অকূলের কাল। পর্ব ৫৩। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
ভাগ্যবানের বোঝা
দোলনকে একা রেখেই একদিন হস্টেলে গেল ক্ষিতি। মনোজিৎদার কাছে। সদ্য চাকরি পেয়েছে রাইটার্সে। ক্লার্কশিপ দিয়ে। ক্ষিতির দু-বছর আগের প্যানেল তামাদি হয়ে গেছে। এবার ডব্লিউ বি সি এসেও মনোজিৎদা খুব ভালো করেছে। এ গ্রুপের যেকোনো একটা চাকরি পাবেই। ক্ষিতির নিজেরও এখন চাকরির দরকার খুব। বিয়ে ফাইনাল হয়ে যাক, তারপরে মন লাগিয়ে ডব্লিউ বি সি এসে বসবে।
কিছুক্ষণ এসব কথাই হলো। মনোজিৎদা বলল, জানো আমি বিসিএসে জয়েন করতে চলেছি জেনে অফিসে আমার খাতির বেড়ে গেছে। সহকর্মীদের কেউ কেউ তাদের করা ড্রাফট আমাকে দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
বেশি কথা হলো ক্ষিতির নবদাম্পত্য বিষয়ে। দোলনের সাহসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ মনোজিৎদা। বাৎস্যায়নকৃত আসনের প্রয়োগ হচ্ছে কিনা জানার খুব কৌতূহল। ক্ষিতি সে-ব্যাপারে গভীর সংশয়ে। এখন তারা দুজনেই কেবল খাবি খেয়ে চলেছে। কাজেই সে কায়দা করে এড়িয়ে গেল প্রসঙ্গটা।
ফেরার পথে হরি ঘোষ আর গ্রে স্ট্রীটের মোড়টায় আচমকাই দেখা হয়ে গেল বিশুদার সঙ্গে। সে গ্রে স্ট্রিটের ফুটপাথ ধরে হনহন করে শোভাবাজারের দিকে হাঁটছিল। বিশুদা অমিয়র বাবার খুড়তুতো ভাই। অনেকগুলো ভাই ওরা। প্রায় সকলেরই সাহেবদের মতো চামড়া আর চুল। ব্লন্ড। চোখ অবশ্য নীল নয়। কয়েকজন গ্রামে থাকে চাষবাস নিয়ে। বাকি কয়েকজন এদিকওদিক নানা পেশায় নিজেদেরই উদ্যোগে। বিশুদা কলকাতায় একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। বিয়ে করেছে প্রেম করে। কলকাতার মেয়ে, এই পাড়াতেই। অমিয় চেনে। আসে মাঝেসাঝে।
ক্ষিতির ঘটনা বিশুদা শুনেছে। নিশ্চয়ই অমিয়র কাছে। এখন ক্ষিতি কোথায় থাকছে বউ নিয়ে – সেসব জানতে চাইল। সব শুনে বিশুদা বলল, – দোলন তো খুব অসুবিধের মধ্যে আছে তাহলে। বড়লোক বাড়ির মেয়ে। তুমি এক কাজ করো। গরানহাটায় মিনার্ভা থিয়েটারের পিছন দিকটায় আমার একটা ঘর ভাড়া নেওয়া আছে। কিন্তু কৃষ্ণা বাপের বাড়িতেই থাকছে। বাধ্য হয়ে আমাকেও সেখানে থাকতে হচ্ছে। শ্বশুর মারা গেছে। শাশুড়ির একটাই মেয়ে। ভাই দুটো ছোট। খুব তাড়াতাড়ি যে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে আসতে পারব তেমন সম্ভাবনা নেই। তুমি বউ নিয়ে দিব্যি থাকতে পারবে আমার ঘরটায়। বড় ঘর একটাই – বলতে বলতে থেমে গেল বিশুদা। তারপর আবার বলল, – দেখাই যখন হয়ে গেল, চলো এই তো সামনেই। দেখিয়ে দিই তোমাকে। পছন্দ হয়ে গেলে ঘরের চাবি আজই দিয়ে দেব তোমাকে। না থেকেও আমাকে ভাড়া গুনতে হচ্ছে। তোমরা থাকলে ক্ষতিটা গায়ে লাগবে না।
ক্ষিতিকে সঙ্গে নিয়ে মিনার্ভা থিয়েটারের পিছনের দিকে একটা গলিতে ঢুকল বিশুদা। পকেট থেকে চাবি বের করে খিড়কির ভাঙাচোরা দরজার তালা খুলল। খুলতেই কলতলা, বাথরুম। এটা বাড়ির পিছন দিক। ভাড়ার অংশটিতে এদিক দিয়েই ঢুকতে হয়। কলতলার পাশে সরু সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে বাঁদিকে এক বারান্দা। বারান্দা দিয়ে এগিয়ে একটা ঘরের তালা খুলল বিশুদা। ক্ষিতিকে বলল, – ভেতরে এসো।
ভেতরে ঢুকেই ক্ষিতি মুগ্ধ। বেশ বড় ঘর। একটা বিশাল খাট। তাতে গদিওলা বাহারি বিছানা। ধপধপে চাদর-বালিশ। না থাকলেও বিশুদা নিয়মিত তদারকি, ঝাড়পোঁছ করে যায় নিশ্চয়ই। খাটের পাশেই বিরাট আয়না লাগানো সাজের টেবিল। ক্ষিতির মনে হলো এ ঘর তো শহুরে কেতায় তার শালাদের বাড়ির কাছাকাছি। দোলন খুব খুশি হবে দেখলে।
বারান্দার কোণটি ঘিরে দিয়ে ছোট্ট একটি রান্নাঘরও করা আছে। বাথরুমটি কেবল নীচে। তা হোক, বারোয়ারি তো নয়।
বিশুদা জিজ্ঞেস করল, – কেমন?
ক্ষিতির চোখে কৃতজ্ঞতা। বলল, – খুব ভালো বিশুদা।
ঘরে তালা দিয়ে চাবির গোছা ক্ষিতির হাতে তুলে দিয়ে বিশুদা বলল, – পারলে কালই চলে এস – বলে অন্তরখোলা হাসি হাসল বিশুদা। ক্ষিতির চোখে চিরকালের জন্য আঁকা হয়ে গেল সুন্দর সেই হাসিমুখ।
এক সপ্তাহ বস্তিবাসের পর ক্ষিতি-দোলন উঠে এল বিশুদার ভাড়া ঘরে। দোলন খুব খুশি। এ তার নিজস্ব পরিবেশ। খবর পেয়ে তাদের দেখতে এল জলি ভেলি নেটকি। দুটো নতুন শাড়ি উপহার পেয়ে খুব সুবিধে হলো দোলনের। একদিন এল বিশু আর গোলোক। ক্ষিতি তাদের চোখে হিরো। চালচুলোহীন হয়েও যে একটি ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে বড়লোক বাড়ি থেকে ছিনিয়ে এনে সংসার পেতে বসতে পারে সে হিরো ছাড়া কী! দোলন তার শিক্ষায়ত্ত একমাত্র ‘স্পেশাল ডিশ’ – ছাঁকা তেলে ভাজা চিঁড়েয় নুন-গোলমরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে তাদের আপ্যায়ন করল। আগের দিনই সে একই জিনিস জলিদের খাইয়ে খুব সুখ্যাতি পেয়েছে। ওরা তো নিজের লোক। বরের বন্ধুদের প্রশংসা আরও বিগলিত করল তাকে।
গরানহাটায় মোটামুটি ভালোই চলছে জীবন। ক্ষিতি সকাল ছ’টায় বেরিয়ে পড়ে ছাত্র পড়াতে। খিদিরপুরে একটা আর ভবানীপুরে একটা। ফিরতে ফিরতে প্রায় বারোটা। ফেরার পথে ফরমায়েস থাকলে এবং পকেট একেবারে ফুটো না হলে টুকটাক কিছু কেনাকাটা। বাড়িতে ফিরে স্নান। রান্নায় এখন ভাত ও আলুসেদ্ধর সঙ্গে তৃতীয় পদ হিসাবে যুক্ত হয়েছে ডাল। তা সত্ত্বেও রান্না শেষ হওয়ার পর বেচারা দোলনকে বহুক্ষণ ক্ষিতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তারপর খাওয়া। একই পাতে দু’জন। বাসনের অভাব থাকলে কত যে সুবিধে সেটা যাদের অভাব নেই তারা বুঝবে না। খাওয়া শেষ হতে না হতেই বাসন ধোয়া সারা। তারপর বকম বকম পায়রা। নিরবচ্ছিন্ন। ডিনার তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। খুনসুটি করতে করতেই সকালের রান্নার অবশেষটুকু হাঁড়ি চেঁছে উদরে চালান হয়ে যায়।
রাত এতদিনে পরিপূর্ণ। তাদের যৌথ জীবনে দোলনের প্রথম চক্র শুরু হয়ে শেষ হতেই ভোজবাজির মতো খেলা পরিপূর্ণ হয়ে গেল। এতদিন ধরে বইপড়া বিদ্যা কোনো কাজেই আসছিল না। এখন তো খাটের পাশেই বিরাট আয়না। নিজেদের দেখা যায় সেই আয়নায়। বাৎস্যায়নের আসনে নব নব অ্যাডভেঞ্চার। ভবানীপুর থেকে ফেরার পথে এস এন ব্যানারজি রোড থেকে দামি কন্ডোম নিয়ে এসেছে ক্ষিতি। তবে আত্মবিশ্বাস এমনই বেড়েছে যে তার ব্যবহার খুবই সীমিত। ফলে সেই খরচ তেমন গায়ে লাগছে না।
সংসারের খরচ হিসেবের মধ্যেই থাকছে। ক্ষিতির রোজগার টিউশনি করে পঁয়তাল্লিশ। বউবাজারে গিয়ে দোলনের একটা আংটি বিক্রি করলে তিরিশ টাকা পাওয়া যায়। কাজেই দুজনের রোজগারেই মসৃণ চলছে সংসার। মসৃণতায় ছেদ পড়ে যায় মাঝে মাঝে। টিউশনির টাকা সময়মতো না পাওয়া গেলেই সমস্যা। টাকা ফুরিয়ে গেছে সেটা আগের থেকে খেয়াল না করলে সমস্যা গম্ভীর হয়ে যায়। তেমনই হলো একদিন।
সময়টা সন্ধে। দোলনের ভাঁড়ারে চাল আলু কিছুই নেই। দুপুরে বিশ্রামের সময় বিশেষ শ্রমে ক্লান্ত ক্ষিতিকে সেকথা জানাতে খেয়াল ছিল না দোলনের। ভেবেছিল, সন্ধেবেলায় বলবে। ক্ষিতির পকেটও যে ফাঁকা সে জানবে কীকরে! সন্ধেবেলায় কার কাছে ধার করতে ছুটবে ক্ষিতি? রাত্রে উপোস করে থাকা কি সম্ভব? বড্ড খিদে পায়, দুজনেরই। কী হবে তাহলে? দুজনে দুজনের দিকে আকুল চোখে চেয়ে আছে।
ঠিক এমন সময় সিঁড়ি বেয়ে পায়ের শব্দ উঠে এসে দরজার বাইরে থেমে গেল। পরক্ষণেই কড়া নড়ল। অসময়ে অতিথি? ক্ষিতি দরজা খোলে। দেখে অমিয়। আপাদমস্তক ঘর্মাক্ত। তার শরীরে ঝুলছে তিন খানা ভারী থলে। দু’হাতে দুটো, কাঁধ থেকে একটা। ঘরে ঢুকেই হাতের ব্যাগ দুটো নামিয়ে কাঁধেরটা ক্ষিতির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খিঁচিয়ে উঠল সে, – ধর না ব্যাগটা – হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস যে!
তাড়াতাড়ি ব্যাগটা নিয়ে ফাঁক করে দেখে সেটি চালে টইটম্বুর। বাকি দুটোর একটাতে গম, ডাল, চা আর চিনি। অন্যটাতে গুচ্ছের আনাজ। মাসখানেকের ভাত-রুটি আর হপ্তা খানেকের তরিতরকারি তার কাঁধে চেপে দিব্যি চলে এসেছে তার মামামামির ক্ষুধার্ত সংসারে। দোলন ততোক্ষণে একটা গামছা বাড়িয়ে দিয়েছে তার দিকে। বলল, – ইস, ঘেমে গেছ একবারে! মুছে নাও।
গামছা নিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে অমিয় আদেশ করল, – চা চাপাও মামি।
চা খেতে খেতে অমিয় মামামামির জন্য রসদ সংগ্রহের কাহিনি জমিয়ে বলতে শুরু করল। তার কলেজ সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ইভনিং। বলল, – আজ আর কলেজ গেলাম না বুজলি। শালা রতনটা গাদাখানেক রেশন কার্ড যোগাড় করে রেখেছে। মাল তোলে আর ব্ল্যাকে ঝাড়ে। আজ শালার গাঁড়ে লাথি মেরে দুটো ব্যাগ ভর্তি করলাম। তারপর বাজার ফাজার করে এখেনেই চলে এলম।
নিজের কৃতিত্বে মুগ্ধ হয়ে নিজেই মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসছে অমিয়। হাসতে হাসতেই বলল, – বুজলে মামি, রতন শালা আমার অফিসেই কাজ করে। বাগরি মার্কেটে অফিস। শালা মালিকটা এক নম্বরের হারামি। পাঁচটা লোক দিয়ে দশটা লোকের কাজ করায়। দু’টাকা মাইনে বাড়াতে গেলে শালার গাঁড় ফেটে যায়।
ক্ষিতি একটু লজ্জাই পাচ্ছে। অমিয়র মুখ খানিক কাঁচা। এইসব অপশব্দ পেরিয়ে তার শুদ্ধ মনটা পর্যন্ত পৌঁছতে পারছে তো দোলন?
(ক্রমশ)
