনি একজন অত্যন্ত দক্ষ সহকারী পেয়ে গেছেন, এক অতি বুদ্ধিমান মালী। মালীর ছোট্ট ঘরখানা বাগানের উত্তর দিকের প্রবেশপথের ধারে পাখি রাখার বড় বড় খাঁচাগুলোর কাছে রয়েছে। মাধবীলতা আর গুলগুলি ফুলে ছাওয়া এই কুটিরটি বাগানের অন্যতম সুন্দর একটি জিনিস। মালীটি একজন বুদ্ধিমান ব্যাক্তি। সে কোম্পানী বাহাদুরের কলকাতার বোটানিকাল গার্ডেনে কাজ করে এসেছে, ফলে গাছপালার ল্যাটিন নামধাম জানে— আর যে কোনও পরিস্থিতিই হোক না কেন, মূলনাথে তার দেখভালে থাকা কোনও গাছ সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন করলেই সে তার এই জ্ঞান ফলানোর সামান্যতম সুযোগ ছাড়ে না।

পক্ষীশালা
আমার বন্ধু আফশোস করে, কেন আমি একমাস আগে এখানে এসে উপস্থিত হলাম না। এক বিশেষ ধরণের লতানে গাছ, যেগুলো বাগানের পূর্বদিকের রাস্তার বড় বড় গাছগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই ঢেকে রাখে, সেগুলোতে ঝেঁপে ফুল এসেছিল। কিন্তু এটুকু বাদ দিলে, আমার মনে হয় না এখানে ভারতীয় বসন্তের সৌন্দর্য্যে কোনও কমতি পড়েছে। আশেপাশের দরিদ্র মানুষ, যাদের না আছে ঠিকঠাক পরণের কাপড় না আছে ঠিকঠাক ঘরবাড়ি, তাদের কাছে এটা শীতকাল। কিন্তু এখানকার ইউরোপীয়ানদের কাছে যাদের কাছে আরামের সব উপকরণ মজুত। যারা সব রকম প্রাচুর্য্যের মধ্যে বাস করছে, তাদের কাছে এটা ‘স্বর্গীয় বসন্তকাল’। আর তোমাদের বলে রাখি, এখানকার এই বসন্ত কিন্তু এমনকি তোমাদের ওখানকার বসন্তকেও কড়া প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলবে!
কল্পনা করো, এখন ভোরবেলা। যে ভোরের সূর্যের উষ্ণ আলোকে দরিদ্র মানুষ আদরে আগলে রাখে, আর বাকীরাও উল্লাসে আপন করে নেয়, সেই সূর্য সবে পূর্বদিকে উঠেছে, জগতের সমস্ত জিনিসের লম্বা লম্বা ছায়া পড়ছে আর সব অবয়ব একাকার হয়ে যাচ্ছে, আর শিল্পীরা যাকে আলোছায়ার সঠিক সংমিশ্রণ বলেন, সামনের বিস্তৃত ভূভাগের ওপর সেরকম নিখুঁত সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে আছে। দুটো জিনকষা ঘোড়া দড়জায় দাঁড়িয়ে আছে আর আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তাদের একটার পিঠে চড়ে গোটা মাঠটা দাবড়ে বেড়াবার।
কিন্তু সবার আগে, কুপারের (২) অনবদ্য লাইনগুলি এখানে থাকঃ ‘জীবজন্তুরা তাদের জীবন উপভোগ করছে, দেখেও ভালো লাগছে’। যেন তাদের আনন্দই তাদের হয়ে সওয়াল করছে। শয়ে শয়ে পোষ্য এখানে রয়েছে আমার ঘোড়সওয়ার সঙ্গীর মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য। প্রথমেই আড়াইশো খানেক পায়রা। তারা এ বাড়ির রান্নাঘরের চওড়া ছাদের ওপর নিশ্চিন্তে বাসা বানিয়েছে। বাড়ি থেকে মোটামুটি শ-খানেক গজ দূর থেকে এরা একসাথে মেঘের মত উড়ে আসে আর বাড়ির কার্নিশে হঠাৎ করে ঝাঁপ খেয়ে পড়ে। এখানে তারা বসে বসে ধৈর্য্যের সঙ্গে খাবারের জন্য অপেক্ষা করে। আর লনে খাবার ছড়ানোমাত্র শোঁ শোঁ করে নেমে এসে ছোট্টখাট্টো যে লোকটা ওদের দেখাশোনা করে, তাকে প্রায় ঢেকে ফেলে। লোকটার আত্মবিশ্বাস দেখে মাঝে মাঝে ঈর্ষাই হয়। তারপর আছে হরিণ। তাদের নেতা এক সাহসী পুরুষ হরিণ। সেই নেতাকে সামনে রেখে এই ভীতু জন্তুগুলো এগিয়ে আসে। আর যখন সকালবেলা তাদের দানাশষ্য খেতে দেওয়া হয়, একজন পাহারা দেয় আর অন্যরা খায়। তারপর খরগোশের বাড়ি দেখতে যাওয়া। সেখানে এই ছোট্ট ভীতু বাসিন্দাগুলোর দেখাশোনার জন্য জমাদার বা খানসামা রয়েছে। এই জন্তুগুলোকে আরামে রাখার ব্যাপারে তাদের কিছু নির্দেশ দিয়ে আসা গেল। এছাড়া বিভিন্ন রকম মোরগজাতীয় পাখি রয়েছে যারা এই খোলা মাঠে নিজেদের খুশিমত ঘুরে বেড়ায়।
এবার আমরা দুলকি চালে পার্ক থেকে বেরিয়ে গেলাম। তার আগে, কচি বাঁশগাছ যে সত্যিই চব্বিশ ঘন্টায় ছয় ইঞ্চি করে বাড়ে, এ ব্যাপারে আমরা আমাদের কৌতুহল নিবৃত করেছি।

বাঁশ
ইতিমধ্যে কারখানার গোমস্তা বা প্রধান সুপারভাইজার তার টাট্টু ঘোড়ায় চেপে উপস্থিত হয়েছে। সে তার মালিককে আশেপাশের দু একটা মাঠ দেখাতে নিয়ে যেতে চায়। সে মনে করে, সামনের চাষের মরশুমের আগে আগে এই মাঠগুলোর দিকে নজর দেওয়া দরকার। সুন্দর সকাল। চারপাশে ভারতের উজ্জ্বল দিনের আলো ঝক্ঝক্ করছে। বাতাস, যতটা আশা করা গেছিল, তার চেয়ে একটু জোরে বইছে। বড় রাস্তাটি সোজা ষোল মাইল দূরে বাজার শহর চাকদার দিকে চলে গেছে। মিঃ এফ— সেই রাস্তা ছেড়ে একটা গাছে ছাওয়া পায়ে চলা পথ ধরলেন। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার দরিদ্র পথচারী চলে। আট বছর আগে গোটা রাস্তাটা জুড়ে দুপাশে উনি মেহগনি জাতীয় গাছ লাগিয়েছিলেন। তারাই এখন ছায়া দিচ্ছে। আমরা হ্রদের ধারে ছবির মত সুন্দর পাঁচপোথা গ্রামের মধ্যে দিয়ে গিয়ে খোলা চষা ক্ষেতের মধ্যে গিয়ে পড়লাম। অধিকাংশের ওপরে তিসি আর সরষে গাছের অপরূপ সবুজ আবরণ। তিসি গাছের সুন্দর ছোট ছোট বেগুনি ফুল সরষে ফুলের অসামান্য হলুদ বিস্তারের সাথে সুন্দর খাপ খেয়ে গেছে। মাঝে মাঝেই দেখা যায় হলুদ আর বেগুনী ফুল মিশে সুন্দর দৃশ্য তৈরি করেছে। এর ব্যাপারটাও ভুট্টা ক্ষেতে আফিম চাষের মতই আকস্মিক ঘটনাবলীর জন্যই হয়েছে। কোথাও বা এই দুই বীজ মাটিতে বোনার সময় অজান্তে মিশে গেছিল হয়ত। এই দুই বীজই অক্টোবর মাসে বোনা হয়। কিন্তু যেখানে সরষে ডিসেম্বর মাসে বা বড়জোর এই মাসে (জানুয়ারী) কেটে নেওয়া হয়, আফিমকে কিন্তু মার্চ মাস পর্যন্ত রেখে দেওয়া হয়।

পাঁচপোথা গ্রাম

তিসি গাছের ফুল
অনুবাদকের টীকা
১। চাইনিজ পাম্পঃ পরপর চেন দিয়ে আটকানো অনেক দোন বা গামলার মত পাত্র আটকানো জলসেচের যন্ত্র। এটি একসময় খুব জনপ্রিয় ছিল। মূলতঃ নীচু জমি থেকে উঁচু জমিতে জল তোলার জন্য এই যন্ত্রটি ব্যবহার হত। গ্রান্ট অসংখ্য ছবি আঁকলেও দ্বিতীয় চিঠিতে চাইনিজ পাম্পের কোনও ছবি এঁকে যাননি। এঁকেছেন অষ্টম চিঠিতে। একখানি নয়, তিনখানি। সেখানে এর কর্মপদ্ধতির বিস্তারিত বর্ণনাও আছে।
২। কুপারঃ অষ্টাদশ শতকের অন্যতম জনপ্রিয় কবি উইলিয়াম কুপারের (১৭৩১-১৮০০) কথা হচ্ছে। উদ্ধৃত কবিতাটি তাঁর ১৭৮৫ সালের কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য টাস্ক’ থেকে নেওয়া।
(ক্রমশ)
