অভিমানভূম। প্রথম দর্শন : এক অপার্থিব লা লা ল্যাণ্ড। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

প্রথম দর্শন : এক অপার্থিব লা লা ল্যাণ্ড

“বেকার ছেলে প্রেম করে আর পদ্য লেখে হাজার হাজার, এমন প্রবাদ হেব্বি প্রাচীন অরণ্যে…”

 

হাজার হাজার প্রেম বা পদ্যের কথাটা ঠিক জানা নেই, তবে একজন বাঙালি বেকার যুবক যা যা করে থাকে, তার সবটাই খেটে বা ঘটে যাচ্ছে তখন আমার সঙ্গেও। সময়টা সন্ধিক্ষণেরই বটে। ২০১১। ইউনিভার্সিটিতে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা চলছে ঠিকই, কিন্তু ঠিক কোথায় যে নিজেকে গুঁজে দেব সেটা বুঝে ওঠা যাচ্ছে না তখনও। যেমন বুঝে ওঠা যাচ্ছে না কীভাবে সাজাতে হবে বায়োডেটা কিংবা কীভাবে জোগাড় করতে হবে সুপারিশ। ক্লাসের পর ক্লাস পেরিয়ে যাচ্ছে আর স্পেশাল পেপারের স্পোর্টস অথবা ফিল্মস মনে হচ্ছে অনেক দূরের বিষয়।  তার আগে জীবনে স্বপ্ন বলতে ছিল ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ম্যাচের রিপোর্ট লিখব ইডেনে বসে অথবা দু-একটা ছবি বানাবো নিজের মতো। এখন চাঁদনী চত্বর ঘুরে ঘুরে সিভি জমা দিয়ে এসে ক্লাসে বসার পরেই চ্যাপলিনের ‘মডার্ন টাইমস’ দেখতে দেখতেও চোখ বুজে আসছে ক্লান্তিতে। হকি মাঠের মাপজোক কিংবা মন্তাজ বা মিজ-অঁ-সিন গুলিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ চিন্তায়।

যদিও ততদিনে একটা জিনিস বুঝে ওঠা গেছে যে, জীবন থেকে ‘না’ এর তালিকায় জুড়ে গেছে আরও কয়েকটা প্রেম। যেমন, ক্রিকেট মাঠে নামা হবে না আর কিংবা ফুটবলে দাঁড়ানো হবে না তিন-কাঠির নীচে। এমন সময় বন্ধুমহলের আলোচনা থেকে যে নির্যাস পাওয়া গেল তা হচ্ছে, যে কোনও জায়গাতেই ইন্টারভিউতে বসলে প্রথমেই যেটা জানতে চাওয়া হচ্ছে সেটা হল, অভিজ্ঞতা কতটা? সেই কথা মাথায় রেখেই এবার শুরু হল অগত্যা ‘প্ল্যান-বি’। ইন্টার্নশিপ। অর্থাৎ যা কিছু শ্রম আছে তোমার, অভিজ্ঞতা কেনার বদলে বিলিয়ে দিতে হবে সংস্থাগুলোর কাছে। কিন্তু সেখানেও বেশীরভাগ জায়গাতেই এমন অমানুষিক শিডিউল, পিছিয়ে আসতে হচ্ছে কিছুদিন পরেই। এরকমই একটা প্রায় নিস্পন্দ দিনে ফাঁকা হয়ে যাওয়া মাথায় সিগারেট টানছি ইউনিভার্সিটির চাতালের লাল বেদীতে বসে (তখনও লালই ছিল), সিনিয়র এক দাদা এসে খোঁজ দিল বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে সদ্য গজানো নতুন একটা নিউজ এজেন্সীর। শিক্ষানবীশ সাংবাদিক প্রয়োজন। অগত্যা ছুটতে ছুটতে পৌঁছে যাওয়া গেল সেখানেও। কাজটা হল, ফিচার নিউজ জোগাড় করে দিতে হবে তাদের এবং তারা সেটা তারপর সাপ্লাই করবেন অন্য কোনও বড় এজেন্সী বা চ্যানেলের কাছে। পদ্ধতিটা সন্দেহজনক। তার উপর দাবী, খবরটা হতে হবে যতটা সম্ভব ‘এক্সক্লুসিভ’ এবং ‘স্থানীয়’।

 

আমার দরকার অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট। ‘পারব’ বলে উঠে এলাম। ফিরতে ফিরতে ভাবছি খবর তো লিখব বটে, কিন্তু কী লিখব?

যদিও এজেন্সি থেকে বলা হয়েছে কী লিখতে হবে বা কোথায় যেতে হবে সেসব আপাতত বলে দেবে তারাই। তা দূরে কোথাও যেতে একদমই কোনও আপত্তি নেই তখন। বরং সদ্য কয়েক মাস আগে যে বান্ধবী জুটেছিল, তার থেকে ‘লেঙ্গি’ প্রাপ্ত হওয়ায় এই প্রান্তর ছেড়েই বেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে তখন প্রবল।

তার কয়েকদিন আগেই একটা ফিল্ম ফেস্টিভাল হয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে। বাইসাইকেল থিভস, দ্য বয় ইন স্ট্রাইপড্ পাজামাস, অপরাজিত, আগন্তুক, কোমলগান্ধার। ‘দ্য বয় ইন স্ট্রাইপড্ পাজামাস’ দেখার পর চুপ করে বসে থাকতে হয়েছিল অনেকক্ষণ। সবাই বেরিয়ে গেলেও সেন্টেনারি হল থেকে বেরোতে পারিনি। এভাবেও তৈরি হয় বন্ধুত্ব? এভাবেও একটা গুলি না চালিয়েও শেষ করা যায় একটা গোটা যুদ্ধের পটভূমিকার সিনেমা?

শেষ যে হয়, সেটা তো বুঝতেই পারছি বেশ। হাতের মুঠো থেকে হাত বেরিয়ে যায় যেভাবে, সেই ভাবেই। এদিকে সময়টাও যেন আগুনে পুড়ছে রীতিমতো। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম ঘটে গেছে তার আগে। রাজ্যে পালাবদলের আবহ নিশ্চিত। এবং বেশ উত্তপ্ত জঙ্গলমহল। টিভিতে নিউজপেপারে প্রতিদিনই খবর আসছে কোথায় রাস্তা কেটে ফেলে রাখা হয়েছে কিংবা কোথায় প্রশাসন অথবা পুলিশের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে খুন করে ফেলে রাখা হচ্ছে স্থানীয় শাসক দল ঘনিষ্ঠ নেতা-কর্মীকে। তার শিকার কখনও লোকাল প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টারমশাই কিংবা কখনও স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান।

এমন অবস্থাতেই একদিন স্ক্রীন ফেটে যাওয়া ছোট স্যামসাংয়ের মোবাইলে ফোন এল ওই এজেন্সি থেকে। রিপোর্ট কভার করতে হবে। রাজ্যে পালাবদল ঘটে যাওয়ার মুহূর্তে জনতার বিপুল সমর্থন নিয়ে দীর্ঘদিন বিরোধীতায় থাকা দল এসে বসেছে ক্ষমতার অলিন্দে। সরকারের কথায় তখন পাহাড় হাসছে, জঙ্গল হাসছে। ফোনে বলা হল, যেতে হবে সেই জঙ্গলমহল।

 

তখন আত্মসমর্পণ করছেন একাধিক মাওবাদী নেতা। দুর্গাপূজা পেরিয়ে গেছে কিছুদিন হল। কালীপুজোর আগে আগে সময়টা। বাতাসে হালকা একটা হিম হিম ভাব। খবর এল, অযোধ্যা পাহাড়ের নীচে একদল ঢাকি পরিবারের। পরিস্থিতির চাপেই হোক বা অন্য যে কোনও কারণে, যারা বন্দুক তুলে নিয়েছিল হাতে কিছু বছর আগে, তারা আবার ফিরেছে তাদের পুরোনো পেশাতেই। সদ্য কলকাতার দুর্গাপুজোর শেষে গাঁ-ঘরের মানুষ রওনা দিয়েছে আবার গ্রামের পথেই। সেটাই খবর করতে হবে। এবং লিখতে গেলে পৌঁছে যেতে হবে অযোধ্যা পাহাড়ের নীচের সেই গ্রামে। পৌঁছে যেতে হবে পুরুলিয়ায়।

সেই প্রথম সম্পূর্ণ নতুন একটা জনপদে যাব। ভয় বা উত্তেজনা, কিছুই সেভাবে নেই তবুও খুব একটা। থেকে থেকে যদিও একটা-দুটো খুন-খারাপির খবর তখনও আসছে না, তা নয়। কিন্তু প্রেম না-হওয়ার আগেই ভেঙে যাওয়ার শোকে তখন চলতে-ফিরতেই মনে হচ্ছে ‘এ জীবন লইয়া কী করিব’? কী আর করিব! অতএব চলেই যাব। এজেন্সিকে বলে দিলাম, “রাজি। টিকিট পাঠাবেন।”

টিকিট চলে এল। দু-দিন পরে রাতের ট্রেন। এগারোটা পাঁচের চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার। নামতে হবে বলরামপুর স্টেশন। সেখান থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। কী ব্যবস্থা থাকবে, সেটা তখনও জানি না। কিন্তু নিজের মতো করে গুছিয়ে নিলাম খাতা, পেন। স্মার্টফোন তখনও আসেনি। একটা রেকর্ডারও দেওয়া হল না; নতুন ছেলে কী করতে কী করবে! একটা ছোটো ওয়ান শট ক্যামেরা জোগাড় করেছিলাম ক্যাননের। বারবার বলে দেওয়া হয়েছিল, স্থানীয় লোকদের সঙ্গে কথা না বলে ক্যামেরা যেন বের না করি। অবশ্য আরও কিছু যে বাধা-নিষেধ থাকবে, সেটা বুঝতে পারিনি তখনও। বোঝা গেল বলরামপুর নামার পর।

এই প্রসঙ্গে প্রথমবার চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার ট্রেন জার্নিটার কথা একটু বলে রাখা উচিত অবশ্যই। কারণ পরবর্তীতে এতবার এই ট্রেনে চড়তে হয়েছে যে, এক ভাই মজা করেই বলতো, “তোমার বাড়ি কি রেলগাড়ি?”

 

প্রথম যাত্রায় হাওড়া থেকে রাতের ট্রেনে সাইড লোয়ার বার্থ। এই বার্থটাই আমার সব থেকে প্রিয়ও বটে। রাতের বেলা তেমন কিছুই বোঝা না গেলেও, খড়গপুর পেরিয়ে যাওয়ার পরেই কনকনে হাওয়া আসতে থাকে একটা জানলা দিয়ে। কাঁচ ফেলে দিতে হয় অগত্যা। তাকিয়ে থাকি রাতের অন্ধকার আর তার মাঝে মাঝে জ্বলে ওঠা সাদাকালো জোনাকির মতো দূরের আলোগুলোর দিকে। যেন সবকিছু ছেড়ে এগিয়ে চলেছি। সবকিছু পিছনে ফেলে যেন ভেসে যাচ্ছি কোথায়। শুয়ে শুয়েই ভাবি, খেয়েছে! একেই কি বৈরাগ্য-টৈরাগ্য বলে নাকি?

গরীব বেকার ছেলের মনখারাপের বাতিক থাকতে আছে কিনা জানা নেই। কিন্তু, মনখারাপ হচ্ছে। ট্রেনের ধকধক শব্দে মনে হচ্ছে পিছনে ফেলে দিচ্ছি এতদিনের মনে পড়া মুখ, মুখের উপর উঠে পড়া চুল, অটোয় পাশে বসে আঙুলের ভিতর ধরে থাকা আঙুল আর ‘কোনোদিন আমায় ছেড়ে যাবে না তো’— এমন কিছু শপথ। মিথ্যে। গায়ে লাগছে না খুব একটা কোনও কিছু আর। শুধু মনে হচ্ছে, কোনোদিন আর ফিরে না গেলেই তো হয়! কী হয়, সাদা কালো মিথ্যে কথার শহরে কখনোই যদি ফিরে না যাই আর? তার থেকে তো এই ভেসে পড়াই ভাল। নতুন গন্তব্য ভাল। নতুন দেখা ভাল।

তখনও জানি না, এসব গন্তব্য আজীবনের মতোই সঙ্গী হয়ে থাকবে আমার চারপাশে।

 

কখন যে চোখটা লেগে গিয়েছিল, বুঝতে পারিনি। ভাগ্য ভাল, স্মার্টফোন না থাকার দৌলতে মোবাইলে চোখ লেগে থাকত না সেই সময়। যখন ঘুম ভাঙল, তখন ঘড়ির কাঁটা ছয়ের ঘর পেরিয়ে গেছে। পুরুলিয়া স্টেশনে থামবে সাতটা নাগাদ। আরও মিনিট চল্লিশ বা পঁয়তাল্লিশ পরে নামতে হবে বলরামপুর। জানলা দিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল বিস্তীর্ণ সবুজ। যদিও সবুজের রংটা ক্ষয়াটে। একটু লালচে আভা তাতে চোখে পড়ছে বেশ। মাটির উপর জমে আছে কুয়াশা। কুয়াশা জমে আছে জলের উপরেও। মাথায় বা সাইকেলের ক্যারিয়ারে খড় নিয়ে কোথায় চলেছে লোকজন। অনেকের সঙ্গেই চাষের জিনিসপত্রও। কুয়াশায় চলে বেড়াচ্ছে গরুর পাল বা ছাগলের সারি। মাটি ভেজা থাকায় ধুলো উঠছে না তাদের ক্ষুরে।

 

কোনও কোনও জায়গায় তখনও হাত সেঁকে নেওয়া হচ্ছে আগুন জ্বালিয়ে। অদ্ভুত অদ্ভুত নামের স্টেশন পেরিয়ে যাওয়ার পরে অবশেষে পুরুলিয়ায় এসে থামল ট্রেন। অর্ধেক ট্রেনটা ফাঁকা হয়ে গেল তখনই। স্থানীয় কিছু মানুষ উঠে বসল রিজার্ভ করা বগিতে। এর পরের গন্তব্যই বরাভূম, যার পোশাকি নাম বলরামপুর। স্থানীয় সহযাত্রীদের জিজ্ঞেস করে স্টেশন আসবার আগে ব্যাগপত্র গুছিয়ে বলরামপুর নেমেই ফোন করলাম স্থানীয় কন্টাক্টের নাম্বারে। ভদ্রলোকের নাম বাবুরাম লোহার। থাকার ব্যবস্থা হয়েছে ওনার গ্রামেই। স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি অনেকক্ষণ, কিন্তু বাবুরামের দেখা নেই। ফোন বেজে যাচ্ছে। হল টা কী? ফেঁসে গেলাম নাকি!

 

চায়ের দোকানে গিয়ে দাঁড়াই। তিন টাকা এগিয়ে দিলে হাতে চলে আসে গরম এক ভাঁড় চা। এমন সময় পিছন থেকে আওয়াজ আসে। তাকিয়ে দেখি, গলায় গামছা ঝোলানো একটা লোক। বাবুরামদাকে খুঁজছেন নাকি? ইতিবাচক উত্তর পেয়েই উল্টোদিক থেকে জবাব আসে, “আসুন। আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। আর, গাড়িতে কোনও প্রশ্ন করবেন না।”

–গাড়ি? মানে? বাবুরামদার তো বাইক নিয়ে আসার কথা?

–বাবুরামদার কাছেই নিয়ে যাব। আর কোনও প্রশ্ন করবেন না।

কিছুই বুঝতে পারলাম না। সাদার উপর লাল গেঞ্জি ভদ্র লোকের পিছনে হাঁটতে থাকলাম। কিছুটা হেঁটেই মুখের উপর গামছা জড়িয়ে নিলেন তিনি। এগিয়ে গেলাম একটা ধূলি-ধূসর জিপ গাড়ির দিকে। গাড়িতে উঠতেই আগের ভদ্রলোক বললেন, “চোখটা বাঁধতে হবে আপনার কিছুক্ষণের জন্য। কিছু মনে করবেন না। আসলে গ্রামের রাস্তা কাউকে দেখানোর নিয়ম নেই।” বললাম, “চোখ বাঁধতে হবে মানে? আরে ঠিকঠাক নিয়ে যাচ্ছেন তো নাকি?” “চিন্তা করবেন না। আমাদের কাছে আগেই আপনার আসার খবর জানানো হয়েছে। কিন্তু চোখ না বেঁধে কাউকে গ্রামের ভিতরে নিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই।” দেহাতি উচ্চারণে উত্তর আসে। অগত্যা! দুটো চোখে ঠুলি বাধা অন্ধ ঘোড়ার মতো অবস্থা হল গোটা যাতায়াতে। তার আগে এক ঝলকে দেখতে পেলাম গাড়িতে আরও দু’জন লোক। আড়চোখে দেখার চেষ্টা করছিলাম কোনও অস্ত্রশস্ত্রের দেখা মেলে কিনা। সেরকম কিছুর দেখা মিলল না যদিও। গাড়ি চলতে শুরু করলে উঁচু-নিচু রাস্তা দিয়ে যে যাচ্ছি, সেটা বোঝা যাচ্ছে বেশ। কারণ, ঝাঁকুনির প্রাবল্য। মাঝে মাঝে শুকনো পাতার উপর দিয়ে গাড়ি চলার শব্দ আসছে। সেই অর্থে দেখতে গেলে আমার প্রথম পুরুলিয়াকে দেখা হয়ে যাচ্ছে মনে মনে। অন্ধকার চোখে। অনুভব করার চেষ্টা করছি, এবং সম্ভবত ঠিকই ভাবছি যে, এই মুহূর্তে গাড়ি চলেছে একটা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে।

গাড়ির কেউ কোনও কথা বলছে না আর। নিজেদের মধ্যেও নয়। প্রায় ঘন্টাখানেক গাড়ি চলার পর আচমকা থেমে গেল একটা ব্রেক কষে। আলো আমার আলো! চোখের ঠুলি সরিয়ে দিতেই রোদ্দুর ঝাঁপিয়ে পড়ল দৃষ্টিতে। বেলা তখন খানিকটা বেড়েছে; যদিও বাতাসে হিমভাব অনেকটাই বেশি এখানে। বেশ শিরশির করছে সারা শরীর। গাড়ি থেকে নামানোর পর যে গ্রামের দিকে এগিয়ে গেলাম, তাকে ঠিক ছবির মতো বলা যায় না; অথচ কী ভীষণ শান্ত, স্নিগ্ধ! একজন ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন হেঁ হেঁ করে। ইনিই বাবুরাম লোহার। থাকার ব্যবস্থা হয়েছে বাবুরামদার বাড়িতেই। বাড়ি মানে, মূল বাড়িটার পাশেই আরেকটা ছোট মাটির ঘর, সেখানে। ঘরে নিয়ে যেতে দেখলাম আসবাবপত্র কিছুই নেই, শুধু একটা চাটাই পাতা আর একপাশে ডাঁই করে রাখা কিছু শতরঞ্চি, কম্বল এইসব। নিজেকেই ব্যবস্থা করে নিতে হল। খাবার আসবে বাবুরামদার বাড়ি থেকে। আর বাদবাকি যা সব কাজকর্ম, নিজেই করব। যে ঢাকি পরিবার মাওবাদী দলে নাম লেখানোর পরেও ফিরে এসেছে আবার পুরনো পেশায়, তাদের সঙ্গে কখন দেখা হবে জানা নেই। কিন্তু আজ যে হবে না, সেটা পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলেন বাবুরামদা। সুতরাং কী আর করা। “গ্রামটা একটু ঘুরে দেখতে পারি?” প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই সাবধানবাণী চলে এল, “খবরদার বাইরে কোথাও যাবেন না। যেখানে যাবার হয়, আমাদেরকে বলবেন। আমরা নিয়ে না গেলে আপনি একা একা কোথাও যেতে পারবেন না…” কারণ জিজ্ঞেস করতেই উত্তর এল, নিয়ম নেই! খানিকটা আশ্চর্য হয়ে বারান্দার দিকে তাকাতেই যেন কথা ঘুরানোর মতো বলে উঠলেন, “আর আপনার যা গায়ের রঙ, দেখে যে কেউ বুঝতে পারবে আপনি এ গায়ের নন বটে। তাই সবার ভালর জন্যই বলছি, জিজ্ঞেস না করে কোথাও যাবেন না।”

একটা চাপা টেনশন কাজ করছে ভিতরে ভিতরে সবারই, বুঝতে পারছি বেশ। যদিও গ্রামের বাদবাকি চালচলনে তার কোনও প্রভাব নেই। মানে, অন্তত এখনও অবধি নেই। ছোটখাটো দোকান। পাশে বিশাল মাঠ। কিছু মাঠ জমি থেকে উঁচুতে; কিছু মাঠ বেশ নীচে। গ্রামের সামনে দিয়ে চওড়া বড় একটা রাস্তা। তার বেশিরভাগ জায়গাতেই পিচ হলেও লাল ধুলো ঢেকে দিয়েছে সেই পিচের কালো রং। রাস্তার ওপারে ঘন শালের জঙ্গল। রাস্তাটা উপরে উঠে গেছে ক্রমশ।

(ক্রমশ)

 

ঋণ:

শ্রীঅনিলবরণ ঘোষ
শ্রীনন্দদুলাল আচার্য
শ্রীধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে
শ্রীরামদাস টুডু রেস্কা
আর পুরুলিয়ার সেই সমস্ত মানুষেরা, যাদের নাম এখানে আছে বা নেই।

শুভদীপ চক্রবর্তী
+ posts

পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহর বাটানগরে। নঙ্গী হাই স্কুল সাক্ষী এইসব দিনের। পরবর্তীতে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে পড়ার পর জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে ঘোরাঘুরি গ্রাম বাংলার নানান প্রান্তে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। পরে কিছুদিন জনসংযোগের কাজ; কিছুদিন সাংবাদিকতা।

প্রথম কবিতার বই 'ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া সব ঢেউগুলো' ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে। পরের বছর 'নিবিড়' থেকে ব্যক্তিগত গদ্য সংকলন 'যতটুকু দৃশ্যে ছিল'। শখ বলতে খেলা দেখা, সিনেমা দেখা, কাছে বা দূরে যেখানেই হোক ঘুরে বেড়ানো। বিকেল বেলা স্টিমারে চেপে গঙ্গা পারাপার। আলমারিতে বই গোছানো নিয়ে খিটখিটে আজীবন। না-পারার তালিকা লম্বা ভীষণ...

3 thoughts on “অভিমানভূম। প্রথম দর্শন : এক অপার্থিব লা লা ল্যাণ্ড। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

  1. বাহ দারুন। টানটান। আমিও শীতের সকালে গ্রামটায় যাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকলাম। অনন্ত শুভেচ্ছা।

  2. মানভূম শব্দ একান্ত ব্যক্তিগত অনুষঙ্গে বুকের মধ্যে ঢেউ তোলে। ‘অভি’ যোগে সেই শব্দ যখন কোনো লেখার শিরোনাম হয়, নিমেষেই তা অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ তৈরি করে। টানটান গদ্যে চমৎকার শুরু করেছেন লেখক, পাঠককে কৌতূহলী করে তোলার উপাদানও যথেষ্ট আছে। একটা কথাই বলার; ‘দেহাতি উচ্চারণ’ উল্লেখ করে মান্য বাংলায় সংলাপ লিখলে মানভূমের ছায়াটাই ফিকে যায় লেখায়। লেখক যদি মানভূম উপভাষা রপ্ত করে সংলাপ লেখার কষ্টটুকু স্বীকার করেন তাহলে শিরোনামের প্রতি সুবিচার হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *