অভিমানভূম। এক অপার্থিব লা লা ল্যাণ্ড : দ্বিতীয় পর্ব। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

উপরে অযোধ্যা পাহাড়। সেদিন গ্রামে পৌঁছে দুপুরবেলা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করা গেল, গ্রামের নামটা কী? বাবুরামদা বলল, “আমরা ডাকি পরাণসখা।”

— মানে? তোমাদের ডাকে নয়, আসল নামটা কী?

— মানে আর কিছুই নয় গ, সরকারের খাতায় অন্য একটা নাম আছে বটে। কিন্তু সেই নামটা গ্রামের কেউ ব্যবহার করে না। গ্রামের নিজের মানুষের কথায় হামদের গ্রামের নাম পরাণসখা।

এমন সময় এমনই একটা গ্রামে আসতে হল আমাকে? গ্রামের নাম নাকি পরাণসখা! ‘হায় হাসান, হায় হোসেন’ করে বুক চাপড়ে আমিও একচোট গড়াগড়ি দিয়ে নিই যদি এখন?

গুমোট মন নিয়ে ঘরে চলে যাই। চুপচাপ বসে থাকি মাটির দাওয়ায়। তাকিয়ে দেখি, একটা সূর্য ডুবছে। এত ঘন লাল হতে পারে? লাল নেমে আসছে শালের জঙ্গলের উপর দিয়ে। লাল নেমে আসছে রাস্তায়। লাল মিশে যাচ্ছে লাল ধুলোতে। হাওয়া দিলে সেই লাল ধুলো ঝাপসা করে দিচ্ছে খানিকটা দূরের পথ, এমনই হু হু হাওয়া বিকেলে। অথচ সদ্য রাজনীতিতে লাল ফিকে হয়ে আসছে কেমন! যেদিন গ্রামে পৌঁছেছি, তার দু’একদিন পরেই কালীপুজো। এতদিন পর স্মৃতিতে সঠিক দিনক্ষণ আসে না। তবে কালীপুজোর কথা মনে হতেই একঝাঁক শৈশব-কৈশোর ভেসে গেল ঢেউয়ের মতো। আমার শহরে মফস্বলে আলোর উৎসব, অথচ এখানে সে-সবের খুব একটা নাম গন্ধ নেই। এটা লোহারপাড়া। এর পিছনেই সাঁওতাল গ্রাম। সেখানে কালীপুজোর পরের দিন থেকে শুরু তাদের সব থেকে বড় পরব। পরে জেনেছিলাম, তার নাম ‘সহরায়’। সেবার সহরায় পরব নিয়ে বেশি কিছু জানতে পারিনি। পরে, মানে অনেকদিন পরে বিশদে জানতে পেরেছিলাম এই বিষয়ে। পরের কোনো পর্বে সে গল্প থাকবে, কথা দেওয়া রইল। আপাতত পরাণসখার কথায় ফেরা যাক…

হাট বসেছে শুক্রবারে। তবে, বক্সীগঞ্জে নয়, অযোধ্যা পাহাড়ের উপরে। যতদূর মনে পড়ছে, সেবার কালীপুজো পড়েছিল সম্ভবত শুক্রবারেই। কালীপুজোর দিন হাট বসবে শুনলাম পাহাড়ের উপরের কোনো গ্রামে। তাই ‘হাট বসেছে শুক্রবারে’ গুনগুন করেছিলাম দু-একবার। কিন্তু এখানে হাটে কী হয় ঠিক? বাবুরামদার কাছে আর্জি পেড়ে ফেলা গেল, “আমাকে নিয়ে যাওয়া যায় না?” বাবুরামদা বলল, “যেতে পারি। কিন্তু কারুর সঙ্গে কথাবার্তা বলা চলবে না।” ধুর, কে কার সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছে! সওয়ারি হয়ে পড়লাম বাবুরামদার ভটভটি বাইকের পিছনে।

এইসব জায়গাগুলোতে যতই অর্থনৈতিক সংকট থাকুক না কেন, প্রত্যেক বাড়িতেই একটা বাইক দেখা যাবেই। কারণ, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের আর বিশেষ কোনো ব্যবস্থাই নেই এখানে। একটা দুটো বাস নিশ্চয়ই চলে, কিন্তু তাতে বাদুড়ঝোলা ভিড় দেখলে পরিস্থিতিটা বোঝা যায় সহজেই। পাহাড়ি রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে তাই এই যান্ত্রিক দ্বিচক্রযানেই ভরসা স্থানীয়দের।

বেশ খানিকটা ওঠার পরে হাট। বাইকে বসে দেখছি, সরে সরে যাচ্ছে চারপাশের প্রকৃতি। রং বদলে যাচ্ছে নিমেষের মধ্যেই। দেখছি পাহাড়ের গায়ে গায়ে সাঁওতাল গ্রাম। গ্রামের বাড়িগুলো সেজে উঠেছে রংবেরঙের আলপনায়। অথচ আলপনা বলা যায় কি? বিমূর্ত কিছু রেখা। কী সহজ-সাধারণ; অথচ মনকাড়া। ভিতর থেকে যা আসে, এরা এঁকে ফেলে সেটুকুই। হয়তো সবসময়েই অন্য মাত্রার একটা শিল্প তৈরি হয়ে যায় এরকম আনমনেই। মনমোহন মিত্র বলেছিলেন না, “এমন কোনো আর্ট স্কুল নেই, যা এমন বাইসন আঁকা শেখাতে পারে…”

উঠতে উঠতে, বা উড়তে উড়তে যেখানে এসে থামা গেল, সেটা যেন আক্ষরিক অর্থেই একটা সব পেয়েছির আসর। কোথাও বিক্রি হচ্ছে চাল, ডাল, সবজি। কোথাও গামছা। কোথাও সস্তার শাড়ি। কোথাও চুলের ক্লিপ। রিনরিনে চুড়ি। কোথাও আবার দেশি মদের নেশায় টলমল করছে পা। হাঁড়িয়া-মহুয়ার ঠেক। ভিড় জমেছে সেখানেও। সঙ্গে সিদ্ধ ছোলা; আদা কুচি আর সাদা নুন মিশিয়ে। রায় বাবুর প্রিয় ছবির কথা মাথায় আসে। ‘জানতে হ্যায় কৌন হ্যায় হাম?’ কেউ নই! এই ভিড়ে আমি জাস্ট কেউ নই!

বাবুরামদা কেনাকাটি করল কিছু। চাল-ডাল। লালচে রঙের শাড়ি বৌদির জন্য। বাবুরামদার বউয়ের নাম অঞ্জলি। আরও এক মহিলার নাম অঞ্জলি ছিল। আমার ঠাকুমার। অনেকদিন পরে যার নামে আমাদের বাড়ির সামনে একটা পাথর লাগানো হবে। অবশ্য ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় আসা অঞ্জলির সঙ্গে মানভূমে বেড়ে ওঠা অঞ্জলির কোনো তুলনাই চলে না। মিল শুধু একটা জায়গাতেই, যেভাবে দুই অঞ্জলি সবটুকু দিয়ে আঁকড়ে রেখেছিল সংসার। মাটির দাওয়ায় লেপে দিয়েছিল গোবরের প্রলেপ; সন্ধেবেলায় মঙ্গলপ্রদীপ জ্বেলেছিল তুলসী মঞ্চে। বাবুরামদাকে বললাম আমার কয়েকটা জিনিস কেনার আছে। বলল, “আমাকে বলে দাও, নিয়ে নিচ্ছি। নতুন মানুষ দেখলে বেশি বেশি দর চাইবে।” অযোধ্যা পাহাড়ের হাটের ধুলোমাখা সাদা জমির গামছা নিলাম একটা। আর একজোড়া মাটির কানের দুল। কার জন্য জানি না।

বাইকের পিছনে বসে ফিরতে ফিরতে আলো পড়ে এল অনেকটাই। বাবুরামদার বাইকের গতিও বেড়ে গেল। গতি না বাড়িয়ে উপায় নেই, কারণ রাত যত বাড়ে ততই চারিদিকটা থমথমে হয়ে যায় কেমন। ইলেকট্রিক আলো এই অঞ্চলে দেখিনি তখনও। যদিও আলো চলে এলে সেটা ভাল না খারাপ, বুঝতে পারি না ঠিক। একটা হলুদ বাল্ব বৈ সাদা আলো তো ছিল না আমাদের দরমার বেড়ার বাড়িটাতেও। টিউবলাইট আসার আগে তবু কোনোরকম অভাববোধও হয়নি বিশেষ।

বাড়ি থেকে এখানে আসার আগে বেশ কিছু রঙিন মোমবাতি আর একটা বড় সাদা খাতা নিয়ে এসেছিলাম সঙ্গে। আর চার-পাঁচটা নানা রঙের জেল পেন। এক লাইনও লেখা হয়নি খাতাটায়। কিন্তু সন্ধের পর চারপাশটা অদ্ভুত চুপচাপ হয়ে গেলে কেমন একটা মনখারাপ হত যখন, কালোমাটির দাওয়ায় একটা করে মোমবাতি জ্বেলে দিতাম রঙিন। দমকা হাওয়ায় ধড়ফড় করে নিভে গেলে খানিকক্ষণ পরে, ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে আবার জ্বেলে দিতাম কালো মাটির মেঝেতে আমার চাটাইয়ের পাশে। কুলুঙ্গিতে জ্বলতো ঝুল পড়া হ্যারিকেন একটা।

রাতের খাওয়া-দাওয়া এখানে মিটে যায় আটটার মধ্যেই। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের অভ্যেস। তারপরে গোটা গ্রামে আর কেউ জেগে থাকে কিনা সন্দেহ। এদিকে শহুরে চোখে ঘুম আসে না মাঝরাতের আগে। মোবাইলেও নেটওয়ার্ক বলে কিছু নেই। তাই বন্ধই করে রাখি সারাদিন। মনে মনে ভাবি, নেটওয়ার্ক থেকেই বা কী হবে? যার ফোন আসার কথা ছিল, তার ফোন তো আসবে না আর কোনোদিন।

এসব প্রত্যাশা থেকে যত দূরে সরে আসছি, ততোই ভালো লেগে যাচ্ছে এই মাঠ ঘাট গ্রাম। সবে দু’দিন এসেছি, যদিও কাজের কাজ হয়ে ওঠেনি এখনও। সেটা হল পরের দিন ভোরবেলা। আটটা নাগাদ দরজায় দমাদম ধাক্কা পড়তে লাগল। দরজা খুলে দেখি একটা কম বয়সী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। বয়স তেরো-চোদ্দ হবে। হাঁটুর নীচ অবধি ডুরে একটা শাড়ি গায়ে। ঝাঁজ মিশিয়ে বলল, “তোদের ঘুম বটে! কখন থেকে ধাক্কা দিচ্ছি, ঘুম ভাঙার নামটা নেই রে!” বললাম, “তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না। তোমার নাম কী?” দূরে উঠোন ঝাঁট দিতে দিতে অঞ্জলি বৌদি সরু গলায় বলল, “ওর নাম মুঙ্গী। ওই যে ঢাকের বাড়িতে যাবে, ওদের বাড়ির মেয়ে। ডাকতে এসেছে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। আজকে ওদের ইন্টারভিউ করবে না?”

অগত্যা ডাইরি পেন নিয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। সেই বাড়ির দাওয়ায় বসে ঢাকি পরিবারের মাথাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন গিয়েছিলে ওই দলে?” কোনো উত্তর নেই। বোকা হাসি। আবার জিজ্ঞেস করলাম, “কেউ জোর করেছিল, নাকি নিজেদের ইচ্ছাতেই গিয়েছিলে?” আবার কোনো উত্তর নেই। বুঝলাম জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। কেন জানি না মনে হচ্ছিল, কোনো অদৃশ্য দৃষ্টি সব সময় নজর রেখেছে চারপাশটায়। ঘিরে রেখেছে এই গ্রাম বা এই মানুষগুলোকে। প্রশাসন নাকি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল, এই উত্তর অধরাই থেকে গেল। অথবা সত্যিই অজানা কি উত্তরগুলো? সুমন মনে পড়ে। ‘প্রশ্নগুলো সহজ, আর…’

রাতবিরেতে বেশ কিছু গাড়ি বা বাইকের একসঙ্গে চলাফেরার আওয়াজ পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে বুঝতে পারি তাদের কিছু কিছু ভারী চাকার গাড়িও বটে। জঙ্গলের ভিতরে টিমটিমে কিছু আলো দেখা যায় মাঝেমধ্যে। এটুকু বুঝতে পারি, খুব ভাল রাস্তাঘাট চেনা না হলে ওইভাবে ওই অন্ধকারে যাতায়াত করা অসম্ভব এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। কারণ, দিনের বেলাতেও সেভাবে কাউকে জঙ্গলের পথে গাড়ি চালিয়ে আনাগোনা করতে দেখা যায় না। কিন্তু এই নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করে লাভ নেই বুঝে গেছি। জবাব কোনোদিনই আসবে না। যুতসই একটা উত্তর তবুও পাওয়া গেল ঢাকি পরিবারের বউয়ের থেকে। “দু’পাশ থেকেই মরে ছিলাম বাবু। গেলেও মার; না গেলেও মার। কী করি বল! অগত্যা বর আর ব্যাটাকে শহরে পাঠিয়ে দিই, আর আমরা এখানে গরু ছাগল হাঁস নিয়ে মাঠে-পুকুরে যাই। সেটাই ভাল। রোজ খাটি, রোজ খাই। কেটে যায়। এই তো কয়েকটা দিন! আর কী আছে? শুধু ব্যাটাটা বড় হলে, নকরি পেয়ে গেলে একটা শহরে, আর কোনো চিন্তা নাই। ব্যাটার ব্যাটা দেখেই মরবো, ব্যাস!”

পরবর্তী প্রজন্মের স্পর্শ পাওয়ার আকাঙ্খায় আকুল এইসব পরিবারের সহজ সাধারণ ইচ্ছের সামনে খানিকক্ষণ বসে থাকি নতজানু হয়ে। এদিকে গ্রামে তখন ইতিমধ্যেই পরবের হাওয়া এসে পড়েছে। লোহারপাড়ায় ফিরতে ফিরতে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে সেই মুঙ্গী। একনাগাড়ে অনর্গল কথা বলেই যাচ্ছে। “শহরে আর কে কে আছে? বাপ-মাকে ছেড়ে চলে আল্যি এভাবে? মনখারাপ করে নাই?” ব্যাপারটা একটু অস্বস্তিজনকই বটে। কারণ, সাধারণভাবে এখানকার মেয়েদের আচমকা বাইরের লোকের সামনে এভাবে কথা বলতে দেখিনি এখনও অবধি। আমি কোনো উত্তর না দিয়ে হাঁটতে থাকি। আলগা হাসি ছুঁড়ে দিই শুধু একের পর এক প্রশ্নের উত্তরে। একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মুঙ্গী বলল, “দশটা টাকা দে তো!” “দশ টাকা? কেন, কী করবি? “দে না!” দশটা টাকা এগিয়ে দিতেই একটা বড় চিপসের প্যাকেট কিনে চিবোতে চিবোতে আবার হাঁটতে শুরু করল মুঙ্গী। আমি বললাম, “তোদের গ্রামে আজকে কী পরব আছে রে?” “ও বড় পরব আছে। কাল আসিস, দেখতে পাবি। লাচ হবে, গান হবে। সে অনেক মজা।” জিজ্ঞেস করলাম, “তুই স্কুলে যাস?” মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উত্তর দিল, “হ, মাঝে মাঝে যাই।”

পরেরদিন কালীপুজোর রোশনাই ভুলে বাবুরামদাকে বললাম, “ওই গ্রামে কী পরব আছে, চলো না দেখে আসি?” বাবুরামদা বলল, “আমাদের তো যাওয়া হবে না। ওই মুঙ্গীকে বলে দিচ্ছি। ও তোমাকে নিয়ে যাবে।” আবার সন্ধে হতে না হতেই এসে হাঁকডাক শুরু করল মুঙ্গী। যেতেই হবে। অন্ধকারে উঠতি বালিকার সঙ্গে গ্রামের রাস্তায় পথ হাঁটা। কতটা ঠিক ভুল ব্যাপারটা, বুঝতে পারছি না। সম্পূর্ণ নতুন এলাকা। মেয়েটার পিছনে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম ওদের গ্রামে। ঢাকি পরিবারের পাশে গিয়ে বসলাম। ওদিকে তখন আগুন জ্বলছে। আগুনের পাশে ধামসা মাদল কাঁধে তুলে নিয়েছে গ্রামের যুবকেরা। বয়স্ক একজন মানুষের বাঁশিতে ভেসে যাচ্ছে চরাচর। আগুন ঘিরে হাতে হাত ধরে নেচে চলেছে মেয়েরা। তাতে যেমন বয়স্ক ষাটোর্ধ্ব মহিলাও আছেন, তেমনই স্কুলে পড়া কচিকাঁচারাও আছে দিব্যি। পায়ের তাল একবারও ভুল হচ্ছে না কারুরই। এদের সমস্ত সংস্কৃতিটাই হাতে হাত ধরে। গানের কথা বুঝতে পারছি না একটাও। কিন্তু গানের সুরে দোলা লেগে যাচ্ছে শরীরে।

বসে থেকে থেকে বোধ হচ্ছে, এদের মধ্যে ইনহিবিশন নেই কোনো। কোনো রকম ছোঁয়াছুঁয়ির ভয় নেই। ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে বসে নেশা করছে আগুনের ধারে। শালপাতার উপর ঢেলে দিচ্ছে হাঁড়িয়া বা মহুয়া। নেশায় চোখ লাল হয়ে উঠলে আবার নাচতে শুরু করছে কখন।

সম্পূর্ণ নতুন এই অভিজ্ঞতায় প্রায় ডুবে আছি, এরমধ্যেই হঠাৎ ঢাকি পরিবারের প্রধান সামনে একটা মোড়ানো শালপাতা এগিয়ে দিয়ে বলল, “একটু প্রসাদ!” আমি “কখনও খাইনি” বা “অভ্যেস নেই” এসব বলে কাটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি, কিন্তু তারা নাছোড়বান্দা। অগত্যা শালপাতায় অনেকটা মহুয়া ঢালা হয়ে গেল। তার সঙ্গে এগিয়ে দিল খানিকটা মাংস পিঠা। চালগুঁড়ির ভিতরে মুরগির মাংস ঠুসে শালপাতা চাপা দিয়ে আগুনে ঝলসে নেওয়া একটা গরীব গ্রাম্য আমোদ। তাতে মিশে কাঠের গন্ধ; পোড়া পোড়া স্বাদ। এক ঢোঁকে শালপাতার পুরো তরলটা ঢেলে দিলাম গলায়। একটা জ্বলন্ত কয়লা খণ্ড যেন নেমে গেল মনে হল গলা দিয়ে। মাথাটা ঝনঝন করে উঠল খানিকক্ষণ পর। মিনিট দশ-পনেরো বসে থাকার পরেই টলমল মাথায় বললাম, “আমাকে একটু ঘরে পৌঁছে দাও।” বসে থাকার মতো অবস্থা আর একদমই নেই তখন। আমার অবস্থা দেখে হা হা করে হেসে উঠল বেশ কয়েকজন। ফিরতে ফিরতে জড়ানো গলাতেই ঢাকি পরিবারের প্রধানকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই জিনিস তোমরা খাও কীভাবে ঢকঢক করে?”

পরের দিন সকালে চোখ মেলে বুঝলাম দশটা বেজে গেছে অনেকক্ষণ। নেশা এমনই প্রবল, তার আগে কী হয়েছে কোনো হুঁশ নেই। জামাটাও বদলানোর সুযোগ পাইনি। অবশ্য কীই বা এসে যায়! কেই বা দেখে এখানে? দরজা খুলতে দেখলাম মুঙ্গী বসে আছে দাওয়ায়। বলল, “কাল শরীর খারাপ হয়ে গেছিল?” আমি বললাম, “না, সেরকম কিছু নয়। তোর বাবাই তো পৌঁছে দিয়ে গেল।” আর কোনো কথা না বলে পায়ের নখ দিয়ে ধুলো ঘাঁটছে মুঙ্গী। কেমন যেন মনে হল। জিজ্ঞেস করলাম, “কিছু বলবে?” মাথা নীচু করেই বলল, “না বলেই চলে আইলি?”

অঞ্জলি বৌদির গলা ভেসে এসে বাঁচিয়ে দিল আমায়। আজ বিকেলে এই গ্রামেও নাচ-গান হবে। আমাকে থাকতে হবে। আমি আর কোথায় যাব! বিকেল তিনটের পর থেকে গ্রামের পুরুষ-মহিলারা জড়ো হল বড় নিকানো উঠোনে। মৃদু মৃদু বোল উঠছে মাদলে। গুনগুন করে গান শুরু করে দিয়েছে গ্রামের মেয়েরা। কখনও অবুঝ হাসিঠাট্টায় গড়িয়ে পড়ছে একে অন্যের গায়ে। গানের কোনো শেষ নেই; গানের কোনো শুরুও নেই যেন। যে যেখান থেকে পারে ধরছে; যে যখন খুশি যোগ দিচ্ছে। যার ইচ্ছে করছে না, সে দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে ঘুরে আসছে আশপাশ থেকে। কখনও কখনও কেউ কেউ বড় কেন্দু পাতায় ঠাসা কড়া তামাকের চুট্টা টেনে নিচ্ছে নাগাড়ে। চুট্টাকে একটু বড় আকারের বিড়ি বলাই যায়। এতেও নেশা হয় বেশ ভালই।

 

একটু দূরত্বে মাটির উপর বসে চোখ চেয়ে দেখে যাচ্ছি এইসব জীবনযাত্রা আর ভাবছি একবারও কেন মনে পড়ছে না আমার বাড়ির কথা? শুধু মনে পড়ছে গঙ্গার ধারের কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোর কথা, যাদের মাঝে মাঝে রাধাচূড়া গাছ ছিল অনেকগুলো। আর সন্ধে নামলে শিবমন্দির থেকে ভেসে আসা বড় ঘন্টার আওয়াজ। এরকমই অন্যমনস্ক হয়ে আছি, এমন সময় আনমনা ভাব কাটল অঞ্জলি বৌদির ডাকে। “এবার আপনি একটা গান করুন বটে!” আমি আর গান? বললাম যে, গান-টান জানি না আমি। করতেও পারি না। বরং তোমরাই করো। কিন্তু জোরজবরদস্তি কমার নাম নেই, গাইতেই হবে। রীতিমত নাছোড়বান্দা গ্রামের লোকেরা… কারুর কারুর মুখ দেখে মনে হচ্ছে, বেশ একটা মজা হল… অগত্যা, আমিও ধরলাম কবীর সুমন।

সুর চায় তোমাকে, আমাকেও চাই তার
দুজনের মনের রং মিলে যাক দুনিয়ার
সাড়া দাও
সাড়া দাও সাড়া দাও সাড়া দাও
উদাসীন থেকো না সাড়া দাও
ফড়িংয়ের ডানাতেও এ জীবন দেয় ডাক
বেঁচে থাক সব্বাই হাতে হাত রাখা থাক
সাড়া দাও

গানটা থামতে বাবুরামদা বলল, “কী কথা বললে কিছুই বুঝতে পারলাম না, কিন্তু ভালো লাগল শুনে।” পরের দিন ফেরার পালা, গ্রামটা ঘুরে দেখা হয়নি সেইভাবে। নিয়ম নেই! অঞ্চলটার ভূগোল বলতে, পিছনে সাঁওতাল গ্রাম। সামনে রাস্তা। রাস্তার ওপাশে জঙ্গল। রাস্তা উঠে গেছে অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে। গ্রামের ভিতরে একটা হরি মন্দির। তার খানিকটা পিছনে গেলেই আবার সাঁওতালদের অধিষ্ঠিত দেবতা মারাংবুরুর থান, যেখানে নিত্য পুজো হয় আদিম দেবতার। সাঁওতালদের আরও বেশ কিছু গল্প শোনা গিয়েছিল। সেইসব গল্পের বিষয়ে আবার জানতে পেরেছিলাম অনেকদিন পরে ছায়া ছায়া কোনো গ্রামে বসে।

আপাতত ফেরার পালা। আবার সেই মনখারাপের দম বন্ধ হয়ে আসা শহর। সকালে বেরোতে হবে ন’টার মধ্যে। সময় নিয়ে বেরনোই ভাল বলল সবাই। বাবুরামদার বাইকে কিছুটা যাওয়ার পর আবার উঠে যেতে হবে সেই জিপে। দুপুরবেলায় ট্রেন। ট্রেনটার যে কী নাম ছিল মনে নেই আজ আর। হাওড়া পৌঁছতে পৌঁছতে রাত। ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে যখন বেরিয়ে এলাম ঘরটা থেকে, অঞ্জলি বৌদি শালপাতায় মুড়ে একটা কাগজের ঠোঙায় খাবার দিয়ে দিল কিছু। “ট্রেনে খিদা লাগলে খেয়ে নিও। কয়টা পিঠা দিয়াছি।” অঞ্জলি বৌদির দেওয়া পিঠে ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে নিলাম। বাবুরামদার বাইকে বসতে যাব, হঠাৎ সামনে মুঙ্গী।

— আমায় কিছু দিয়ে গেলি না তো!

— কী দেব বলতো তোকে?

দেখলাম রঙিন মোমবাতির বেশ কয়েকটা বাকি আছে এখনও। গোটা প্যাকেটটা ব্যাগ থেকে বের করে ওর হাতে দিয়ে দিলাম। আর, বড় সাদা খাতাটাও বের করে এগিয়ে দিলাম, যার একটা পাতাতেও কিছু লেখা হয়নি। মুঙ্গী ধুলো ঘাঁটছে পা দিয়ে। বাবুরামদার বাইক স্টার্ট হতেই লাল ধুলো উড়ে গেল খানিকটা। অঞ্জলি বৌদি হাত নাড়ছে, “আর নিশ্চই কখনও আসবে না? যদি কখনও মনে পড়ে, একবার ঘুরে যেও। ওপাশে আরও অনেক দেখার জিনিস আছে। পরেরবার নিয়া যাবো।” আমি বলছি, “হ্যাঁ, আসবো অবশ্যই…”

তখনও সত্যিই জানি না, আরও অনেকবার এই প্রদেশে আসা হলেও এই গ্রামকে আমি আর খুঁজে পাব‌ো না কখনও। পরবর্তী সময়ে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট অফিসে কিছু কাজ করার সময়েও তন্নতন্ন করে খুঁজেছি ‘পরাণসখা’ নামের গ্রাম। পুরুলিয়ারই অনেক স্থানীয় সহকর্মীকেও জিজ্ঞেস করেছি। কেউ বলতে পারেনি, যে গ্রামের ছদ্মনাম ‘পরাণসখা’, তার আসল নাম কী। একটা অদ্ভুত ইউটোপিয়া হয়েই থেকে গেছে এই গোটা সময়টা। একটা গোটা গ্রাম অদ্ভুত একটা ‘লা লা ল্যান্ড’ হয়ে জুড়ে গেছে ঝাপসা স্মৃতিতে। যে গ্রাম থেকে ফিরে আসার সময়, লাল ধুলো ওড়ানো বাইকের পিছনে বসে রোগাসোগা আমিটা শেষ বারের মতো তাকিয়ে ছিলাম পিছনে। ক্যাননের ওয়ান শটে যে ছবি তোলা হয়নি, হয়তো শেষবারের মতো ধরতে চেয়েছিলাম সেই পুরো ক্যানভাস।

দেখেছিলাম, সবকিছু কেমন ঢাকা পড়ে যাচ্ছে আশ্চর্য ধুলোয়। আর তার আড়াল দিয়ে খুব অদ্ভুত দেখাচ্ছে দুটো চোখ।

এ কী! মুঙ্গী কাঁদছে কেন?

(ক্রমশ)

 

ঋণ:

শ্রীঅনিলবরণ ঘোষ
শ্রীনন্দদুলাল আচার্য
শ্রীধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে
শ্রীরামদাস টুডু রেস্কা
আর পুরুলিয়ার সেই সমস্ত মানুষেরা, যাদের নাম এখানে আছে বা নেই।

শুভদীপ চক্রবর্তী
+ posts

পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহর বাটানগরে। নঙ্গী হাই স্কুল সাক্ষী এইসব দিনের। পরবর্তীতে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে পড়ার পর জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে ঘোরাঘুরি গ্রাম বাংলার নানান প্রান্তে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। পরে কিছুদিন জনসংযোগের কাজ; কিছুদিন সাংবাদিকতা।

প্রথম কবিতার বই 'ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া সব ঢেউগুলো' ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে। পরের বছর 'নিবিড়' থেকে ব্যক্তিগত গদ্য সংকলন 'যতটুকু দৃশ্যে ছিল'। শখ বলতে খেলা দেখা, সিনেমা দেখা, কাছে বা দূরে যেখানেই হোক ঘুরে বেড়ানো। বিকেল বেলা স্টিমারে চেপে গঙ্গা পারাপার। আলমারিতে বই গোছানো নিয়ে খিটখিটে আজীবন। না-পারার তালিকা লম্বা ভীষণ...

1 thought on “অভিমানভূম। এক অপার্থিব লা লা ল্যাণ্ড : দ্বিতীয় পর্ব। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

  1. Bah. Osadharon. Kichu Kichu lekha aache jaa pore choop kore bhaabte bhaalo laage, Kichu bolar thaakena, eta se dhoroner lekha

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *