অভিমানভূম। পর্ব ১৫। বিস্মৃত বিষাদের সাক্ষ্য। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

“শুকতারা একটিই হয়, বহুকাল এই কথা বিশ্বাস করেছি। ওটা ভুল।”

                        (শুকতারাদের জন্য কথা : জয় গোস্বামী)

 

ভুলে যাওয়ার ব্যকরণ হয় কোনও? বানান ভুল হয়? বিধান হয় ণত্ব বা ষত্বের? কিংবা ইতিহাস? অথচ, ভুলেই যদি যাওয়া হয়, তবে কেমন করেই বা কেউ খুঁড়ে আনবে সেই পুরাতন সমাধির ফসিল? সুপ্রাচীন মুদ্রা যেমন আচমকা আয়না হয়ে অতীত মেলে ধরে চোখের সামনে, তেমনই কি তার উল্টো পিঠের খোদাই করা কোনও গল্পের আলাদা কোনও কোণ? আর সেই কোণ ঘেঁষে আলো এসে পড়লে, এই আশ্চর্য হতে ভুলে যাওয়া দিনেও ঝলসে ওঠে চোখ। শেষ আশ্বিনের মেঘে আচমকা স্থানু করে দেওয়া বৃষ্টির মতো তার অভিঘাতে, গোটা একটা দিনের শেষে চুপচাপ পেয়ে বসে অনেকক্ষণ। স্থির পুকুরের জলে ঢিল পড়ার মতো ওঠে ঢেউ। রহস্যময় জগৎ যেন হঠাৎ এক বিকালে চোখ টিপে ইয়ার্কি মেরে যায় খানিক…

 

কমিউনিটি রেডিও স্টেশনের অনুষ্ঠান এখন যেমন চ্যানেল টিউন করলেই শোনা যায় মোবাইলের বা ট্রানজিস্টার রেডিওতে, অনেকটা সময় ধরেই সেরকম ছিল না ব্যাপারটা। বস্তুত ‘অনএয়ার ব্রডকাস্টিং’ শুরু হয়েছিল বেশ খানিকটা পরেই, তার কারণ এটার জন্য নির্দিষ্ট কিছু টেকনোলজি এবং সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ টালবাহানার পর একসময় মিলল সেই পারমিশন। সোজা হয়ে দাঁড়ালো ত্রিশ ফুট লম্বা রেডিও ট্রান্সমিটার টাওয়ার। রেডিও স্টেশন থেকে সাত কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে শোনা যেতে লাগলো গ্রামীন কমিউনিটি রেডিওর সমস্ত অনুষ্ঠান।

 

কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহারেও অশান্তির কমতি কিছু নেই। ঝড়ঝাপটায় ট্রান্সমিটারের মুখ ঘুরে যায় মাঝেমধ্যেই। তার ফলে কিছু কিছু গ্রামে অনুষ্ঠান শুনতে যে সমস্যা হচ্ছে, সে অভিযোগ ছিল কয়েকদিন ধরেই। তাছাড়াও সাত কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে সমস্ত গ্রামেই পরিষ্কার ব্রডকাস্টিং হচ্ছে কিনা, সেটাও ঘুরে দেখার প্রয়োজন ছিল একটু। প্রথম প্রথম কয়েকদিন আমি আর মঞ্জুর বেশ কয়েকটা গ্রামে ঘুরে বুঝলাম যে, নিজেদের পক্ষে এই পুরো কাজটা করে ওঠা মুশকিল। দায়িত্বটা ভাগ করে দেওয়া হল রেডিও স্টেশনের বাকি সহকর্মী এবং তাদের নিজস্ব সোর্সের উপর। যদিও এই টেকনিক্যাল ব্যাপারটা পুরোপুরি হাতেও থাকে না কারোর। কোনও গ্রামের আগে যদি পাহাড় বা উঁচু টিলা মতো কিছু থাকে, তাহলে ফ্রিকোয়েন্সি অনেকটাই আটকে যায় সেখানে। ফলে তার পিছনের গ্রামগুলোতে স্বাভাবিক ভাবেই একটু সমস্যা হয় রেডিওর অনুষ্ঠান পরিষ্কার ভাবে পৌঁছতে।

 

যদিও এই ব্রডকাস্টিং শুরু হবার আগে ব্যাপারটা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। তখন বাংলা বা সাঁওতালি ভাষায় অনুষ্ঠান তৈরি করার পর সেগুলোকে নিয়ে পৌঁছে যাওয়া হত আগে থেকে ঠিক করে রাখা নির্দিষ্ট গ্রামে। সেই গ্রামেও আগেই জানিয়ে রাখা হত কোন দিন আর কোন সময় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হবে সেখানে। অনুষ্ঠান বাজানো হত সাধারণত একটু ভাল মানের স্পিকার বক্সে। গ্রামের লোকজনকে এক জায়গায় জড়ো করা কিংবা আগে থেকে জানিয়ে রাখার কাজটা করতেন সেই গ্রামের দায়িত্বে থাকা কোনও ভিলেজ কো-অর্ডিনেটর। পদ্ধতিটার নাম, ‘ন্যারোকাস্টিং’।

 

এই সমস্ত অনুষ্ঠানের বিষয়গুলোও ঠিক করা হত যেভাবে, সেই পদ্ধতিটাও ছিল একাধারে বৈজ্ঞানিক ও গণতান্ত্রিক। নির্বাচন হত একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে। প্রথমেই কোনও গ্রামে বা কোনও অঞ্চলে গিয়ে সেখানকার মানুষদের সঙ্গে কথা বলা হত খোলামেলাভাবে। এইভাবে কথায় কথায় উঠে আসতো সেই গ্রামের বিশেষ কয়েকটা সমস্যা। সেগুলো হতে পারে গ্রামে চাষ বা অন্যান্য কাজের সুবিধা না থাকার জন্য বেশিরভাগ গ্রামীণ পুরুষদেরই একটা বড় সময়ের জন্য কাজের সন্ধানে বাড়ির বাইরে থাকা কিংবা সাঁওতালি গ্রামগুলোতে ছোটদের মধ্যে স্কুলছুটের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া মারাত্মক হারে। ‘দেশে বড় দুখ রে…’ পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যার কারণ চিরন্তন হলেও, বিশেষ করে সাঁওতাল গ্রামগুলোতে স্কুলছুটের সংখ্যা ভাবিয়েছিল বেশ। সমস্যাটার কারন জিজ্ঞেস করে যেটা জানতে পারা গিয়েছিল, সেটা আরও একবার সামাজিক স্তরবিন্যাস নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছিল নতুন করে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে কেন এতদিন সেই ভাবে কাজ করা হয়নি, সেটা নিয়ে একটু হলেও খেদ যে তৈরি হয়নি মনে, তাও মিথ্যে নয়।

 

মাটির দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে বাচ্চা মেয়েটা বা জাহের থানে খেলে বেড়াচ্ছে কলকল করে ছেলেপুলের দল, তারা সকলেই সরল মনে জানিয়ে গেল তাদের স্কুলে যেতে ভাল না লাগার কারণ। ঠিকই তো! নিজেকে সবসময় পিছিয়ে পড়তে দেখতে কারই বা ভাল লাগে? ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স শুধু শহরের গন্ডিতেই আটকে, সেটাই বা কে বলল? তারা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছিল স্কুলের বাকি ছেলেমেয়েদের থেকে। আর তাদের এই পিছিয়ে পড়ার মূল কারণটা ছিল, তাদের পড়তে বাধ্য করা হচ্ছিল বাংলা ভাষায়। স্বাভাবিকভাবেই মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ না পেয়ে, তারাও নিজেদেরকে মেলে ধরতে পারছিল না সেভাবে। বাংলা ভাষাভাষী ছাত্র-ছাত্রীদের তুলনায় ক্রমশই পিছনের সারিতে চলে আসছিল আমাদের এই নাম্বার আর মার্কস সর্বস্ব শিক্ষা ব্যবস্থায়। ফলে স্কুলে যাওয়ার উৎসাহ এসে ঠেকেছিল তলানিতে।

 

এই বিষয়টা নিয়ে আমরা বেশ কিছু সময় ধরে টানা অনুষ্ঠান করেছিলাম বেশ কয়েকটা। তার ফলস্বরূপ কয়েকটা গ্রামে পাঠশালার আকারে ছেলেমেয়েদের সাঁওতালি ভাষায় প্রাথমিক বিষয়টুকু শিখিয়ে পড়িয়ে দেওয়ার কেন্দ্রও গড়ে উঠেছিল খানকয়েক। সুবিধা যেটা হয়েছিল সেটা হল, ছেলেমেয়েরা স্কুলে কোনও বিষয় বাংলাতে বুঝতে না পারলেও, এইসব কেন্দ্রগুলোতে সেগুলো আগে বা পরে নিজের মতো করে বুঝে নেওয়ার সুযোগটুকু পেয়েছিল অন্তত।

 

ডেভলপমেন্ট ইকোনমিক্সের একদম প্রাথমিক পাঠে উন্নয়নের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, সেটা হতে হবে সার্বিক। অর্থাৎ, এমন একটা ক্ষেত্রও যদি থেকে যায় যেখানে উন্নয়নের আওতা থেকে বাদ পড়ে যাবে কিছু মানুষ বা সম্প্রদায়, তাহলে সেটাকে কখনোই সার্বিক উন্নয়নের অর্থনীতির আওতায় ফেলা যায় না। মনে হয়, এই সহজ-সাধারণ পাঠগুলোই মনে রাখতে পারলে, আজকের দিনে দাঁড়িয়েও আমাদের দেশকে শুধুই ‘উন্নয়নশীল’ তকমায় হয়তো আটকে থাকতে হত না। ঠিক যেমন শহুরে নিউজ পেপার বা টেলিভিশনে দেখা প্রাইম টাইম অনুষ্ঠানের রাজনীতিও যে আসলে কতটা ভ্রান্ত, সেটাও স্বল্প অভিজ্ঞতা নিয়েই সেখানকার পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছিল চোখে আঙুল দিয়ে।

 

এলাকার ভূগোল মেনেই, মূল সাঁওতালি গ্রামগুলোতে যেতে হলে পাকা রাস্তা থেকে নেমে যেতে হবে ডানদিকে বা বাঁদিকে। সেইসব রাস্তার বেশিরভাগ অংশেই সিমেন্ট বা পিচের নামগন্ধ নেই কোনও। এমনকি এমনও হয় যে, বর্ষাকালে পাহাড় থেকে ঝোড়ো স্রোত নিমেষে রাস্তা ভেঙে দিয়ে চলে যায় মাঝখান থেকে। যোগাযোগবিহীন হয়ে পড়ে বেশকিছু গ্রাম।

 

ন্যারোকাস্টিংয়ের মাধ্যমে, অর্থাৎ, গ্রামে গ্রামে গিয়ে এই সব বিষয়ের উপরই অনুষ্ঠান তৈরি করে সেটা চালানো হত গ্রামের মানুষদের জন্য। থাকতো হেলথ বুলেটিন অথবা সরকারি প্রকল্প সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্যও। অনুষ্ঠান শুরু করার আগে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপর গ্রামবাসীদের কতটা জানাশোনা আছে, সেটা জেনে নেওয়ার জন্য তাদেরকে দিয়ে ভর্তি করানো হত একটা সাধারন ফর্ম। ফর্ম বলতে দাগ দিতে হবে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’-তে। সেই একই ফর্ম আবার তাদেরকে ভরার জন্য দেওয়া হত ন্যারোকাস্টিং শেষ হওয়ার পর। এর ফলে তাদের নির্দিষ্ট সেই সব বিষয়ের উপর কতটা নলেজ তৈরি হল, সেইটাকে মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করতে হত পরবর্তী অনুষ্ঠানের।

 

ব্রডকাস্টিংয়ের মাধ্যমে খুব সহজেই অনেক বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারলেও, ন্যারোকাস্টিং পদ্ধতিটা আসলেই অনেক বেশি মাটির কাছাকাছি। সরাসরি মানুষের সঙ্গে বসে মানুষের মুখের ভাব দেখতে পাওয়া যায় সেখানে, কথা বলা যায় অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি দিক নিয়ে। তাই ব্রডকাস্টিং চলা শুরু হলেও ন্যারোকাস্টিং সম্পূর্ণ বন্ধ হল না কখনোই।

 

এইভাবে এদিক-সেদিক ঘুরতে ঘুরতে দেখি শরৎ শেষ হয়ে আসছে যত, ততই বিকেলগুলো মায়া মায়া মন কেমনের মতো হয়ে উঠছে কেমন। লম্বা তাল কিংবা খেজুর গাছের মাথায় কমলা সূর্যের গায়ের উপর দিয়ে আলগোছে ভেসে যাচ্ছে দলছুট একটা মেঘ। আলগা ক্লান্তি পেয়ে বসে এইসব বিকেলগুলোতে। একাধিক প্রজেক্টের রিপোর্ট আর ফিউচার প্ল্যান পাঠাতে পাঠাতে ধরে আসে মাথা। শুধুই তো প্রোজেক্ট নয়, তার সঙ্গে জুড়ে থাকা এতগুলো মানুষ, তাদের নিজস্ব সমস্যা বা সুবিধা… ফোন আসতে থাকে একের পর এক। এত কিছুই ভুলতে থাকি একসঙ্গে যে, একটা নোটবুক পর্যন্ত রাখার অভ্যেস করতে হয় সবসময় নিজের সঙ্গে…

 

তবুও সাঁওতালি গ্রামগুলোতে কোনও কাজের জন্য গেলে, কাজের পরেও একটু বেশি সময় থেকে যাই সেখানে। এটা-সেটা গল্প হয় করকট্যা, বারোমাস্যা, জলহরি এইসব ছবির মতো গ্রাম আর তার মানুষদের সঙ্গে। কেমন পরিচিত হয়ে যায় সকলেই, যেন পাশের ঘরের ছা! যে কোনও সময় যে কোনও গ্রামেই চলে যেতে বাধা নেই একদমই। সন্ধের পরে দাওয়া থেকে ওঠার তোড়জোর করলেই ধমক দিয়ে বসিয়ে মুড়ির বাটি এগিয়ে দেয় সরলাদি। হড় ঘরের বউ সরলা সোরেনের সেই ধমক অগ্রাহ্য করে, এত ক্ষমতাই বা কার!

 

জলহরি গ্রামটার পাশেই বেশ উঁচু সবুজ পাথুরে একটা টিলা। সেটার উপর উঠে গেলে দেখা যায় নেমে আসা সূর্য ধীরে ধীরে একা হয়ে যাচ্ছে কেমন। একা হয়ে যেতে যেতে কেমন জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে অন্যান্য নক্ষত্রদের। অন্ধকার একটু জমাট বাঁধতে থাকলে নীচ থেকে ডাক দেয় কেউ তখন। “অন্ধকার হয়ে গেলে দাদা মুশকিল হবে নামতে!” মিতনদাদের গ্রাম করকট্যায় গেলেই আবার কাজের পর মিতনদা বা তার বাড়ির লোকের সঙ্গে আড্ডা মারা ছিল একটা বেশ মজার ব্যাপার। একদিন বিকেলের দিকে দেখি, মিতনদার দু-তিনজন ভাইপো বেশ বড় কয়েকটা ইঁদুর ধরে নিয়ে এসেছে মাঠ থেকে। মনে ফুর্তি খুব। “তা, কী করবি রে ওগুলো নিয়ে?” জিজ্ঞেস করতেই খুশি চেপে রাখতে না পেরে বত্রিশ পাটি উবাচ। “খাব!” মঞ্জুরের দিয়ে তাকাই। সত্যি সত্যি ইঁদুর খাবে? মঞ্জুর হাসতে হাসতে বলে, ওদেরকেই জিজ্ঞেস করো! আবার জিজ্ঞেস করি অগত্যা, কী করে খাবি রে? ইঁদুরের লেজ ধরে নাড়াতে নাড়াতে হাসতে হাসতে উত্তর আসে এবার, “আগুনে পুড়াবো। তারপর খাব…”

 

মিতনদাদের গ্রামের বাঁদিকে একটা শালবন। আর ডানদিকে গেলে উঠে যাওয়া যায় আর একটা উঁচু মতো টিলায়। সেখানে বসলে চোখের সামনে খলবল করে হলুদ সর্ষের দল। একটু দূরেই নিচু একটা পুকুর থেকে পাম্প দিয়ে টেনে আনা জল গুবদগুব করে মিশে যাচ্ছে ক্ষেতের মাটিতে। সেইসব সূর্যাস্তের সামনে বসে কথা বলতে পারি না আমরা কেউ। এত ক্ষুদ্র মনে হয় সমস্ত পিছুটান, রোজকার দিন আনি দিন খাই সমস্যা— যে উঠতে ইচ্ছে করে না একদমই। সহজ-সরল ভালো মানুষ মিতনদাও ডাকতে এসে বসে পড়ে পাশে। আরও একটু গলা নামিয়ে বলে, “একটু চা হয়েছে বাড়িতে; খেয়ে যেও।” ফেরার পথে হাঁটতে হাঁটতে বলি, “একটু মহুয়া হবে মিতনদা?” মিতনদা হেসে বলে, “কাল দেব। কিন্তু খুব অল্প। বেশি খেতে পারবে না…”

 

মিতনদাদের বাড়ির বাইরে পেতে দেওয়া খাটিয়ায় বসে স্টিলের গ্লাসে চা খেতে খেতেই পরপর মেসেজ। মিসড্ কল অ্যালার্ট। এবং ডিরেক্টর স্যারের মেসেজ। “ফোন লাগছে না। একটা লিংক পাঠিয়েছি, দেখো।” গ্রামে আর লিংক দেখার মতো নেটওয়ার্ক কই? স্টুডিওতে ঢুকতে ঢুকতেই পেরিয়ে যায় সন্ধে। ইন্টারনেট কানেক্ট করতে দেখি, আশ্চর্য একটা ইমেল। কদিন আগেই পেরিয়ে যাওয়া দুর্গাপুজোর সময়েই কীভাবে শোক পালন করেছেন এখানকার অসুর সম্প্রদায়, কীভাবে অল্টারনেটিভ থেকে ধীরে ধীরে মেইনস্ট্রিমে নিজেদের কথাগুলো নিয়ে আসার চেষ্টা করে চলেছেন তাঁরা— সেই নিয়ে একটা বিস্তারিত রিপোর্ট।

 

অসুর সম্প্রদায়ের কথা আগে শুনেছিলাম বটে। কিন্তু এই অঞ্চলে যে এনারা এত বড় একটা প্রতিবিপ্লব করে ফেলেছেন প্রায়, সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব হত। বেশ কয়েক দিনের চেষ্টায় খুঁজে পাওয়া গেল এই সম্পূর্ণ আয়োজনের যিনি মূল হোতা, সেই অজিত প্রসাদ হেমব্রমকে। পুরুলিয়ারই মানুষ, তাই মঞ্জুরকে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলে ফোন করতে বললাম একটুও দেরী না করে। উদ্দেশ্য, এখানে যদি উনি এই মুহূর্তে থাকেন, তাহলে কবে, কখন আর কোথায় গেলে একটু কথা বলা যাবে ওনার সঙ্গে সেটা জানতে চাওয়া। সময় পাওয়া গেল তার দু-তিন দিন পরেই। মঞ্জুরের বাইকে আমি আর মিতনদা সওয়ারি হয়ে রওনা দেওয়া গেল কাশীপুরের দিকে।

 

বেশ কয়েকবার ফোন করে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেখা হল যে মানুষটার সঙ্গে, তার একটা চোখ অস্বাভাবিক রকম লাল। দেখেই মনে হয়, কোনও অসুস্থতা আছে গভীর। অজিত প্রসাদ হেমব্রম যে তাঁর এই বিকল্প উদযাপন প্রচারের জন্য বেশ দৌড়াদৌড়ি করছেন, সেটা অবশ্য ইতিমধ্যেই জানতে পেরেছি তার আগেই বেশ কয়েকটা রিপোর্ট দেখে। ডাক এসেছে এমনকি জেএনইউ থেকেও। এবং সেই সঙ্গেই চলছে বেশ কিছু বই লেখার কাজ। খানিকটা অবাক হয়েই দেখলাম, বইগুলো মূলত মৌলবাদের বিরুদ্ধে আর প্রান্তিক সংস্কৃতির কথা সামনে আনার কথাই বলেছে যতটা সম্ভব ভয়ডরহীন ভাবে।

 

দুর্গাপুজোর বেশ কিছুদিন পরের সময়টা। আকাশে মেঘ তাও। সন্ধেটাও যেন খানিক তাড়াহুড়ো করেই নেমে আসে তাই। একটা দোতলা বাড়ির ছাদে পেতে দেওয়া চাটাইয়ের উপর বসে অজিত প্রসাদ হেমব্রম শোনাতে শুরু করেন একটা না-জানা ইতিহাস। সে ইতিহাস নিয়ে ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু গবেষণার দায় কোনও কালেই নেই। বরং মিথোলজি যদি একটা মুদ্রা হয়, তবে তার উল্টোদিকের গল্পটা শোনাই উদ্দেশ্য একমাত্র।

 

গল্পের সেই উৎসবের নাম, ‘দশানি’। নামেই উৎসব, কিন্তু জাঁকজমক নেই একটুকু। নেই রংবাহারি প্রকাশ কোনও। বরং আছে শুধুই বিষাদের মূর্চ্ছনা। বিষাদ, কারণ একসময় নিজেদের দেশ-ঘর-মাটি ছেড়ে বিতাড়িত হবার যন্ত্রণা তো নিদারুণ। বিষাদ, কারণ একসময় ঈশ্বরের মতো প্রবল পরাক্রমী ও প্রজা বৎসল রাজ্যপ্রধানকে শেষ করে দেওয়ার জন্য তথাকথিত ‘সভ্য’ মানুষদের শঠতা ও বিশ্বাসঘাতকতা। তাঁর স্মরণেই প্রান্তিক মানুষদের এই উৎসব। রুখা মাটিতে বৃষ্টির গন্ধ এসে পড়লে, বুকের জমানো মেঘে এক বিষাদসিন্ধু-যাপন।

 

সে দেশের নাম ছিল ‘চাইচম্পা’। আদরের জন্মভূমিকে দেশের লোক আরও ছোট করে ডাকতো, ‘চম্পা’। লোকমুখে তার অবস্থান ও বৈশিষ্ট্যগত যা বিবরণ পাওয়া গেছে, তাতে এই স্থানের সঙ্গে মহেঞ্জোদারো-হরপ্পার মিল পাওয়া যায় অনেকাংশেই। ইতিহাসেরও ইতিহাস লেখা হয়নি যেই সময়ে, তাকেই আমরা ‘প্রাগৈতিহাসিক’ বলি কি? সেই প্রাগৈতিহাসিক সময়েই এই চাইচম্পাতে বসবাস করতো এই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীণ আদিবাসী সম্প্রদায়। সেই বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীকে একত্রে বলা হতো ‘খেরওয়াল’। শুধু সাঁওতাল নয়— সাঁওতাল, কোল, ভীল, মুন্ডা এই সকল গোষ্ঠীই ছিল এই খেরওয়াল সম্পদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন বেশ শিক্ষিত; কোনও গরিবী ছিল না সেই দেশে। বাণিজ্য যাঁরা করতেন, তাঁদের বাড়ি-ঘর ছিল বড় ও রীতিমতো সুসজ্জিত। আর সেই দেশের ছিল এক রাজা; আমাদের ইতিহাস বা সমাজ-রাজনীতি যাঁকে চিনতে শিখিয়েছে অন্য ভাবে।

 

…অথচ এই ইতিহাস ছড়িয়ে যাবার কথা ছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তার বদলে গল্পটা হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্যরকম। কিন্তু এই ক্রমাগত বদলে যাওয়া গল্পগুলোর বাইরেও যে ভিতরের গল্পটা থাকে, অনেকসময় তা আমাদের চিরাচরিত বিশ্বাসকে ধাক্কা মারে; ধাক্কা মারে সেই সকল বিশ্বাসজাত একেকটি অভ্যেসকে। আমার এই ভালবাসার, শ্বাসকষ্টের শহর থেকে অনেক দূরে, এক বৃষ্টি ধোওয়া বিকেলের পর মানভূমের এক অন্ধকার নেমে আসা উঁচু-নিচু জমির উপর বসে যে গল্প বা মনে-না-রাখা ইতিহাস আমাদের শোনান আমাদেরই এক সহনাগরিক, সেই সব উচ্চারণ কী ম্যাজিকে যেন সন্ধে নামিয়ে আনে আরও একটু তাড়াতাড়ি। চা’য়ের গ্লাসের পাশ জুড়ে মিটমিট করে জোনাকি। বেশ দেখতে পাই, শুধু বাংলা নয়, এই তীব্র বিশ্বায়নের যুগে যখন সারা পৃথিবী জুড়েই দুর্গাপুজো বা বাংলার বাইরে বৃহত্তর ভারতবর্ষে নবরাত্রি পালনের ধুমধাম চলছে, তখন এই ভারতবর্ষেরই বেশ কিছু আদিবাসী পরগণা কিভাবে ডুবে যাচ্ছে সেই আলোর থেকে দূরে নিবিড় এক বিষাদসিন্ধুতে।

 

ছোটবেলার বাংলা রচনায় লেখা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ শরৎকালের আকাশে ইদানীং আর দেখা না গেলেও, ওই পুজো পুজো হুল্লোড়ের ঢেউ গায়ে এসে লাগলেই আপামর বাঙালি সমাজ যখন বছরে একদিন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, শারদসম্মান, পুজোপরিক্রমা বা ইটিং আউটের প্ল্যান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, শহরতলীর সব ভিড় যখন শহরমুখী হয়ে যায়, হাসিখুশি মুখের ছবি যখন ছড়িয়ে পড়ে টিভিতে-খবরের কাগজে, সেই খুশি বা হুল্লোড়ের মুহূর্তগুলোর পাশে কখনই পড়ে না বাংলা, বিহার বা অধুনা ঝাড়খন্ড এলাকার মানভূম অঞ্চলের আদিবাসী খেরওয়াল সম্প্রদায় ও বিশেষভাবে তার অন্তর্ভুক্ত ‘অসুর’ সম্প্রদায়ের মানুষগুলোর সাদা কাপড়ে ঢেকে থাকা শোকের ছায়া। যারা বিশ্বাস করে তাদের প্রবল পরাক্রমী পূর্বপুরুষকে ছল-চাতুরী আর প্রলোভনের মাধ্যমে হত্যা করেছিল ‘বহিরাগত’রা, আর এই কাজে তারা ব্যবহার করেছিল সেই বহিরাগত আর্য সম্প্রদায়ের এক নারীকে।

 

আদিবাসী সম্প্রদায়ের কথায়, তাদের প্রবল পরাক্রমী সেই পূর্বপুরুষের নাম ‘হুদুর দুর্গা’, যাঁকে ভারতীয় সমাজ চেনে ‘মহিষাসুর’ নামে; আর যে নারী ছলনা-প্রতারণার মাধ্যমে তাঁকে হত্যা করেন, তাঁর নাম, দুর্গা। এই বর্ণনার সাথে মেলে না মার্কন্ডেয় পুরাণে বর্ণিত নয় দিন ব্যাপী দেবী দুর্গার সাথে মহিষাসুরের যুদ্ধ এবং তাতে শুভের পরিচিতি স্বরূপ দেবী দুর্গার জয় এবং ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর— এই ত্রিদেবের সন্ধিতে দেবী দুর্গার জন্ম বৃত্তান্তের কথাও।

 

চাইচম্পা দেশের উপর যখন বহিরাগত আর্য উপজাতির আক্রমণ নেমে এল, তখন শুরুতে হকচকিয়ে গেলেও তাদের রাজা হুদুর দুর্গার নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ায় খেরওয়াল উপজাতিরা। প্রবল পরাক্রমী হুদুর দুর্গা ছিলেন যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী এবং রণকৌশল সাজাতে দক্ষ। একা একটা দশাশই মহিষের উপর চড়ে তিনি চলাফেরা করতেন বা যুদ্ধক্ষেত্রে যেতেন বলে, তাঁকে ডাকা হতো ‘মহিষাসুর’ নামেও। হুদুর দুর্গার নেতৃত্বে ঘোষিত এই যুদ্ধে যখন রীতিমতো কোনঠাসা হয়ে পড়ে আর্যরা, তখন তারা খুঁজতে শুরু করে রাজার দুর্বল জায়গা; এবং অচিরেই জানতে পেরে যায় যে, যতই যুদ্ধে পারদর্শী হোক, এই আদিবাসী উপজাতিরা সন্ধের পর অস্ত্র ধরে না আর এবং কখনই নারীজাতির উপর কোনও রকম আক্রমণ করে না। বর্তমানেও ঘরে ঘরে মহিলাদের প্রতি পারিবারিক হিংসা বা নির্যাতনের মতো ঘটনা যেকোনও আদিবাসী পরিবারে উল্লেখযোগ্য ভাবে কম। আদিবাসী রাজা সম্পর্কে এই সব খোঁজ-খবর নিয়ে আর্যরা যুদ্ধবিরতি চায় এবং সন্ধিপ্রস্তাব দেয়। সেই সন্ধিপ্রস্তাবে আর্যরা বলে যে বীর রাজার সাথে তারা সম্পর্কসূত্রে আবদ্ধ হতে চান এবং তাদের গোষ্ঠীর এক সুন্দরী রমণীর সাথে রাজার বিয়ের প্রস্তাব দেন। সেই রমনীর নাম দুর্গা, এবং পেশাগত কারণে বেশ্যাবৃত্তির সাথে জড়িত থাকার কারণে যিনি ছিলেন নানান ছলা-কলায় পারদর্শী।

 

এখানে একটু খটকা লাগে। গলা খাঁকাড়ি দিতেই থেমে যান অজিত প্রসাদ। তারপর আরও একটু গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলেন, বর্তমানে ‘বেশ্যা’ শব্দটির সাথে আমরা যেভাবে পরিচিত, সেই সময় সেরকম ছিল না। সমাজে বেশ্যা বা গণিকাদের যথেষ্ট সম্মান ছিল এবং ছিল ‘গণিকাবিদ্যা’ বিষয়ক পড়াশোনাও। রীতিমতো প্রশিক্ষণ আর অনুশীলন করেই তৈরী হতে হতো আগামীদিনের গণিকাদের। নাচ-গান ছাড়াও তাঁদের শিখতে হতো অভিনয়, ছবি আঁকা, রান্না। পারদর্শী করে তোলা হতো বিভিন্ন ভাষা শিক্ষায়, কথা বলা বা বাচন ভঙ্গী রপ্ত করতে, মালাগাঁথার মতন আরও নানারকম চৌষট্টি কলায়। এই চৌষট্টি কলায় সুশিক্ষিতা, সুন্দরী ও গুণবতী বেশ্যা বা গণিকারাই সমাজে বিশেষ মর্যাদা পেতেন।

 

তারপর আসে সেই রাত। বিয়ের পরেই এক সন্ধ্যায় ছলাকলা করে রাজাকে প্রচুর মদ খাইয়ে, ঘনিষ্ঠ অবস্থার মধ্যে রাজার শরীরের উপর বসেই পূর্ব পরিকল্পনা মতন রাজাকে হত্যা করেন দুর্গা। …এখান থেকেই দুর্গা পুজোর সময় বেশ্যাবাড়ির মাটি আনার রেওয়াজটা মনে পড়ে যায় হঠাৎ। মনে পড়ে যায় পা’য়ের কাছে পড়ে থাকা মহিষাসুরকে হত্যায় উদ্যত দেবী দুর্গার ছবি। প্রাচীনকালের সেই হত্যার সাথে এইসব মূর্তি ভাবনার কোনও সম্পর্ক আছে কিনা জিজ্ঞেস করা হয় না, কারণ লিখিত কোনও ইতিহাসই এদের নেই বলেই জানা যায়।

 

রাজার হঠাৎ মৃত্যুর পর শোকাচ্ছন্ন এবং হতোদ্যম হয়ে পড়েন আদিবাসী মানুষেরা। তাই প্রাণ বাঁচাতে নিজেদের দেশ ছেড়ে তাঁরা চলে যেতে থাকেন পূর্বে; আরও পূর্বে। আবাস গড়ে তোলেন সেখানে, হিসেবমতো বর্তমানে যার ভৌগোলিক অবস্থান দাঁড়ায় বাংলা-বিহার-ঝাড়খন্ড-উড়িষ্যা বা মধ্যপ্রদেশের অরণ্য ঘেরা মালভূমি অঞ্চলে। তাঁদের বিশ্বাস ছিলো যে, কোনও সভ্য জাতিই নিশ্চই মহিলাদের উপর আক্রমণ করবে না; তাই পালানোর সময় পুরুষেরাও নিজেদেরকে সাজিয়ে নেয় মেয়েদের বেশে। রাজার মৃত্যুর শোকে, প্রাণাধিক প্রিয় চম্পা ছেড়ে চলে আসার শোকে, তাদের ‘দশানি’ বা ‘দাঁসাই’ গানের সুর পাল্টে যায়। আনন্দের ‘সুখ দাঁসাই’ পরিণত হয় “হায় হায়” ধ্বনির ‘দুখ দাঁসাই’তে। সেই প্রথা মেনেই এখনও দশানি পরবে কোথাও কোথাও পুরষেরা মহিলাদের মতো সাজগোজ করেই অংশগ্রহন করেন। সময় এগিয়ে যায়, শোকের পাল্লায় হাহাকারের ওজন কমে না তবুও। “হায় হায়” ধ্বনিতে কান্না যেন হয়ে ওঠে সরিৎসাগর, রুখা মাঠ-ঘাটের বুকের মধ্যেও।

 

যদিও আদিবাসীদের এই ইতিহাসের কোনও লিখিত প্রমান পাওয়া যায় না। আদিবাসী সমাজ একটা দীর্ঘদিন পর্যন্ত শ্রুতি বা শুনে শুনে মনে রাখার মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল ছিল। সেই কারনেই প্রায় সকল আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন লোকাচারগুলির কোনও লিখিত প্রমান না থাকাতেই হয়তো পরবর্তীতে আর্য সমাজের পক্ষে সেই ইতিহাসের প্রবাহকে নতুন পথে বইয়ে দিতে সুবিধা হয়েছিল। তারও অনেক পরে আদিবাসী সাঁওতাল পরগণায় বারংবার প্রতিহত হতে হতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী আদিবাসী সম্প্রদায়ের থেকে উচ্চ বংশীয় জমিদার গোষ্ঠীগুলিকে আলাদা করার বিশেষ প্রয়োজন অনুভব করে। উচ্চ বংশের থেকে আদিবাসীদের আলাদা করতে তখন সেই ধর্মীয় বিভাজনের পথই তারা নিয়েছিল এবং দিকে দিকে দুর্গাপুজোর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে দিতে ব্যাপক আর্থিক সাহায্যও কোম্পানী করেছিল বলে মনে করা হয়।

 

মেঘলা আকাশের নীচে অন্ধকার ছাদে বসে এসব শুনতে শুনতে মনে হয় তবু, ইতিহাস মনে হয় ভুলে যায় না কোনোকিছুই। বরং ভীষণ অভিমানে দুয়োরানীকে বনের মধ্যে লুকিয়ে রাখার মতোই নিজের শরীরের আনাচ-কানাচের মধ্যে গোপনে সরিয়ে রাখে এইসব ইতিহাস, আর মজা দেখতে থাকে চুপ করে। ক্ষমতালোভী গোষ্ঠীর মিথ্যে আর আলো-আঁধারির মতো কথা শুনে নিজের মনেই হাসতে থাকে বীভৎস মজায়। হাসতে থাকে বিজ্ঞাপন দেখে, বিজ্ঞাপনের মাঝে কখনও কদাচিৎ টুকরো-টাকরা খবর দেখেও— যে খবর পেশী ফুলিয়ে বলে গড়তে হবে নতুন সমাজ; আর সেই সমাজ হবে শ্রী রামচন্দ্রের রাজত্বের মতো। শ্রীকৃষ্ণের অযোধ্যার মতো। বৈদিক যুগের সোনা রঙের দিনের মতো সুখের সমাজ!

 

আর সেইসব মেইনস্ট্রীমের পাশ কাটিয়ে নিজেদের মতো বেঁচে থাকেন তাঁরা; প্রকৃতির আদিম সন্তানেরা। পুজোর হুল্লোড়ের মধ্যে জানতেই পারি না কেউ যে, বর্তমানে আমাদের রাজ্যের কমবেশী প্রায় সাতশোরও বেশি আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ত্রিশ হাজারেরও বেশি অসুর জনজাতির মানুষ এই  হুদুর দুর্গার স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করেন। আকন্ঠ শোকপালন করেন। দুর্গাপুজো চলাকালীন শোকপালন করতে নিজেদের সাদা কাপড়ে মুড়ে রাখেন এই অসুর সম্প্রদায়ের লোকেরা। অনেকক্ষেত্রে সূর্যের আলোতেও বেরোতে দেখা যায় না এঁদের অনেককেই। শোকপালন করেন মানভূম অঞ্চল ছাড়াও মালদা, উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিন দিনাজপুর জেলার অসুর সহ আরও বেশ কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়।

 

কাশীপুর থেকে ফেরার সময় বৃষ্টি নামে হুড়মুড়িয়ে। লালপুর পেরিয়ে দাঁড়াতেই হয় অগত্যা। মজা করেই মঞ্জুরকে বলি, “ভাই, এনার যা বক্তব্য রেকর্ড করার, তাড়াতাড়ি স্টুডিওতে নিয়ে এসে করিয়ে নাও। শরীরের যা অবস্থা দেখলাম…” একটু ধরলে বৃষ্টি, উঠে পড়ি বাইকে আবার। মঞ্জুরের মাথায় হেলমেট। তীরের ফলার মতো ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি এসে লাগছে আমার আর মিতনদার মুখে। হঠাৎ দমকা হাওয়া দিলে একটা, বাইকের হেডলাইটের সামনের আলোয় দেখি সরে গেল বৃষ্টির ঝাপটাটা কেমন। হাওয়ার দাপট পাশের ঝোপে গিয়ে পড়তেই “হায় হায়” করে উঠল কারা…

 

…আর সেইসব “হায় হায়”-এর পাশে চলতে চলতে মনে হল, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে যে কোনও ইতিহাসের বই তুলে দেবার সময় একটুও কী হাত কাঁপবে না আমার? আমাদের? কোন ইতিহাস শিখে আমরা ঠিক ঠিক ‘বড় হতে’ বলবো ওদেরকে?

(ক্রমশ)

শুভদীপ চক্রবর্তী
+ posts

পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহর বাটানগরে। নঙ্গী হাই স্কুল সাক্ষী এইসব দিনের। পরবর্তীতে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে পড়ার পর জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে ঘোরাঘুরি গ্রাম বাংলার নানান প্রান্তে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। পরে কিছুদিন জনসংযোগের কাজ; কিছুদিন সাংবাদিকতা।

প্রথম কবিতার বই 'ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া সব ঢেউগুলো' ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে। পরের বছর 'নিবিড়' থেকে ব্যক্তিগত গদ্য সংকলন 'যতটুকু দৃশ্যে ছিল'। শখ বলতে খেলা দেখা, সিনেমা দেখা, কাছে বা দূরে যেখানেই হোক ঘুরে বেড়ানো। বিকেল বেলা স্টিমারে চেপে গঙ্গা পারাপার। আলমারিতে বই গোছানো নিয়ে খিটখিটে আজীবন। না-পারার তালিকা লম্বা ভীষণ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *