অভিমানভূম। পর্ব ৫। চায়ে পে চর্চা। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

গত পর্বের পর

‘জীবনটা ভাই রেলের গাড়ি, মনটা যে ড্রাইভার

একা একা একটা লম্বা যাতায়াতের মজা হল, মাঝে মাঝেই ছোটবেলা এসে ডানা ঝাপটিয়ে যায় সেখানে। জানালা ধরে বসে থাকতে থাকতে মনে পড়ে নিচু চালের দরমার একটা বাড়ি। বাড়ির সামনের উঠোনে গাছগুলো বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে রোগা দুটো ছেলের ব্যাট-বল পেটানো। আর, সন্ধে হয়ে গেলে গা হাত পা ধুয়ে বইখাতা নিয়ে বসে যাওয়া দু’জনের বড় একটা চৌকির দুটো কোণে। বাড়িতে আর বসার জায়গা নেই তো। খুব একটা কেউ আসেই না কখনো বাড়িতে তাই। পড়া থেকে শোওয়া, ওই জোড়া দেওয়া দুটো খাটই ভরসা। তবু দুম করে কেউ চলে এলে কদাচিৎ, সামনে শিকার পাওয়া বিড়ালের মতো লকলক করে ওঠে দু’জোড়া ক্ষুদে শয়তানি চোখ। দুই ভাইয়ের দৌরাত্ম্যে কথা বলতে অসুবিধা। তাই, “যাও, বাইরে গিয়ে খেলো।”

সেই সব খেলার দিন, ধুলোর দিন— দরমার বাড়িটার মতোই উপড়ে গেছে অতীত থেকে। এত অতীত-বিলাসিতা মধ্যবিত্ত সংসারে মানায় না, সাবধানও করেছিল একজন। সেসব সাবধানবাণী পেরিয়ে, হুহু হাওয়ায় দরজা ধরে তাকিয়ে থাকি যাতায়াতের বাইরে। হাওয়া যেন ফালাফালা করে দেয় অন্ধকার। দমকা হাওয়ায় জট পাকিয়ে যায় চুলে। জিন্সের পকেটে নিস্তেজ মোবাইল। আচমকা কোনও টিমটিমে স্টেশনে এসে দাঁড়ালে ট্রেন, মনে হয় নিজেরাও কেমন যেন জড়িয়ে-মড়িয়ে নিজেদের কাছেই দুর্বোধ্য হয়ে যাচ্ছি দিন দিন। কিন্তু এভাবে মাথায় লাগাতার হাওয়া লাগিয়ে চললে, পরদিন পুরুলিয়া পৌঁছে যে দুঃস্বপ্নের মতো মাথাব্যথা নিশ্চিত, সেটা খুব একটা দুর্বোধ্য নয়!

পুরুলিয়ায় যে গ্রামে থাকি, তার নাম লৌলাড়া। সম্ভবত ‘লহু লাড়া’ অর্থাৎ রক্তে নাড়া দেওয়ার মতো কোনও ঘটনার পরেই গ্রামের এইরকম একটা নাম হয়েছিল, গল্প করেন গ্রামবাসীরা। অবশ্য অন্য মতও যে নেই, তা নয়। মাঝেমাঝেই যাতায়াত করতে হয় জেলারই অন্যান্য আরও কয়েকটা জায়গাতেও। একটা জায়গা থেকে আরেকটা জায়গার দূরত্ব এতটাই বেশি যে, ঠিকানাহীন গন্তব্যের মতো মনে হয় চলতে চলতে। চলাফেরার মাঝে দিয়েই ছবি ছবি গল্পদের সঙ্গেও দেখা হয় যায় আরও কত কত!

এই লাগাতার চলাফেরার সুবাদে, যে কোনও কারুর সঙ্গে মোটামুটি সহজেই আলাপ জমাতে পারি এখন। সমস্যা হলে বলতে পারি, “বেজ হইল্য!” ফোন এলে ‘হ্যালো’র বদলে মানভূমি টানে বলে উঠি, “বলহ্!” চেয়ে নিতে পারি গ্রাম্য কড়া বিড়ি। অভ্যেস নেই। গলা জ্বালা করে ওঠে। কিন্তু গ্রামের মাঝে মাঝে হরিমন্দিরে বসে আলাপ সহজ করার জন্য এর থেকে বেহতর উপায় আর হয় না!

অন্য আরও বেশ কয়েকটা প্রান্তিক জায়গায় গিয়ে যেটা বুঝলাম, এই পুঞ্চা পঞ্চায়েত এলাকা বা লৌলাড়া গ্রাম মূল শহর থেকে অনেকটাই দূরে হলেও, অন্যান্য বেশ কিছু অঞ্চলের তুলনায় একটু হলেও বেশি উন্নত। তার কারণ সম্ভবত পনেরো কিলোমিটারের মধ্যেই মানবাজার সাবডিভিশনের গায়ে-গতরে বেড়ে ওঠা। ঐতিহাসিকভাবেই মানবাজার ব্লক সমগ্র পুরুলিয়া জেলার নিরিখেই বরাবর বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কবেকার সেই সাদা সাহেবদের আমলের কথা! ১৮৩৩ সালে জঙ্গলমহল জেলা ভেঙে যখন তৈরি হল মানভূম জেলা, তখন সেই মানভূমের জেলাসদর করা হয়েছিল মানবাজারকেই। পরবর্তীতে ১৯১১ সালে যখন ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি পুরোদমে চালু করে দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার, তখন বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে গোটা মানভূমকেই জুড়ে দেওয়া হয় বিহারের সঙ্গে।

বঙ্গভঙ্গ আটকাতে যে বিপুল উন্মাদনা দেখা গিয়েছিল কলকাতা শহরে এবং তার যে পরিমাণ প্রচার হয়েছিল, সেটার প্রায় কিছুই হয়নি যখন মানভূমকে বাংলার বুক থেকে কেটে নিয়ে বিহারের অংশ করে দেওয়া হয়। তবে মানভূমের বাংলা ভাষাভাষী সম্প্রদায় একদমই মন থেকে মেনে নিতে পারেনি এই বিচ্ছেদ। যে হিন্দি আগ্রাসন নিয়ে বর্তমানে এত তোলপাড় সারাদেশে, ভাবলে অবাক লাগে এই একই আন্দোলন সেই সময় মানভূমের মানুষ শুরু করেছিলেন মোটামুটি ১৯১২ সাল থেকে, যা চলে স্বাধীনতার পর অবধিও! বহু ভাষাতত্ত্ববিদ এবং ঐতিহাসিক গবেষকেরাও স্বীকার করেছেন, ভাষার অধিকারের জন্য মানভূমের এই আন্দোলনকে পৃথিবীর দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন বলাই যায়।

মানভূমের বাংলাভাষী বাসিন্দারা স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীনতার পরে আবার তাঁরা ফিরে আসবেন বাংলার বুকে। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টায় স্বাধীনতা এলেও, তাঁদের সেই দাবীদাওয়া পূরণ হল না একটাও। অতএব এবার আন্দোলন শুরু হল স্বাধীন দেশের স্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের বছর থেকেই। মানভূমের বাঙালিদের মধ্যে তীব্র ভাবে ছড়িয়ে পড়ল ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন। শেষে ১৯৫৬ সালের এপ্রিল মাসে চরমে পৌঁছায় আন্দোলনের তীব্রতা। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। তারমধ্যেই আমাদের এই পুঞ্চা এলাকারই পাকবিড়রা গ্রাম থেকে প্রায় এক হাজার মানভূমবাসী পায়ে হেঁটে রওনা দিলেন কলকাতার পথে। টানা সতেরো দিন হাঁটার পর মিছিল কলকাতা পৌঁছলে, লালমাটির বিরুদ্ধতার ঝাঁজ টের পেয়েছিল রাজশক্তির শহর। অবশেষে এই আন্দোলনের কাছে মাথা ঝোঁকাতেই হয় সরকারি উপর মহলকে। ১৯৫৬ সাল। পয়লা নভেম্বর আসে খবরটা। উল্লাসে ফেটে পড়েন মানভূমবাসীরা। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়েছে পুরুলিয়া জেলাকে! ওখানে থাকতেও দেখেছি, পয়লা নভেম্বর দিনটা রীতিমতো সারা জেলাতেই পালন করা হয় পুরুলিয়ার জন্মদিন হিসেবে।

কোথাও দেখার বা পড়ার আগে পুরুলিয়া জেলার এই ইতিহাস আমি জানতে পেরেছিলাম শেখরদার চায়ের দোকানে বসে। আমার থাকার বাড়িটা থেকে স্টুডিও অবধি রাস্তায় চায়ের দোকান মোটামুটি দুটো। যে বাড়িতে থাকি, তার উল্টোদিকেই ভগবানদার দোকান, আর, কলেজের ঠিক পাশে শেখরদার দোকান। মোটামুটি বাইরে ঘোরাঘুরি না থাকলে, সকালে দশটা থেকে দিনের বাকি সময়টা কাজের ওখানেই। তাই বেশ খানিকটা সময় কেটে যায় শেখরদার দোকানে। শেখরদারা পাঁচ ভাই। বড় ভাই ওভারশিয়ার। শেখরদার আগের ভাই বিখ্যাত ‘লেডু দা’ নামে। বাকি দুই ভাই, তপন দা আর পলাশ দা। খুবই অদ্ভুত একেকটা চরিত্র এবং সময় সময় একটু খ্যাপাটে মনে হলেও, শেখরদা, তপনদা বা পলাশদা খুবই গভীরভাবে মিশে এই জেলার সংস্কৃতির সঙ্গে।

শেখরদা বা তপনদার সঙ্গে মাঝেমাঝেই জমে উঠত একদম খাঁটি চায়ের দোকানের আড্ডা। বিশেষ করে সন্ধের পর কার্বনের দাড়ি-গোঁফে সাজানো হলুদ বাতিটা জ্বলে উঠলে, আড্ডায় রং লেগে যেত আরও। মাঝে মাঝেই স্থানীয় কেউ কেউও অংশীদারী হয়ে উঠলে এইসব উত্তেজনার, চুপচাপ বসে শুধু শুনে যেতাম যাবতীয় মতবাদ। তার কিছু কিছু কিম্ভূতকিমাকারও বটে! সাইকল নিয়ে দূরের গ্রাম থেকে চলে আসতেন সুজিতদাও। সাদা-চুল দাড়ির সুজিত হাঁসদা এখানকার আদিবাসী সাঁওতালদের মধ্যে মোটামুটি নেতা গোছের একজন। আড্ডার বিষয় বহুবিধ। দেশ বা রাজ্যের সরকার কিংবা সমকালীন রাজনীতি। গ্রামীণ রাজনীতির অন্দরমহলটা নিয়ে এখানকার মানুষেরা কী ভাবেন, সেটাও বোঝার চেষ্টা থাকতো একটু আধটু।

আগের দুই ভাইয়ের সঙ্গে এইসব কথা হলেও, পলাশদার সঙ্গে যখনই কথা হতো, তখনই সেটা হয় কোনও গান নিয়ে, নয়তো আবৃত্তি ক্লাস নিয়ে, নয়তো কলকাতার কোন শিল্পী কেমন পারফর্ম করছেন সেইসব খুঁটিনাটি নিয়ে। কথা হতো মানে, ডায়লগের ব্যাপারই নেই; পুরোটাই মনোলগ। পলাশদা একাই বক্তা। ছোটখাটো লোকটা আমাদের রেডিও ষ্টেশনেও বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে এর আগে। এখনও এলাকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে পুরোদমে চেষ্টা করছে নাটক, নাচ, গান বা আবৃত্তির ক্লাস চালিয়ে যাওয়ার। যদিও তাতে খুব একটা সাড়া যে পাওয়া যাচ্ছে, তা বলা যাবে না। কারণ, মাঝেমাঝেই পলাশদা আক্ষেপ করে ফেলছে যে, কী করতে চেয়েছিল আর কেন সেটা হল না সেই নিয়ে…

চায়ের দোকানে বসেই নাকি দেখে ফেলা যায় একটা গোটা সমাজ, এরকম একটা লাইন কি কেউ লিখে গিয়েছিলেন আগে? লিখে না থাকলেও, সত্যিই যে চায়ের দোকানে বসে একটা গোটা সমাজ ব্যবস্থার মোটামুটি একটা ছবি এঁকে ফেলা যায় চোখের সামনে, সেটা বুঝতে পারি বেশ। ভগবানদার দোকানের তুলনায় শেখরদার চায়ের দোকানে ভিড়টা একটু বেশিই হয়। তার কারণ, দোকানটা একদমই লৌলাড়া কলেজ বা ছেলেমেয়েদের স্কুল আর হোস্টেল সংলগ্ন। ছুটির দিন ছাড়া প্রায়ই চায়ের দোকানের সামনে লেগে থাকে ছেলেমেয়েদের ভিড়।

ট্রেনের মতোই সময় মেনে এখানকার রাস্তার ধারে যাত্রীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় বাসের জন্য। বেশিরভাগ বাসই পুরুলিয়া-মানবাজার রুটের। দু-একটা আবার বাঁকুড়া বা ঝাড়গ্রাম। একেকটা বাস এসে থামলে, গাদাগাদি করে উঠে যায় ছেলেমেয়ের দল। ধুলো উড়িয়ে চলে যায় বাস। আশেপাশের গ্রামের ছেলেমেয়েই সব। বেশিরভাগেরই অনার্স নেই কোনও সাবজেক্টে। অনেক দূরের গ্রাম থেকে বা পড়শী বাঁকুড়া বা মেদিনীপুর জেলা থেকে যারা পড়তে আসে, তাদের থাকতে হয় ছেলে আর মেয়েদের জন্য আলাদা করা নির্দিষ্ট হোস্টেলে। কলেজ ক্যাম্পাসের ভিতরে একটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো রাস্তা বাইরের মেন রোডের পাশেই মূল গেট থেকে শুরু হয়ে চলে গেছে একদম পিছনের বড় মাঠ অবধি। বড় মাঠ মানে ঠিক কতটা বড়, সেটা বলে বোঝানো মুশকিল। ‘দিগন্তবিস্তৃত’ এর জন্য একদম ঠিকঠাক একটা শব্দ। মাঠের পাশে বেশ কিছুটা চাষ জমি। শোনা যায়, একসময় নাকি এই জমির ফসল বিক্রি করে সেই অর্থেই চালানো হতো স্কুল-কলেজের খরচা। সন্তান-সন্ততির শিক্ষার খাতিরে চাষ করতেন স্থানীয় মানুষেরাই। এইসবই যদিও শোনা-কথা এখানকারই নানান মানুষজনের কাছ থেকে, তবু এখন মাঝেমধ্যে মনে হয় যদি ব্যাপারটা সত্যি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে বিকল্প রাজনীতিতে যে ‘কমিউন’ বা বা ‘সকলের তরে সকলে আমরা’র কথা বলা হয়ে থাকে, এর থেকে ভাল উদাহরণ তার জন্য আর কীই বা হতে পারে?

এখানে টুক করে বলে রাখাই যায়, এই কলেজে গড়ে ওঠার পিছনে ভীষণ অবদান আছে যে মানুষটার, তিনি হলেন আমার তৎকালীন সংস্থার সেক্রেটারি স্যারের বাবা। ভদ্রলোক নাকি ১৯৫৭ সাল নাগাদ জাহাজে করে লিভারপুল গিয়েছিলেন পড়াশোনা করতে। এখনই যে যাতায়াত ব্যবস্থা দেখতে পাচ্ছি এখানকার, তাতে ১৯৫৭ সালে পুরুলিয়ার এই গ্রাম থেকে কারুর লিভারপুল যাওয়া মানে, আমাদের মতো অগা মানুষের প্রায় চাঁদে যাবার মতোই ব্যাপার বলে মনে হয়!

অবশ্য চাঁদ ছোঁওয়ার মতো জটিল কোনও মনোবৃত্তি গ্রামের ভিতরের কারুর মধ্যেই দেখি না। বেশিরভাগেরই আর্থিক অবস্থা সেরকম স্বচ্ছল নয়। সহকর্মীদেরও আয়ের মান ন্যূনতম। সেটা নিয়ে অভাব-অভিযোগও থাকে। মানে, পুরুলিয়া যে অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া জেলা, সেটা তো মোটামুটি জানাই। তবু, এসব কিছুর পরেও এখানকার মানুষেরা যেভাবে প্রাণ খুলে হাসে, বেঁচে থাকে প্রাণভরে, সেটা দেখে একটু হিংসেও হয় বটে। নিজেকেই প্রশ্ন করি, কীভাবে পারে এরা? বলেও ফেলি কখনও কখনও আমার সঙ্গে স্টুডিও থেকে চা খেতে আসা কাউকে কাউকে। যেমন একদিন শ্রীমন্তিদিকে বলেই ফেললাম, “তোমাদের হাসিগুলো খুব সুন্দর।” উত্তরে শুধুই হাসি বিলিয়ে দেয় সহদেবদার বউ শ্রীমন্তীদি। সাঁওতালি ভাষার রেডিও প্রোডিউসার, সঞ্চালক এবং অবলীলায় উঁচু তারে আদিবাসী গান ধরে মাত করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখা শ্রীমন্তী হেমব্রম। বলে, “একবার আসো আমাদের গাঁয়ে।” যেন গেলেই দেখা যাবে কোথায় লুকানো সুখের চাবিকাঠি! বলি, “অবশ্যই যাব।”

যেতেও হয় কাজের সূত্রে। বিভিন্ন সাঁওতাল গ্রাম ঘুরে ঘুরে দেখি সহজ-সাধারণ জীবনযাত্রা। হাজারটা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও, নিজেদের মতো করে সামলে ওঠার চেষ্টা সকলে মিলেই। মাটির দেওয়ালে ঝুলতে থাকা ধামসা-মাদল। এবড়োখেবড়ো মাঠে বল নিয়ে দাপাদাপি করে বেড়ানো সুঠাম সাঁওতাল কিশোরের দল। সুন্দর করে মাটি দিয়ে লেপে রাখা রাস্তায় বিছিয়ে রাখা ধানের সারি। গ্রামের মেয়েদের হাতে আঁকা রঙীন ছবি দেওয়ালে দেওয়ালে। ধান পাহারা দিতে দিতেই নাতি-নাতনি সামলানো বয়স্ক সাঁওতালি ঠাকুমা। গান গাইছেন গুনগুন করে। বসে থাকার পাশে শুইয়ে রাখা একটা বাঁশের লাঠি, যে লাঠি এখন ভার বয়ে যায় একটা যুগ পার করে দেওয়া মানুষের যাবতীয় যাতায়াতের। অবাক হই সাঁওতাল যুবক-যুবতীদের ক্লান্তিহীন ভাবে সারাক্ষণ কিছু না কিছু কাজ করে যাওয়ার মাঝে হঠাৎ হঠাৎ নির্বিকার অলস বসে থাকা দেখেও।

গ্রামের পাশে পাশে উঁচু-নিচু টিলা। খুব ইচ্ছা হয়, একদিন একটা টিলার উপর বসে একটা সূর্যের ডুবে যাওয়া দেখব একা একা। কিন্তু কাজের চাপ বাড়ছে দিনের-পর-দিন। সময় বের করাই হয় না প্রায়। হাজারটা ফাইল। ডকুমেন্টেশান। সরকারি নথি। ইমেল। প্রোজেক্ট বাজেটের চাপ। সেইসঙ্গে মাথাব্যথার রোগটাও যেন জাঁকিয়ে বসছে পাল্লা দিয়ে। রোজ ওষুধ খেতে হয় এক গাদা। স্টুডিও থেকে কেউ কেউ যখন ঘরে আসে আমার, তখন টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা ওষুধের স্ট্রিপ দেখে তারা বলেও ফেলে, “ওষুধ খেয়েই তো পেট ভরে যায়, তাই তোমায় কিছু খেতে হয় না আর!” কাজের পোস্ট বা ডেজিগনেশন-টেজিগনেশন গুলি মেরে, কাজের বাইরে সবাই বন্ধু হয়ে ওঠে খুব। আজীবন বন্ধু খুঁজে বেড়ানো আমি এখানে এসে বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন মনের একগাদা বন্ধু পেয়ে বর্তে যাই যেন। পুঁথিগত বিদ্যা বাদ দিলে, আরও নানান বিষয়ে যাদের জ্ঞান আমার থেকে অনেকটাই বেশি।

নইলে হঠাৎ করে তেড়ে বৃষ্টি এলে যে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার জলে মাটির রাস্তা ভেসে গিয়ে সমস্যা হতে পারে আর তার জন্য তাড়াতাড়ি ফেরার পথ ধরা দরকার, সেটা আমার বইপড়া বিদ্যে আদৌ কি জানতো? এদিকে মাটি আলগা হয়ে রাস্তার ধার থেকে মাঠের উপর শুয়ে পড়েছে ইলেক্ট্রিকের খুঁটি। সারা রাস্তা জুড়ে ইলেক্ট্রিক তার এবং সেটা পেরিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। অগত্যা কখন বিদ্যুৎ আপিসের লোকেরা এসে কাজকর্ম শুরু করবে, সেদিকে চেয়ে থাকা হাপিত্যেশ করে। শুধুমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থাই যে একটা অঞ্চলের মানুষের কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, সেটা এখানে না এলে বোধগম্য হতো না সেভাবে কখনোই। শুধু যাতায়াতের কারণেই এই পরিমাণ স্ট্রাগল যে স্বাধীনতার এত বছর পরেও একটা সভ্য দেশের মানুষকে এখনও করতে হয়, সেটা দেখে একদিকে যেমন রাগ হয়, তেমনই আশ্চর্য হতে হয় এখানকার মানুষদের অবলীলায় সেইসব সমস্যায় নির্বিকার থেকে প্রতিদিন যাপনের মানসিকতা দেখেও।

সেরকমই একটা দিনে বহু ঝামেলার পর ভাঙা রাস্তা ছেড়ে ঘুরপথ ধরে ফেরত এসে যখন রীতিমতো ক্লান্ত, তখনই বেশ মজার জিনিস আবিষ্কার করা গেল একটা। ক্লান্তি কাটাতে চায়ের জুড়ি নেই। শেখরদার দোকানে বসে আছি চায়ের অপেক্ষায়। পাশে বসে মোবাইলে কী একটা দেখাতে দেখাতে অনর্গল বকবক করে যাচ্ছে পলাশদা। চা চেয়েছি অনেকক্ষণ, কিন্তু তখনও না আসায় আর একবার তাড়া দিতে হল। শেখরদা এবার একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “দাঁড়াও, হচ্ছে!” এদিকে দেখতে পাচ্ছি দিব্যি চা ঢেলে দেওয়া হচ্ছে অন্যান্য খরিদ্দারকে। আমি অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলাম, “চা তো আছেই?” শেখরদা বলল, “না, তোমারটা হচ্ছে।”

সন্দেহ নিয়ে পলাশদার দিকে চাইতে, পলাশদা মোবাইল থেকে চোখ উঠিয়ে বুঝিয়ে দিল ব্যাপারটা। ঘটনা হল, যে কোনও দোকানে চা চাইলে দু’রকম চা মিলতে পারে। একটা রকম হল, ইতিমধ্যেই বানিয়ে রাখা চা, যেটা গরম করে ঢেলে দেওয়া হবে গ্লাসে। আর দ্বিতীয়টা হল, নতুন চা বানিয়ে দেওয়া। এখন এই নতুন চা সবাইকে বানিয়ে দেওয়া হয় না। এই যে কারুর জন্য আলাদা করে চা বানানো হচ্ছে, সেটাকে নিছক ভালবাসা বলব নাকি একটা ছোটখাট বা মাঝারিমানের শ্রেণীভেদ— সেটা এখনও মাঝেমধ্যে ভাবায় আমাকে।

এদিকে সারাদিন এতটা বেশি সময় মোবাইলে মেসেজ, ইমেল আর ফোন রিসিভ করতে চলে যায় যে, আমার তুলনায় বেশ দামী ফোনটাও বিগড়োতে শুরু করেছে এর মধ্যেই। ব্যাটারি প্রায় থাকে না বললেই চলে। এর একটা সুবিধা হল, বাইরে বেরোলে খুব একটা অহেতুক ফোন ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয় না আর। চারপাশে চোখ তুলে তাকানোর মতো সুযোগটা পেয়ে যাই তাই খানিক। কিন্তু এক্ষেত্রে চোখ তুলে নয়, বরং চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম মাথার পিছনে উপরের দিকের দেয়ালে বেশ কিছু কাগজ সাঁটা। কয়েকটা হাতে লেখা। কিছু আবার কম্পিউটারে প্রিন্ট নিয়ে জেরক্স। তাতে বেশ মজার বা গুরুগম্ভীর কিছু নাটকের নাম। নাটক বা পালা অনুষ্ঠিত হবে নাকি এই গ্রামেই। ব্যাপারটা কী? “এই, নাটকটা কী হয় এখানে?” জিজ্ঞেস করতেই শেখরদা বলল, “সেকি, তুমি এতদিন আছো, এটা এখনও জানো না?” সত্যিই জানি না। মাথা নাড়তে নাড়তে শেখরদা বলল, “পুজোর সময় এখানে তো চারদিন ধরে দমে নাটক হবে!”

নাটক শুধু হবেই না, সেই নাটকের আগে রীতিমতো রেষারেষি চলে এখানে নাটকের দলগুলোর মধ্যে। নাটকের দলগুলো আবার মোটামুটি বয়স ভিত্তিক। একই গ্রামের বিভিন্ন বয়সের মানুষ আলাদা আলাদা দল করে প্রত্যেক বছর পুজোয় নামায় নতুন নতুন পালা। বিশেষ কিছু চরিত্রের জন্য মাঝেমাঝে ভাড়া করেও নিয়ে আসা হয় অভিনেতা-অভিনেত্রী। শেখরদার চায়ের দোকানের পাশেই বড় একটা ফাঁকা মাঠ। মাঠের শেষে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো একটা স্টেজ। সেটাই হল পালার মাঠ। নাটকের প্রায় তিন চার মাস আগে থেকেই নাটকের নাম এবং দলের নাম লিখে লিখে পোস্টার পড়া শুরু হয়ে যায় এলাকায়। অমুক গোষ্ঠীর পরিবেশনায় অমুক নাটক। পরিচালকের নামও থাকবে। কিন্তু কেউ জানতে পারবে না নাটকের বিষয়বস্তু বা অন্যান্য খুঁটিনাটি। গোপনীয়তা রক্ষা করা হয় ভীষণভাবে, রেষারেষি এতটাই! আড়ালে-আবডালে খবর কানাকানি হয় কোন দলের কোন পার্টটা কে বড় জমিয়ে করছে। এভাবেই যেন বিজ্ঞাপনের ভাষায় একটা রীতিমতো ‘হাইপ’ তৈরি হয়ে যায় নাটকগুলোকে ঘিরে।

সহজ অথচ প্রাচীন এই ‘প্রমোশন’ মাধ্যমটা দেখে মজাই লাগে বেশ। চশমা মুছতে মুছতে বলি, “খুবই দারুণ ব্যাপার তো!” দোকানে খরিদ্দারের ভিড় থাকলেও শেখরদা কিছু বলতে বসে পড়ে এবার দোকানের ভিতরের বেঞ্চে। অনেকক্ষণ আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় কপালে ঘাম, মুখে লালচে ভাব। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পলাশদাকে উঠে যেতে হয় অগত্যা। কেজো দায়িত্ব শিল্পী মানুষদের কবেই বা পছন্দ হয়েছে আর? কিন্তু এই ভিড়ও তো লক্ষীর স্বরূপ! সেই ভিড় পলাশদার দায়িত্বে ছেড়ে শেখরদা বিড়ি ধরায়। একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বলে, “বুঝলে কিনা, তোমাদের টিভিতে যে টাইপের প্রোগ্রাম দেখানো হয়, আমাদের জন্য কই সেসব? আমরাই বা সেখানে কই? ওই বাহামনির মতো ভাষায় সত্যিই তো কথা বলি না আমরা… তাই নিজেদের জন্যই নিজেদেরকে অনুষ্ঠান বানাতে হয় আমাদের। এতে যে ‘এন্টারটেনমেন্ট’, স্টার জলসা, জি বাংলা সব মিলে গেলেও তা কখনোই দিতে পারবে না।”

সাংস্কৃতিক শ্রেণীভেদ এবং তার অবমূল্যায়ন যে কতটা কোনঠাসা করে দিতে পারে একটা স্থানিক মানবগোষ্ঠীকে, সেটা যে শেখরদা এত সহজ করে বুঝিয়ে দেবে, সেটা খানিকটা গুগলিই ছিল। লাইন-লেংথ বুঝতে না পেরে বোল্ড হয়ে যাওয়া ব্যাটসম্যানের মতো, কিছুই বলার থাকে না অগত্যা। হেসে চশমাটা চোখে লাগিয়ে নিই আবার। দোকানে ভিড় বাড়ছে আরও। চা কিংবা খাবার না পেয়ে বিরক্ত অনেকেই। কী একটা ফোন এসে যাওয়ায়, পলাশদা ব্যস্ত হয়ে গেছে সেটা নিয়ে যথারীতি। একটু হতাশ চোখে সেদিকে তাকাল শেখরদা। দোকানের ছোট্ট জানালা দিয়ে একচিলতে রোদ এসে পড়েছে তেলচিটে বেঞ্চে। গরম চায়ে চুমুক দিতে দেরী। নিজেকেই আবার হাল ধরতে হবে বুঝতে পেরে শেষ টানটা দিয়ে বিড়িটা ছুড়ে ফেলল দোকানের মেঝেতে। উঠতে উঠতে পিঠে হাত রেখে বলল, “নতুন করে বানিয়ে দিলাম, চা’টা শেষ করো…”

(ক্রমশ)

শুভদীপ চক্রবর্তী
+ posts

পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহর বাটানগরে। নঙ্গী হাই স্কুল সাক্ষী এইসব দিনের। পরবর্তীতে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে পড়ার পর জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে ঘোরাঘুরি গ্রাম বাংলার নানান প্রান্তে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। পরে কিছুদিন জনসংযোগের কাজ; কিছুদিন সাংবাদিকতা।

প্রথম কবিতার বই 'ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া সব ঢেউগুলো' ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে। পরের বছর 'নিবিড়' থেকে ব্যক্তিগত গদ্য সংকলন 'যতটুকু দৃশ্যে ছিল'। শখ বলতে খেলা দেখা, সিনেমা দেখা, কাছে বা দূরে যেখানেই হোক ঘুরে বেড়ানো। বিকেল বেলা স্টিমারে চেপে গঙ্গা পারাপার। আলমারিতে বই গোছানো নিয়ে খিটখিটে আজীবন। না-পারার তালিকা লম্বা ভীষণ...

1 thought on “অভিমানভূম। পর্ব ৫। চায়ে পে চর্চা। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

  1. পুরুলিয়ার লাল মাটির গন্ধমাখা,সহজ করে বলা,সহজ করে কথা।
    লুকোনো সুখ।উদাত্ত কণ্ঠে সাঁওতালি গান,শব্দগুলো স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে।
    পরের পর্বের অপেক্ষায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *