অভিমানভূম। পর্ব ৮। বর্ষামঙ্গল। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

অ্যায়সি ইয়াদ তুমহারি আয়ে,

বেকল মনওয়া চৈন না পায়ে

ছায়ে কালে বদরওয়া ছায়ে

কৌন মেরে মনকো সমঝায়ে

 

কালো একটা চাদর ঢেকে ফেলছে ক্রমশ আকাশ। তার কালো ছায়ায় আরও গাঢ় হয়ে উঠছে কালচে সবুজ। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে জংলী লতা। মাথা তুলে যেন বুলি ফোটা বাচ্চাদের মতো শোনাতে চাইছে কিসসা কোনও ভিতর দেশের। বৃষ্টি আসছে খুব। খুব বারিষ! খলবল করতে করতে ছুটছে কোথায় ছেলেপুলের দল? “বাঁধের ধারে। মাছ উঠবে তো!” শিলাই মাঠের হরিমন্দিরে আড্ডা খানিক প্রৌঢ় বা মধ্যবয়স্কদের। তাদের আশেপাশে, সামনে বা পিছনের দিগন্তে সবুজ খুব বেশি এখন। সবুজ খুব ঘাস। গাছের পাতা। রুখা জমিতে কদিনের জন্য যেন আদরের প্রলেপ।

পুরুলিয়া টাউন থেকে কাজ সেরে ফেরার পথে দেখা হয় এইসব কিছু কিছু অল্প চেনা জানা মুখের সঙ্গে। ডাক আসে অধিকারের টানে। সেই অধিকারের কী নাম? জানা নেই। ভালবাসা কি এতই সহজে পাওয়া যায়? কিংবা নিছক স্নেহ বা বন্ধুত্ব? দু’গ্লাস চায়ের পরে উঠতেই হয় অগত্যা। খুব বৃষ্টি চলে এলে আটকে পড়তে হবে। সঙ্গে ডকুমেন্টস বেশ কিছু। আর এই গ্রাম থেকে ভোরবেলা টাউনে গিয়ে সারাদিনের কাজ সেরে ফেরা তারপর আরও পঞ্চান্ন কিলোমিটার— ব্যাপারটা একটু ক্লান্তিকরও বটে। “চইল্যে?” “উঠি এবার!” এখন আর “বাড়ি যাব” বলা হয় না। বলি, “ঘর যাব।” বলি আবার আসবো পরে একদিন।

ফিরতেই ফিরতেই মেঘ কালো হয়ে আসে আরও। যেদিকটা কালো হয়ে এসেছে খুব, সেদিকটাই বাঁকুড়া-দুর্গাপুর হয়ে শহর আমার। আবার সেই টানাপোড়েন চিরন্তন। কবে যাওয়া হবে ঘরে? হাওয়া আসে ধানজমির উপর দিয়ে। মাঠের কাজ সেরে কাদা শরীরে উঠে আসছে পুরুষ-মহিলার দল। মুখে হাসি। কারণ আকাশের মেঘ। এটুকুই তো সম্বল! তাদের হেঁটে যাওয়াদের দিকে তাকিয়ে থাকি খানিকক্ষণ। ওই পথেই? ওই পথেই কি? ‘কান্ট্রি রোডস্ টেক মি হোম’… হঠাৎ করে কোথা থেকে ডেনভার এসে গুনগুন করে যান মাথার ভিতর… ‘টু দ্য প্লেস আই বিলং…’ আই বিলং? কোথায়?

অথচ গান আসার কথা ছিল ‘শালতলে বেলা ডুবিল’। ডুবলই তো! এই কালচে হয়ে আসা মনমরা বিকেল, জোলো হাওয়া… খুব বৃষ্টি হলে ভাসবে কাঁসাই… বাঁধ ভরে উঠবে জলে… এমন সময়েই তো ডুবে যায় চোখ হঠাৎ পথচলতি কারুর হাসি বা কানেকানে ফিসফাস দেখতে দেখতে। সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকের থেকে মুখ ফিরিয়ে এক তরুণীর বলে ফেলা ভীষণ অভিমানে, “মিথ্যে মিথ্যে মিথ্যে!” বৃষ্টি আসার আগেই অকাল শ্রাবণ তার চোখে। কোন ছাতায় বাধ মানবে এই ধারা? পশ্চিমের বাতাস ছুঁয়ে, দক্ষিণের মেঘ ছুঁয়ে তো গান আসার কথা ছিল এমন সময়ে… ‘সোনার ছাতা ভাঙিল, সোনার ছাতা ভাঙিল, সোনার ছাতা ভাঙিল রে…’

পুরুলিয়ার কথা উঠলেই বিভিন্ন জায়গায় শীত, গরম আর অবশ্যই বসন্ত নিয়ে যত কথা হয়, বর্ষাকাল নিয়ে সেরকম কথা হয় না প্রায় একদমই। অথচ বর্ষাকালে পুরো জেলাটাই কেমন সেজে ওঠে নতুনভাবে। সেজে ওঠে টাঁড়-বহাল। আচমকা উত্তাপের পারদ নেমে যায় নীচে অনেকটাই। চারপাশের রুখা-সুখা জমিগুলোও হঠাৎ বদলে ফেলে রূপ। যেন নতুন বিয়ের পর আচমকা বদলে যাওয়া কমবয়সী মেয়ের মুখের মতো। মায়া মায়া। গভীর। রহস্যময়।

তবে বর্ষাকালে পড়া গেল নতুন একটা সমস্যায়। যে ঘরে থাকি, সেটা তীব্র গরমকালের মধ্যেও খুবই আরামদায়ক হলেও, বর্ষা আসতেই বুঝলাম ঘরটা কী প্রচন্ড পরিমাণ স্যাঁতস্যাঁতে! এদিকে পুরনো কালের স্ট্রাকচার হওয়ায় ছাদের উপর জল জমে থাকে অনেকটা, আর সেই জল ছাদ আর দেওয়াল চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামে ঘরের ভিতর। সেবার পুরুলিয়া নেমে লৌলাড়া পৌঁছে ঘরে ঢুকতেই দেখলাম, ফেরত যাওয়ার সময় ঠিক যে অবস্থায় ছিল ঘর, একদমই সেই একই অবস্থায় পড়ে আছে। কোনও কাজের জন্য অথবা চিকিৎসার কারণে বয়স্ক সেক্রেটারি স্যারকে প্রায়ই গিয়ে থাকতে হতো কলকাতায় ওনার ছেলের কাছে। বুঝলাম, মাথার উপর থেকে ছাতা সরে গেলে রোদ-বৃষ্টির প্রাবল্য এভাবেই বেড়ে যায় হয়তো! যেহেতু দেখাশোনা করার জন্য তিনি নেই, তাই শুনতে খারাপ লাগলেও, কাজেও ফাঁকির পরিমাণ বেড়ে গেছে অনেকটাই। হিসেব মতো ঘরটা দেখভাল করার কথা গুণধরদা অথবা তার বউয়ের। কিন্তু একদিনও যে ঘরের ভিতরে ঝাড়ুও পড়েনি, সেটা বোঝা যাচ্ছে বেশ। খাটের কোণায় টিভির দিকটায় ভর্তি ঝুল, মাকড়সার জাল। তার থেকেও বড় কথা হল, শোয়ার জায়গাটা নরক হয়ে আছে পুরো! বিছানার তোষক, বালিশ, বালিশের চাদরে ভর্তি ফাংগাস! সাদা সাদা ছাতা ফুটে গেছে গায়ে দেওয়ার কম্বলেও!

সেবারই পুরুলিয়া থেকে পৌঁছতে রাত হয়ে গেছে অনেকটা। সকালে নেমে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট অফিস। সংস্থার একটা কাজ সেরে উঠতে উঠতে পেরিয়ে গেছে বিকেল কখন। তাছাড়াও সেখানে দেখা হয় জেলারই অন্যান্য জায়গার অন্য সংস্থার মানুষগুলোর সঙ্গে। কথায়-গল্পে সময় নেয় সেটাও খানিকটা। এদিকে বিকেল চারটের পর আর কোনও বাস নেই গ্রামে ফেরার। অগত্যা একটা ছোট গাড়ির ব্যবস্থা করতে হয়। কারণ, হোটেলে থাকলে একরাতের খরচ তার থেকে বেশি। এত অবধি ঠিকই ছিল। কিন্তু বিপত্তি হল ঘরে পৌঁছানোর পর। এবার কী করনীয়?

ভ্যাবলা কী করে যেন টের পায় আমার সমস্ত ফিরে আসা! চলে এসেছে নিয়মমতো হাতে দুটো বড় জলের বোতল নিয়ে। যদিও অঞ্জনদাকে আগে থেকেই ফোন করে বলা ছিল আসার জন্য একটু। প্রোজেক্টের একটা ঝামেলার কাজের জন্য সেদিনই কথা বলা দরকার খুব। কিন্তু সেসব আলোচনা এখন মাথায়! মাথায় রাতের ঘুমও। কাল সকালেই গুণধরবাবুকে কোথায় পাকড়াও করব, সেটা ভাবতে ভাবতেই একটা উপায় বের করে ফেলল ভ্যাবলা আর অঞ্জনদা। তোষকের উপর জমে থাকা ফাংগাসগুলো মোটামুটি উঠিয়ে ফেলা হল ঝাঁটা দিয়ে। তারপর উল্টে দেওয়া হল পুরো তোষকটাকেই। উল্টো পিঠে ফাংগাসের আক্রমণ সেরকম নেই। কিন্তু, ভিজে ভাব তো আছেই। একটা গায়ে দেওয়ার চাদর থাকেই ব্যাগে সবসময়। পুরুলিয়া আসার রাতের ট্রেনে গায়ে দেওয়ার চাদর সবসময়েই অতিআবশ্যিক! সেটাই পেতে দেওয়া হল আপাতত। তার নীচে বিছিয়ে দেওয়া হল ব্যাগে পড়ে থাকা একটা পুরনো নিউজপ্রিন্টের পাতাও। ফাংগাস পড়া স্যাঁতস্যাঁতে তোষকের ভেজা ভাবের সঙ্গে যুদ্ধের ঢাল-তরোয়াল বলতে এই!

কিন্তু অযত্নে ভিজে যাওয়া জমা হলে কারুর ভিতর, অতই কি সহজ তা শুষে নেওয়া কাগজে? সেই রাতের মতো শোয়ার জোগাড় হলেও, পরের দিন সকালে উঠে বোঝা গেল দুরবস্থাটা। ভয়ঙ্কর ব্যথা সারা গায়ে। যেভাবেই হোক রোদে দিয়ে তোষক-বালিশ শুকিয়ে ফেলতে হবে, আর, ধুয়ে ফেলতে হবে বিছানার চাদরগুলো। খবর পাঠানো গেল গুণধরদার কাছে। সমস্যা কমলো না তাতেও। এটাই এবার হয়ে দাঁড়ালো এবার থেকে প্রত্যেক দু’দিন অন্তরের কাজ। প্রত্যেকবার বেঁটে-খাটো মানুষটাকে তোষক রোদে দেওয়ার জন্য বলতে কত আর ভাল লাগে? চাদরগুলো বের করে রেখে দিলে বাইরে, বৌদি তার সময়মতো এসে সেগুলো রেখে যায় ধুয়ে। তোষকগুলো নিয়ে নিজেরই অগত্যা পাড়ি দেওয়া দোতলার ছাদে। যেটুকু সময় বৃষ্টি থাকত না, তখন খটখটে রোদ। জলীয় ভাবটা মরে যেত একদমই। তোষক ছাদে দিয়ে স্টুডিওতে চলে গেলেও শান্তি কোথায়? মাঝেমাঝেই বেরিয়ে গিয়ে দেখে আসতে হচ্ছে আকাশে মেঘ করল কিনা! যদিও গুণধরদাকে বলে আসা হয়েছে খেয়াল রাখার কথা, কিন্তু একবার তাড়ি বা দিশি পেটে পড়ে গেলে সে খেয়াল যে কোন খেয়ালের মার্গে ছুটবে, তা বোধহয় কবীর সুমনেরও আয়ত্তের বাইরে! অগত্যা, বেটা আত্মনির্ভর বনো!

বর্ষার দিনগুলোতে বৃষ্টি না থাকলে, মাঝে মধ্যে ছাদে গিয়ে দাঁড়াই ভোর রাতে। কিংবা বিকেলের দিকেও কখনও কখনও। মশার সমস্যা অদ্ভুতভাবে আমার ঘরের এইজায়গাটাতে নেই। দিনের আলো থাকতে, ছাদে দাঁড়ালে দেখা যায় বাড়ির পিছনে একটা ফাঁকা প্রায় মাইলের পর মাইল ছড়ানো মাঠ আর তার পিছনে সেই একটা পাহাড়। পাহাড় অবশ্য শহুরে চোখেই; এখানকার মানুষের কাছে সেটা ছোটখাটো টিলা বা ডুংরী বই আর কিছু না। নামও বলতে পারে না কেউ। এদিকে একটা পাহাড়ের নাম থাকবে না, তা কী করে হয়! সন্ধের পর শুধুই অন্ধকার। অথচ অন্ধকারও এমন দেখার জিনিস হয়ে উঠতে পারে, আগে কে জানত! দূরে অনেক দূরে কোথাও ঝিলিক দিয়ে ওঠে আলো একচিলতে। উঠোনে মাটির উনুনে আগুন জ্বালে কেউ। তার সঙ্গে শব্দ কতরকম। ঝিঁঝিঁ। পাখি কিছু নাম-না-জানা। গরু-মোষের ডাক। বর্ষায় ভারী কেমন গাছের পাতাও। পাতার ভিতর দিয়ে হাওয়া খেলে গেলে তাই তার শব্দও আলাদা যেন এখন। কিন্তু, তারপরেও কেমন একটা রহস্য চরাচর জুড়ে। সব আছে। এদিকে-ওদিকেই আছে। অথচ কিছুই দেখা যায় না পরিষ্কার। যেন, নিজের মতো করে যে কোনও একটা রূপকথা গল্প সাজিয়ে নিতে বলে অন্ধকারে টিমিটিম করতে থাকা জোনাকিদের দল।

সবথেকে কাছে যে শব্দগুলো, সেগুলো গুণধরদার বাড়ির। অন্ধকারে গৃহস্থালির শব্দ আসে টুকিটাকি। মাঝেমধ্যে নেশায় জড়ানো গলার আওয়াজ আর মেয়েলি মুখঝামটাও। রাস্তা দিয়ে চলে যায় একটা দুটো ভারী ট্রাক বা রাতের শহরে যাওয়ার বাস। বিজাতীয় হর্নের শব্দে যেন রাস্তা ছেড়ে দেয় অন্ধকারও। আটটা বাজলেই মোটামুটি বন্ধ হয়ে যায় চায়ের দোকান। তারপরই নিঝুম গোটা পল্লী। একা একা একজন ভেজা ছাদের উপর দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে, কী আছে পাহাড়ের ওই পাড়টায়? ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক বাড়তে থাকে আরও। এবার আর ঝোপেঝাড়ে নয়, গোটা মাঠ জুড়েই যেন কলোনি বানিয়ে ফেলে ঝাঁকেঝাঁকে জোনাকি। কোথায় ছিল তাদের দেশ? কত গভীর তাদের পিঠে কাঁটাতারের দাগ? একটা সিগারেট জ্বালিয়ে একা একা সেইদিকে তাকিয়ে থাকে সে অনেকক্ষণ। অপূর্ব নিস্তব্ধ চরাচর। কিছুই দেখার নেই; অথচ আগে কোনোদিন না দেখার মতোই অপার্থিব। ছেলেটা ভাবে, ভাগ্যিস এখানে কথা বলার মতো নেই কেউ আর! সামান্যতম মুখের কথাও মনে হয় বেমানান এই জগতে। তখনই আরও একটু ঘন হয়ে আসে অন্ধকার। যেটুকু চিলতে চাঁদ ছিল আকাশে, সেটাও আড়াল করে মেঘ। ডুংরীর ওপাশ থেকে আসতে থাকে শিরশিরে হাওয়াটা। তার সঙ্গেই কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি পায় কপাল।

এই বৃষ্টিতে ভেজার কোনও মানেই হয় না। মানভূমের জোলো বাতাস! তার উপর ঘর অমন স্যাঁতস্যাঁতে!

জুতো বা চটি ভিজে গেলেও সেটা পায়ে গলাতে বরাবর অনীহা ছিল যার, সেই ছেলেই একটা প্রায় ভেজা তোষক চাদর বালিশের উপর শুয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে রাতের পর রাত, নিজেকেই আশ্চর্য করে তাকে সেটা। অথচ অভিযোগ নেই তেমন। বর্ষার দিনে উত্তাপ নেমে যায় এতটাই, সন্ধের পরে স্নান করতে হলে জলটা গরম করে নিতে হয় একটু। সিলভারের বালতিতে বিজবিজ করে দানা ফোটায় ইমারশন হিটার। স্নান করে ল্যাপটপ খুলে কাজ অথবা বইয়ের খোঁজ এটা-ওটা। ‘হে চিরপ্রণম্য অগ্নি…’ এত আগুন যে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায়, সেই তাঁর বইয়ের পাতাও ভিজে নরম কেমন! হেসে ফেলে নিজের মনেই সে। “ঠিক ঠিক ঠিক” করে তার হাসির কারণে সঙ্গত দেয় জানালার কাচের ওপাশে বসে থাকা টিকটিকিটা। সন্ধে হলেই সেটা নজরে আসে রোজ। সারারাত খিটখিট করতে থাকে নিজের মনে। যতদিন ওই ঘরটায় থাকা, এমন একটা দিনও নেই, যেদিন ওই জানলায় সে উপস্থিতি জানান দিয়ে যায়নি নিজের।

এদিকে বর্ষার ছোঁয়ায় গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে নদীগুলোও। বছরের অন্য সময় ন্যাড়া ন্যাড়া পাঁজরের হাড় বের হয়ে থাকা রোগা রোগা শরীরের নদীগুলো কোন আজব কাঠির ছোঁয়ায় যেন জেগে উঠেছে নতুনভাবে। আচমকা শরীরে গত্তি লাগা যুবক-যুবতীর মতোই যেন; কে সামলাবে তাদেরকে তখন আর! জল বাড়তে বাড়তে উঠে পড়ে কাঁসাইয়ের উপরের ব্রীজেও। একবার তো বান এল এমন, পুঞ্চা-মানবাজারের মাঝে কাঁসাই নদীর উপরের সেই ব্রীজটাই গেল ভেসে। যতদিন না ব্রীজ সারাই হয়, এদিক থেকে মানবাজার যাওয়ার আর কোনও উপায় নেই। মানবাজার থেকে কাজ করতে আসা আকাশ বেজায় সমস্যায় এবার। বাড়ি ফেরার উপায় নেই, কয়েকদিন অগত্যা রয়ে গেল আমার সঙ্গেই। মনে পড়ে মাঝরাতে মাঝেমাঝেই ঘুম থেকে উঠে আকাশের অবাক জিজ্ঞাসা, “তুমি এখনও কাজ করছো? আচ্ছা, করো!” কিংবা ঘুম চোখে প্রলাপের মতো, “এখনও জেগে আছো? আচ্ছা, জাগো…” বলেই ওপাশ ফিরে ঘুম আবার!

একটা বর্ষার দিনের কথা মনে পড়ে খুব। ভরা শ্রাবণ হলেও গত কয়েকদিন তার আগে বৃষ্টি না হওয়ায়, গরমটা জাঁকিয়ে বসেছে আবার। গুমোট গরমে সারাদিনই হাঁসফাঁস অবস্থা। এর মধ্যেই একদিন মানবাজার ছুটতে হলো এসডিও অফিসে। ফেরার পথে বাঁধানো রাস্তার দু’পাশে যেন হাত বাড়ালেই আকাশ! সেই আকাশ কালো করে ঘনিয়ে আসা মেঘ এতটাই ঘন যে, মাঠে কাজ করতে করতে কেউ কেউ মাথার টোকা সরিয়ে মেপে নিচ্ছে প্রলয়ের দূরত্ব। তখনই আকাশ ফালাফালা করে নেমে আসে সাদা আলোর ঝলকানি একটা। তার তীব্র শব্দ আরও গতিতে পৌঁছে দেয় শনশন শব্দের বাতাস। যেন সংকেত পাঠায় কোনও। মাঠের থেকে চাষের কাজ ছেড়ে উঠে আসতে আসতে মানুষগুলো বলাবলি করতে শুরু করে, “বড় নামবে আজকে হে! দমে গরমটা লাগছিল!”

এসব সময় দাঁড়িয়ে পড়তে ইচ্ছা হয়। ইচ্ছা হয় তাদের সঙ্গে কথা বলতে একটু। চায়ের দোকানে গিয়ে এক সঙ্গে ভাগ করে নিতে ইচ্ছা হয় চায়ের গ্লাস… এইসব ফসলের জন্মবৃত্তান্ত শুনতে, ইচ্ছা হয় বড়…

পোড়া আমাদের ভারতবর্ষের আরও নানান প্রান্তের মতো মানভূমের এই প্রান্তেও চাষবাস নির্ভর করে থাকে এই প্রকৃতির উপরেই। যে বছর বৃষ্টি হয় ভাল, সেই বছর মুখে হাসি ফোটে মানুষগুলোরও। যদিও আগের থেকে কৃষি ব্যবস্থায় এখানে খানিকটা উন্নতি হয়েছে বলেই মনে হয়। অন্তত খাতায়-কলমে! আধুনিক প্রযুক্তি চোখে পড়ে মাঝেমধ্যেই। বেশ কয়েকটা কৃষিমেলাও হতে দেখেছি একাধিকবার। যদিও তাতে লাভের লাভ কতটা কী হয়েছে, সেটা এই সময়ে দাঁড়িয়ে বলা সম্ভব না হলেও, একটা শুরুয়াৎ যে হয়েছে, সেটাই বা কম কী?

চাষের কাজকর্ম কীভাবে হয়, সেটা আমাকে অনেকটা শিখিয়েছিল মঞ্জুর। সকালে রেডিও স্টেশনে আসার আগে নিয়ম করে মাঠে কাজ করতে যেত রোজ। চাষের কাজই এখানকার প্রধান জীবিকা। অথচ এমন একটা জীবিকা, যেটাকে কাজ বলে হয়তো মনেই করে না কেউ! অনেক পরে যখন রেডিও স্টেশনের বিভিন্ন কাজে নতুন ছেলেমেয়ে নিয়োগ করার দরকার হল, তখন তাদের প্রত্যেককেই জিজ্ঞেস করা হয়েছিল বাবা-মা কী করেন? তারা প্রায় সবাই উত্তর দিয়েছে, “কিছু না।” আশ্চর্য হয়েছি। কিছু না মানে? কিছু তো করেন নিশ্চই? আবার মাথা নেড়ে উত্তর এসেছে, “কিছু না।” তারপর আরও ভেঙে ভেঙে প্রশ্ন করতে উত্তর এসেছে, “কিছু করে না, ওই চাষ করে শুধু!” আনমনেই হেসে ফেলি। চায়ের গ্লাস থেকে চলকে ওঠে চা। আচ্ছা, অর্জুন টেন্ডুলকার কোনোদিন বলবে, আমার বাবা কিছুই করত না; শুধু ক্রিকেট খেলত একটু?

কিন্তু মঞ্জুরকে ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি। বাইকের স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে ভগবানদার দোকানের সামনে নামিয়েই বেরিয়ে গেল সোজা। মিনিট দশ-পনেরো যেতে না যেতেই বৃষ্টি এলো হুড়মুড়িয়ে। এমন বৃষ্টির নামই বোধহয় ‘আকাশভাঙা’! পিঠের ব্যাগ আপাতত এখানেই থাক। পরপর দু’কাপ চা খেয়ে, প্লাস্টিকের প্যাকেট চেয়ে নিলাম একটা। প্রযুক্তি আমাদের টেনে রেখেছে এতটাই, হুট বলতেই প্রকৃতির মধ্যে মিশে যাওয়া যায় না সহজে! প্লাস্টিকের প্যাকেটের মধ্যে মোবাইলটা পেঁচিয়ে, শরীর রাখা গেল বর্ষাতে তারপর। ধীরেসুস্থে রাস্তা পেরিয়ে হাঁটা এবার ঘরের দিকে। যতক্ষণ হাঁটা, হাঁটতে হাঁটতে ফেরা এই, ততক্ষণ ধুয়ে যাওয়া এরকম। ‘বেকল মনওয়া চৈন না পায়ে…’ ধুয়ে দিক সব। সব ধুয়ে যাক।

এমনিতেই পুরুলিয়ার গত কয়েকদিনের তুমুল গরমটা এই আজ সন্ধের বৃষ্টির ফলে খানিক কমলেও, সকাল থেকে ঘরটা বন্ধ থাকায় ভিতরটা কেমন একটা গুমোট। আর স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ তো আছেই। অন্য দিন ঘরে ঢুকেই তাই সিলিং ফ্যানটা চালিয়ে দরজা-জানালাগুলো খুলে দিই হাট করে। কিন্তু বাইরের বৃষ্টির চোটে আজ জানালা খোলার উপায় নেই কোনও। অগত্যা ঘরের গুমোটটাও কাটছে না কিছুতেই। কী আর করা অগত্যা! ‘প্রফেশনাল হ্যাজার্ড’ হিসেবে মেনে নেওয়া ছাড়া, আর উপায়টাই বা কী! ভেজা জামা-কাপড় মেলে দিয়ে খাটে এসে বসতেই হঠাৎ জানালার কাঁচে একটা হাল্কা ঠকঠক শব্দ। কে এল? ‘হলুদ হিমু’ থেকে মুখ সরিয়ে দেখি, বন্ধ জানালার ওপারের ভাঙা গ্রীলটায় বসে একটা পুঁচকে টুনটুনি। ভিজে একসা! চটপট জানালার পাল্লাটা সরাতেই পুঁচকে টুনটুনি যেই ঢুকে এল ঘরে, বুঝতে পারলাম ভুল একটা হয়েই গেছে! হুড়ুম-দুড়ুম করে লাফিয়ে গিয়ে সিলিং ফ্যানটা বন্ধ করি তাড়াতাড়ি।

তারপর হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। পুঁচকে টুনটুনি এদিক লাফাচ্ছে, ওদিক লাফাচ্ছে। বেশ মজায় দোল খাচ্ছে টিভির কেবলের তারে। আর, কিচিরকিচির করে কী সব যে বলে যাচ্ছে! এমনিতে একা থাকতে কখনোই খুব খারাপ না লাগলেও, এখানে ঘরে ফেরার পর ভীষণ লম্বা আর চুপচাপ সন্ধেগুলোর মতো সেদিন আর একদমই একা লাগছে না। ভাল লাগছে। ‘কৌন মেরে মনকো সমঝায়ে…’ বৃষ্টিটা চলুক বাইরে!

অবশ্য লাগাতার বৃষ্টির অন্য সমস্যাও আছে। যেদিন বিকেল থেকেই বৃষ্টি নামে প্রচন্ড, সেদিন সন্ধ্যার আগেই চায়ের দোকানে ঝাঁপ। এত বৃষ্টিতে কোথায় আর আসবে খরিদ্দার! এমন সব সময় যেন আচমকাই ভারী খুব নিজের কাছে। প্রথম প্রথম পুরুলিয়া যাওয়ার পর আনজান মনখারাপের মতো। সোঁদা বিছানায় শুয়ে নিজের ভিতরটাও যেন ভিজে যায় কেমন। আর যে কয়েকটা কাজ করার ছিল, তার তো হল না কিছুই। ক্যামেরার লেন্সে গল্প বলা হল না আর। গল্প লেখা হলেও মাঝেমধ্যেই, ছুঁড়ে ফেলা সেইসব হারানোর ঠিকানায়। তার উপর নিজের একটা ক্যামেরাও তখন নেই। কোথা থেকে তৈরি হবে ছবি? পারানির কড়ির ভান্ডার শূন্য। অগত্যা সেইসব স্বপ্নের মুখে চাপা দিয়ে বালিশ, সন্ধেবেলার ঘুমে জড়িয়ে যায় চোখ। ঘুম ভাঙলে দেখি, ভগবানদা খাবার দিয়ে চলে গেছেন কখন। দরজা খোলাই থাকে তো। বৃষ্টির জন্যেই বোধহয় ভ্যাবলা আসেনি আজকে আর। খাবার খেতে ইচ্ছে হয় না তখনই। শুয়েই থাকি অনেকক্ষণ। মনে আসে নিজের লেখার কথাও। কোথাও কি পৌঁছচ্ছে আদৌ এসব? নাকি অযথাই নিজেকে ক্লান্ত করা শুধু? আবার ঘুমে জড়িয়ে আসার আগে চোখ, ভাবি আর কিছু হোক বা না হোক, নিজের একটা ক্যামেরা আমি কিনবোই! আর একটা থার্টি ফাইভ প্রাইম লেন্স…

ক্যামেরা কেনা হয়েছিল তার বেশ কয়েকদিন পর। সেই ক্যামেরা কেনার গল্পটাই আলাদা একটা পর্ব হতে পারে! ক্যামেরা কেনার পর অপটু হাতে পুরুলিয়ার এ মাথা-সে মাথা ঘুরে আবোল-তাবোল কত যে স্মৃতি ধরা হয়েছিল তাতে! সেসব ছবি মাথার মধ্যে ফিরে এলে হঠাৎ মনে করার চেষ্টা করি পাহাড়ের পিছনের গ্রামের নাম— যেখানে একটা বিশাল ঝাঁকড়া বটগাছ। ঝুড়ি নেমে এসেছে মাটি অবধি… বটগাছের নীচে শান-বাঁধানো বেদী একটা… একটা ভীষণ বৃষ্টির দিনে আটকে পড়া বিকেল… আর তাই সেই বেদীতে বসে আড্ডা জমানো অনেক বয়স্ক একটা মানুষের সঙ্গে। একগাল দাড়ি। চওড়া কপাল। একমাথা সাদা কোঁকড়ানো ঘন চুল। চোখের তারায় সাদা ছোপ। কথায় কথায় হাঁপ ওঠে, তবু গল্প বলে চলায় বিরাম নেই। সিংবোঙা। মারাংবুরু। পিলচুহারাম, পিলচুবুড়হি। একটা ডিম ফুটে তৈরি হওয়া বিশাল এই সভ্যতা। আদিম আদিবাসী উপকথা এসব! গল্পের শেষ হলে দেখি, হুড়হুড় করে ঝর্ণা নামছে ডুংরীর গা বেয়ে। নাদান প্রশ্ন করে ফেলি বয়স্ক মানুষকে, “জীবনের শুরুও কি তাহলে এভাবেই?”

ছেঁড়া ময়লা ফতুয়ার পকেট থেকে বেরিয়ে আসে বিড়ি আর দেশলাই। বিড়ির ধোঁয়া ছেড়ে কয়েকবার কেশে নিয়ে ক্লান্ত গলা সাফ করে নেন মানুষটা। তারপরই বিড়বিড় করে ওঠে কয়েকটা শব্দ তাঁর মলিন কালচে কুঁচকে যাওয়া মুখে; যে মুখের বলিরেখাও যেন কবেকার প্রাগৈতিহাসিক! ঝরঝর বৃষ্টিতে ছিটকে যাওয়া কাদামাটির কণার দিকে তাকিয়ে যে মুখ বলে ওঠে, “শেষ নাই গ্য! শুরু নাই! জীবন অক্ষয়; জীবন অক্ষয়…”

শুভদীপ চক্রবর্তী
+ posts

পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহর বাটানগরে। নঙ্গী হাই স্কুল সাক্ষী এইসব দিনের। পরবর্তীতে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে পড়ার পর জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে ঘোরাঘুরি গ্রাম বাংলার নানান প্রান্তে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। পরে কিছুদিন জনসংযোগের কাজ; কিছুদিন সাংবাদিকতা।

প্রথম কবিতার বই 'ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া সব ঢেউগুলো' ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে। পরের বছর 'নিবিড়' থেকে ব্যক্তিগত গদ্য সংকলন 'যতটুকু দৃশ্যে ছিল'। শখ বলতে খেলা দেখা, সিনেমা দেখা, কাছে বা দূরে যেখানেই হোক ঘুরে বেড়ানো। বিকেল বেলা স্টিমারে চেপে গঙ্গা পারাপার। আলমারিতে বই গোছানো নিয়ে খিটখিটে আজীবন। না-পারার তালিকা লম্বা ভীষণ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *