অকূলের কাল। পর্ব ৫৬। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

(গত পর্বের পর)

সর্বজ্ঞানী দিগম্বর

কিছুক্ষণের মধ্যেই বিডিও ক্ষিতির থাকা-খাওয়ার সমস্যা মিটিয়ে দিলেন। যেসব কর্মচারীর দূরে বাড়ি, তারা দুটো কোয়ার্টারে ভাগাভাগি করে থাকে। খাওয়াদাওয়া চলে মেস-ব্যবস্থায়। ক্ষিতিকে সঙ্গে করে মেসে নিয়ে গিয়ে অল্পবয়সি বিডিওটি তাকে ভিড়িয়ে দিলেন অন্য কর্মীদের সঙ্গে। তাদের মাঝে একটা তক্তপোশ জুটে গেল তারও। তার সঙ্গে বেডিং নেই বলে এদিক ওদিক থেকে একটা শতরঞ্চি, চাদর আর বালিশও পাতা হয়ে গেল সেই তক্তপোশের উপরে। এক ঘণ্টা আগেও অন্ধকার মাঠের মধ্যে পথ হাতড়াচ্ছিল যে-ক্ষিতি, এই মুহূর্তে তার জন্যে রাজশয্যা প্রস্তুত! সেরকমই মনে হচ্ছিল তার। ভোজবাজির মতোই এই জীবন। ক্ষণে ক্ষণে কেমন রঙ বদলায়। নিরুদ্বেগ পরিশ্রান্ত শরীর এলিয়ে পড়তে চাইছিল। কিন্তু তখনও খাওয়া বাকি।

সকলের সঙ্গে খেতে বসে জানা গেল, সেদিন সকালে একই গোত্রের আরও পাঁচজন শিক্ষানবিশ যোগ দিয়েছে অফিসে। তাদের বাড়ি খুব দূরে নয়, অফিস শেষে বাড়ি চলে গেছে সবাই। খাওয়া শেষ হতে এমনই ঘুম এল যে দোলনের মুখটাও ভাবতে সময় পেল না ক্ষিতি। পরদিন সকালে উঠেই পরিষ্কার হয়ে বটতলার চায়ের গুমটির বেঞ্চিতে গিয়ে বসল। গত রাতের বকেয়া চা খেতে খেতে ঠিক করে ফেলল, এখনই একবার বিডিওর কোয়ার্টারে যাবে। কাল রাতে তাঁর ব্যবহারে বেশ ভরসা পেয়ে গেছে। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার ছুটি এখনই মঞ্জুর করিয়ে নিতে পারলে সব চিন্তার অবসান।

চাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, সাহেব উঠে পড়েছেন। এক প্রস্থ চা খাওয়াও হয়ে গেছে তাঁর। ক্ষিতি গিয়ে ঢুকতেই একটু হাসলেন। বললেন, – ট্রেনিং-এ যোগ দেওয়ার অনুমতি চেয়ে একটা দরখাস্ত লিখে ফেলুন। সরকারি আদেশের একটা কপিও দরখাস্তের সঙ্গে দিয়ে দেবেন। তারিখ গতকালের। আজ এখনও তো অফিস শুরু হয়নি। তার আগে পর্যন্ত কালকের তারিখই বলবৎ।

সেটাই সরকারি নিয়ম নাকি বিডিওর স্রেফ রসিকতা ঠিক বুঝল না ক্ষিতি। যা-ই হোক, লঘুতার আভাস আছে ব্যাপারটার মধ্যে। উৎফুল্ল ক্ষিতি তাঁর কাছেই কাগজ চেয়ে নিয়ে দরখাস্ত লিখতে লিখতে ভাবল, পরীক্ষার গানটা গেয়ে রাখার উপযুক্ত সময় এটাই। দরখাস্ত তাঁর টেবিলে রেখেই বলল, – এই চোদ্দ তারিখেই আমার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে। তেরো থেকে দিন দশেকের ছুটি চাই।

সাহেব বললেন, – কী পরীক্ষা?

–বি এ।

–অনার্স আছে?

-হুঁ।

–কোন বিষয়?

–ইংরাজি।

শুনেই কেমন যেন উষ্ণ হয়ে উঠলেন তিনি। বললেন, – ইংরাজি সাহিত্য নিয়ে পড়ছেন, তাহলে এখানে এসে পড়লেন কেন! ট্রেনিং শেষে চাকরি হবে কি-না কেউ জানে না। হলেও কী-ই বা চাকরি! যান যান, গিয়ে পরীক্ষা দিন ভালো করে। অনেক ভালো চাকরির সুযোগ আসবে পরে।

ক্ষিতির গলায় মিনতির সুর এসে গেল। বলল, আমার কোনো উপায় নেই স্যার। ট্রেনিংও করতে হবে, পরীক্ষাও দিতে হবে।

বেশ কিছুক্ষণ ক্ষিতির মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন সাহেব। কী বুঝলেন কে জানে, দরখাস্তের উপরের দিকের কোণে তারিখসহ সই করে বললেন, – তাহলে যা পারেন করুন। কিন্তু জেনে রাখুন, ট্রেনিং পিরিওডে কোনো ছুটি হবে না। তেমন নিয়মই নেই।

ঈষৎ মনমরা ক্ষিতি চান-খাওয়া সেরে অফিস গেল। তবে সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। ঠিক জানে উপায় একটা বেরোবেই। অফিসে গিয়েই আলাপ হলো অন্য পাঁচ জন ট্রেইনির সঙ্গে। তারা ঝাঁক বেঁধে একই বাস থেকে নেমেছিল অফিসের সামনের রাস্তায়। তারা ছাড়াও আরও কয়েকজন। এই বাসটা মেদিনিপুর থেকে ছেড়ে মোটামুটি দশটায় লালগড়ে তার যাত্রা শেষ করে। আসার পথে ভাদুতলা থেকে উলটো দিকের অফিসযাত্রীদেরও কুড়িয়ে আনে। এই কারণে এই বাসটার নামই হয়ে গেছে অফিস বাস।

নতুন কারও সঙ্গে নিজের থেকে আলাপ করা ক্ষিতির স্বভাবের বাইরে। একবার আলাপ হয়ে গেলে ভিন্ন কথা, আপন করে নিতে সময় লাগে না। চন্দ্রকোনা রোডের বিকাশ আর গোদাপিয়াসালের রবীন দেখা গেল সদামুখর। ক্ষিতিকে বগলদাবা করে ফেলল প্রথম দিনেই। দ্বিতীয় দিনে রবীন জেনে নিল ক্ষিতির বিবাহের রোমাঞ্চকর ইতিহাস। এবং জেনে রামের হনূমানের মতোই প্রায়, ক্ষিতির ভক্ত হয়ে গেল। সুমন্তর বাড়ি আমলাগোড়ায়। একমাত্র সেই খুব কম কথা বলে। কিন্তু তার কথায় মজা এবং ওজন দুটোই আছে। ছয় ট্রেইনি মিলে বট গাছের তলায় আড্ডা আর গুলতানির ট্রেনিং নিতে নিতে দিন দশেক কাটল। তারপর উপরমহল থেকে আদেশ এল – এবার ট্রেইনিদের ভূমি রাজস্ব অফিসে পাঠানো হোক সেই অফিসের কাজকর্মের জ্ঞান আহরণ করতে। ততদিনে ক্ষিতির সমস্যা আর তার একার নয়, হয়ে গেছে সকলেরই। বিশেষত রবীনের। সে ক্ষিতিকে বলল, – তুই আজকেই কলকাতায় পালা। পরীক্ষা দিয়ে ফিরে আয়। কাউকেই কিচ্ছুটি বলতে হবেনি। জেএলআরও অফিসের জ্ঞান আমরা ছাঁদা বেঁধে তোর জন্যে নিয়ে আসব।

সুমন্ত বলল, – নিশ্চিন্তে চলে যাও। ট্রেনিং-এর নামে আমাদের ঘাস খেতে ছেড়ে দিয়েছে সরকার। গোয়ালে কোনোদিন তুলবে কিনা সন্দেহ। দেখছ আমাদের যাওয়াআসা নিয়ে কাউকে মাথা ঘামাতে অফিসে!

ক্ষিতি তো জানতই সময় এলে উপায় বেরিয়ে যাবে। তাকে তেমন কিছু ভাবতেই হলো না, তার সদ্যপ্রাপ্ত বন্ধুরাই তার ভার লাঘব করতে মুখিয়ে আছে। সেদিন নয়, পরদিন সকালেই রওনা দিয়ে সে বিকেলে পৌঁছে গেল শ্রীরামপুর। আসার পথ যেন আর ফুরতেই চাচ্ছিল না। আজ নিয়ে পাক্কা বারো দিন সে দোলনকে ছেড়ে আছে। যতদিন পর্যন্ত আসার দিন ঠিক হয়নি, মন তেমন উতলা হয়নি। কিন্তু গতকাল সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই আকুলতার ঢেউ বইছে শরীরমনে। শ্রীরামপুর স্টেশনে নেমে একটা বাজে সম্ভাবনার কথা মাথায় আসতেই থমকে দাঁড়াল সেসব ঢেউ –পতু নেই, উড়নচণ্ডী দিগম্বর যদি বাড়ি না থাকে! যদি গিয়ে দেখে ঘর তালাবন্ধ!

স্টেশনে নেমে রিক্সা নিল ক্ষিতি, মাথায় দুশ্চিন্তা। ঘরের সামনে নেমেই দেখে কড়ায় ঝুলছে তালা। তবে তালার দুলুনি তখনও থামেনি, তার চাবি সবে ঢুকছে দিগম্বরের পকেটে। ক্ষিতিকে দেখেই একগাল হাসল। তারপর চাবিটি ক্ষিতির হাতে তুলে দিয়ে একটি মাত্র বাক্য হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল দিগম্বর, – অপেক্ষা কর।

ক্ষিতির কাছে সেই অপেক্ষা অনন্তের কাছাকাছি ঠেকলেও প্রকৃত হিসাবে এক ঘণ্টা পরেই সারা শরীরে আলো জ্বেলে দোলন ঢুকে পড়ল ঘরে। ঢুকেই ঘরের ছিটকিনি লাগিয়ে আছড়ে পড়ল ক্ষিতির শরীরে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠোঁট কোনরকমে ফাঁক করে ক্ষিতি জিজ্ঞেস করল, – দিগম্বর?

অস্থির শ্বাসবায়ুর ফাঁকে অধৈর্য-কম্পিত স্বরে দোলন বলল, – কোথায় যেন কাজ আছে বলল, আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।

কী অসাধারণ কর্তব্যবোধ! কী অতুলনীয় সময়জ্ঞান! কৃতজ্ঞ ক্ষিতি বেলাগাম হয়ে দোলনের নিরাবরণ ত্বকে ফুটে ওঠা পদ্মকাঁটার স্বাদ নিতে মগ্ন হলো। বিরহের ভেলা রকেটের মতো এই বস্তাপচা গ্রহের টান ছাড়িয়ে তাদের নিয়ে গিয়ে ফেলল অন্য এক অপরূপ গ্রহে।

সময়জ্ঞান লুপ্ত হয়েছিল। বাইরে কড়া নড়ে উঠতেই ক্ষিতি দেখে রাত দশটা বেজেছে। ভদ্রস্থ হয়ে দরজা খুলতেই দিগম্বরের সঙ্গে ঘরে ঢুকে পড়ল গরম খাবারের সুবাস। তার দু’হাতে ঝুলছে খাবারের বড় বড় প্যাকেট। বিরহ এবং খিদে যে আদতে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ – সেই অনুভবে ঋদ্ধ হয়ে উঠল ক্ষিতি এবং দোলন, দুজনেই।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply