রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ১০। অনুবাদে অর্ণব রায়
হুগলী নদীর জল কেটে যত জলযান যাতায়াত করে তার মধ্যে আমার সবচেয়ে সুন্দর মনে হয় ইলিশ মাছ ধরার নৌকাগুলিকে। এই একহারা চেহারার নৌকাগুলি, যদিও লম্বায় অনেক বড়, দুদিকে সরু হয়ে যাওয়ার কারনে দেখে মনে হয় তাদের পূর্ণ দৈর্ঘ্যের এক তৃতীয়াংশ জায়গাই দখল করে আছে মাত্র। এই নৌকাগুলি মোটামুটি জনাপাঁচেক লোক বহন করতে পারে। আর মাছ ধরার মরশুমে এর সঙ্গে একটা ৬ ফিট চওড়া আর মোটামুটি ৩০০ ফিট লম্বা জাল আটকানো থাকে। এই জালের নীচের লম্বা দিকটায় হালকা হালকা ওজন আটকানো থাকে। আর ওপরের দিকটা ধরে থাকে বাঁশের কাঠামো। আর যখনই মাছ ধরার সময় আসে, বাঁশের কাঠামো সমেত জাল নেমে গিয়ে জলের ভেতরে একখানা প্রাচীর তৈরি করে দেয়। স্রোতের সঙ্গে দ্রুত সাঁতার কেটে আসা ইলিশ মাছগুলির ডানা এই জালের প্রাচীরে আটকে যায় আর তারা পালাতে পারে না। মাঝে মাঝে দেখা যায় এই বিশালাকার জালগুলো নদীর অর্ধেকটা জুড়ে টাঙানো আছে। এমনভাবে টাঙানো আছে যে দরকার পড়লে কাঠামোসুদ্ধু জালকে এতটাই গভীরতায় নামিয়ে দেওয়া যাবে যে বড় নৌকা বা স্টিমার ওপর দিয়ে গেলেও কোনও ক্ষতি হবে না। এই সময় জালসুদ্ধু নৌকাটিই স্রোতের সাথে সাথে ভেসে চলে। স্রোতের বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনওরকম প্রচেষ্টাই জালটির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। বাংলার ছোট ছোট নদীনালাগুলিতেও দেখা যায় যে এপাড় ওপাড় জাল টাঙানো রয়েছে, উদ্দেশ্য সেই মাছ ধরা।
বছরের অন্যান্য মরশুমে এই নৌকাগুলি সাধারণ মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করা হয়। তাতে অন্যরকম জাল লাগে। সে জালের দৈর্ঘ্য-প্রস্থও অনেক কম। এই জাল টাঙানো থাকে দুখানা বাঁশের দু মাথায়। সেও বাঁশদুটির মোটা দিকে বা গোড়ার দিকে আবার কোনাকুনি করে বাঁধা। এই জালসমেত বাঁশ দুখানা ছোট ছোট বাঁশের ওপর পেতে রাখা একটি বাঁশের ওপর হেলান দিয়ে রাখা, যা কিনা এই কোনাকুনি বাঁধা জালসমেত বাঁশের ঠেকনা হিসেবেও কাজ করে আবার কবজা হিসেবেও কাজ করে। যদি জালটাকে জলে নামাতে হয়ে, তাহলে শুধুমাত্র বাঁশের ভারী দিকটাকে ছেড়ে দিতে হয়। বাঁশের মাথার দিকের জালসমেত ভার পুরো জিনিসটাকে জলে টেনে নামানোর জন্য যথেষ্ট। জালটাকে জল থেকে তুলতে গেলে তখন ওই বাঁশের কবজা পুলি হিসেবে কাজে লাগে। তিনচারজন লোক পুরো শক্তি লাগিয়ে বাঁশের ভেতরের দিকটায় চাপ দিয়ে জিনিসটাকে জলের বাইরে বের করে আনে।

মাছ ধরার জাল ও ইলিশ মাছ ধরার নৌকা
মাছ ধরার আর একটা অসাধারণ উপায় হল গোল জাল দিয়ে ধরা। জালের বাইরের দিকে ছোট ছোট সীসের ওজন দিয়ে ভারী করা থাকে। জালের কেন্দ্র থেকে একটা দড়ি লাগানো থাকে যেটা জেলের হাতে ধরা থাকে। আর একটা দড়ি আলগা করে জালের প্রান্তে লাগানো থাকে। জালটাকে প্রথমে হাতের মধ্যে জড়ো করা হয়, মাথার ওপর তোলা হয় আর অত্যন্ত নিপুণভাবে মাথার ওপর ঘোরানো হয়। মুহূর্তের মধ্যে জালের ধারগুলো বাতাসে একটা প্যারাশুটের মত খুলে যায় আর মোটামুটি আঠারো কুড়ি ফিট জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে জলের ওপর নেমে আসে। জালের কেন্দ্রটা তার সাথে লাগানো দড়ি দিয়ে হাতে ধরা থাকে। কিন্তু তার ধারগুলো সীসে দিয়ে ভারী করে রাখার দরুণ মুহূর্তের মধ্যে হতভাগ্য মাছেদের ঘিরে একটা তাঁবুর মত ঘিরে নেমে আসে। যে সমস্ত মাছ জালের তাঁবুটি নেমে আসার আগেই তলা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যেতে পেরেছে, তারা বেঁচে গেল, বাকীদের ঘন্টাখানেক পেরোতে না পেরোতে স্থানীয় মাছের বাজারে দেখতে পাওয়া যাবে।
এখানে বলে রাখি, ইলিশ কিন্তু অত্যন্ত সুস্বাদু মাছ। ইউরোপীয়ানরা এই মাছ খুবই পছন্দ করে। কিন্তু এত বেশী কাঁটা যে খাওয়ার আনন্দের থেকে গলায় কাঁটা বিঁধে মরার ঝুঁকিটাই বেশী হয়ে যায়। ইলিশ মাছের ডিমও একটি অতি উপাদেয় খাবার। আর এতে কোনওরকম বিপদের ঝুঁকি নেই।
মাছ ধরার আর একটা অদ্ভুত তৃতীয় পদ্ধতি আমি আশেপাশের ছোট নদীগুলিতে ব্যবহার হতে দেখেছি। একটা বড় ঝোঁপ বা একটা ছোট গাছকে নৌকা করে মাঝনদীতে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর সেটাকে সেখানে জলে ডুবিয়ে রেখে দেওয়া হয়। তার বেশ খানিকটা দূরে বাঁশ দিয়ে গোল করে ঘিরে দেওয়া হয়। এই কাজটি হয়ে গেলে লোকজন জায়গাটাকে ঘিরে দাঁড়ায়। প্রথমে বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখে। তাদের হাতে একটা ছোট ঢোল অথবা দুটো বাঁশ বা কাঠের টুকরো, যেটা তারা তালে তালে বাজায়। উদ্দেশ্য হচ্ছে মাছেদের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে ওই বিশ্বাসঘাতক ডুবে থাকা গাছের আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া। বৃত্ত ছোট করতে করতে লোকজন এবার ধীরে ধীরে গাছটার দিকে এগিয়ে আসে। ইতিমধ্যে তারা একটা লম্বা জালের নীচের দিকটা জলের তলায় ফেলে দিয়ে সবাই মিলে হতভাগ্য মাছগুলোকে ঘিরে ধরে। দুতিন জন লোক এরপর জলের তলায় ডুব দিয়ে জালের তলার দিকটা একজায়গায় জড়ো করে বেঁধে দেয় আর তাদের প্রতিরোধহীন পুরস্কার জল থেকে তুলে নিয়ে আসে।
নদীর ছোট ছোট মাছ যেমন বড় বা ছোট চিংড়ি, বিভিন্ন ধরনের ছোট ছোট মাছ যেমন পুঁটি মৌরলা বা পারশে, নদীর ধারের গ্রামগুলিতে বসবাস করা দরিদ্র গ্রামবাসীরা এগুলোই খেয়ে থাকে। নদীর পাড়ের কাছে এদের দেখতে পাওয়া যায়, নারী পুরুষ নির্বিশেষে কোমর পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বা হেঁটে বেড়াচ্ছে। তাদের সামনে একটা বেলচার মত হাতজাল। প্রতি দু-তিন মিনিট অন্তর অন্তর যখন সেই জাল তারা জল থেকে তুলে আনছে, তার মধ্যে একমুঠো ছোট ছোট মাছ ধরা পড়ে থাকছে। তাদের ধৈর্য্য আর পরিশ্রমের ফসল।

মাছ ধরার হাতজাল
কিন্তু আমাদের এই জলযাত্রা গত দু ঘন্টায় অত্যন্ত ক্লান্তিকর হয়ে পড়েছে। একটু আগে আমরা যে জোয়ারের বেশ সাহায্য পাচ্ছিলাম, তা এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। বছরের এই ঋতুতে এই রকমই হয়। জোয়ারের টান খুব অল্প সময়ের জন্য থাকে। এদিকে উত্তর পূর্ব দিক থেকে এমন এক হাওয়া বইছে যে পাল খাটিয়ে যে একটু লাভ পাওয়া যাবে, তাও হচ্ছে না। আমাদের লোকেরা শুধু শুধুই দাঁড় টানছে (বিশেষ করে তাদের নিজস্ব ভঙ্গীতে)। অবশ্যই কিছু বখশিসের আশায়। আমিও একখানা বাড়তি দাঁড় নিয়ে বৃথাই ঠেলাঠেলি করছি। কোনও দিকেই কোনও অগ্রগতি হচ্ছে না। আর কিছু করার নেই। এবার আমাদের লোকেদের নৌকাটাকে গুন টেনে নিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ একটা লম্বা দড়ি মাস্তুলের মাথায় বাঁধতে হবে। তারপরে নদীর পাড়ে পাড়ে হেঁটে সেই দড়ি ধরে নৌকাটাকে টেনে টেনে নিয়ে যেতে হবে। অসম্ভব পরিশ্রমের কাজ। তার ওপর নদীর পাড় ভাঙাচোরা, কোথাও উঁচু কোথাও নিচু। আর কয়েকশো ফিট যেতে না যেতেই বিভিন্ন নালা আর ছোট বড় খাল এসে নদীতে মিশছে। এই বাইরে থেকে এসে মেশা খালগুলোকে মাঝারি গভীর ও চওড়া হতে হয়। যদি সে খাল বেশী চওড়া আর গভীর হয় তাহলে আমাদের লোকেদের হয় সেই সংক্ষিপ্ত দূরত্ব সাঁতরে পার হতে হবে না হলে নৌকায় এসে সেই দূরত্বটুকু দাঁড় টেনে পার করে আবার ডাঙায় নামতে হবে। মাঝে মাঝেই বড় বড় নৌকার সারি, যেগুলোর জোয়ারের স্রোত ঠেলে যাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই, নদীর পাড় ঘেঁসে নোঙর ফেলে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের নৌকা গুন টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় এই নৌকাগুলোর উঁচু উঁচু মাস্তুল সেই গুনের দড়ির লাইনে এসে পড়ে। এখন আমাদের সেই নৌকাগুলোর মাঝিদের দয়ার ওপর ভরসা করে বসে থাকতে হয়, কখন তারা কৃপা করে উঠে গিয়ে মাস্তুলের ওপর থেকে দড়িটাকে পার করে দেবে। আর যদি তারা দয়া না করে বা নৌকার সারিতে অনেক নৌকা থাকে, তাহলে আমাদের লোকেদের গিয়ে সেইসব নৌকায় উঠতে হয়। আর তারপর সেই নৌকার ওপর দিয়ে দড়ি ধরে টেনে টেনে আমাদের নৌকাটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় যতক্ষণ না খালি তটভূমি পাওয়া যায়। আমার এরকমও অভিজ্ঞতাও আছে যেখানে নদীর স্রোত ছিল যথেষ্ট বেগবান আর হাওয়া আমাদের অনুকূলে ছিল না, আমাদের একটা দীর্ঘ নৌকার সারি পার হতে এক ঘন্টার ওপর সময় লেগেছে!
অতএব বুঝতেই পারছো, এতরকম বাধা পেয়ে পেয়ে আমাদের অগ্রগতি সত্যিই ধীর হয়ে গেছিল। কিন্তু সারাক্ষণ দুপাশে চাষের ক্ষেত আর তার ওপর চাষীদের হাল চালানোর দৃশ্য আমাদের সঙ্গ দিয়েছে। এতক্ষণে নদীর বাম পাড়ে সুখসাগর হাউস দেখা গেল। আমাদের চক্ষু সার্থক হল। আমাদের এতক্ষণের জলযাত্রা এবারে মোটামুটি বিকেল চারটে নাগাদ শেষ হল।

সুখসাগর হাউস
(ক্রমশ)
