রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ১। অনুবাদে অর্ণব রায়
মুখবন্ধ
এই চিঠিগুলি, দুটি ব্যতিক্রম ছাড়া, সবকটিই বছর পাঁচেক আগে লেখা। নিরন্তর ঘুরে বেড়ানো আর নানা রকম দায়দায়িত্বের চাপে এগুলি প্রকাশ করতে অনেক দেরি হয়ে গেল। ইতিমধ্যে গত কুড়ি মাস ধরে সারা দেশ জুড়ে যে বিধ্বংসী বিদ্রোহ চলেছে, দেশের কোনও কোনা তার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। অসংখ্য গৃহে শোকের হাহাকার বয়ে এনেছে এই বিদ্রোহ। আর চারপাশে এই ভয়াবহ নাটক চলতে থাকায়, অন্য সমস্তরকম ভাবনাচিন্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চারপাশের এই সর্বগ্রাসী বাস্তবতা দেশের প্রতিটি খ্রিস্টানকে কোনও না কোনও ভূমিকা পালন করতে আহ্বান জানিয়েছিল, তা সে যত সামান্যই হোক আর যত দূর থেকেই হোক না কেন। ধরে নেওয়া হয়েছিল, এই ধ্বংসলীলা আর যুদ্ধের কোলাহল ছাড়া আর সমস্ত বিষয়েই মানুষের আগ্রহ নির্বাপিত হয়ে গেছে। কিন্তু এখন বিদ্রোহের হাইড্রার (১) মত বহুমাথাওয়ালা মূলশক্তিটিকে থেঁতলে দেওয়া গেছে, ওই যে একটা কথা আছে না, ‘বিপ্লবকে ধমকে দেওয়া হয়েছে’! বিবাদের স্বর আবছা থেকে আরও আবছা হয়ে আসছে। রাজকীয় ক্ষমা-র নারীসুলভ কোমল কমনীয় সুর তাকে চুপ করিয়ে দিচ্ছে। শান্তি ফিরে আসছে। আর তার সাথে ফিরছে বসন্তের স্বর্গীয় কোমলতা, তার অভ্যস্ত হাসিটুকু নিয়ে। যেন পুরোনো দিনের হারিয়ে যাওয়া ঘুঘুপাখিটি বসার জায়গা খুঁজতে খুঁজতে আমাদের এই মানববর্জিত প্রান্তরে নেমে আসছে, এই ক্ষুব্ধ দেশে আবার শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য।
আর তাই, সেই রাজরাজেশ্বরী মহারাণির অপার ‘ক্ষমা’-র দ্বারা সুরক্ষা পেয়ে ও তাঁর সদাশয়তার ওপর ভরসা করে তার ‘অপরাধ’-টিও ক্ষমা পেয়ে যাবে, সেই আশায় এই লেখক তাঁর এই তুচ্ছ নিবেদন মহারাণির শান্তির দরবারে পেশ করছেন।
এই যে দীর্ঘ সময় মাঝখানে বয়ে গেল আর এর মধ্যে সারাদেশে বিদ্রোহের ঝড় বয়ে গেল, যার দিকে আধখানা পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে নিস্পলক তাকিয়ে ছিল, এই সমস্ত কিছুও কিন্তু আমাদের ঘরের কাছের অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ঝামেলাগুলো থামিয়ে রাখতে পারেনি। আর তাই নিজের কাজে ফিরে এখন লেখক খেয়াল করে দেখছেন যে তিনিও এই সময়টাতে নানারকম বিবাদে ঘেরা এলাকাতেই ঘুরে বেড়িয়েছেন। এখানে নীলচাষের কথা হচ্ছে। নীলকর রায়ত সবাইকে জড়িয়ে যে সমস্ত সমস্যা নিয়ে আজ থেকে তিরিশ বছর আগে সবরকম আলোচনা ফুরিয়ে গেছে, বিভিন্ন দল আবার নতুন করে সেসমস্ত বিষয় উত্থাপন করে, বাকবিতন্ডা করে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে একটা বিতর্কে পরিণত করে তুলছে। লেখক ব্যাক্তিগতভাবে অবশ্য এতে দুঃখ পাওয়ার মত কিছু খুঁজে পাননি। এতে করে বরং বিষয়টি সম্পর্কে তার জ্ঞানের পরিধি আর দৃষ্টিভঙ্গী দুইই প্রসারিত হয়েছে। যদিও তাঁর এই গ্রন্থের মূল কাঠামোটিতে এর কোনও প্রভাব পড়েনি। আর, এক সময়খন্ডের ঘটনাকে অন্য সময়খন্ডে টেনে এনে লেখকের ভাবনাচিন্তাকে প্রভাবিত করার কোনও প্রয়োজনও নেই। যদিও এই গ্রন্থ কোনও রকম তদন্ত বা সমালোচনাকে ভয় পায় না, তবু একথা জানিয়ে রাখা ভালো, এর কাঠামো, খুব স্পষ্ট ভাষায় বললে, কোনওভাবেই বিতর্কিত নয়, বরং বর্ণনাত্মক ও চিত্রময়। যে বিষয়বস্তু সে এই চিঠি আর ছবিগুলির জন্য বেছে নিয়েছে তা মূলতঃ তাঁর বোনেদের নরম মন আর নারীসুলভ কমনীয় মনকে খুশি করার জন্য। চিঠিতে বর্ণিত ‘সুন্দর সুন্দর বাড়ি’ আর ‘নোয়ার নৌকা ও অন্যান্য বস্তুগুলি’ কোনও এক বিদঘুটে জাদুবলে সাদা ফটফটে সমাধিগৃহে বা বিভৎস কঙ্কালে বদলে যাবে, এমনটা ভাবাও নিতান্ত বাড়াবাড়ি হবে। তাই এখন লেখক আশা করতেই পারেন যে তার এই ছবিগুলির ভেতরে এমন কোনও মারাত্মক ধ্বংসাত্মক বস্তু নেই যার সম্বন্ধে তিনি আগে থেকে আন্দাজ করতে পারেননি আর সেই কারনেই ছবিগুলিকে তৎক্ষণাৎ আগুনে ছুঁড়ে দেননি। কেননা, লেখক খুব নিশ্চিতভাবেই বলতে চান যে, যদি ধরা পড়ে যে তিনি এই ছবিগুলির মধ্যে দিয়ে, ওই ধর্মগ্রন্থের ভাষায় যাকে বলে ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে লড়াই’, এরকম কিছু একটা করে বসেছেন, মানে ক্ষমতাবান ও দুর্বলের সম্পর্ক নিয়ে আকাশকুসুম বর্ণনা দিয়েছেন বা দরিদ্রের অবস্থা, দুঃখকষ্ট, চাহিদা ইত্যাদি বিষয়ে কোনও মিথ্যা ধারণা দিয়েছেন, তাহলে তিনি সেই মুহূর্তেই বইখানিকে আগুনে সমর্পণ করতে একবারও দ্বিধা করবেন না।
এই পুরো দ্বন্দ্বের মধ্যে থেকে যে বিষয়টি উঠে এসেছে, লেখক যেখানে বিরাটভাবে আটকে গেছেন আর বারবার সেই উদাহরণের কাছে ফিরে ফিরে এসেছেন, যাকে সে দরিদ্রের ওপর শোষনের মূল হাতিয়ার মনে করে যতোভাবে পারা যায় মন্তব্য করেছেন— সেই দস্তুরি (২) দেওয়া-নেওয়ার প্রথা সম্পর্কেই আশ্চর্যজনকভাবে সর্বত্র সবচেয়ে কম কথা বলা হয়েছে। একজন লেখক, যার কথার সমস্ত গুরুত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তার অনুসন্ধান ও মতামতের দ্বারা প্রকাশিত হয়, এখানে ঘোষণা করছেন, বিশ্বশুদ্ধু সবাই জানে যে বাংলায় একমাত্র একটি জেলায় (পাবনা) রায়তকে যে অগ্রিম বায়না দেওয়া হয়, তার হাতে তার অর্ধেক নয়, মাত্র এক তৃতীয়াংশ বা কখনও তারচেয়েও কম টাকা এসে পৌঁছোয়। বাকী সিংহভাগটা নীল তৈরির কারখানা নামক প্রতিষ্ঠানটি গিলে নেয়। এবার আপনার কল্পনার নৌকা ভাসিয়ে একবার বৃটিশ উপকূলভাগে গিয়ে উপস্থিত হন দেখি। রাজকীয় বন্দর বা অন্য যেকোনও জায়গাতেই শ্রমিকরা যদি শোনে যে তাদের উপার্জিত অর্থের দুই তৃতীয়াংশ বা তারও বেশী তাদের উর্ধতন অফিসার, যারা কি না সর্বক্ষণ তাদের হুকুম দিয়ে চলেছে, তাদের পকেটে গিয়ে ঢুকবে, তাহলে তারা কী বলবে বা করবে!
আর এইরকম একটা ব্যবস্থা আর এই পরিমানে, নাহ্, এর অর্ধেক পরিমানেও যদি এদেশের মাঠেঘাটে চালু থাকে, তাহলে দরিদ্র মানুষ যে যন্ত্রণায় কাতরে কাতরে উঠবে, এতে আর আশ্চর্য কী! আজ যদি সরকার আর শিক্ষাব্রতী মানুষদের পাঁচগুন উৎসাহ না দেওয়া হয় তাহলে তারা কীকরে এই সমস্ত মানুষদের অবস্থার ক্রমোন্নতি ঘটাবে, কীকরেই বা অন্ধজনে দেবে আলো! কী করেই বা এই হতভাগ্যরা এই সামাজিক ব্যবস্থা যা তাদের চিরকাল দরিদ্র আর শেকড়হীন করে রেখে দেওয়ার ফিকিরে থাকে, তার জোয়াল থেকে নিজেদের ক্রমে ক্রমে মুক্ত করবে?
যদি (একটু আধুনিক শব্দ ব্যবহার করলে) এই ঢাকাচাপা দেওয়া বিষয়টিকে প্রকাশ্যে এনে আলোচনা করলে সত্যিটাকে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য হয়, আর নিজের কাজ করতে গিয়ে এই লেখক যদি সেই সত্যের প্রতিষ্ঠানকে এককনাও সাহায্য করে থাকেন, তাহলে তাঁর আনন্দের সীমা থাকবে না। এই সমস্ত বিতর্কিত বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি মূলতঃ যা দেখেছেন তাই লিখেছেন। আর যা তিনি দেখতে পাননি, তার জন্য অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্রের ওপর নির্ভর করেছেন। তাই, তাকে আর যাই হোক, পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা যাবে না বলেই তাঁর বিশ্বাস। লেখকের প্রাবন্ধিক হওয়ার কোনও বাসনা নেই। তাই যা তিনি পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন বা খোঁজখবর করে পেয়েছেন, তাই তিনি লিখেছেন। এতে তাঁর লেখার পরিধি সীমাবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তাঁর লেখার কোমল সৌন্দর্য্য বা বর্ণনার মসৃণতা কোনওভাবে ব্যহত হবে, এই ভয়ে তিনি কোনও বিষয়কে এড়িয়ে যাননি। মোদ্দা কথা হল, এই লেখার উদ্দেশ্য কোনও ব্যাক্তিবিশেষকে তোল্লাই দেওয়া বা কাউকে সম্পুর্ণ দোষশূণ্য মহামানব হিসেবে দেখানো নয়। বরং মানুষের প্রতি মানুষের যে ব্যবহার দেখতে ভালো লাগে ও যা দেখে লেখকের মনে হয়েছে যে তা অনুকরণযোগ্য, তার কথাই লেখক এখানে বলেছেন। এই ব্যবহার শুধুমাত্র উপলব্ধি করার নয়, প্রতিদিনের আচরণে একে পুনরুদ্ধার করে আনতে হবে। শুধুমাত্র তিরস্কার করে কিছু হবে না।
লেখক আশা করেন ও বিশ্বাস করেন যে তাঁকে দরিদ্রের দলেই ফেলা হবে। তিনি শুধু তাঁর লড়াইটা নিজের মত করে করার অধিকারটা নিজের কাছে রাখতে চান। তিনি শুধু এটুকুই বলতে পারেন, এই অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা হলে, এই পৃষ্ঠাগুলোকে প্রকাশ করার উৎসাহ তিনি অর্ধেক হারিয়ে ফেলবেন।
সবশেষে তিনি এটাই বলতে চান, সমস্ত বিষয়টার মধ্যে তিনি নতুন কোনও অভিজ্ঞতা যোগ করছেন না। তাই পুরোনো দিনের সব ক্রুদ্ধ প্রশ্নগুলোকে খুঁচিয়ে জাগিয়ে তোলার কোনও প্রয়োজন নেই। আর তিনি আন্তরিকভাবে আশা করেন, যে বিষয়গুলো দ্বন্দ্ব নয় পারস্পরিক সহযোগিতা আর সহমতের দ্বারা অনেক সুষ্ঠুভাবে সমাধান করা সম্ভব, সে সমস্ত বিষয়ে এই লেখাটি নতুন করে ঝগড়াঝাঁটি বাঁধিয়ে তুলবে না। আর গ্রামবাংলা যদি সত্যিই ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় হয়, আর সেখানে পৃথিবীর কলকোলাহল থেকে শান্তিময় একাকীত্ব পাওয়া যায়, তাহলে সেখানে ঝগড়াঝাঁটি দ্বন্দ্বমূলক বিষয় ঢোকানোর মত বাজে কাজ আর কিছু হয় না। এই গ্রামবাংলায় নীলকররা আর ধর্মপ্রচারকরা সাধারণ দরিদ্র দেশীয় মানুষজনের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে। তারা তাদের ভাষা খুব ভালো করে শিখে নিয়েছে। তারাই একমাত্র পারে ওখানকার সত্যিটাকে সবার সামনে তুলে ধরতে। যে সত্যি শুনলে যেকোনও সুস্থ মস্তিস্কের মানুষের দমবন্ধ হয়ে আসবে। যে কোনও সৎ ইংরেজ এই অবস্থার উন্নতি কামনা না করে পারবে না। এর সাথে এটাও যোগ করা যায়, এমন কঠোরহৃদয় কি সত্যিই কেউ আছে যে ঈশ্বরের এই নির্দেশ অমান্য করবে— “কারন প্রভু তাদের পক্ষ নেবেন আর যারা তাদের লুন্ঠন করেছে, তাদের প্রাণ লুন্ঠণ করবেন” (৩)
প্রার্থনা এই, নীলকর আর ধর্মপ্রচারকরা আরও ঘনিষ্ঠভাবে একজোট হোন। আর তাদের বন্ধুত্বের এই যৌথশক্তি এই বিপুল দেশের অগনিত দরিদ্র মানুষকে সাময়িক আরাম আর চিরন্তন শান্তি, দুইই প্রদান করুক।
কলকাতা, ১৮৫৯

নীল গাছের কচি পল্লব
টীকা
১। হাইড্রাঃ গ্রীক ও রোমান মিথোলজির বহুমাথাওয়ালা দানব। এ আন্ডারওয়ার্ড-এর প্রবেশপথে দন্ডায়মান থাকে। এক একটা মাথা কেটে দিলে সেখানে একাধিক মাথা জন্মায়।
২। দস্তুরিঃ দস্তুরি বলতে মূলত দালালির জন্য প্রদেয় অর্থকে বোঝায়। নীলচাষ করার বিভিন্ন পর্যায়ে নীলকর সাহেব বা নীল উৎপাদনকারী কারখানার মালিকরা বিভিন্ন লোককে নানারকম দস্তুরি দিত। যেমন নীল গাছ সংগ্রহ, নীল প্রক্রিয়াকরণ ও তাকে বাজারজাত করার বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে জড়িত ব্যাক্তিরা এই দস্তুরি পেত। এই অর্থের সবচেয়ে কম অংশ চাষীদের কাছে পৌঁছোত। এবং এই অর্থের লোভেই বিভিন্ন স্তরের লোকেরা চাষীদের নানারকমভাবে শোষন করত।
৩। কিং জেমস-এর বাইবেলের প্রবাদ অংশের ২২:২৩ নম্বর ভার্স।
