অভিমানভূম। পর্ব ১৬। শুধুই দহন নয়। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

‘হেরো অরণ্য ওই, হোথা শৃঙ্খলা কই–

 

দক্ষিনের পর্বত না হলেও, মানভূমের পাহাড়ি ঝোড়াগুলোও কম পাগল নয়! আর সেসবের সামনে দাঁড়ালেই মনে হয়, নিয়ম কখনও শিকল হয়ে গেলেই, সেটা যতটা না ভয়ের, তার থেকেও বেশি একঘেয়ে। বোরিং। যেমন, উৎসবের এই এত এত আঙ্গিক, তার পিছনে চলমান ইতিহাস, সেসব সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে শুধুই কেমন একটা দেখনদারি নিয়ে থেকে গেল শহুরে উৎসবগুলো। আনন্দগুলো আটকে গেল গ্লাসে আর চিৎকারে অকারণ। ভীষণ চাকচিক্য নিয়েও, থেকে গেল কেমন মধ্যবিত্ত হয়েই। অথচ ভিন্নমতকে শোনার বা মেনে নেওয়ার জন্য যে ধৈর্য বা মনটা, সেটা যেন এসবের ভিড়ে হাত ছাড়িয়ে হারিয়ে গেল কোথায়। অসুরেরও যে পুজো হতে পারে, সেটা সামনে আনার চেষ্টা করতেই তাই একরাশ অনভিপ্রেত অশান্তি; ফোনকল। এসব থেকে তাই আবার পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে গভীর রাতের হ্যাজাক এবং গ্যাস বাতির সাদা আলোর মধ্যে ধুলোওড়া মাঠে। শুধুই ধর্মকথা বা বীরগাথা নয়, বরং যে উদযাপন তার বুকের ভিতর মিশিয়ে নিতে শিখে যায় জীবনের ছোট বা বড় আনন্দ দুঃখ আশা এবং নিরাশার আলো-ছায়াগুলোকেও।

 

এদিকে পুজোর আগে-পরে পুরুলিয়া যেতে হলেই অন্য একটা অশান্তি উড়ে এসে জুড়ে বসেছে শেষ দু-এক বছর ধরে। অবশ্য অশান্তি বললেও, তার কার্যকারণটা পছন্দই। বিরক্তি বাড়ে শুধু সঙ্গের লাগেজের বেড়ে যাওয়া ওজন দেখে।

 

দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ আমার মা আর বাইরে বেরোতে পারে না বলে, নিজের শাড়িগুলো পাঠিয়ে দেয় পুরুলিয়ায়। নিজের শাড়ির পরেও, আমার অন্য মাসিদের থেকেও শাড়ি-কাপড় জোগাড় করে করে এনে তাতে রেডিও স্টেশনের একেকজনের নাম লিখে লিখে ভাঁজ করে দিলে ব্যাগে, আমার দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় ডেলিভারি ম্যানের। ছেলেদের জন্যেও, যতদূর মনে পড়ছে, একবার হয়তো পাঠিয়েছিল কিছু। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয়েছিল একাধিকবার।

 

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপারটা হল, নিজের হাতে কখনোই সেগুলো দিয়ে ওঠা যায়নি সেগুলো ওদেরকে। ব্যাগটা নিয়ে গিয়ে রেডিও ষ্টেশনে রেখে দিতাম, আর মিলি, শ্রীমন্তিদি কিংবা শ্যামলী বৌদির মধ্যে কাউকে বলে দিতাম, “মা কিছু পাঠিয়েছেন তোমাদের জন্য, একটু দেখে নিও।” নাম লেখা থাকায়, কাউকেই বাছাবাছি কিছু করতে হত না। স্নেহলতাই একবার সম্ভবত জিজ্ঞেস করেছিল, “জেঠিমা এত সুন্দর করে বেছে বেছে পছন্দ করে দিল কী করে?” ঠিকই তো! মনে পড়ল, এখানে আসার আগে একবার ছবি দেখাতে বলেছিল সকলের। আর ভাললাগার বিষয়টা ছিল, পরের দিন সমস্ত মেয়েরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে মায়ের দেওয়া শাড়িগুলোই পরে এল স্টুডিওতে। হাসতে হাসতে বলল, তোমার মাকে একটা ফোনে ভিডিও করে দেখিয়ে দাও কেমন লাগছে! কী জানি, এতটা প্রাণখোলা ভাবে কোনও কিছু গ্রহণ করাও যে এতটাই সহজ, এদের মধ্যে না থাকলে সেটা এভাবে কখনও শেখা হয়ে উঠত কিনা আর?

 

এদিকে পুরুলিয়ার গ্রামে ঘোরাফেরার মাঝেই কাজে-অকাজে কতগুলো দিন পেরিয়ে গেছে হিসেবে-বেহিসেবে। উৎসবের ছুটিছাটায় শহরে বা মফস্বলে না ফিরতে পারলেও অসুবিধা হয় না এখন আর। অন্য একটা ঘর-পরিবার বসে গিয়েছে সেখানেও। স্থানীয় রাজনীতি, সংস্কার, মাঝে মাঝে ফিল্ড ওয়ার্কে গিয়ে খুব ক্লান্তি চেপে ধরলে কোনও টিলার উপর বসে পড়া একা একাই। সিগারেট ধরিয়ে দেখা ডুবে যাওয়া সূর্য। এই ডুবে যাওয়া সূর্যে কেমন নেশা লেগে যাচ্ছে যেন! কেউ একজন সঙ্গে থাকলে যে কোনও গ্রামেই চলে যেতে পারি যে কোনও সময়। অঞ্জনদা মাঝেমাঝে মজা করে বলে, তোমাকে পরের বার এখান থেকে পঞ্চায়েত ভোটে দাঁড় করিয়ে দেব! সেই সঙ্গে সঙ্গে জাঁকিয়ে ধরেছে মাথা ব্যথা, সাইনাস ইত্যাদি হাবিজাবি। অসহ্য কাজের চাপের মাঝে পাইস হোটেলে খাবার পর মুখ ধুতে গিয়ে হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করা গেল জুলফির পাশে একটা সাদা রেখাও! অগত্যা, দীর্ঘশ্বাস। এমন হুহু করে পার হয় সময়!

 

পার হয়ে যায় অক্টোবরও। ‘একদিন কার্তিকের নীল কুয়াশায়/যখন ঝরিছে ধান বাংলার ক্ষেতে-ক্ষেতে ম্লান চোখ বুজে’, এসে নামি পুরুলিয়াতে আবার। আবার একটা কালীপুজোর দিন। ঝলকে ফিরে আসে সেই কোন কালে প্রথমবার এই মানভূমিতে পা রাখার স্মৃতি, এই দিনেই। গ্রীষ্মের দহন নেই; শীতের জড়তা নেই। সন্ধেগুলোর তাড়াহুড়ো লেগে যায় রাত্রির কোলে মাথা লুকানোর জন্য। কলকাতা বসে এই মানভূমের প্রকৃতির আঁচ করা খুব মুশকিল। ছটা ঋতুই ভীষণ স্পষ্ট যেখানে। ভীষণ স্পষ্ট পাতাঝড়ার মরশুম।

 

পাতা কুড়াবার দিন ঘাসে ঘাসে—কুড়ুনির মুখে তাই নাই কোনো কথা,

ধানের সোনার কাজ ফুরায়েছে—জীবনেরে জেনেছে সে—কুয়াশায় খালি

তাই তার ঘুম পায়—ক্ষেত ছেড়ে দিয়ে যাবে এখনি সে—ক্ষেতের ভিতর

 

এবার আর মলয়দাকে ডাকা হয়নি গাড়ি নিয়ে আসার জন্য। সঙ্গে লাগেজ কম। আগেরবারে রেখে যাওয়া হয়েছিল অনেককিছুই। তবু পুরুলিয়া স্টেশনে নেমে ভোরের বাসে পঞ্চান্ন কিলোমিটার দূরের গ্রামে পৌঁছতে পৌঁছতে, ঠান্ডা হাওয়াটা বশে নিয়ে নেয় মাথা-কপাল সবটাই। অগত্যা বিকেল পেরোতে না পেরোতেই, বেশ কিছুদিন পর আবার সেই জঘন্য মাথাব্যথাটা কমিউনিটি রেডিও স্টেশন থেকে বের করে দিয়ে ঘরের পথ ধরিয়ে দেয় তাড়াতাড়ি। ফেরার পথে মাথা ব্যথার অ্যান্টিডোট নিতে দাঁড়াতেই হয় চা’য়ের দোকানে।

 

হঠাৎ কোথাথেকে ইমন এসে হাজির। প্রায় আমারই সমবয়সী অথবা দু-এক বছরের এদিক-ওদিক ইমন, যার ভাল নাম ইমনকল্যান, যার সঙ্গে কাজের পর মাঝেমধ্যে আমরা মাঠের পাথরের উপর ঠান্ডা বোতল নিয়ে বসি এবং যে ওই প্রত্যন্ত গ্রামের অতি সাধারণ একটা রেডিও স্টুডিয়োতে বসে অদ্ভুত অদ্ভুত প্রোডাকশন করে চমকে দেয়। ইমনের অদ্ভুত ডায়লগ ছিল একটা: “শুনো, তুমি আমারই বয়সের হবে। তাও তোমাকে দাদা বলি। কিন্তু কাজের পর মাঝেমাঝে তোমাকে নাম ধরে ডাকব…” এইসব কালজয়ী ডায়লগের পর ‘পোকার ফেস’ করে স্লো ক্ল্যাপ দেওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। কিন্তু তখন এসব কায়দা কোথায়! স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে প্রায় ‘আগুন গরম’ চা গলায় ঢেলেও যখন মাথা ব্যথা কমেনি, বুঝতে পারছি আজকে ভোগান্তি চরমে, তখনই ইমন বাইক নিয়ে একদম গা ঘেঁষে, “ঘর চললে?”

 

এমনই মাথা ধরেছে, দশ-বারো মিনিটের হাঁটা পথকেই মনে হচ্ছিল দশ-বারো মাইল বলে। ফেরেস্তা ইমনের বাইকে উঠে পড়া গেল। বললাম, “আগে একটু বাজারের দিকে চলো তো। কয়েকটা ওষুধ নেওয়ার আছে…”

 

দু’পাশে ছোট ছোট চাষ জমি, নিচু পুকুর, ছোট ছোট ঘর-বাড়ি। মাটির দেওয়াল। খোলা মাঠের মধ্যে বাৎসরিক যাত্রাপালার জন্য বাঁধানো স্টেজ। হাওয়ার ঝাপটা এড়াতে অনুরোধ, “একটু আস্তে চালিও!” অনুরোধের আর্জি মান্যতা পাওয়ায় আস্তেই উড়ছে দু’চাকা! বাইকের পিছনে খেয়াল করে ডাক দিচ্ছে কেউ কেউ, “আজ আসা হইল্য?” মাথা নেড়ে যাচ্ছি, তখনই ইমন বলল, “এবার একটু ইস্পিড নিই, নাকি?” ঠিক তখনই হঠাৎ একটা পুকুরের পাড়ে নেমে যাওয়া ঢালের ঘাস জমিতে ওদের সঙ্গে দেখা। এক ঝাঁক কচিকাঁচা। কিছু একটা কাঠামো তৈরি করেছে তারা। উপাদান বলতে কাঠ, খড়, নারকোল বা সুপারি পাতা। কাঠামোর আবার তিনটে মোট মাথা! বেশ কোলাহল। কিন্তু উন্নয়ন বা প্রযুক্তির গতিবেগ ছোটদের আনন্দের উ‌‌ৎসগুলো কবেই বা ধরতে পেরেছে? অগত্যা পুনরায় অনুরোধ করে থামানো গেল বাইক। বাইকের থেকে নেমে আবার কিছুটা হেঁটে গেলাম পিছনের দিকে।

 

কচিকাচাদের আয়োজনের উপাদানে কমতি হলেও, উ‌‌ৎসাহে ভাঁটা নেই যদিও। খানিক গল্প করা গেল।

 

— এটা কী বঠে রে?

— রাবণ!

— সেকি! তা রাবণের বাকি মাথাগুলো ক‌ই?

— ছাড়াইন গ্যাছে।

— হ্যাঁ?

— বাকি মাথা গুলহ্ ঘুচাইন গ্যাছে গ!

— ওহ হো! তা, এটা কী হবে এরপর?

— আগুন দিব! আর পটকা জ্বালাব! ছ’টা বাইজলে চলি আসবে।

 

কথা বলতে বলতে একবারও চোখ তুলে তাকানোর সময় পায় না তারা। নিজেদের কাজে ব্যস্ততা ভীষণ। অনুভব করি, জীবনের এইসব ছোট ছোট আবিষ্কারের মধ্যে অনাবিল আনন্দ আছে। প্রচণ্ড বেঁচে থাকা আছে। আর চারপাশের এই ভীষণ ধর্ম নিয়ে রাজনীতি বা অসহিষ্ণুতার মধ্যেও শিখিয়ে দেওয়া আছে যে, জীবনে আসলে সত্যিই সারল্যের থেকে বেশি আর কিছুরই প্রয়োজন নেই। যেমন, রাবণেরও আর দশটা মাথার প্রয়োজন হচ্ছে না; এই তিনটে মাথাতেই কাজ চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছে বেশ।

 

এই টুকরো টুকরো মুহূর্তের হাত ধরে ছেলেবেলায় ফিরে যেতে ইচ্ছা করে খুব। কয়েক মুহূর্ত বসে থাকতে ইচ্ছা করে নিজের শৈশবের পাশে। মনে পড়ে বুড়ির ঘর। কাল আমাদের দোল। পোড়া আলুর রসনা। একটু বেশি টক আর ঝালে আওয়াজ ওঠা টাকরায়। আর মনে আসে প্রিয় গান, ‘মন সে রাবণ যো নিকালে, রাম উসকে মন মে হ্যায়’…

 

উঠে পড়তে পড়তে বোধ করি, মাথার হাতুড়ি পেটা শ্রমিকগুলো জলপানের বিরতিতে গিয়েছে বোধহয়!

 

তখনই রাস্তায় দেখা কাজের বাইরে ওখানে আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী ক্লাস ইলেভেনের সুব্রতর সঙ্গে, যার ডাক নাম ‘ভ্যাবলা’! পেটানো চেহারায় ফুটবল নাচাতে নাচাতে ফিরছে বন্ধুদের সঙ্গে। দেখা হতেই চিৎকার, ‘ভাল দিনে আসছ! এ তো ছোট রাবণ! রাতে যাব, বড় রাবণ পোড়া দেখত্যে…’

— কী বলিস! বড় রাবন পোড়া? সেটা আবার কোথায়?

— বুধপুরের নদীতে হে! আমি আসছি দাঁড়াও একটু পরেই…

চায়ের দোকানে বসে যেটা জানতে পারলাম, সেটা হল, মানভূম অঞ্চলের বেশ কিছু জায়গায় কালীপুজোর রাতে রাবণ পোড়ানোর চল আছে। সাধারণত মানভূমের বুক চিরে এগিয়ে চলা পাথুরে নদীগুলোর উপরেই রাবণের মূর্তি দাঁড় করিয়ে আগুন ছোঁড়া হয় তার মধ্যে। রাবণের শরীরের মধ্যে ভরা থাকে নানা রকম আতসবাজি। দুষ্টের দমনের এই পালা কখন যেন হয়ে ওঠে আতসবাজির প্রদর্শনী নিরন্তর।

 

“দেখতেই হবে তো তাহলে!” ভ্যাবলাকে বলি দোকানে বসেই। সেখানে আরও কী কী হয়, সেগুলোও এবারে বিস্তারিত বলতে থাকে চায়ের দোকানের বাকিরা। “তুমি তাড়াতাড়ি খেয়ে নিও। ন’টার সময় আসবো আমি।” হাতের ভাবড়া ভাজা শেষ করে উধাও হয়ে যায় ভ্যাবলা।

 

সন্ধে সাড়ে আটটা নাগাদ ফিরে আসে আবার একগাদা মনখারাপ নিয়ে।

— তুমি যেতে পারবে না।

— মানে? কেন?

— সাইকেল নেই, আর বাইকে নিয়ে যাওয়ারও কাউকে পেলাম না। অতদূর হেঁটে যেতে পারবে না তুমি।

এ বলে কী! জিজ্ঞেস করলাম, “বুধপুর তো? কতদূর? পাঁচ-সাত কিলোমিটার?” উত্তর এল, “হ্যাঁ।” জ্যাকেট চাপিয়ে, মাথা ঢেকে বললাম, “চ!”

 

বাইরে বেরিয়ে সে এক আশ্চর্য দৃশ্য! ঠান্ডা বেশ। কিন্তু তার মধ্যেই পিলপিল করছে লোক রাস্তায়। দূরের দূরের গ্রাম থেকে গাড়ি ভাড়া করে আসছে লোকজন। যাওয়ার পথে দেখলাম মুসলিম ওসির হাতে তৈরি চরণপাহাড়ি কালীমন্দিরে থিকথিকে ভিড়। রাস্তায় মাঝেমাঝেই হ্যালোজেনের বাতি। তার মাঝের রাস্তায় আন্ধার। সেইসব আঁধার রহস্যময় করে আরও ঝকমকে জামাকাপড় পরে খিলখিল করতে করতে চলেছে বয়সে একটু বড় মেয়েদের দল। আমি আর ভ্যাবলাও হাঁটছি হনহন করে। ঠান্ডা কেটে শরীরের ভিতর ভাপ জাগে বেশ। একটা সময় নামিয়ে দিতে হয় জ্যাকেটের চেন। রাস্তায় ভিড় সামলাচ্ছে পুলিশ। মাঝে মাঝে আলোর উল্টোদিক থেকে কেউ এসে ডাক দিয়ে যাচ্ছে, “দাদা, রাবন দেখত্যে নাকি?” কে যে ডাকছে বোঝা যায় না কিছুই। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’ করে এগিয়ে যাই। ভ্যাবলা বেশ বিখ্যাত! মাঝেমাঝে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা হলে দাঁড়িয়ে পড়ে। একটু জিরিয়ে নিই তখন। তারপর হাঁটা শুরু আবার। দু’একবার দেখতে পাই মলয়দাকে। ভরপুর ‘ট্রিপ’ মারছে আজকে। দেখতে পেয়েও চেনার সময় নেই!

 

বুধপুরের মোড়ে পৌছতেই ভিড় বেড়ে যায় আচমকা অনেকটাই। সবাই চলেছে নদীর দিকে। নদীর পাড়ের বালিতে নানা রকম জিনিসের পসরা। ছোটখাট মেলা বসে গেছে যেন। পাথুরে নদীর বুকে কাতারে কাতারে লোক। দেশি নেশার গন্ধ। টলোমল করে এগিয়ে আসছে অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে কেউ কেউ। নদীর বুকে বিশাল একটা মূর্তি দাঁড় করানো। তা রাবণ পোড়াই দেখতে যখন এসেছি, তখন ওইটা রাবণই, মেনে নিতে অসুবিধা কোথায়? মজাই লাগে বেশ। এখানে যদিও রাবণের মাথা দশটাই রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক হবে কী? ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ একটা শোরগোল। দেখি হাতে একটা তীরের মাথায় আগুন নিয়ে ছুঁড়ে মারে কেউ রাবণের দিকে। তারপর কেউ কখনও নীচ থেকে রংমশাল ছুঁড়ছে। কেউ বা আবার অন্য কোনও ভাবে আগুন দিচ্ছে রাবনের গায়ে। আর সেই রাগেই মনে হয় রাবণের শরীরে বাঁধা একেকটা আতসবাজি ছিটকে ছিটকে যাচ্ছে এদিক-ওদিক! আর বারুদ তো বেপরোয়া বরাবরই…

 

আর বেপরোয়া বলেই, ব্যাপারটা একটু হলেও বিপজ্জনক। কিন্তু সেসব নিয়ে বিশেষ কারুর মাথা ব্যাথা আছে বলে মনে হল না। আসলে, এরা হয়তো এতটাই মিশে এইসব প্রকৃতির সঙ্গে, এদের মধ্যে তাই ভয় বা বিপদ সংক্রান্ত অনুভূতিও অত্যন্ত প্রখর। রাবণের শরীর থেকে ফটফট শব্দ আসা শুরু হতেই, আনন্দে হইহই করে উঠছে সবাই। কোথাও কোথাও বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে মায়ের কোলেই। কাঁসাইয়ের বালিতে একটা কাঁথা পেতে সেখানেই শুইয়ে দিয়েছে শিশুকে তার মা। প্রকৃতির কোলে ঘুমিয়েও থাকে তারা। এত কোলাহলেও ঘুম ভাঙে না!

 

এইসব ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ালেই একটা দেশের কথা মনে হয়। যে দেশটাকে হয়তো চেনা হয়নি কখনও সেইভাবে। অন্যরকম ভাবে তাই চিনতে থাকি দেশ। চিনতে থাকি দেশের মানুষ। উৎসবকে চিনতে শিখি। রাতের আলো-অন্ধকারে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে কাঁসাই নদীর মধ্যে দাঁড়িয়ে রাবনকে জ্বালিয়ে ফেলা উৎসব দেখার পরে আবার সেই পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে ফেরা। মনে হয়, যতদিন এক হাঁটাটুকু আছে, ততদিনই আসলে আছে এই দেখাটুকুও। ভ্যাবলা বলে, “জল খেতে হবে।” আমি বলি দোকান দেখলেই দাঁড় করাতে। তবু ক্লান্তি লাগে না। চরণপাহাড়ির কাছে এসেই দোকান খোলা পাওয়া যায় একটা। আর একটু হাঁটলেই ঘর। ঘরের সামনে এসে ভগবানদার দোকানটার বেঞ্চিতে বসি। জ্যাকেট খুলে ফেলতে হয়। কপালে ঘাম জমেছে বিজবিজ করে। অন্ধকারে বসে থাকতে থাকতে উত্তাপ কমে আসে শরীরের। সামনের রাস্তা দিয়ে অগুনতি লোক ফিরছে তখনও তাদের একচালা ঘরের দিকে। সেইসব ঘরের ভিতর অপার সংসার। অগুনতি হইচই। অগুনতি কোলাহল। অনন্ত পথ হাঁটা।

 

আর সেই সমস্ত ছায়া-ছায়া মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয়, এই সব হেঁটে চলাই তো চিরন্তন হতে পারত আমার। এই সব হেঁটে চলা তো, চিরন্তন হতে পারত আমাদেরও?

 

অথচ সেভাবে জানাটাই হয়ে উঠল কই? এই যে পার হয়ে গেল কার্তিক মাসের অমাবস্যা, এই যে রাত পোহালেই আদিবাসী সাঁওতালদের ‘সহরায় পরব’, সেটা না হলে মনে পড়ল না কেন এতক্ষণ? মানভূমের অভিমান হয়? মাথার মধ্যে গুনগুন করে ওঠে কেউ, “আর ওই গল্পটা?” ওয়ার্ড ডক্ সেভ করতে করতে ম্লান হেসে ফেলি আমিও। কথা দিই, “পরের দিন, পরের দিন, পরের দিন।”

(ক্রমশ)

শুভদীপ চক্রবর্তী
+ posts

পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহর বাটানগরে। নঙ্গী হাই স্কুল সাক্ষী এইসব দিনের। পরবর্তীতে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে পড়ার পর জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে ঘোরাঘুরি গ্রাম বাংলার নানান প্রান্তে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। পরে কিছুদিন জনসংযোগের কাজ; কিছুদিন সাংবাদিকতা।

প্রথম কবিতার বই 'ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া সব ঢেউগুলো' ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে। পরের বছর 'নিবিড়' থেকে ব্যক্তিগত গদ্য সংকলন 'যতটুকু দৃশ্যে ছিল'। শখ বলতে খেলা দেখা, সিনেমা দেখা, কাছে বা দূরে যেখানেই হোক ঘুরে বেড়ানো। বিকেল বেলা স্টিমারে চেপে গঙ্গা পারাপার। আলমারিতে বই গোছানো নিয়ে খিটখিটে আজীবন। না-পারার তালিকা লম্বা ভীষণ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *