অকূলের কাল। পর্ব ৫৯। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
খ্যাতির উদয় এবং অস্ত
হস্টেল-জীবন আবার ফিরে পেয়েছে ক্ষিতি। তার মধ্যে মজে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। দক্ষিণবঙ্গের সব জেলা থেকেই শিক্ষার্থীরা এসেছে। সংখ্যায় প্রায় অর্ধশত। সকলেই অনূর্ধ্ব তিরিশের তরুণ। তাদের মধ্যে সম্ভবত ক্ষিতিই বয়ঃকনিষ্ঠ এবং একমাত্র বিবাহিত। কলেজের অধ্যাপকরা হরেক বিষয়ের ক্লাস করাচ্ছেন, পাঠ্যপুস্তক কিছু নেই। তাঁরা নোটস দিচ্ছেন। কৃষি, পশুপালন ও চিকিৎসা, সেচ, সমবায়, সমষ্টি-উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে। ট্রেনিং শেষ হলে পরীক্ষা হবে। চাকরি হওয়া না-হওয়ার সঙ্গে সেই পরীক্ষার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা কেউ জানে না, কিন্তু তাতে পাশ করতে না পারলে চাকরি ফস্কে যেতে পারে সেটা সবাই স্বতঃসিদ্ধ ভেবে নিয়েছে। ক্ষিতিকে ঘিরে কলেজ হস্টেলের মতোই যে একটা অনুরাগী বন্ধুবৃত্ত গড়ে উঠল মাস খানেকের মধ্যেই, তার প্রথম কারণ তার ক্লাস-নোটের খাতা।
অধ্যাপকদের মধ্যে কেউ বাংলায় নোটস দেন, কেউ বা ইংরাজিতে। বলা আছে, দুই ভাষাতেই উত্তরপত্র লেখা যাবে। তবুও বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর ধারণা, ইংরাজিতে লিখলে, এমনকি সে ইংরাজি ভুল হলেও নম্বর বেশি পাওয়া যাবে। গোড়া থেকেই ক্ষিতির অভ্যেস বাংলা নোটকে ইংরাজিতে অনুবাদ করে নিজের খাতায় লেখা। অতএব তার খাতা নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে গেল। আর আত্মপ্রসাদের এমন হেতু পেয়ে ক্ষিতিও উদারহস্তে তার খাতা বিলোতে লাগল।
হস্টেলজীবনের স্বাদে আর একটা নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে এবার। সপ্তাহকাল বিরহের শেষে কলকাতা যাওয়ার টান। এর মধ্যেই প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে ক্ষিতি সঙ্গে দুজন শাড়ি-বিশেষজ্ঞ বন্ধুকে নিয়ে তাঁতিপাড়ায় গিয়ে তার কর্তব্য পালন করে ফেলেছে। বন্ধুরা জানিয়েছিল, মহাজনের কাছ থেকে সুতো এবং শাড়ি বোনার বরাত পায় তাঁতিরা। বোনা হলে শাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসে মহাজনের গুদামে। তাদের প্রাপ্য কেবল মজুরি। তার মধ্যেই তারা সুতো বাঁচিয়ে এবং কিনে দু-চার খানা নিজেরাও বিক্রি করে। তাদের কাছে দেখেশুনে কিনতে পারলে বাজারের থেকে সস্তা হয়। সেইমতোই দুটি শাড়ি কিনেছে ক্ষিতি। একখানা পঁয়তাল্লিশ টাকার সরু জরি পাড়ের ১২০/১০০ সুতোর মিহি নীলাম্বরী, আর একখানা পনেরো টাকার সবুজ শান্তিপুরি। দুটো শাড়িই খুব পছন্দ হয়েছে দোলনের। প্রথমটা পরে সে বাইরে বেরোবে আর দ্বিতীয়টা ঘরে পরবে। ঘরে পরার আর একটা শাড়ি পরের মাসেই কিনবে ক্ষিতি। ঘরেবাইরে বেশ প্রশংসা পাচ্ছে সে। হস্টেলে ক্লাস-নোটের প্রশংসা, হাতিবাগানে দিদির বাড়িতে শাড়ি কেনার প্রশংসা।
ফুলিয়ার কর্মী-প্রশিক্ষণ কলেজে কেবল ছেলেরাই ট্রেনিং নিচ্ছে না, নিচ্ছে মেয়েরাও। তবে মেয়েদের বিভাগ আলাদা, হস্টেলও আলাদা। ছেলেদের মধ্যে ক্ষিতি যেমন বয়ঃকনিষ্ঠ, তেমনি বয়োজ্যেষ্ঠ হলো গোপাল দেবনাথ। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ছেলে, বয়স তিরিশ ছুঁয়েছে। বেশ মুরুব্বির মতো হাবভাব। ক্ষিতির মতো তারও একটি অনুরাগী বন্ধুমহল হয়েছে। কারণ সে একজন উঠতি নাট্যকার। চিৎপুরের কোন এক যাত্রাদল নাকি তার লেখা পালা নামিয়ে বেশ নাম করেছে। আর এই গোপাল দেবনাথের কারণেই ক্ষিতির কপালে অপ্রত্যাশিতভাবে জুটে গেল তিন নম্বর খ্যাতি।
কেবল শিক্ষণ নয়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও এই কলেজ যে কম অগ্রণী নয় – সেটা শিগগিরই প্রকাশ পেল। প্রজাতন্ত্র দিবস সামনে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক ঠিক করলেন এই উপলক্ষে ছোট একটি নাটিকা মঞ্চস্থ করা হবে। সেই নাটিকার বিষয় হবে এক তরুণকে নকশালি পথ থেকে সরিয়ে এনে অহিংসা ও শান্তির পথে ফেরানো। দেবনাথের নাম অধ্যাপকের কানে গিয়েছিল। তিনি তাকে সেই নাটিকা লেখার বরাত দিলেন। দেখা গেল দেবনাথের এলেম আছে। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে সে বাঁধা গতে নামিয়ে দিল নাটকটি। মূল চরিত্র দুটি। এক নকশাল তরুণ এবং এক অধ্যাপক। গান্ধিজির জন্মদিন পালনের অনুষ্ঠানে আচমকা ঢুকে পড়বে তরুণ। ঢুকেই সে গান্ধিজির ছবি ইত্যাদি ভাঙচুর শুরু করবে, ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ ইত্যাদি শ্লোগান দেবে। সামান্য বক্তৃতাও দেবে। সভায় উপস্থিত অন্যরা তাকে পাকড়াও করে পুলিশের হাতে তুলে দিতে চান। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন যে অধ্যাপক তিনি তাতে সম্মত না হয়ে সেই তরুণের সঙ্গে বাকযুদ্ধ শুরু করবেন। ডিবেট শেষে ছেলেটি নিজের ভুল বুঝতে পারবে। তখন অধ্যাপক তাকে ধর্মান্তরিত করবেন। হিংসাধর্ম থেকে অহিংসাধর্মে।
নাটক পড়ে অধ্যাপক সন্তুষ্ট। নাট্যকার গোপাল দেবনাথই নাটকের পরিচালক। অধ্যাপকের চরিত্রে অধ্যাপক স্বয়ং। এবার দরকার নকশাল তরুণের ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য একজন ভালো অভিনেতা। সিদ্ধান্ত হয়েছে অভিনয়ের জন্য কোনো মঞ্চ তৈরি হবে না। অভিনেতাদের কোনো মেক-আপ থাকবে না, এমন-কি কলেজের হলঘরে অনুষ্ঠিত প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে আগত সাধারণ শ্রোতা-দর্শকদের জানানোও হবে না যে সেখানে কোনো নাটক অভিনীত হতে যাচ্ছে। পথ-নাটিকার ঢঙ-ও হবে, আবার অভিনয় ভালো হলে লোককে চমকে দেওয়াও যাবে।
ঠিক হলো নকশাল তরুণের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য ইচ্ছুক ছেলেদের অভিনয়-পরীক্ষা নেওয়া হবে। নাটকের পরিচালক, দেবনাথই সেই পরীক্ষা নেবে। পরীক্ষা সামান্য, তরুণের একটি লম্বা সংলাপ পাঠ করতে হবে।
ক্ষিতির অভিনয়ের সামান্য পূর্ব-অভিজ্ঞতা ছিল। স্কুলে সুকুমার রায়ের নাটকে পাগলা দাশুর ভূমিকায় একটুখানি, পাশের গাঁয়ের যাত্রাদলে এক সেনাপতি আর নিজের গ্রামের দলে খোদ নায়ক, এক উপজাতি সর্দারের ভূমিকায়। কোনটাতেই তার অখ্যাতি হয়নি, বরং সর্দারের ভূমিকায় অতি-অভিনয়ের জোরে ‘রৌপ্য পদকের পরিবর্তে’ বেশ কয়েকটি এক টাকার নোট-প্রাপ্তি ঘটেছিল। তবুও দেবনাথের নাটকে অভিনয় করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার প্রথমটায় জাগেনি। সত্যি বলতে কি, অধ্যাপকের যতই পছন্দ হোক, দেবনাথের পাঠ্যপুস্তকীয় নাটকটি তার কাছে হাস্যকর ঠেকেছিল। কিন্তু অভিনয়-পরীক্ষার প্রস্তাব শুনেই তার মন নেচে উঠল। পাঠ্যসূচিহীন যেকোনো পরীক্ষার প্রতি তার আজন্ম দুর্বলতা। তেমন পরীক্ষার সুযোগ পেলে সে ছাড়তে পারে না কিছুতেই। কাজেই দেবনাথের পরীক্ষার আসরে গিয়ে সে হাজির হলো এবং তার আবেগময় কণ্ঠস্বরের তুবড়িতে অন্য প্রতিযোগীরা স্রেফ উড়ে গেল।
নির্দিষ্ট দিনের সকালে কলেজের হলঘরে নাটিকা শুরু হতেই প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে গেল চমক। দু-চার জন তো আতঙ্কে হলঘরের দরজার দিকে দৌড় লাগিয়েছিলেন। কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁদের আশ্বস্ত করে ফিরিয়ে নিয়ে এল। অভিনয় শেষ হতেই প্রবল হাততালি।
পরের দিন ক্লাস নিতে এসে সেই অধ্যাপক বললেন, ছেলেটির অভিনয়প্রতিভা দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি। ক্রোধের অভিব্যক্তি যেন তার সারা অবয়ব থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল।
শরীরে ক্রোধের অভিব্যক্তির গোপন রহস্যটি কেবল ক্ষিতিই জানে। অভিনয়-মঞ্চে একা উঠলেই তার হাতপা কাঁপে। প্রবেশ-দৃশ্যে সে ছিল একক অভিনেতা। তাই সংলাপ বলতে বলতে সে যখন ভাঙচুর করছে, তার হাত-পায়ের পেশি তখন অনৈচ্ছিক ক্রিয়ায় কাঁপতে শুরু করেছে। অধ্যাপক সেটাকেই ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ভেবে নিয়েছেন। আর এই অন্যায্য প্রশংসা চুপচাপ হজম করে নেওয়াটাই কিছুদিন পরে ক্ষিতির নেমেসিস হয়ে দাঁড়াল।
হাতের কাছে এমন প্রতিভাবান অভিনেতা আর দক্ষ নাট্যকার পেয়ে নাট্যমোদী অধ্যাপকের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়ে গেল। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক মঞ্চস্থ করার পরিকল্পনায় মেতে উঠলেন। মেয়েদের হস্টেলটি ছেলেদের হস্টেলের পাশাপাশি হলেও দুই হস্টেলের মাঝখানে এক দুর্লঙ্ঘ প্রাচীর। অভিনেত্রীর সন্ধানে সেই প্রাচীর ডিঙোলেন অধ্যাপক। পরাধীন ভারতের এক প্রখ্যাত সশস্ত্র বিপ্লবীর জীবনকাহিনির আদলে দেবনাথের একটি পূর্বরচিত নাটক ছিল। অধ্যাপক সেটিকেই মঞ্চস্থ করা স্থির করলেন। বিপ্লবীর চরিত্রে ক্ষিতি, বলাই বাহুল্য। নাটকটিতে তিনটি স্ত্রী-চরিত্র ছিল। তার মধ্যে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সে বিপ্লবী নায়কের বিপ্লব-সহচরী। যেহেতু বিপ্লবীর জীবনে দেশপ্রেম ছাড়া অন্য কোনো প্রেমের অস্তিত্ব বাতুলকল্প, অতএব দেবনাথ তার নাটকে তাকে বিপ্লবীর ভগ্নী-প্রতিম করে সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষা করেছিল। তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। নাটকের শেষ দৃশ্যে পুলিশের গুলি খেয়ে বিপ্লবী মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর সহচরী তার মাথাটি নিজের কোলে তুলে নেবে। মহিলা শাখার অধ্যক্ষা বললেন, – ভাইবোন হলেও স্পর্শদোষ ঘটানো চলবে না।
সুতরাং মরার পর বিপ্লবীকে মাটিতেই পড়ে থাকতে হবে যতক্ষণ না তার সহবিপ্লবীদের শ্রদ্ধা ও শপথ-সংলাপ শেষে মঞ্চের পর্দা নেমে আসে।
নাটকের রিহার্সাল চলছে প্রতি সন্ধ্যায়। মেয়ে তিনটিকে নিয়ে অধ্যক্ষা ছেলেদের হলঘরে চলে আসেন এবং খর চোখে তাদেরকে পাহারা দেন। নায়িকাটি শ্যামলবরণ, কোঁকড়ানো চুল, আঁখিতারায় যথেষ্ট বিদ্যুৎ। নেহাত ক্ষিতির জীবন তখনও দোলনময়, নইলে অধ্যক্ষার পাহারা কতোটা ফলপ্রসু হত কে জানে!
অবশেষে এক বসন্ত-সন্ধ্যায় শুরু হলো নাটক। শুরুটা খারাপ হয়নি। তারপর নাটক যতই এগোয়, ক্ষিতি সংলাপ ভুলতে থাকে। আর প্রম্পটারের গলা যতই উঁচুতে ওঠে, ততই সে মিইয়ে যেতে থাকে। অতি-অভিনয়ের প্রবণতা থেকে সে নেতি-অভিনয়ে ঢুকে পড়তে থাকে ক্রমশ।
তারপর শেষ দৃশ্যে পুলিশের গুলি খেয়ে হাঁটু গেড়ে পড়ে যাওয়ার সময় তার একটি হাঁটু মঞ্চের কাঠের পাটাতনে লাগানো একটি পেরেকের উপর পড়ে। এদিকে তার সহচরীর শ্রদ্ধা-বিলাপ আর শেষই হয় না, পর্দাও নামে না। ক্ষিতি তো আর ক্ষত্রিয়-সন্তান নয় যে অনন্তকাল দেহের যন্ত্রণা চেপে রাখতে পারবে! অতএব পর্দা নেমে আসার আগেই মৃত বিপ্লবী পেরেকের উপর থেকে হাঁটু সরাতে গিয়ে আধশয়ান থেকে ধপাস করে পূর্ণশয়ান হয়ে যায়।
শোকের আবহে দর্শকের মৃদু হাস্যরোলে ক্ষিতির অভিনয়-খ্যাতি অস্তমিত হয়।
(ক্রমশ)
