অভিমানভূম। পর্ব ৪। জলের কাছে চুপ। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

পাথর পাথর পাথর আর নদীসমুদ্রের জল

নীল পাথর লাল হচ্ছে, লাল পাথর নীল

একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা করো

ফলে ‘ন’টার সাইরেন সংকেত সিলেবাসে মনোযোগ কম…’ বেঞ্চ বাজিয়ে গান মানেই, ক্লাসের ফাঁকে মস্তি চরমে। আর লাস্ট বেঞ্চ হলে তো কথাই নেই! সেই ডানদিকের লাস্ট বেঞ্চ বাঁধা ছিল তাদের জন্য। দুটো ছেলে। অনেকটা বড় হয়ে যেত তাদের কছে ক্লাসরুম। ঘন্টা বাজলেও তাড়াহুড়ো নেই। পায়ে পায়ে ওড়া ধুলো খানিকটা থিতিয়ে গেলে, স্কুল ছুটির পর কিংবা শনি-রবির বিকেলে ছোট্ট সবুজ মফস্বলের পাশ দিয়ে বাঁক নেওয়া গঙ্গার ধার। জংলা মতো জায়গাটা পেরিয়ে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া একটা সিমেন্টের চাতালে বসলেই, পায়ের সামনে জল। ছলাৎ ছলাৎ শব্দের ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘আমার ভিতর ও বাহিরে’। কখনও কখনও বয়স খানিকটা বেড়ে যাওয়ার পরেও গঙ্গার উপরের বাতিল কাঠের জেটিতে নাদান ছেলেমানুষি একগাদা। চিৎকার করে ‘সুন রি সখী’ কিংবা ‘মেঘ বলেছে’ হয়তো। বলতোও মেঘ। হঠাৎ বৃষ্টি দিলে কোনোদিন, কাক-ভেজা ঝুপ্পুস। তারপরে আরও খানিকটা পার ভেঙে এগিয়ে এলে নদী, টান পড়ে কখন সেই বন্ধু-বৃত্তের ব্যাসার্ধে। ছেলেটাও আজগুবি হয় আরও। খুব মনখারাপ থাকলে আচমকা চলে যায় দক্ষিনেশ্বর বা গঙ্গা পেরিয়ে বেলুড়। চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে সেখানে হঠাৎ মনে হয়, ঠিক কোন সিঁড়িতে পা দিয়ে নামতেন নিবেদিতা? ঠিক কেমন মনখারাপ হত তাঁর স্বামীজির জন্য?

এই বিশাল জোয়ার-ভাঁটা নদী আর তার পলি-কাদার গন্ধ নিয়ে বেড়ে উঠেছে যে, সেই তার কাছে পাথুরে মানভূমের এই রোগাসোগা পাঁজরের হাড় বের করা নদী ভাললাগতে পারে কি? কিন্তু এতই আশ্চর্য এখানকার নদীদের রং আর রূপ, এমনিতেই বসে পড়তে ইচ্ছা হবে পাথরের গা ঘেঁষে। এদিকে বুকের ভিতর লুকানো ভীষন ‘চাঁদের পাহাড়’। আনমনা ছেলেটা প্রথম যেদিন নদী দেখতে গেল, পাথুরে উপত্যকা দেখে বলে উঠেছিল, “আরে, এতো আমাদের ভেরি ওন রিখটারসভেল্ড!”

কাজের জন্য প্রায়ই ঘুরতে হয় এদিক-ওদিক। কথা বলতে হয় অনেকের সঙ্গে। যত মিশছি, বুঝতে পারছি, মূলতঃ জল, জঙ্গল, মাটি— এই হল ভরসা এখানকার মানুষদের। প্রায় সমস্ত উৎসবও এইসব চির বহমান প্রকৃতিকে ঘিরেই। নদীর উপরেও সারি সারি পাথর। জলের উপর থাকলেও, পাথরে শ্যাওলা নেই একটুও। পাথরের মধ্যেই সবুজ ঘাসের দল মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে কোথাও কোথাও। তার নীচ দিয়ে কলকল চলে যাচ্ছে জল। মনে হয়, এই অসীম প্রকৃতি থেকেই হয়তো ‘সহাবস্থান’ শব্দটা এভাবে শিরায়-উপশিরায় ঢুকে গেছে এখানকার মানুষজনদের মধ্যে।

কাজ না থাকলে মাঝেমাঝেই বিকেল হলে নদীর দিকে যেতে মন চায়। কিন্তু একলা হেঁটে যাওয়া মুশকিল। অনেকটাই দূর। কেউ না কেউ বাইকে লিফট না দিলে যাওয়া হয় না তাই আর। রাগ হয় নিজের উপরেই। কেন যে এতটা অপগণ্ড হলাম! একটা সাইকেল বা বাইক, কিছুই চালানো আসে না! একদিন বিকেলে চায়ের দোকানে বসে আছি, দেখলাম চারপাশে বেশ একটা উত্তেজনা ছেলে-ছোকরার মধ্যে। মাইক-বক্স সাজাতে ব্যস্ত সবাই। কারণ, পরের দিন সরস্বতী পুজো। এই একটা ব্যাপারে মফস্বলের সঙ্গে কোনও পার্থক্য নেই এখানেও। প্যান্ডেলের সাইজ-টাইজ যাই হোক না কেন, তার থেকে তিনগুণ উঁচু সাউন্ডবক্স! বুঝলাম পরের দিন কপালে দুঃখ আছে। মায়ের মতোই অবস্থা আমার। একটু জোরে শব্দ বা চিৎকার শুনলেই অস্বস্তি; মাথাব্যথা।

বড় হওয়ার পর থেকে সম্ভবত এই প্রথম সরস্বতী পুজোর দিন আমার ছোট্ট সাজানো মফস্বলটার বাইরে। যদিও অঞ্জলি-টঞ্জলি নয়, বরং চোখে হারায় এই দিন সারে সারে হেঁটে যাওয়া; আর তার মধ্যে মিশে যাওয়া পাঞ্জাবীর হলুদ থেকে শাড়ির বাসন্তী। এখানেও যে সেটার ছোঁয়া একদমই নেই, তা নয়। কিন্তু এখানে সেই একজন কাউকে খোঁজা নেই আমার আর অনেকদিন পর… হঠাৎ একবার দেখতে পেলে দাগিয়ে রাখা নেই ডায়েরির ক্যালেন্ডারের পাতায়…

সরস্বতী পুজোর পরেরদিনের সকাল। তীব্র ডিজে বক্সের তান্ডব কাটিয়ে পিঠে ব্যাগপত্র নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি কাজের জায়গার দিকে, দেখি রাস্তায় ভিড় অন্যদিনের থেকে অনেকটাই বেশি। কাজের জায়গা বলতে, আপাতত স্টুডিয়োতেই। যখন যেখানে ফাঁকা পাই, বসে পড়ি ল্যাপটপ নিয়ে। সুবিধা হচ্ছে, স্টুডিয়োটা ওই লৌলাড়া সেন্টিনারি কলেজের ক্যাম্পাসের মধ্যেই হওয়ায়, মোটামুটি স্টেবল ইন্টারনেট কানেকশন পাওয়া যায় একটা। সেদিন হেঁটে যেতে যেতে চায়ের দোকান থেকেও ডাক এল না কোনও। ব্যস্ততা খুব আচমকাই। চা, তেলেভাজার দাম মেটানো বা নোটের ভাঙানি নিয়ে মৃদু বচসা। স্টুডিয়োতে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “ব্যাপার কী? এত ভিড় বাইরে?” মিতনদা, সাঁওতালি ভাষার রেডিও প্রোডিউসার মিতন টুডু নিজের স্বভাব মতো হাতের আঙুল নাচিয়ে নাচিয়ে বললেন, “আজ পরব তো…”

সরস্বতী পুজোর পরের দিন মানভূমের এই অঞ্চলে পালন করা হয়, ‘মাকুরি পরব’। কাঁসাই, মানে যে নদীর ভাল নাম কংসাবতী, তারই পাশের গ্রাম বুধপুরে নাকি এই মেলা হয়ে আসছে কয়েক শতাব্দী ধরে। মিতনদার সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম ক্যামেরা, রেকর্ডার নিয়ে— যদি নিউজপেপার বা রেডিওতে কোনও খবর করা যায় এটার…

‘নিজের’— এই শব্দটাকে ঘিরে যে একটা ইলিউশন থাকে, সেটা কেমন কেটে যাচ্ছে এখানে আসবার পর থেকেই। এত এত প্রাচীন সব সংস্কৃতির হদিশ মিলছে, যেগুলো হয়তো না-জানাই থেকে যেত এখানে আসা না হলে। ঠিক কবে থেকে যে এই মাকুরি মেলার শুরু, সে তথ্য যদিও কারুর কাছেই পাওয়া গেল না। লোক উৎসবের বৈশিষ্ট্যই বোধহয় এটা। আজীবন বহতা নদীর মতো ভেসে চলা শুধু। দেখি, উৎসব ঘিরে বিশাল মেলা। কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও উৎসাহে যে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি, সে বোঝা যাচ্ছে থিকথিকে ভিড় দেখেই। মেলা বসেছে নদীর পাড়ে যেমন, তেমনই নদীর চরেও। বেশ কয়েকজন পুলিশের বড়কর্তাকেও দেখা গেল হাজির ভিড় সামলাতে। দূর-দূরান্ত থেকে গাড়ি বোঝাই হয়ে আসছে মানুষজন। মেলার প্রকৃতি যদিও মানভূমেরই অন্য পাঁচটা মেলার থেকে বিশেষ আলাদা কিছু নয়। প্রচুর খাবার দোকান, মেয়েদের সস্তা কাঁচের চুড়ি, কানের দুল, ঘরের কাজের জিনিস এমনই সব। কেনাকাটি সেরে নদীর চরেই বালির উপরে বসে পড়েছে মানুষ। যতক্ষণ দিনের আলো, ততক্ষণই উৎসব।

কিন্তু উৎসবের হেতুটা যে ঠিক কী, বোঝা যাচ্ছে না কিছুতেই। অথচ ইতিহাস তো একটা ঠিক থাকবে নিশ্চই। অথবা, সত্যিই কি থাকার খুব একটা দরকার আছে? সহজ-সাধারণ মানুষ যেভাবে কোনও উপলক্ষ্য ভুলেই মেতে উঠেছে খুশিতে, সেরকম সহজ কি সত্যিই হতে ভুলে যাচ্ছি আমরা? এরা ভুলে যায়নি বলেই হয়তো, মেলা ঘোরা হয়ে গেলে ভিড় করেছে আবার বুধপুরেরই বিশাল ঐতিহ্যবাহী শিবমন্দিরে। ঐতিহ্য এর বিশালতায় নয়, প্রাচীনত্বে। ফেরার পথে স্থানীয় পুলিশকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেল, জেলার নানা প্রান্ত থেকে মেলায় এসেছেন সেদিন প্রায় দেড় লাখ মানুষ!

এই কংসাবতী নদী নিয়ে মহাভারতের সময়কার গল্প খুঁজে পাওয়া যায় একটা। এসব গল্প এখানকার বাতাসে ভাসে মিথের মতো।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিশ্ব পরিভ্রমণে বেরিয়েছেন। ঘুরতে ঘুরতে একসময় তাঁর রথ এসে থামল ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে। প্রকৃতির অপরূপ সুষমায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন ভগবান। গুনগুন সুরে গান ভেসে আসছে কোথাও থেকে। নীচে তাকিয়ে দেখলেন, পাহাড়ি নদীর জলস্রোত গায়ে মেখে গান গাইছে কিশোরী কন্যা এক, যার নাম কংসাবতী। শ্রীকৃষ্ণের প্রশ্নের উত্তরে সেই কন্যা জানাল, সাগরে চলেছে সে। হঠাৎ লীলাখেলার মনোবৃত্তি হল শ্রীগোবিন্দের। অচেনা-অজানা কন্যার প্রেম প্রার্থনা করে বসলেন তিনি। কিন্তু সে মেয়ে তো সাগরের প্রেমে পাগল! সাগর ছাড়া আর কারোর সঙ্গেই মিলতে পারবে না সে। শ্রীকৃষ্ণের ডাক ফিরিয়ে দিয়ে জলস্রোত হয়ে বয়ে চলল কন্যা কংসাবতী। কিন্তু এই জগতের যিনি অধিপতি, তাঁকে কি এত সহজে ফাঁকি দেওয়া যায়? নিজেও ভয়াল জলস্রোতের রূপ নিয়ে কংসাবতীর পিছনে ধাওয়া করলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর এই রূপের তাণ্ডবে ছারখার হয়ে গেল চারপাশ; ভেসে গেল গ্রামের পর গ্রাম। কিন্তু কংসাবতীকে পাওয়া ছাড়া তখন আর অন্য কোনও লক্ষ্য নেই দামোদরের! এভাবে মাইলের পর মাইল চলার পর হঠাৎ পিছন ফিরে তাকালেন তিনি। দেখলেন নিজের ধ্বংসাত্মক রূপ। বুঝলেন, এইভাবে পাওয়া যাবে না কন্যার ভালবাসা। রূপ বদলে নিজেকে এবার মায়াময় শান্ত করে নিলেন তিনি। তাঁর এই রূপ দেখে মোহিত হয়ে গেল জগত-পারাবার। শান্ত জলস্রোতের নাম হল, ‘রূপনারায়ণ’। এক ঝলক পিছনে তাকিয়ে কংসাবতীও প্রায় বশ হয়েই গেল রূপনারায়ণের। কিন্তু আচমকা রূপনারায়ণের ভেতর থেকেও সেই পরিচিত স্বর শুনতে পেয়ে অচিরেই নিজের ভুল ভাঙলো কংসাবতীর। আবার দুরুদুরু বুকে ছুটে চলল সে। সাগরের কাছে তাকে পৌঁছতেই হবে! পৌঁছেও গেল একসময়। কিন্তু স্বয়ং জগৎপতি যাকে প্রার্থনা করেছেন, তাকে সাগর কী করে মিলতে দেয় নিজের সঙ্গে? ফিরিয়ে দিল কংসাবতীকে সাগর। হৃদয় ভাঙলেও, জেদ কমে না কন্যার। যতই শক্তিধর হোক ভগবান, কিছুতেই নিজেকে তাঁর কাছে বিলিয়ে দেবে না কংসাবতী! কিন্তু কোথায় যাবে সে এখন? নেই, আর যাওয়ার নেই কোথাও। অবশেষে সকল অগতির গতি যে, সেই গঙ্গা মায়ের কোলেই নিজেকে সঁপে দিল কংসাবতী। নিজের প্রেমের কাছে পৌঁছানো হল না কিশোরী কংসাবতীর আর কখনোই…

এইসব গল্প শোনার পর চুপ হয়ে বসে থাকি খানিকক্ষণ। ভাবি, ঠিক কতটা উদার এবং প্রিয় হলেই সর্বশক্তিমানকেও প্রায় ‘ভিলেন’ বানিয়ে একটা নদীকে ঘিরে লোককথা বুনে ফেলা যেতে পারে এমন! চা ঠান্ডা হতে থাকে গ্লাসে। পাশ থেকে কেউ নাড়া দিলে বলি, “ঠান্ডাই খাই আসলে চা আমি।”

এখানকার মূল নদী এই কাঁসাই হলেও, এর উৎপত্তি হয়েছে অনেক দূরে। সম্ভবত ঝালদায়। তার কয়েকদিন পরে, কিংবা সেবার পুরুলিয়া থেকে শহরে ফিরে পরেরবার যখন ফেরত গেলাম গেলাম সেখানে আবার, তখনই একদিন এলাকার ‘সোশ্যাল ম্যাপিং’ প্র্যাকটিস করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম আরও একটা নদী। শিলাই। কিন্তু যেদিকে দেখানো হচ্ছে, সেদিকে নদী তো দেখিনি আর কোনও! তাহলে? সোশ্যাল ম্যাপিং করা হচ্ছিল নিউজপেপার বা রেডিও স্টেশনের বাকি সকলের সঙ্গেই। সোশ্যাল সেক্টরে যারা কাজ করেছেন তাদের সকলের কাছেই ‘সোশ্যাল ম্যাপিং’ খুবই পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ একটা শব্দ। একটা বড় কাগজে একটা নির্দিষ্ট এলাকার গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো পয়েন্ট করতে করতে মোটামুটি ভাবে এলাকার খুঁটিনাটি মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে নেওয়া। যে কোনও এলাকা ভিত্তিক পরিকল্পনা করতে যেটার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

সেই ম্যাপিং করতে গিয়েই আচমকা নিজের মতো করে চমকে যাওয়া আমার। জানা গেল, পুরুলিয়া সহ বাঁকুড়া বা মেদিনীপুরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলাই নদী, যার ভাল নাম শিলাবতী, সেই শিলাবতীর উৎস নাকি এই এলাকাতেই। একটা নদীর উৎস, তায় এত সুন্দর একটা নাম— দর্শনের অপেক্ষা কি সওয়া যায়?

— কবে যাব এটা দেখতে?

— পুরুলিয়া যাওয়া-আসার পথেই তো পড়ে। দেখোনি?

— আমি থোড়ি জানতাম! কতদূর এখান থেকে?

সেদিন বিকালেই অঞ্জনদা’র বাইকে সওয়ার হয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। শুধুই একজন সহকর্মীর থেকেও বড় কথা, অঞ্জনদা প্রায় সব সময়ের সঙ্গী ওই দিনগুলোর প্রথম দিকে— সে সকালের চা’য়ের গ্লাসে হোক কিংবা সন্ধের গরম ভাবড়া ভাজার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়া।

মিনিট দশেকের পথ। উত্তেজনা যথেষ্ট। একটা নদী কোথা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে সেটা দেখবো, এরকম অভিজ্ঞতা তো হয়নি এর আগে কখনও!

কিন্তু উৎসস্থলে পৌঁছে হতাশই হলাম। জল কই? এ তো রুক্ষ এক পাথুরে গর্ত! ফোঁটা ফোঁটা জল যেটা পড়ছে, তার রং আবার কালো। কাদা কাদা প্রান্তর। কোথায় নদীর জন্ম মুহূর্তের সেই উচ্ছ্বলতা? ভুল ভাঙালো অঞ্জনদা। ওখানে বর্ষা ছাড়া সারা বছরই এই ভাবে ধারা স্নান হয়ে যায়। এরকম ফোঁটা ফোঁটা জল পড়তেই থাকে সারা বছর। আর ফল্গু ধারাটা বইতে থাকে ভিতরে ভিতরে। অর্থাৎ? অন্তসলিলা? ভাবি, স্থানীয় কলেজের ভূগোলের মাস্টারমশাইয়ের থেকে জানতে চাইবো একবার। গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বইতে বইতে শিলাবতী পৌঁছে গেছে তারপর বাঁকুড়া হয়ে পশ্চিম মেদিনীপুর। এবড়ো-খেবড়ো রাঢ়ভূমি পেরিয়ে শেষে স্থিতি পেয়েছে খনিক সমতলে এসে।

আবার বুঝতে পারি, প্রকৃতিই ঈশ্বর এই সব অঞ্চলগুলোতে। নদীর উৎস থেকে খানিক পিছিয়ে এসে রাস্তার ধারেই বিস্তৃত সবুজ মাঠে শিলাবতী মায়ের মন্দির। আড়ম্বর নেই। তবে ভক্তি আছে। এই মন্দিরে কিছু চাইলে নাকি সেই চাওয়া বিফলে যায় না। এই নদীর নামেই প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তিতে মেলা বসে এখানেই। নাম, ‘শিলাই মেলা’। কৃষিজীবি মানুষগুলোর হপ্তাখানেকের জন্য আনন্দে মেতে থাকার মেলা। এখানেই উদযাপিত হয় বিখ্যাত ‘ছাতা পরব’ কিংবা ‘ভাদুর মেলা’ও। কাছের-দূরের মানুষের মিশেলে অদ্ভুত এক খোয়াবনামা মাতিয়ে রাখে এই প্রান্তর।

ভাবতেই কী আশ্চর্য লাগে, যে দেশে একটা গোটা নির্বাচন ব্যবস্থার সামনের সারিতে রাখা হয় জাতপাত বা ধর্মের ঝনঝনানি, সেখানে দেশের এরকম একটা প্রান্তিক জায়গায় একই দিনে উদযাপিত হয় ‘ভাদু পরব’ আর ‘ছাতা পরব’। দুই ভিন্ন সম্প্রদায়ের হৃদয়ের কাছের দুই উৎসব। একেকটা উৎসব মানেই একেকটা গল্প এখানে। এতটাই মনকাড়া সেসব, বলে ফেলার লোভ সামলানো যায় না। সবটাই লোকমুখে শোনা যদিও, তাই মতভেদ থাকতেই পারে। যেমন, ভাদু পরবের কথাই ধরা যাক।

অনেকপরে একদিন বাড়ি ফেরার পথে পুরুলিয়া স্টেশনে ট্রেন ধরতে যাওয়ার সময় দেখেছিলাম বাংলার অন্যতম রঙিন এই স্থানীয় গ্রামীণ উৎসব, ‘ভাদু’। একান্ত ভাবেই গ্রামের মহিলাদের নিজস্ব একটা উৎসব উৎস। বাংলা ক্যালেন্ডার ধরে বলতে গেলে, বছরের পঞ্চম মাস, অর্থাৎ ভাদ্র মাসের শেষ দিনে পালন করা হয় এই ভাদু উৎসব। প্রচলিত মত বলে, ‘ভাদু’ হল দেবী ভদ্রাবতীর (বা অন্য আরেকটি উৎস অনুসারে রানী ভদ্রেশ্বরীর) ডাক নাম। মানভূম অঞ্চলে দেবী ভদ্রাবতী পরিচিত উর্বরতার দেবী হিসেবে। উর্বরতা, অর্থাৎ জমির ফসল এবং নারীর সন্তান। গ্রামের মহিলাদের কাছে দেবী ভদ্রাবতী ঘরের আদরের মেয়ের মতোই। তাই সারা মাস আনন্দ করলেও, দেবীকে ভাসানের মুহূর্তে বিষাদ আসতেও দেরি হয় না। দেবীর কাছে চাওয়া তো সামান্যই, আসন্ন মরসুমে যেন ফসল হয় ভাল আর ঘরের দুয়ার থেকে যেন দূরেই থাকে দারিদ্রের কালো ছায়া।

এদিকে একদিকে যখন শিলাই সংলগ্ন জলাশয়ে ভাদু ভাসান চলছে, অন্যদিকে তখন সেই একই মাঠে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে ‘ছাতা’ পরবের। এতটাই ভিড় যে, গাড়িই আটকে গেল। নেমে পড়লাম ব্যাপারটা দেখার জন্য।

এ এক আশ্চর্য উৎসব, যেখানে পুজো হয় বর্ষার দেবতার। প্রার্থনা? সেই প্রকৃতির রোষানল থেকে বাঁচাই। যেন বৃষ্টি হয় ভাল। যেন ফসল হয় ভাল। যদিও এই পরবের সঙ্গে মিশে আছে পঞ্চকোট রাজপরিবারের নাম, তবুও আদতে সেটা হয়ে দাঁড়িয়েছে আদিবাসী উৎসবই। উপস্থিত ধামসা, মাদল, হাঁড়িয়া, মহুয়া, মাংস পিঠা, পাতা নাচ। বিশাল একটা শাল কাঠের গুঁড়ির উপর টাঙানো কাপড় দিয়ে তৈরি ততোধিক বড় একটা ছাতা! এই পরব ঘিরেও রাজপরিবারকে জড়িয়ে একাধিক মিথ থাকলেও, আদিবাসী মানুষদের উদ্দীপনা সেই কথা মাথায় রাখতে দিচ্ছে না আর। পরে শুনেছিলাম, ছাতা পরবের মূল অনুষ্ঠানটা যেখানে হয়, অর্থাৎ পুরুলিয়ার চাকলতোড়ে, সেখানে নাকি একটা সময়ের পরে ‘দিকু’ অর্থাৎ শহুরে সভ্য মানুষদের থাকতেও দেওয়া হয় না আর। এখানে সেসব মাথায় নেই। ভিড়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে দেখছি আদিবাসী মেয়েদের সাজ। লাল-সাদা বা লাল-সবুজে মেশানো শাড়ি। খোঁপা করে টেনে বাঁধা মাথার চুলে হলুদ ফুল কারুর কারুর। মেয়েদের নাকি আসতেই হয় এই পরবে। জীবনসঙ্গী বা সঙ্গীনিও খুঁজে নেয় অনেকে এই মেলার মাঠ থেকেই।

একপাতা ঘুগনী কিনে রাস্তার উপর বসে হইহই দেখছি এইসব, তখনই ড্রাইভার দাদা তাড়া দেয় এসে। “ট্রেনটা ফেল করবে তুমি! চলো…” অগত্যা! ‘কে কোন চুলোয় ঘাপটি মেরে, কার কপালে ঠুকছে পেরেক/কে কার ঘাড়ে নল রেখেছে বন্দুকের/তবুও প্রেম সর্বনাশী…’ ভাবতে ভাবতে উঠে বসি গাড়িতে। গোটা রাস্তাটা ভাবি, কে কার হাত ধরল আজ মেলার ধুলোর ভিড়ে?

শিলাই নদীর ফ্ল্যাশব্যাকে ফেরা যাক। নদীর উপনদী থাকবে না, সে কেমন কথা হল! শিলাবতীরও আছে। বাঁকুড়া জেলায় শিলাবতীর অন্যতম প্রধান উপনদী হল, জয়পান্ডা। কিন্তু এটা কেমন নদী দেখা? ধুর! এর থেকে কাঁসাই অনেক ভাল! শহর থেকে আসা রোগা ছেলের কথা শুনে হাসলেন ঝুঁঝকো আলোয় আরও নিচু হয়ে আসা চায়ের দোকানের বয়স্ক দোকানি। বয়স্ক দোকানির কন্ঠায় তুলসির মালা। নিভে আসা উনুনের শেষ আঁচের লাল আভা তাঁর মুখে। কেটলি থেকে শেষবারের মতো চা ঢেলে বাসনপত্র জলে দিতে গেলেন তিনি। ধুতে ধুতে নদী দেখে বিরক্ত শহরের ছেলেকে শোনাতে লাগলেন একটা অপূর্ণ প্রেমের গল্প। অপূর্বও। যে রূপকথায় কাঁদে চোখ, শেষমেষ সব ভাল হবে ভেবে তার মায়া কে কবেই কাটাতে পেরেছে আর! ঠান্ডা বাড়তে থাকলেও, কিছুতেই ওঠা গেল না অগত্যা এই সব গল্প ছেড়ে।

প্রাচীন এক তপোবন। মহাজ্ঞানী এক ঋষির আশ্রমও সেখানে। সেই ঋষিরই কন্যা শিলাবতী। অপরূপ রূপসী। অসামান্যা মেধাবী। কিন্তু অকালে মাতৃহীনা কন্যাটির সব দায়-দায়িত্ব এসে পড়েছে ঋষিরই কাঁধে। এদিকে টোলে পাঠ দান আছে। আছে শয়ে শয়ে শিষ্য। অগত্যা কন্যাকেও নিজ টোলেই বাকিদের সঙ্গে শিক্ষা দিতে লাগলেন ঋষি। দিন যেতে লাগল। বড় হতে লাগল শিলাবতী। এরমধ্যেই একদিন ঋষি উদাত্ত কন্ঠে ব্যাখ্যা করছেন শাস্ত্র, দরজায় এসে দাঁড়াল এক সৌম্য দর্শন যুবক। পাঠে ছেদ পড়ল। কী যেন একটা হল শিলাবতীর মধ্যেও। কে এই যুবক?

ঋষির শিক্ষাদানের সুখ্যাতিতে মুগ্ধ হয়ে সুদূর মিথিলা থেকে ছুটে এসেছে যুবক জয়পান্ডা। তারপর ওই আশ্রমেই থেকে গিয়েছে বাকি শিষ্যদের সঙ্গে। বছর ঘুরেছে। যুবতী শিলাবতীর সেদিনের মুগ্ধতা দৃঢ় হয়েছে আরও। একে অপরের প্রেমে পাগল জয় ও শিলাবতী। কিন্তু তাও কিছুতেই জয়ের ডাকে কেন যেন সাড়া দেয় না শিলা! কেন যেন আসতে চায় না তার সঙ্গে মিথিলায়। কিন্তু জয়কেও যে ফিরতে হবে। অবশেষে শিলাবতী কান্নায় ভেঙে পড়ে জয়ের সামনে। বৃদ্ধ পিতাকে ছেড়ে কী করে যাবে সে? জয় নিরুপায়। শিলাকে ছাড়া ফেরা সম্ভব নয়। গুরুর পা’য়ে গিয়ে পড়ে। শিলাবতী শুনতে পায় বাবা বলছেন, “তুমি যোগ্য পাত্র। নিয়ে যাও ওকে। তবে আর আমার সামনে এনো না। হৃদয় স্নেহের কাঙাল…” আচমকা চরাচর ভেঙে যায় নিক্কনের শব্দে। শিলাবতী শুনে ফেলেছে সব! শিলাবতী দৌড়চ্ছে পিতার কথা শুনে। শিলাবতীর খুব অভিমান জয়ের প্রতি; পিতার প্রতি।

জয়ও দৌড়তে থাকে শিলাবতীর পিছনে। কেন দূরে যাচ্ছে শিলাবতী? শিলাবতীও অনড়, কিছুতেই ধরা দেবে না জয়ের কাছে ও। অবশেষে যখন প্রায় জয়ের হাতের নাগালে শিলাবতী, তখনই হঠাৎ জলের স্রোত হয়ে ভেসে গেল ঋষিকন্যা। জয়পান্ডার হাহাকার চিৎকার হয়ে ছড়িয়ে গেল দিগন্তে। শিলাকে ছাড়া সেও যে অন্ধ! নিজেও সে একটা স্রোত হয়ে যায় অতঃপর। কিন্তু একি! এত বালি! এত বালি আসছে কেন জয়ের সামনে! কেন আটকে দিচ্ছে ওকে? কিছু দেখতে পাচ্ছে না ও! কোথাও পৌঁছতে পারছে না!

সেই থেকেই পাশাপাশি শুয়ে আছে শিলাবতী ও জয়পান্ডা। শুধু বর্ষার সময়েই আর কোনও বাঁধা আটকাতে পারে না ওকে। সবকিছু ভাসিয়ে দেয় জয়। ঝাঁপিয়ে পড়ে শিলাবতীর বুকে। শাঁখ বাজে দুই পাড়ে। দুর্দম জলরাশির সামনে রব ওঠে গ্রামবাসীদের, “সামাল সামাল সামাল!”

গল্পের সঙ্গে সঙ্গে, রাতের দিকে ঘনায় সন্ধেও। ফিরতে ফিরতে সিগারেট ধরাই। দু’পাশে মাঠে, ধানক্ষেতে নাগাড়ে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। গ্রামের ভিতর কুয়োতে বালতি পড়ে কোথাও। বাড়ির পুরুষটা ফিরল হয়তো। তারও পিছনে কোথাও শাঁখ বাজে তিনবার। ‘সামাল সামাল সামাল’!

ভাবি, কেই বা কাকে সামলায় আর! কেই বা কার মাথার ভিতর নেভায় জোনাক পোকা? তেমন তেমন জোয়ার লাগে যদি, কোনও কোনও পারও কি আদতে ভাঙতে চায় না কখনোই? চায় না কি, উপচানো জল, ভীষণ ঢেউ, সর্বনাশ, আর বন্যার বারোমাস্যা?

(ক্রমশ)

শুভদীপ চক্রবর্তী
+ posts

পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহর বাটানগরে। নঙ্গী হাই স্কুল সাক্ষী এইসব দিনের। পরবর্তীতে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে পড়ার পর জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে ঘোরাঘুরি গ্রাম বাংলার নানান প্রান্তে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। পরে কিছুদিন জনসংযোগের কাজ; কিছুদিন সাংবাদিকতা।

প্রথম কবিতার বই 'ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া সব ঢেউগুলো' ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে। পরের বছর 'নিবিড়' থেকে ব্যক্তিগত গদ্য সংকলন 'যতটুকু দৃশ্যে ছিল'। শখ বলতে খেলা দেখা, সিনেমা দেখা, কাছে বা দূরে যেখানেই হোক ঘুরে বেড়ানো। বিকেল বেলা স্টিমারে চেপে গঙ্গা পারাপার। আলমারিতে বই গোছানো নিয়ে খিটখিটে আজীবন। না-পারার তালিকা লম্বা ভীষণ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *