অভিমানভূম। পর্ব ৭। দহন দিন। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

ফুলগাছটি লাগই ছিলাম ধুলা মাটি দিয়া রে

সে ফুলঅ ফুটিয়া রইল অগম দইরার মাঝারে

 

একটা মাঠ জ্বলে যাচ্ছে রোদ্দুরে। রোদে পুড়ে হলদে হয়ে গেছে মাঠের ঘাস। মাঠের মাঝে মাঝে খেজুর বা তালগাছ। তার পিছনে, গরম হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে ওঠার মতো দূরে রুক্ষ পলাশ খান কয়েক। পলাশের সঙ্গে শাল। সোনাঝুরিও। মাঠের পাশে আলের ধারে একটা অশ্বত্থ গাছ ঝাঁকড়া। তার তলায় এই আকাশ ফাটা রোদেও ছায়ার ভীষণ প্রলেপ। সেখানে বসে একটা আদুল গায়ের ছেলে… না, বাঁশি বাজাচ্ছে না। ফোন ঘাঁটছে গাছে হেলান দিয়ে। উন্নয়ন তার সর্বস্ব নিয়ে হইহই করে ঢুকে পড়ছে প্রান্তিক মানভূমের কোণায় কোণায়।

এই ঠাঠা পোড়া দুপুরে বাইরেই বা কেন আদুল গায়ের ছেলে? গাছের ছায়া থেকে একটু দূরত্বে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার বাইরে বেরনোর উপলক্ষেরা। উপলক্ষদের রুগ্ন সাদা-কালো-ঘিয়ে-খয়েরি শরীরের মধ্যে উজ্জ্বল শুধু গলার টুংটুং ঘন্টিটা। তাদের সারা গায়ে ছোপ ছোপ দাগ। আসলে রোল নম্বরের মতো মার্কিং করে দাগিয়ে দেওয়া, যাতে গুলিয়ে না যায় এই চারপেয়ে শাবকদের আসল সংসারের প্রমাণ।

মোবাইল ঘাঁটতে থাকা ছেলের পাশ দিয়ে এগিয়ে আসে এতক্ষণ ধরে মাঠে কাজ করে চলা কয়েকটা শরীর। এই গরমে খোলা মাঠের রোদ্দুরে সানস্ট্রোক হওয়াও আশ্চর্য নয়। অথচ এদের হবে না কিছু। কিছু হয় না এদের। সকালেই তাল বা খেজুরের তাড়ি খেয়ে মাঠে নেমে গেলে রোদের বড়মামারও সাধ্যি নেই নাকাল করে আর! মুখ লুকিয়ে কোথাও নাগাড়ে ডেকে যাচ্ছে পাখি একটা। ট্টি ট্টি ট্টি।

এইসব দৃশ্যের থেকে দূরত্বে দাঁড়িয়ে, ঘটমান এই বর্তমান রেকর্ড করতে থাকে একটা সস্তার ডিএসএলআর। দূরত্ব বজায় রাখতে হয়, কারণ এই আশ্চর্য নীরবতা ভেঙে দিতে ইচ্ছা করে না কিছুতেই। কিছু দূরত্ব মানতে শেখা জরুরীও, শিখিয়ে যায় একলা থাকার সময়। কোথা থেকে বাচ্চা একটা ছেলে ওই রোদের মধ্যে দিয়েই ছুটে এসে আলের পাশ দিয়ে নেমে গিয়ে হারিয়ে যায় জল শুকিয়ে আসা একটা পুকুরের ওই পাড়ে। সেখানে নিচু চালের খড়ের কুঁড়ে একটা, খিদের সময় যার কথা মনে পড়া চিরন্তন। সেখানে ফিরে এসে আঁচলের ছায়ায় দাঁড়ালেই, এনামেলের থালায় ভাতের সঙ্গে সেদ্ধ মেটে আলু। নুন, কাঁচালঙ্কার সওগাত। খিদের মুখে সেই ভাতের গন্ধ পেলেই এনামেলের থালার ভাঙা কোণে সূর্য ঠিকরিয়ে চকচক করে ওঠে চোখ। খিদের মতোই সহজ সেই ছেলের হাত ডুবে যায় এক থালা বাষ্পে।

পুরুলিয়া-কলকাতা আর কলকাতা-পুরুলিয়া যাতায়াতের মধ্যে এই তীব্র গরমের দিনগুলো কেমন হলুদ রঙের মায়ার মতো ভিড় করে আসে বিকেলের জানালার কাছে। পুরুলিয়া যাওয়ার জন্য সকালের ‘রূপসী বাংলা’ আর বিকেলের ‘পুরুলিয়া এক্সপ্রেস’ বিলকুল না-পসন্দ। রাতের চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার ছাড়া বরং মায়াবী ভীষণ দুপুরের রাঁচি-হাওড়া ইন্টারসিটি। ঝাড়গ্রাম থেকে টাটানগর হয়ে বরাভূম পেরিয়ে ঢোকে সেটা পুরুলিয়ায়। ছোটার পথে পার হয় বিশাল ছোটনাগপুর মালভূমি রেঞ্জ। দুপুরের রোদটা পড়ে এলেই, বাইরের গনগনে গরম হাওয়ার তেজটাও পড়ে আসে কেমন। তার সঙ্গেই গা ধুয়ে পাড়া বেড়াতে বের হওয়া মেয়েদের মতো জেগে ওঠে অদ্ভুত সুন্দর সুন্দর নামের একেকটা স্টেশন। নামের থেকেও বেশি সুন্দর হয়তো গাছপালা ঘেরা তার নির্জনতা। স্নিগ্ধতাও কেমন ছিমছাম। লাল-সাদা দেয়াল। গাছের পাতায় ভরে আছে স্টেশনের লালচে বেঞ্চিগুলোও। প্ল্যাটফর্ম জুড়ে শালপাতা, অশথপাতা। সেই খয়েরি-সবুজ পাতাদের ব্যাকড্রপে আবছা ধূসর একটা পাহাড়। পাহাড়ের পিছন দিয়ে অন্ধকার নেমে এলে ঝুপুস, ট্রেন থেকেও নামার সময় হয়ে আসে। স্টেশনে বাহন নিয়ে মলয়দা। লাস্ট বাস তো বিকেল চারটে বাজলেই পগারপার! এত সন্ধেয় ভরসা অগত্যা তিনিই। দেখতে পেয়ে চায়ের ভাঁড় ফেলে দূর থেকে একগাল হাসি। “দমে গরমটা পড়েছে হে!”

গরমের দুপুরগুলোতে শনশন করে হাওয়া বয় একটা। গাছের সুখা পাতায় ঘষা লেগে শব্দ ওঠে খসখস। দুপুরে খেতে যাওয়ার সময় চোখ মুখ ঢেকে নিতে হয় কোনও একটা কাপড় দিয়ে। ভেজা হলে ভাল হয় আরও। খাওয়ার পরে গাছের ছায়া খুঁজি ধোঁয়া টানার প্রয়োজনে। প্রকাশ্যে সিগারেট খেতে দেখলে মহা মুশকিল!

অদ্ভুতভাবে, যতই গরম হোক না কেন, গাছের নীচে বা অন্য কোনও ছায়াঘেরা জায়গাতে গিয়ে দাঁড়ালেই উত্তাপের ধার যেন অনেকটাই কম। বিকেলের রোদ পড়ে গেলে আবার পরিবেশ বদলে যায় একশো আশি ডিগ্রি। হাওয়ার প্রলেপে ধুয়ে যায় খানিক আগের দহন। সূর্যের আঁচ কমে গেলে, কলেজ হোস্টেলের মেয়েরা হাঁটতে বের হয় এদিক-ওদিক। হাট থেকে ফেরার পথে কার সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায়, সাইকেল থামিয়ে মাথার গামছা খুলতে খুলতে চায়ের দোকানে কেউ কেউ— “আডি জঁহার…”

সারাদিন ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আর মোবাইলের লাগাতার বাতচিৎ বিরক্ত করে দিলে, আমিও উঠে হাঁটতে থাকি মাঝেমাঝে এলোমেলো। কলেজের থেকে বাঁদিকের রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকলে উঁচু ঢিবি মতো যে জায়গাটা, তার পাশেই একটা নিচু পুকুর। পুকুরে শালুকের পাশে পাশে সোনা হয়ে টলটল করে বিকেলের সূর্যের গলে পড়া রং। ডানদিকে একটা ঝাঁকড়া আমগাছ রাস্তার উপর। সেটাকে পেরিয়ে গিয়ে সারি সারি খেজুর আর সুপারি গাছ দিয়ে ঘেরা সেই বড় মাঠ। ক্ষয়াটে ঘাসের উপর চটি পেতে বসে থাকি একা একাই। দূরে কোথাও থেকে ডাক আসে চেনা গলার। ফুটবল নিয়ে দাপাদাপি করছে যারা, তাদেরই কেউ নিশ্চিত। ডাক আসে ভ্যাবলারও, “নামবে নাকি?” ঘামে ভিজে সপসপ করছে সস্তার বার্সেলোনা জার্সি। হাতে পায়ে কপালে ধুলো। “আসো হে, নামো একদিন!” মাথার উপর জোড়হাত করে দেখাই। অভ্যেস-টভ্যেস নেই। ভিনদেশে ক্ষুদিরাম হতে চাওয়ার কোনও মানে হয়?

রাতের ট্রেনে পুরুলিয়া আসার সময়, ঘুম ভেঙে যায় আদ্রা পেরোনোর পরেই। গরমকাল হলেও পাথুরে এলাকার সকাল ঠান্ডা হাওয়ার দখলে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে দেখা যায়, লালচে সূর্য উঠছে মাঠের পাশ দিয়ে। তাতে দহন দিনের বার্তা আগাম। আদ্রার পরে আর পাঁচটা স্টেশন পেরোলেই পুরুলিয়া। মাঝে গড়ধ্রুবেশ্বর, আনারা, বাগালিয়া, কুস্তাউর, ছররা।

ভোরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয়, এখনই গান বেজে উঠবে দূরের কাঁকুড়ে আলপথের পিছনে। ‘আমগাছে আম নাই, কুটা কেন লাড় রে? তুমার দেশে আমি নাই, আঁখি কেন ঠার রে?’ অদ্ভুত সব মুখোশ পড়ে লাইন দিয়ে গান গাইতে গাইতে চলে যাচ্ছে একদল লোক— চিরন্তন এই সব ম্যাজিক দৃশ্যের সঙ্গে আমাদের পরিচয় যিনি করিয়ে দিয়েছেন, তিনি তো বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। যাতায়াতের মাঝের এই আনারাই নাকি জন্মস্থান প্রখ্যাত চিত্রপরিচালকের। ছোটবেলার অনেকটা সময় তাঁর কেটে গেছে তাই এই রুখা মাটির দেশেই। যে সময়টা এই যাতায়াত, তার অনেক আগেই ‘উত্তরা’ বা ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’-এর মতো আরও কত কত ছবির শুটিং যে তিনি ততদিনে করে ফেলেছেন এই পুরুলিয়াতে! এই কিছু বছর আগে ‘জানালা’ কিংবা তার কয়েক বছর আগে ‘স্বপ্নের দিন’। বিশেষভাবে মনে পড়ে ‘উত্তরা’ ছবিটার কথা। প্রথম যখন দেখেছিলাম, তখন বেশ ছোট। মায়ের মামাতো ভাইয়ের ছেলে সৌরভ, আমরা ডাকতাম রিম বলে, ওইটুকু বয়সে অভিনয় করেছিল ‘উত্তরা’ ছবিতে ছোট্ট ম্যাথুর চরিত্রে। চরাচর শূন্য মাঠ। তার উপর একটা গীর্জা। একটা উঁচু টিলার উপর সারাদিন কুস্তি লড়ে যাচ্ছে দুটো বিশাল চেহারার মানুষ। অনেক পরে জেনেছিলাম, ওই দল বেঁধে মুখোশ পরে গান গাইতে গাইতে যাওয়াটা আসলে নাটুয়া নাচ। গানগুলো তখনই মনে ধরে গিয়েছিল খুব। ‘কালো জলে কুচলা তলে ডুবল সনাতন’। অত কম বয়সে পাশের বাড়ির সাদাকালো টিভিতে কতটা কী বুঝতে পেরেছিলাম ‘উত্তরা’ দেখে, কে জানে! তবে পুরো জিনিসটা দেখতেই ভাল লাগছিল খুব। সেটা এখন মনে হয়, শুধু এই অদ্ভুত পরিবেশ আর প্রকৃতির জন্যই। অথবা, গানগুলোর জন্যও নয় কি?

তবে গরম যতই হোক না কেন, পুরুলিয়ায় যে ঘরটা পাওয়া গিয়েছিল, লাইফলাইন ছিল সেটাই। অনেক পুরনো স্ট্রাকচার বলেই হয়তো একদিকে যেমন ঘরের মধ্যে নেটওয়ার্ক পেতে সমস্যা হতো খুব, তেমনই আবার দিনের ওই প্রচন্ড গরমের মধ্যেও ঘরে ঢুকলে বাইরের উত্তাপ বোঝা যেত না একটুও। আদ্দিকালের চওড়া দেয়াল আর ততোধিক মোটা ছাদ। সেই সঙ্গে বাড়ির পিছনের বড় শালগাছটাও অনেকটাই আটকে রাখত তীব্র রোদ। বহুদিন দেখা না হওয়া প্রেমিকার রাগের মতোই যেন, সন্ধে গড়ালে কমে আসতো দিনের ভীষণ সেই উত্তাপও। রাতের বেলা একটু কমিয়েই রাখতে হতো ছাদ থেকে ঝোলানো পাখা। মাঝেমধ্যে ছুটির দিনে ঘরে থাকলে, আচমকা ঢুকে আসতো কেউ কেউ। প্রচন্ড গরমে চোখ-মুখে কালি। জলটল খেয়ে ধাতস্থ হলে, গল্প খানিকক্ষণ এদিক-সেদিক। গল্পের মাঝেমাঝেই ছাদের দিকে মুখ তুলে তাকানো বার কয়েক। “ঘরটা ব্যাপক ঠান্ডা যে হে! একটু বসলেই ঘুম লাগে!”

যদিও দিনের এই প্রচণ্ড দাবদাহের পুরো ছবিটাই আচমকা বদলে যায়, যদি বৃষ্টি আসে কখনও। বিকেলের পর ঝড় উঠলে, তার চেহারা হয় মারাত্মক। কয়েক মিনিটের তোলপাড়ের পর রেডিও স্টেশনের বাইরে শাটারের উপর টিনের চালের অংশটায় টুংটাং ঝরে পড়ে শিল। সেই সময়টায় রেডিও স্টেশনের কয়েকজনের সঙ্গে বেরিয়ে আমারও বসে পড়া বাইরের সিঁড়িটার উপরে। বৃষ্টির ছাট এসে দখল নিয়ে নেয় জামা-কাপড় থেকে মাথার চুল। সারাদিনের পর মনে হয়, এই আচমকা ভেজা যেন ‘থেরাপি’ আসলে একটা। চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে গেলে, ঝাপসা হতে দেওয়া যায় চোখকেও। ‘চিতাং সিনি রিমিল গীতা’… পিছন থেকে গুনগুন করে ওঠে কেউ সাঁওতালি গান। কার গান হতে পারে? কল্পনা হাঁসদা? কল্পনা হাঁসদার গলায় শোনা গানই কখন যেন গুনগুন করে উঠি আমিও— ’পূব দিকে মেঘ নাইও, পশ্চিম দিকে ঝড় হইল’। এসব ছোঁয়াচে ভাল লাগা পেয়ে বসলে মনে হয়, যতখুশি ভিজুক চোখ। চশমা খুলে রেখে দিই পকেটে। বৃষ্টি থেমে গেলে রুদ্র বাতাস শান্ত। ঠান্ডা শিরশির গায়ে মেখে এবার ভিড় তাই সবাই মিলে শেখরদার দোকানে। বৃষ্টির আনন্দে আজকে চায়ের ট্রিট আমার। সঙ্গতে সদ্য ভাজা গরম সিঙ্গারা কিংবা ভাবরা ভাজা!

সিঙ্গারার শৃঙ্গারের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত হলেও, এক্ষেত্রে ভাবরা ভাজা জিনিসটা কী, সেটা একটু বলে রাখা ভাল। মোটামুটি আমরা জিলিপি যেটা চিনি, সেটাই যদি মিষ্টি না হয়ে নোনতা হতো, আর বাইরের আবরণটা শক্ত না হয়ে হতো চপের মতো নরম, সেটাকে ভাবরা হিসেবে আন্দাজ করে নেওয়া যেতে পারে। পুরুলিয়ার আইকনিক যে খাবারগুলো আছে, তার মধ্যে এই ভাবরা বিশেষ ভাবে অন্যতম!

বৃষ্টির পর বাইকে চড়ে ফিরতে ফিরতে ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগলে গায়ে, মনে হয় হেমন্ত এসে গেছে আচমকা। সেসব রাত্তিরে মোটা কিছু চাপাতে হয় গায়ে। কলকাতার মতো দরদরে ঘাম নেই। বৃষ্টির পর ভ্যাপসা গরম নেই। বরং এমনই অদ্ভুত প্রকৃতি, একদিন বৃষ্টি হলে মোটামুটি দু’দিন কাবু থাকবে গরম।

তবে আবার বেশ কয়েকদিন বৃষ্টি না হলে, স্বমহিমায় ফিরে আসে বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যের দহন। অন্যান্য দিনের মতোই একদিন দুপুরে নাওয়া-খাওয়া ভুলে বসে আছি, যথারীতি মাথাতেই নেই আমার জন্য অপেক্ষায় বসে আরও একজন। শেষে আর খিদে চাপতে না পেরে মঞ্জুর জোর করেই উঠিয়ে নিয়ে গেল শ্রাবণদার মাহাতো হোটেলে। খেয়ে বেরিয়ে ধোঁয়া টানার জায়গা খুঁজছি এদিক-ওদিক, মঞ্জুর সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে কী কথা বলছে স্থানীয় একজনের সঙ্গে, হঠাৎ নিবিড় শান্তির একটা ছবি স্থির করে দিয়ে গেল চোখ! দূরে যে মাটির বাড়িটা, পিছনে সবুজের ঝোপ, বাড়ির পাশে ঝাঁকড়া একটা গাছ— তার তলায় খাটিয়া পেতে দিব্যি ঘুম দিচ্ছে একজন। মাথার নীচে গুঁজে দেওয়া গামছা। ময়লা সাদা ধুতি, খালি গা। বয়স খুব বেশি কিছু নয়। মঞ্জুর ততক্ষনে এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। আমি এক নাগাড়ে দেখেই যাচ্ছি দ্বিধাহীন নিশ্চল ঘুমিয়ে থাকা মানুষটাকে। রীতিমত হিংসা করছি তাকে আমি ভিতরে ভিতরে। মঞ্জুরকে বলেই ফেলি, কী করছি বলতো আমরা এখানে? সবকিছুর পরে যদি দিনের শেষে ঘুমটাই না আসে, তাহলে এত কিছুর আদতে লাভটা কী? এই সব কিছুর সমাধান এদের কাছে একটাই। মঞ্জুর হাসতে হাসতে কোমরে দু’হাত তুলে বলে, “এবার বিয়েটা করো!”

ওই নিখাদ নিশ্চিন্তের ঘুমের ছবিটা মাথায় নিয়েই গরমের দিনে মাঝেমধ্যে সন্ধের পরে এদিক-ওদিক বেরিয়ে পড়া অঞ্জনদা, ইমন বা মঞ্জুরের সঙ্গে। সেভাবেই হঠাৎ একদিন খুঁজে পাওয়া লুকানো একটা ট্রেজার আইল্যান্ড। পুঞ্চা বাজারের কাছে চরণপাহাড়ি কালীমন্দিরকে ডানদিকে রেখে, ব্লক হসপিটাল পেরিয়ে খানিক দূরেই অদ্ভুত নিঝুম একটা জায়গা। মাঝখান দিয়ে বাঁধানো রাস্তা চলতে চলতে মিশে গেছে সোজা কোথায় অন্ধকারে। রাস্তার দু’পাশে অল্প উঁচু-নিচু মাঠ, ধান জমি আর মধ্যে মধ্যে জেগে থাকা প্রাচীন পাথরের স্তূপ। কবেকার লাভা জমে সৃষ্টি হওয়া এই প্রাগৈতিহাসিক পাথর যেন বুদ্ধ! নির্বিকার আশ্রয় দিয়ে যায় তা আমাদেরও। বসে থাকি অনেকক্ষণ। বোধি লাভ হয় কিনা জানা নেই, তবে এটা-সেটা কথায় কথায় জানতে বুঝতে চেষ্টা করি এলাকার ভিতরের সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিস্থিতি। শুনি কখনও না-যাওয়া গ্রামের কথা। পরব আর জঙ্গলের কথা। অসুস্থ বাবার কথা। উঁচু জমিতে জলের সমস্যার কথা, কিংবা, দূর গ্রামে থাকা প্রেমিকার গল্প কারুর কারুর। তখনই খোঁজ পড়ে বিয়ারের। ইমন চমকে উঠে বলে ফেলে, “তুমি এসব খাও নাকি?”

— মানে? এতে চমকে ওঠার কী আছে? এখানে কি পাওয়া যাবে ভাল বিয়ার?

— তা পাওয়া যাবেক!

— তবে দুটো নিয়ে আসবে নাকি? আর সঙ্গে খাওয়ার মতো কিছু।

মঞ্জুরদের ধর্মে শরাব হারাম। কিন্তু গ্রামের ছেলেটার মনে গোঁড়ামি নেই কোনও। নিজে কখনোই এসব ছুঁয়ে না দেখলেও, সঙ্গে বসতে আপত্তি নেই। বলে, “আমার জন্যেও নিয়ে আসো তবে একটা, ছোট কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল!”

এরকমই কত-কতদিন এইসব পাথরের উপর বয়ে যায় আমাদের অবসর। রূপকথার মতো দিনে, শুধু কথা শুনে যাওয়ার মধ্যেও যেন উড়ান থাকে কত! এমনও হয়, ইমন কাজে কোনও ভুল করলে রীতিমতো রাগারাগি হয় ওর সঙ্গে। তারপর সন্ধের পর যখন সবার শেষে স্টুডিও ছেড়ে বের হচ্ছি তিনজন, তখন নিজের থেকেই এগিয়ে এসে বলে, একদম শুদ্ধ ভাষায়, “যা ভুল হয়েছে হয়েছে। কাল থেকে আরও বেশী সচেতন।” “আরে কোনও ব্যাপার না… কাজ করলে তো ভুল হবেই।” “তাহলে এখন কি ঘর যাবে? নাকি বসা যাক একটু?” আমি আর মঞ্জুর হেসে ফেলি দু’জনেই। মঞ্জুরের টিউশন। পড়িয়ে আসতে দেরি হবে একটু। ততক্ষণে আমরা ফিরে গেছি সেই পাথরের গল্পে। ফসিলের গল্পে। একটা-দুটো বিয়ার, আর তার সঙ্গে বিটনুন দিয়ে মাখা ছোলা-মটর সিদ্ধ। সেসব যেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবির মতোনই। ‘স্বপ্নের দিন’। ছেঁড়া মলিন পকেটেও যেন স্মৃতি উথালপাথাল। প্রাচীন মায়াবী অক্ষয় সেই শিলাখন্ডের উপর আমরাও রেখে আসি তাই আমাদের এলোপাথাড়ি গল্পের খুঁদকুড়ো খানিক…

এদিকে গরম পড়তেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় ছো-পার্টির। পুরুলিয়া মানেই যে ‘ছো লাচ’ বা ছৌ নাচ, সেটা বেশ খানিকটা সত্যিও বটে। বিশ্বব্যাপী এতটা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা পরিচিতি তো খুব বেশি লোকশিল্প পায়নি! কিন্তু এতদিন ওখানে থেকেও তখনও অবধি ভাল করে দেখা হয়ে ওঠেনি ছৌ নাচ। একবারই যা দেখা হয়েছে, তা খুবই কম আলোয় এবং অত্যন্ত কম সময়ের জন্য। কিন্তু লম্বা সময় ধরে কেমন হয় পালা, সেটা তখনও দেখতে না পাওয়ার আক্ষেপ তাই মাঝেমাঝেই করে ফেলছি স্টুডিও লোকেদের কাছেও।

ছৌ নাচের পালা বসে সাধারণত গরমকালের মাসগুলোতেই। সন্ধের পর জ্বলে ওঠে হলুদ বিজলি বাতির জ্যোৎস্না। সারাদিন মাঠেঘাটে কাজ করার পর ক্লান্ত হা-হদ্দ মানুষগুলো মেতে ওঠে মহিষাসুরমর্দিনী পালা, কার্তিকেয় পালা বা শিব-পার্বতীর পালায়। মাথা নীচে পা উপরে করে লাফিয়ে ঘুরে গেলে শূন্যে, বোঝা যায় যুদ্ধ পৌঁছেছে চরমে! যেন ব্রহ্মান্ডও কেঁপে ওঠে তারপর শূন্য থেকে নেমে আসা তাদের স্পর্শ পেলে মাটি। ভাবি, এভাবেই কি আরোপিত হয় দেবত্ব? সহজ-সরল মানুষগুলোর ভিতর থেকে আদ্যন্ত শিল্পী প্রকৃতিটা বেরিয়ে এলেই কি ঈশ্বর স্বয়ং এসে বসেন তাদের পাশে?

আবোলতাবোল এসব ভাবনারা উড়াল দেয় আরও করকট্যা গ্রামের ঢিপির উপর বসলে। নাম-না-জানা শাকের ক্ষেত সামনে। সেখানে গুপগুপ শব্দে দুলকিচালে জল আসছে পাশের পুকুর থেকে পাম্পে। পাশের পুকুরে তাকানো যাবে না। সারাদিনের কাজ সেরে সেখানে গা ধোয়ার জন্য মেয়েদের ভিড়। বিশ্বাসের জায়গা এতটাই, ঢিপির উপর ছেলেরা বসে থাকলেও, মেয়েদের বাধে না তাই। গাই-বাছুর নিয়ে ফিরতে ফিরতে হাঁক দিয়ে যায় কেউ সাঁওতালিতে, “ঘর যাব্যেক লাই?” পরের জায়গা পরের জমিন… হাসন রাজা মনে পড়ে চকিতে। ইচ্ছা হয় ডেকে জিজ্ঞেস করি লোকটাকে, কোন ঘরে যাই বলো তো খুড়া?

চূড়ান্ত আলস্য পেয়ে বসে এইসব দিন। কথা হারায় নিজের মধ্যেই। চায়ের দোকান ভাল লাগে না। শুয়ে থাকি মুখের উপর স্যাঁতস্যাঁতে বালিশ ফেলে রেখে। খাবার রেখে চলে যায় ভগবানদা। ওঠা হয় না। ভীষণ একটা কিছু দরকার হয় এসব দিনে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু চাইলেই বা, কোথায় সেই উড়াল?

কোন মেঘ কখন যে ডানা পাঠায়, তার খোঁজ করতে করতেই এরমধ্যে হঠাৎ রাতের দিকে মঞ্জুরের ফোন। দশটা পেরিয়ে গেছে। ওই সময় এখানকার কারুর থেকে ফোন পাওয়া একটু আশ্চর্যই বটে! ফোন ধরতেই চিরাচরিত মঞ্জুর, “কী হে, রাতে আসবে নাকি?”

একটু আশ্চর্য।

— কোথায় আসবো?

— আমাদের দামোদরপুর। বিশাল ছো-লাচ পালা আছে আজকে। সারা রাত্রিভর। আসবে বলো তো যায়ে নিয়ে আসব।

— আরে, অবশ্যই যাবো! কখন থেকে শুরু?

— বারোটা। আমি সাড়ে এগারোটা নাগাদ যাব তবে…

ভগবানদার দিয়ে যাওয়া খাবারের সদগতি তাড়াতাড়িই হয়ে যায় সেদিন। সাড়ে এগারোটার সময় মঞ্জুর ফোন করলে, অগত্যা পাওয়া যায় কাঙ্খিত সেই ডানা। খানিকক্ষণের উড়ান শেষে, যেখানে পৌঁছনো হয় শেষমেষ, সে দৃশ্যটা অভূতপূর্ব। একটা বিশাল মন্ডপ, কিন্তু দর্শকদের সঙ্গে শিল্পীদের উচ্চতার পার্থক্য নেই কোনও। স্টেজ বলতে ধুলোময় জমিটাই। সেইটাই দর্শকাসনও বটে।

ধুলোময় জমির স্টেজের একদিকে অর্কেস্ট্রা দল। ধামসা, মাদল, বাঁশি আর আরও অনেক রকম বাজনাপত্র নিয়ে পালা জমাতে প্রস্তুত তারা। শুরুর আগে একটু বিড়ির মৌতাতে জাল দিয়ে ঘন করে নেওয়া ধুনকি মেজাজ। সমগ্র পালাটি গাইতে গাইতে যাবেন যে গায়ক, গলার সাম্মানিক উত্তরীয় গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত তিনি বেজায়। নাচের শিল্পীদের জন্য বাকি গোটা ময়দানটাই। আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষ ভেঙে পড়েছে পালা দেখতে। কিংবা অনেকে দেখছেও না। এদিক-সেদিক ঘুরছে, নেশা করছে একটু দূরের অন্ধকারে। বিবাহিত মহিলাদের কোলের উপর ঘুমিয়ে পড়েছে ছোট শিশু। মনে হচ্ছে এই পালা বা গান-বাজনার শব্দ যেন এতটাই রক্তে মিশে আছে তাদের,  আওয়াজের ভীষণ তীব্রতাতেও তাই ঘুম ভাঙছে না এমনকি শিশুদেরও কিছুতেই। শূন্যে পাক খেয়ে যখনই জমি ছুঁয়ে নিচ্ছেন কার্তিকেয়, তখন তার পা থেকে ধুলো উড়ে এসে লাগছে সেই শিশুর মুখে। তার তরুণী মা আঁচল দিয়ে মুছে দিচ্ছে ঘুমন্ত শিশুর কপাল। এসব দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক ক্যামেরার আঠেরো-পঞ্চান্ন বালখিল্য লেন্সও কখন যেন ধুলোর আদর মেখে ঝাপসা করে দিচ্ছে ছবি।

পরপর দুটো পালা দেখে ভোর চারটে নাগাদ মঞ্জুরের সঙ্গে হাঁটতে থাকি আশেপাশে। রাস্তার পাশে ঝোপের ধারে নেশা করে ঘুমিয়ে পড়েছে ছেলেরা। সুখী সুখী মানুষের শরীর ডিঙিয়ে আসতেই হঠাৎ দেখি, পাশের ছোট মাঠে দাঁড় করিয়ে রাখা একটা ট্রাক। ট্রাকের ভিতর বিশাল বিশাল ছৌ নাচের মুখোশ। কাছে গিয়ে ভাল করে মুখোশগুলো দেখে ভাবি, এই বিশাল আর ভারী জিনিসটা মাথায় নিয়ে ওরকম ভাবে লাফ-ঝাঁপ অথবা শূন্যে ভোল্ট খেয়ে ল্যান্ড করা ঠিক কতদিনের অভ্যাসে সম্ভব?

তারপর থেকে ছৌ নাচ দেখা হয়েছে আরও বহুবার, কিন্তু প্রথম দিনের সেই জামায়-মাথায় লাল ধুলো নিয়ে ভোর রাতের আলো ফোটা দেখতে দেখতে ফিরে আসা ঘরে— সেটা যেন পরাবাস্তব কিছুই। যেন সেই বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবিরই আজব কোনও চরিত্র এখনই নেমে এসে সামনে, পকেটে ভরে দিয়ে যাবে প্রজাপতি ভরা একটা খাম। যে খাম খুললেই প্রজাপতির ডানার রঙে রঙে দৃশ্যান্তর— শহুরে চোখ যেন চিনতে শিখতে চাইছে নতুন এই সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ আলাদা একটা দর্শন— যেখানে শিল্প, শিল্পী এবং দর্শকদের মধ্যে দূরত্ব থাকে না কোনও। একটুও থাকে না বিভেদ!

লাগাতার ফ্রেম বদলাতে থাকে ভোরের এইসব দৃশ্যে। ঝিম ধরা ঘর। ঝুল পড়া জানালায় হলুদ আলো ভোরের। জানালা খুলতেই সেই আলোর সঙ্গে আড্ডায় ব্যস্ত এই ঋতুতেও মাঠের পিছনের টিলাটার মাথায় জমে থাকা হাল্কা কুয়াশার মেঘ। এসব দৃশ্য স্বপ্নে নিতে, সারা শরীর জুড়ে নামতে থাকে ঘুম। একটা গোটা রাত পার করে ঘুমিয়ে পড়ার আগে শুধু মনে হয়, আমরা, শহুরে বাঙালিরাই কেন যে দিনদিন এই সংস্কৃতিটা থেকে দূরে সরে এলাম অযথা? কেন যে যেচে পড়ে হাত রাখলাম এই অকারণ মনখারাপের মতো সরে থাকা দূরত্বে!

ঘুমের মধ্যেও ঘুরেফিরে বাজতে থাকে গানটা। ধুলোমাটির যত্নে লাগানো ফুলগাছে ফুল এলে যখন, ফোলা ঠোঁট অভিমানে তা ফুটে থাকে অগম দরিয়ার মাঝারে…

(ক্রমশ)

 

ঋণ:

শ্রীঅনিলবরণ ঘোষ
শ্রীনন্দদুলাল আচার্য
শ্রীধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে
শ্রীরামদাস টুডু রেস্কা
আর পুরুলিয়ার সেই সমস্ত মানুষেরা, যাদের নাম এখানে আছে বা নেই।

শুভদীপ চক্রবর্তী
+ posts

পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহর বাটানগরে। নঙ্গী হাই স্কুল সাক্ষী এইসব দিনের। পরবর্তীতে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে পড়ার পর জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে ঘোরাঘুরি গ্রাম বাংলার নানান প্রান্তে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। পরে কিছুদিন জনসংযোগের কাজ; কিছুদিন সাংবাদিকতা।

প্রথম কবিতার বই 'ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া সব ঢেউগুলো' ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে। পরের বছর 'নিবিড়' থেকে ব্যক্তিগত গদ্য সংকলন 'যতটুকু দৃশ্যে ছিল'। শখ বলতে খেলা দেখা, সিনেমা দেখা, কাছে বা দূরে যেখানেই হোক ঘুরে বেড়ানো। বিকেল বেলা স্টিমারে চেপে গঙ্গা পারাপার। আলমারিতে বই গোছানো নিয়ে খিটখিটে আজীবন। না-পারার তালিকা লম্বা ভীষণ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *