অভিমানভূম। পর্ব ৬। আহারে, বাহারে। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

গত পর্বের পর…

একহ দিনঅ উড়ি চলি যাব গিয়া হায় রে হায়
সোন্দর কায়া মাটিতে মিল যাবে গিয়া হায় রে হায়

ঝমঝম বৃষ্টি এলে, গান পেয়ে বসে রাতগুলোতে। কিংবা ‘প্রিয় বন্ধু’। সেই স্কুলবেলা থেকে শুরু করে কত কত কত বার যে ঠিক, নাগাল থাকে না। অর্ণব-জয়িতার অদ্ভুত সম্পর্কটা আসলে একটা শহুরে রূপকথা— ভাবতে ভাল লাগে ছেলেটার। ভাবতে ভাল লাগে, অনেক বড় আর ঝলমলে একটা শহরের চাকরি ছেড়ে দিয়ে অনেকটা জিন খেয়ে বর্ষার মধ্যে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে ঘোরা যায় এই কখনও ছেড়ে যেতে না চাওয়া ছাপোষা শহরটায়। যেন এই ভিক্টোরিয়া আর ময়দানের চারপাশে ভেজা হলদে আলোয় ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে আসলে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একটা মধ্যবিত্ত ভীরুতা ছুড়ে ফেলার মতো সাহস। অথচ ‘প্র্যাকটিক্যাল’ হওয়ার প্রয়োজনও কি জলাঞ্জলি একদম? এমনই অখাদ্য টানাপোড়েনের মাঝে আরও উৎপটাং উস্কানি দেয় ডায়েরিটা। কতদিন তার সোঁদা পাতা দেখেনি লাল-নীল অগ্নি জেলের কাটাকুটি। কিন্তু চুপ করে বসাটাই হয় কই? সেইসব হাতছানি উপেক্ষা করে তাই পায়ের কাছে খুঁজতে থাকে সে রংচটা চাদর। বিছানার মাথার কাছে যে উঁচু মতো জায়গাটা কাঠের, সেখানে পিঠ ঠেকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে দেয় নীচের দিকে। উল্টো হয়ে দেখতে থাকে কৌণিক অবস্থান বদলে ফেলা ছাদ। অবস্থানের ভারসাম্য টাল খাওয়ায়, মাথার দিকে ছুটতে থাকে রক্তের দল। ব্রহ্মতালু পেরিয়েও যেন আরও কত নীচে নামতে থাকে তারা… নামতে থাকে নামতে থাকে…

এসব সময়েই যাবতীয় বোকামির কথা মনে পড়ে নিজেদের। অন্ধকারে নিঃশ্বাস মনে পড়ে ঘন। আচমকা মনে হয়, জীবনে ‘থ্যাংক ইউ’ বলা হয়নি কত কাউকেই! অথবা, সত্যিই বলা হয়ে ওঠে কি কখনও সেটা? শুনেছি, চলে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো জীবনীশক্তি ফিরে পায় মানুষ। কেন? আমার জন্মের পরপরই অন্ধ হয়ে যাওয়া দাদুর চোখ মৃত্যুর ঠিক আগে খুলে গিয়েছিল আচমকা। চোখ ঘুরিয়েছিলেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পরবর্তী প্রজন্মের দিকে একবার। তারপর আজীবনের মতো অন্ধ হয়ে গিয়েছিল শ্বাস-প্রশ্বাস। কিন্তু কেন খুলে গেল চোখ? কেন মুহূর্তের এটুকু সুস্থতা? জীবনে যাদের কাছে ঋণ রয়ে গেল, শেষবারের মতো একটা সুযোগ তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকারের? আজীবন প্রেমিকের আকুতি? যেটুকু বলার ছিল কিন্তু বলা হল না, এটুকুই? কী জানি! এমন সময় দপদপ শুরু হলে তালুতে, মাথা সোজা করতেই হয় অগত্যা।

ভাবি, আমাকেও যদি ফিরতে হয় এইসব স্বীকারের কাছে, তবে কাদের দিয়ে শুরু করা যায়? বাইরে থাকলেই বাড়ি থেকে ফোন আসে কখনও কখনও। দুপুর বা রাতের দিকে। একটাই প্রশ্ন মূলত— “খাওয়া হয়েছে?” এদিকে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে চূড়ান্ত নীরস আমাকে বারবার এই প্রয়োজনটার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে যারা, তারা কীভাবে যেন একটা আগলে রাখার দায়িত্বও নিয়ে নিয়েছিল অজান্তেই। বরাবরই আমার খাওয়া নিয়ে বাকিদের অশান্তির মধ্যেও নিজস্ব লজিকটা সহজ ছিল আমার কাছে— নির্দিষ্ট কয়েকটা জিনিস ছাড়া আমি মোটামুটি বাকি সবকিছুই খেতে পারি, আর একবারে কখনোই খুব বেশি খেতে পারি না। এদিকে সংস্থার ডিরেক্টর যিনি, তিনি বেদম খাদ্যরসিক। বলতেন, ‘পৃথিবীতে দু’ধরণের মানুষ হয়— একদল যারা খাওয়ার জন্য বাঁচে; আর একদল যারা বাঁচার জন্য খায়!” আমি হাসিমুখে দ্বিতীয় দলে। অগত্যা পাতে পদ যত কম, ততই সুবিধা। পেট ভরানো নিয়ে দরকার!

যদিও এটা যে বিশেষ আত্মশ্লাঘার বিষয় নয়, সেই কথা বারবারই আমাকে মনে করিয়ে দিতে কসুর করেনি কেউই, সে ছোট হোক বা বড়। বাড়িতেও দেখেছি, বরাবর ঘুরে ঘুরে বাজার করার শখ ছিল বাবার। শাকসবজি, এবং, মাছ। বাড়িতে প্রতিদিন সকালে আলোচনার একটা বড় বিষয়ই থাকতো, কী রান্না হবে আজ দুপুরে বা রাতে? বাজার ঘুরে ঘুরে একেকদিন একেক রকম মাছ আনা হত বাজার থেকে। কিন্তু দুপুরে সেই মাছের কাঁটা বেছে খেতে হবে শুনলেই প্রমাদ গোনা শুরু। অনেকটা সময় বেরিয়ে যাবে যে! যেন কী ভীষণ রাজকার্য পড়ে আছে আমার তারপর! অগত্যা অনেকটা সাহস এনে বুকে, একদিন ঘোষণা বিদ্রোহের— ওই মাছ আমি খেতে পারব না। এখনকার টেলিভিশন সিরিয়ালের যুগ হলে, তিন-চারবার এদিক থেকে, ওদিক থেকে, জুম হয়ে, কালার চেঞ্জ হয়ে ‘জিগ জিগ জিগ জিগ’ মিউজিক বেজে উঠত। তখন সাদাকালো দূরদর্শনের আমল বলেই হয়তো নাটকীয়তা কম ছিল তাই এসব অভিমানে। বাবা রাগ করে বলত, আর আনবো না কোনোদিন এইসব। বরাবর মধ্যস্থতাকারী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মতো এইসব সময়ে এন্ট্রি নিত মা। মাছের কাঁটা বেছে দিয়ে আসতো সমঝোতার শর্ত— শুধু সেদিনের মতো খেয়ে নিলেই হবে, আর কোনোদিন মাছ খেতে হবে না। আর এইসব কূটনীতির চালে দুর্বল প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার পরের দিন আবার বাবা বাজারে যেত নতুন কোনও মাছ খুঁজতে।

পুরুলিয়াতে এসেও দেখলাম, আমার খাওয়া-দাওয়া বাকি লোকের চিন্তার এবং কখনও কখনও হাসির কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুতেই বুঝতে পারছি না, এটা নিয়ে এত চিন্তা-ভাবনার কারণটা কী? প্রথম কয়েকদিনের খাওয়ার ইন্তেজাম সেক্রেটারি স্যারের বাড়িতেই। দুপুরবেলা ভাত, ডাল; দু’-একটা ভাজা সবজি আর পাতলা মাছের ঝোল। রাতের বেলা রুটি আর ঘুগনি অথবা অন্য কোনও তরকারি এবং তারপর একটা মিষ্টি। কী অপূর্ব যত্নে পাশে দাঁড়িয়ে খাবার দিতেন জেঠিমা, সেক্রেটারি স্যারের স্ত্রী। কিন্তু তিনটে রুটির পরে আবার একটা? জোরাজুরি বাড়তে লাগলেই থালার উপর পেতে দিতে হত দুই হাত— “আর একটাও না!” যেন তিনটে রুটি এর আগে এখানে কেউ খায়নি, “এ কেমন পাখির খাদ্য!” অপ্রস্তুত হয়ে গেলে হাসি দিয়ে ঢাকা দিতে হয় তা অগত্যা। মনে মনে ভাবি, এখানে আমি যেটা খাই, সেটা আবার আমার মা দেখতে পেলে অবধারিত বলে উঠত, বাইরে সব ঠিক, শুধু ঘরেই খাওয়া নিয়ে নাটক যত!

এদিকে কাজের চাপ বাড়ছেই। কখন স্টুডিও থেকে ফিরছি তার কোনও ঠিক থাকে না মাঝে মাঝেই। জেঠিমা বসে থাকেন। সেটা একটু আলাদা রকম খারাপলাগা দিয়ে যায়। তাছাড়াও শীতে বা বর্ষার রাতে এই ঘর থেকে বেড়িয়ে অতদূর খেতে যাওয়াটাও সমস্যাই ছিল একটু। অগত্যা উপায় যেটা ঠিক হল, দুপুরে আমি খেয়ে নেব কাছেপিঠের কোনও হোটেলে, আর স্যারের বাড়ির পাশের মেঘনাথদার বাড়ি থেকে আসবে রাতের খাবার। মেঘনাথ মাহাতো, আমাদের ‘মেঘা দা’, আমার ওই তৎকালীন সংস্থার হয়েই গাড়ি চালাতেন মোবাইল মেডিকেল ইউনিটের। পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিক জায়গাগুলো, যেখানে কোনোরকম স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যবস্থা নেই, সেখানে একটা মোবাইল ভ্যানে ডাক্তার, ওষুধপত্র, কেমিস্ট বা ল্যাব টেকনিশিয়ান পাঠিয়ে সপ্তাহে মোটামুটি তিনদিন চিকিৎসা পরিষেবার সরকারি ব্যবস্থাই হল ‘মোবাইল মেডিকেল ইউনিট’। এর ফলে সরকারকে যেমন হাসপাতাল পরিকাঠামো না থাকার দায়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে অসুবিধায় পড়তে হল না, তেমনি প্রান্তিক মানুষগুলোর রোগ নিরাময়ের একটা অন্যদিকও খুলে গিয়েছিল।

মেঘাদার সঙ্গে রাতের খাবারের ‘ডিল’টা হয়েছিল অনেকটা এইরকম—

— রাতে কী খাও? ভাত না রুটি?

— রুটি হলেই ভাল। তাড়াতাড়ি খাওয়া হয়ে যায়। তবে একদমই তিনটের বেশি না দিয়ো না। খুব বেশি হলে চারটে। না হলে নষ্ট হবে।

— দুটো রুটির পয়সা বাঁচিয়ে কে বড়লোক হয়? আর তিনটে রুটিতে মানুষ বাঁচে!

পৃথিবীতে যখন রোটি-কাপড়া-মওকান দাবী তোলার সময় আসেনি, সেই তখন থেকেই হয়তো নিখাদ বন্ধুত্বগুলো তৈরি হয়েছিল এই রুটির জন্যই। সেভাবেই কিনা জানি না, তবে মেঘাদার বাড়ি থেকে খাবার আসায় লাভের লাভ যেটা হয়েছিল, আমার নতুন কমবয়েসী বন্ধু জুটল একটা। যার ডাক নাম ভ্যাবলা, তার ভাল নাম সুব্রত মাহাতো। রোজ রাতে থালায় খাবার আর বড় একটা বোতলে করে জল নিয়ে ভ্যাবলার আসাটা দু’জনের কাছেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল অভ্যেসের মতো। মানভূমের নির্মেদ কঞ্চির মত চেহারা। রোজ বিকেলে স্কুলের পর দাপিয়ে বেড়াতো ফুটবল বা ক্রিকেটের মাঠে। আর সন্ধে পার করে আমি ফিরলেই চলে আসতো ডেরায়। তারপর আমার মোবাইল অথবা ল্যাপটপ, যে কোনও একটা দখলে চলে যেত ওর। যদিও মোবাইলে কোনও গেম না থাকায়, সেটা বিশেষ কাজে লাগেনি; কিন্তু আমার ল্যাপটপের কাজ হয়ে গেলেই বসে যেত সেটা নিয়ে। জিজ্ঞেস করত টুকিটাকি এটা-ওটা। এবং, একটু অবাক করেই সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় আমার ল্যাপটপে বসে বসেই শিখে নিয়েছিল মাইক্রোসফট ওয়ার্ড বা পাওয়ারপয়েন্ট। অবশ্য মোহনবাগান, কেকেআর বা ভারতের খেলা থাকলে আমাদের আর পায় কে! আমার অনেক অনেক না-পারা একা হাতে ঢেকে দিয়েছিল স্কুলে পড়া ছেলেটা। অনেকগুলো একা সন্ধেয় সঙ্গী হয়েছিল একটাও কথা না বলে। অনেকগুলো অলস সকালে ঘুম থেকে ডেকে তুলে টেনে নিয়ে গিয়েছিল খাবারের দোকান অবধি।

সকালের খাবারের দোকান মানে আলুথালু পুরুল্যার বাতাস। চোখে তখনও ঘুম টলটল। “এত বেলা অবধিও ঘুম?” “তোমরা যখন উঠলে, আমি তো তখন ঘুমোতে গেলাম…” ব্রেকফাস্টের টেবিলে আড্ডার রেওয়াজ চলতে থাকে। ব্রেকফাস্ট বলতে, ঘুম থেকে উঠেই উল্টোদিকে ভগবানদার দোকান। আলকাতরা মাখানো কালো বাঁশের সাপোর্টে কালো লম্বা একটা টেবিল আর নিচু কালো বেঞ্চি। কচুরি-তরকারি কিংবা মটরের ঝোলে ডুবিয়ে খাওয়া বানরুটির পরে চা এক গ্লাস—  শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, সকালের এই রুটিন যেন কর্নওয়ালিস সাহেবের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তই!

তবে কেলেঙ্কারিটা হতো দুপুরে খাওয়ার সময়। মানে একবার একটা কাজ নিয়ে বসার পরে পরেই এটা কাজ, সেটা কাজ। একটা রিপোর্টের পর আরও অন্য কয়েকটা রিপোর্ট। কোন প্রোজেক্টের বাজেট ওভার হয়ে গেছে। কীসের ইনভয়েস পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন করে আবার কিছুর ওয়ার্কশপ প্রোপোজাল। বিরক্ত হয়ে মাঝেমাঝেই চায়ের দ‌োকান থেকে ঘুরে আসার জন্য মরে থাকতো খিদেটাও। এই করতে করতে কখন যেন দুপুর পেরিয়ে যেত খেয়ালের নাগাল! এদিকে রেডিও স্টেশনের কয়েকজন বাদ দিলে বাকিরা দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে আসতো বাড়ি থেকেই। বোধহয় খানিক খারাপলাগা বোধ থেকেই খেতে যাওয়ার আগে একেকজন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে যেত, খাওয়া হয়েছে কিনা? ‘না’ শুনলেই, অবাক হওয়া হাত উঠে আসতো কপালে। সেই হাত যেন ভাষা জানলে বলে উঠত, “আর খাতে হব্যেক লাই!” কালী দা, মানে, কালীপ্রসাদ চক্রবর্ত্তী মাঝে মাঝে বলেই ফেলতো, “তুমি এবার ফুটে যাবে কোনোদিন!” এই ‘ফুটে যাওয়া’ মানে ফুল হয়ে ফোটা নয়, বরং ঝোলানো ফুলের মালা নিয়ে ছবি হয়ে যাওয়া। এসব কথা শুনলে হাসি আসতে বাধ্য। সাঁওতালি অনুষ্ঠান করতেন সহদেব মান্ডি। সেই সঙ্গেই কবিরাজি চিকিৎসাও। পায়ের ব্যথায় জড়িবুটি-শিকড় দিয়ে তৈরি করে দিয়েছিলেন কেমন অব্যর্থ কবিরাজি তেল। সেই মান্ডিদাও মাঝেমাঝেই সাবধান করে দিতেন ভয়াবহ বিপদের কথা বলে, “এমন না খেয়ে থাকলে পেটে আগুন জ্বলে, বুঝলেন!”

কিন্তু চিনি চাইলেই তা যোগাচ্ছে কোন চিন্তামনি! দুপুরের খাবার খেতে যাওয়ার ভরসা কখনও মঞ্জুর অথবা কখনও কখনও ইমন। মঞ্জুর আমাদের রেডিও স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার। আর ইমন অত্যন্ত গুণী একজন অনুষ্ঠান সঞ্চালক। দুপুরে খেতে যেতাম পুঞ্চা বাজারের একটু আগে পেট্রোল পাম্পের কাছে মাহাতো হোটেলে। মাহাতো হোটেলের মালিকের নাম শ্রাবণ মাহাতো। স্থানীয় উচ্চারণে সেটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল শরাবন। সারাদিন দোকানের গরমে খাটার পর দুপুরে সব মিটিয়ে যখন একটু বিশ্রামের দিকে গুটিগুটি পা, তখনই বাইক থেকে নেমে বিরক্তিকর আমরা। স্বাভাবিক ভাবেই বিরক্ত হতও শ্রাবণদার বউ। চল্লিশ টাকায় মাংস-ভাত। তবে আমার পছন্দ ছিল দু’মুঠো মোটা চালের ভাতের সঙ্গে একহাতা ডাল। আর পেঁয়াজ-লঙ্কা ছাড়া একটা ডিম ভাজা। ডিম ভাজা করার আগে বারবার বলে দিতাম পেঁয়াজ-লঙ্কা যেন অবশ্যই না দেয়। প্রথম প্রথম বলার পর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত মুখের দিকে। পেঁয়াজ-লঙ্কা ছাড়া আবার ডিম ভাজা হয় নাকি? যদিও দিনের পর দিন এটাই চলতে থাকায়, আমিও যেন অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম তাদের। দুপুরবেলা গিয়ে ফাঁকা টেবিল দেখে বসলেই, তিন-চার মিনিট পরেই চলে আসত ওই একই খাবার। মাঝেমাঝে আমড়া বা জলপাইয়ের ভয়ানক লোভনীয় একটা চাটনি।

মাহাতো হোটেল বন্ধ থাকলে কোনও কোনও দিন যেতে হতো পুঞ্চা বাজারের কাছে আর একটা হোটেলে। সেটার নামও মনে নেই এখন আর; সম্ভবত অন্নপূর্ণা হোটেল বা সেরকমই কিছু একটা। অনেক পরে স্টুডিওর কাছেই নতুন আর একটা হোটেল হয়েছিল। নামটাও বাহারি, ‘ক্লাসিক হোটেল’। তার ম্যানেজার প্রায়ই গল্প দিত, মিঠুনদা, মানে মিঠুন চক্রবর্ত্তীকে নাকি রান্না করে খাইয়েছেন তিনি দীর্ঘদিন। যদি ব্যাপারটা সত্যিই হয়, তাহলে ওই ভয়ানক তেল-ঝাল খেয়েও মিঠুনদা এত বছর পরেও ‘ফাটাকেষ্ট’ হয়ে কীভাবে এরকম ‘ঝাড়পিট’ করে গেলেন, সেটা তদন্তযোগ্য! তবে পুরুলিয়ার গ্রামের হোটেলের মতো ছিল না জায়গাটা। বোঝাই যায়, পুঁজি ছিল ভাল। সেখানে সুন্দর সাজানো ছিল চেয়ার টেবিল; বড় টিভিতে কেবল লাইনের সুবিধা আর ভাত ছাড়াও পাওয়া যেত পরোটা, কষা মাংস।

এই সবগুলো বিষয়ের মধ্যে মিল যেটা ছিল সেটা হল, অবেলায় খেতে যাওয়া আমরা এবং কখনও কখনও ভাত ঘুম ভাঙানো দোকানদারের ভয়ঙ্কর বিরক্তি নিয়েও প্লেটে বা শালপাতার থালায় সাজিয়ে দেওয়া খাবার। ইমন বা মঞ্জুর ছাড়াও পরে দুপুরের অবেলায় এই খাবার-অভিযানের সঙ্গী হয়েছিল আকাশ, মানবাজারের আকাশ ব্যানার্জি। এখন ভাবলে একটু একটু খারাপই লাগে যে, আমার জন্য বহুবার খিদে চেপে বসে থাকতে হয়েছে এদের কাউকে কাউকে। অনেকসময় হয়তো খিদে মরেও গেছে অনেকের। এদের কাউকেই মন খুলে কখনও ‘সরি’ বলা হয়নি একবারও। অবেলাতে যারা খাবার গরম করে সাজিয়ে দিয়েছেন সামনে, তাদেরকেও কখনও নেহাত ‘ধন্যবাদ’ও বলা হয়নি একটা।

ধন্যবাদ বলা হয়নি তাদেরও, যারা শীত এলেই পিঠে দিয়ে যেত বাড়ি বয়ে। নতুন ধান উঠলেই মানভূমে খুশি খুশি বাতাস। বাতাসে সোহরায়, বাঁদনা বা টুসুর ঝিলমিল। পৌষ পরবের সময় আসকা পিঠা জুটতো তো বটেই, তাছাড়াও কপালগুনে পাওয়া হয়ে যেত আরও কয়েক রকম পিঠে, যেগুলোর স্বাদ মনে আছে, নাম মনে নেই। একদমই এতদিন খেয়ে আসা পিঠেগুলোর মতো নয় এর স্বাদ। এখানকার পিঠের মধ্যে নরম ভাব যেমন কম কিছুটা, তেমনই মানভূমের ভূগোলের সঙ্গেই সঙ্গতি রেখে রুক্ষতা কিছুটা পিঠের শরীরেও। ঈদের জন্যেও অপেক্ষা থাকত খুব। কখনও কখনও ভোরবেলা ঘুমানোর আগে ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালে, পিছনের কোনও গ্রাম থেকে ভেসে আসতো ভোরের আজান। মঞ্জুর বাড়ি থেকে আনতো শিমাই আর লাচ্ছা পরোটা। কখনও কখনও নিজের বাইকে উঠিয়ে নিয়ে চলে যেত ওদের বাড়িতেই। শিমাইয়ের পায়েস বরাবরই অত্যন্ত পছন্দের একটা খাবার। এক সময় মফস্বলের বাড়িতে মাকে কাজে সাহায্য করত যে মুসলিম মেয়েটি, আমরা ডাকতাম দিদি, সেও ঈদের সময় প্রত্যেকবার দিয়ে যেত শিমাইয়ের পায়েস।

কালীপ্রসাদ’দা একবার বাড়িতে ডেকে নিমন্ত্রণ করে খাইয়ে ছিল লুচি আর মুরগির ঝোল। হাতে টর্চ নিয়ে রাতের বেলায় তারপর ধুলো ধুলো পথ হেঁটে পৌঁছে দিয়েছিল ঘর অবধি। রেডিও স্টেশনেরই আর একজন সহকর্মী শ্যামলী বৌদি সম্ভবত কোনও এক সরস্বতী পুজোর সন্ধেয় বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল লুচি, তরকারি আর সুজি। পরে আকাশের বাড়িতে বা অঞ্জনদার বাড়িতেও খাওয়া হয়েছে পাত পেড়ে। মানে, আমার ক্ষমতায় যেটুকু হয় আর কি! ইমনের বাড়িতে খাওয়া হয়েছে লুচি-মাংস ভরপেট। তবে সবক্ষেত্রেই আমি কেন এত কম খাই, সেই আক্ষেপ শোনা থেকে বিরতি মেলেনি। স্বীকার করতে সমস্যা নেই, মানুষকে খাইয়ে যে তৃপ্তি বা সুখ, সেই মোকামে হয়তো আমার মাধ্যমে পৌঁছানো হয়নি কারুরই। কিন্তু এই সমস্ত নিঃশর্ত হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসার কথা ভাবলে, মাথা নিচু হয়ে আসে আজকাল। আরও একবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেইসব বাড়ির দাওয়ায়, যাদের কাছে দিনের যে কোনও সময় বলে ফেলা যেত নির্দ্বিধায়, খিদে পেয়েছে খুব। ‘তুমি মায়ের মতোই ভাল’… সেসব রাতে বড় গভীরেই ‘চন্দ্রবিন্দু’তে ডুব!

পরবের সময় আদিবাসী গ্রামে গেলে, অবধারিত ভাবে কপালে জুটে গেছে মাংস পিঠা অথবা এনামেলের বাটিতে বাড়িতে ভাজা মুড়ি। শহুরে মধ্যবিত্ততার সংকোচের মতো কখনোই এক বাটি মুড়ি এগিয়ে দিতে হাত কাঁপেনি এইসব মানুষদের। খুব ভিতর থেকে আপন করে নিতে না পারলে এটা হয়তো সম্ভব নয় কখনোই। ফেরার পথে বাড়তি পাওনা বলতে কখনও কখনও জুটে গেছে ছোট একটা বোতলে ভরে প্লাস্টিকের প্যাকেটে জড়িয়ে দেওয়া মহুয়াও। ঝাঁঝালো মিষ্টি গন্ধে উড়ান মিলেছে কত কত রাত… ছেলেমানুষী অক্ষর ভেসেছে মুখচোরা ডায়েরিতে…

বাকি সব পড়ে থাক, ওপিয়াম চোখ রাখো চোখে
জিঘাংসা মরে গেলে,
তোমারআমার মাঝে
শূন্যতা ছাড়া বুঝি, আরও কিছু থাকে?

যদিও আফিমের থেকে কম কিছু নেশা নয় পোস্তর স্বাদে। পুরুলিয়ার খাবার-দাবারের মধ্যে পোস্তর যে এত বেশি চল, সেটা প্রথম প্রথম একটু আশ্চর্যই করেছিল। পরে বুঝতে পেরেছিলাম, এখানকার চরম আবহাওয়া আর পরিবেশের জন্য পোস্তটা আসলেই কতটা উপযোগী। আলু-পোস্ত তো আছেই, কখনও কখনও পোস্ত বাটাও জুটে যেত কপালে। তবে পোস্তর বড়া পাওয়া গেলে কোনোদিন, দিল গার্ডেন গার্ডেন! একবার বাড়ি ফেরার সময় একটা পলিথিনের প্যাকেটে বেশ কিছু পোস্ত আমাকে দিয়ে দিয়েছিল শ্রাবণদা। মঞ্জুর একবার কেজিখানেক চাল দিয়েছিল বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। মোটা দানার লাল রংয়ের চাল। বাবার খুব দাবী ছিল এই জিনিসটার প্রতি। কারণ কী? ছেলেবেলায় সেদ্ধভাতের স্বাদ? নিজের ছোটবেলায় গ্রামের ঢেঁকি ছাটা চালের গল্প তো করতো মাঝে মাঝেই। কেউ কেউ আবার বাড়ি ফেরার সময় কখনও কখনও সঙ্গে দিয়ে দিত গ্রামেই বানানো খাঁটি দেশি ঘি। অবশ্য ঘিয়ের কথা উঠলে, মানবাজারের জামাইয়ের দোকানে ঘিয়ে ভাজা মিষ্টির কথা না বললে, ভয়ঙ্কর অবিচার করা হয় অবশ্যই। মিষ্টি ভাল লেগেছে বলায়, দামটাও নেননি নাকি ভদ্রলোক! এসব ভালবাসা হুমায়ূন আহমেদের প্রেমের গল্পের মতো। সুন্দর। রহস্যময়। ‘আফিমি হ্যায় ইয়ে প্যায়ার…’

এর মধ্যেই মেঘাদার স্ত্রী অসুস্থ হওয়ায় ওই বাড়ি থেকে খাবার আসা বন্ধ হল কদিনের জন্য। অঞ্জনদাকে জানাতেই বলল, “কোনও সমস্যা নেই, অন্য ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। খাবার চলে আসবে ঠিক রাতের বেলায়।” কোথায় বা কাকে বলে কী ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেসব নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই অগত্যা আমার আর। এরা যখন বলেছে, ব্যবস্থা হয়েই যাবে কিছু একটা! সবকিছুতেই রাজনীতি খোঁজার আগে, এইসব ভালবাসার জন্যই হয়তো খুব সুন্দর একটা শব্দ তৈরি হয়েছিল বাংলায়, ‘মমতা’।

তবু, নিজে যেন হারিয়ে যাচ্ছি কোথায়। সন্ধের পর চারপাশ ফাঁকা হয়ে গেলে বাড়ির পিছনের ধূধূ প্রান্তর শনশন করে যেন আরও। মাঠের ওপাশে টিলাটার মাথা অবধি নেমে আসে মেঘ। শালগাছের শিরা বের হওয়া পাতার জালির ফাঁক দিয়ে টিমটিম করতে থাকে মেঘভাঙা জ্যোৎস্না। জানালার বাইরে জমে থাকা শালপাতায় শব্দ হয় খসখস। এদিকে লম্বাটে সরীসৃপে ফোবিয়া। বিরামহীন ঝিঁঝিঁর ডাক। শব্দই নাকি ব্রহ্ম? এসব কি একযোগে কিছু বলতে চাইছে নিভৃতে? কানে মন্ত্র দেওয়ার মতো টানতে চাইছে কোথাও? একসময় তারা দেখার শখ ছিল খুব। স্কুলে ‘মহাকাশ’ চ্যাপ্টার পড়ানোর পর, সন্ধেবেলায় পড়ার ফাঁকে বেরিয়ে সারা আকাশ জুড়ে খুঁজে বেড়াতাম খসে পড়া তারা। সেই করতে করতেই কি কালপুরুষে চোখ আটকে গেল কোনোদিন? কোথাও একটানা মন বসে না কেন তাহলে আমার? সারাদিনের পর মাঝেমধ্যেই খারাপ লাগা কেমন, নিজের তো লেখা হচ্ছে না কিছু। ছবি তোলা হচ্ছে না। অথচ কিছু গল্প তো বলার ছিল আমারও! ছোট কয়েকটা চিত্রনাট্য… হারিয়ে যাচ্ছে সেসব?

সেইসব দিনে ঘরে ফিরেই খোঁজ পড়ত ডায়েরিটার। ভ্যাবলা নিজের মত খুটখাট করে যাচ্ছে আমার ল্যাপটপ অথবা মোবাইল নিয়ে, আর আমি ডায়েরিতেই ঘুমিয়ে পড়েছি— এই সব ছবি হয়তো রয়ে গেছে স্যাঁতস্যাঁতে ছাদ বা ঢিমেতাল সিলিং ফ্যানের স্মৃতিতে এখনও। ভাবি, সেই ঝাঁকড়া শালগাছ, এবড়ো-খেবড়ো মাঠ, অন্ধকার পাহাড়, ছেঁড়াখোঁড়া মেঘ আর জ্যোৎস্নার বায়োস্কোপে কি এখনও ঘুরে বেড়ায় সেই সব ছায়া?

এরকমই একদিন কয়েক লাইন লেখা হয়েছে…

রুখা জমিতে হঠাৎ বৃষ্টি এসে পড়লে, মাটিও তাকে মেনে নিতে পারে না সবসময়। সব দেওয়াল পেরিয়ে গিয়ে কোনও কোনও দরজা খোলা কঠিন হয়ে পড়ে ভীষণ। অমূলক পৃথিবীর এই আড়ি-ভাবের অকারণগুলো আছে বলেই হয়তো, আমরাও বেঁচে আছি এখনও; বেঁচে যাচ্ছি রোজ। তবু সুখা জমিতে ফসল ফলে না আর; হঠাৎ অবান্তর বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে সেই মাটি মেনে নিতে শেখে না কোনোদিন—’

…এত অবধি লিখে থামতেই হল। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। আর শব্দ নেই কোনও। মেঘ ডাকছিল বেশ অনেকক্ষণ ধরেই। এখন শালগাছগুলোর পাতায় পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে একটা। এত জোর বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়া যে, বারান্দাতেও দাঁড়ানো গেল না। ভাবতেই কেমন একটা লাগছে যে, এই এত এত বৃষ্টির মধ্যে চারপাশে আর কেউ কোথাও নেই আমার এই তল্লাটে! আর এই একা থাকাটা আমার খারাপও লাগছে না আর। লেখা বন্ধ। বই পড়তে ইচ্ছা করল না, গান শুনতে বা সিনেমা দেখতেও না। শুধু চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছি। হঠাৎ লোডশেডিং। তাও মোমবাতি জ্বালতে ইচ্ছা করছে না উঠে। বরং মনে হচ্ছে এই বৃষ্টিটা এদের চাষের জন্য ভাল হবে, নাকি খারাপ? তখুনি ভাবলাম ফোন করে জিজ্ঞেস করি কাউকে একটা। এটা নিয়ে কালকে একটা প্রোগ্রাম করা যায় না? বাংলায় আর সাঁওতালিতে? চাষীদের ইন্টারভিউ আর এক্সপার্ট হিসেবে পঞ্চায়েত বা কৃষি বিভাগের কেউ? তারপর সেটাকেই ট্রান্সলেট করে কোট হিসেবে ইউজ তো করাই যায়? কিন্তু কাউকেই জিজ্ঞেস করা গেল না, কারণ এত বৃষ্টিতে এখানে নেটওয়ার্কের আশা করাটা বৃথা। অগত্যা…

যেটুকু জেনেছি, এখানে জমির প্রকৃতি সাধারনত তিন ধরণের হয়। নিচু আর চাষের জন্য সব থেকে উর্বর জমি হল বাঁধ। তার থেকে একটু উঁচু জমি হল বহাল। আর তার থেকেও উঁচু, কাঁকুড়ে আর চাষের পক্ষে সবথেকে খারাপ প্রকৃতির জমি হল টাঁড় বহাল। খুব ভাল বৃষ্টি না হলে টাঁড় জমিতে ফসল ফলানো খুবই কষ্টকর। মন রে, কৃষিকাজ জানো না… আঃ, এমন বৃষ্টিতে একটাই অসুবিধা এখানে। এক কাপ চা যদি পাওয়া যেত! অলস-অকর্মন্য ছেলের কাছে এখানে চা মানেই চা’য়ের দোকান। আর চা’য়ের দোকান মানেই ‘অজীব-গরিব’ আড্ডাখানা এক। মেকি লোকদেখানো ভাব নেই কোনও। সরাসরিই জিজ্ঞেস করে ফেলে কেউ, “তা, কাজটা কী করো?” এতদিন পর পিঠের ব্যাগ নামিয়ে আমিও হাসতে হাসতে উত্তর দিই, “আমিও সেটাই জানার চেষ্টা করছি দাদা!” “আর জানার চেষ্টা করে লাভ নাই দাদা। বরং চা খান। এই দাদাকে একটা পোড়া-চা দে রে!”

হেসে ফেলি। চা আসার আগেই দোকানির থেকে অশ্রাব্য গালাগাল ভেসে আসে ‘পোড়া-চা’ বক্তার দিকে। টিমটিমে হলুদ আলোয় উনুনের ধোঁয়া কুহক তৈরি করে কেমন। মাটির গনগনে উনুনে রসের মিষ্টি জাল দিতে বসে কারিগর। সেই কয়লার আঁচে লাল হয়ে ওঠা কারিগরের মুখ যেন ভৈরব। একটা অচেনা দেশ। আমার দেশ!

এই সব ভাবতে ভাবতে কখন যেন লেগে গেছে চোখ। হঠাৎ দরজায় ধাক্কা। এই সময় কে ডাকবে? বাইরে মেঘ ডাকছে। বাজ পড়ছে তুমুল। তার উপর এই অন্ধ করে দেওয়া বৃষ্টি! এমন বারিষকে এখানে বলে, ‘ঝারি’। সহজে থামবে না। উঠে দরজা খুলে দেখি, রাতের খাবার এসেছে।

— আলো জ্বালাওনি কেন?

— ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আসলে…

— মোমবাতি আছে? নাকি আমার টর্চটা রাখবে? তোমরা শহর থেকে এসেছো, এই অন্ধকারে ভয় লাগছে না তো? আমি কি একটু বসবো?

হেসে ফেলি। বললাম, “একদমই না। কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। মোমবাতি জ্বালাবো এবার…” বলতে না বলতেই চলে আসে কারেন্ট। বললেন, “গরম গরম খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি।”

আশ্চর্য আমি গেট অবধি এগিয়ে আসি তাকে এগিয়ে দিতে। বৃষ্টির ছাটে ভিজে যাই বারান্দাতে দাঁড়িয়েই। চোখে-মুখে বৃষ্টির ছিটা নিয়ে দেখতে থাকি, একটা ঘোলাটে হলুদ আলো মিশে যাচ্ছে বৃষ্টির মধ্যে। মিশে যাচ্ছে, কারণ টর্চ জ্বালিয়ে তিনি ফিরে যাচ্ছেন। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে চুপচুপে ভিজে তিনি ফিরে যাচ্ছেন। প্রতিদিন তিনটের বেশি রুটি দিতে না করলেও, প্রতিদিনই পাঁচটার কমে রুটি না দেওয়া তিনি ফিরে যাচ্ছেন। পুরুল্যার ভীষণ ঝারিতে ভিজে যাচ্ছে তাঁর গামছায় বাঁধা মাথা আর একমুখ দাড়ির নীচে সাদা ছেঁড়া গেঞ্জির শরীর।

আর আমি তাকিয়ে দেখছি, এই তুমুল দুর্যোগ মাথায় নিয়ে, শরীর-মাথা সব ভিজিয়ে, আমায় রাতের খাবার পৌঁছে দিয়ে যিনি ফিরে যাচ্ছেন, কাকতালীয় হলেও তাঁর নাম, ভগবান।

(ক্রমশ)

 

ঋণ:

শ্রীঅনিলবরণ ঘোষ
শ্রীনন্দদুলাল আচার্য
শ্রীধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে
শ্রীরামদাস টুডু রেস্কা
আর পুরুলিয়ার সেই সমস্ত মানুষেরা, যাদের নাম এখানে আছে বা নেই।

শুভদীপ চক্রবর্তী
+ posts

পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহর বাটানগরে। নঙ্গী হাই স্কুল সাক্ষী এইসব দিনের। পরবর্তীতে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে পড়ার পর জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে ঘোরাঘুরি গ্রাম বাংলার নানান প্রান্তে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। পরে কিছুদিন জনসংযোগের কাজ; কিছুদিন সাংবাদিকতা।

প্রথম কবিতার বই 'ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া সব ঢেউগুলো' ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে। পরের বছর 'নিবিড়' থেকে ব্যক্তিগত গদ্য সংকলন 'যতটুকু দৃশ্যে ছিল'। শখ বলতে খেলা দেখা, সিনেমা দেখা, কাছে বা দূরে যেখানেই হোক ঘুরে বেড়ানো। বিকেল বেলা স্টিমারে চেপে গঙ্গা পারাপার। আলমারিতে বই গোছানো নিয়ে খিটখিটে আজীবন। না-পারার তালিকা লম্বা ভীষণ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *