অকূলের কাল। পর্ব ৫২। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

(গত পর্বের পর)

নবদাম্পত্যের

জুন মাস পেরিয়ে যেতেই জামাইবাবুর উলটো সুর। বললেন, – আমি আর পুতুলের দায়িত্ব নিতে পারছি না। যা ঠিক করেছিলাম – সামাজিক অনুষ্ঠান – সেসব করা সম্ভব হচ্ছে না। তোর বউ, তুই নিয়ে যা। যেভাবে পারিস রাখ।

ক্ষিতি বিস্মিত। তার সামান্য খারাপ লাগছে। একটা মানুষ কথা বলে এক, দুদিন পরেই উলটো করে কীভাবে! আবার বেশিটাই ভালো লাগছে। দোলন এবার নিজস্ব হবে। কাছে পাবে সর্বক্ষণের জন্য। কোথায় থাকবে, কীভাবে চলবে – সেসব জটিল কথা নিয়ে ভাবছে না সে। এতদিন তার হয়ে অন্যরাই ভেবেছে যখন, এবারও তাই হবে।

জামাইবাবুর ভাবনার হদিশ কিছুটা পাওয়া গেল দোলনের কথায়। পঞ্চু বসাক তো বটেই, জামাইবাবুর নিজের ভাই বোন আত্মীয়রা – সবাই তাকে চাপ দিচ্ছে দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলার জন্য। জামাই তো দিব্যি আসছে রবিবার রবিবার। ঘরে ছিটকিনি তুলে কাটিয়েও যাচ্ছে দু-তিন ঘণ্টা করে। কিছু বেধে গেলে ও ছেলে যে বউকে ছেড়ে পালিয়ে যাবে না তার কোনো গ্যারান্টি আছে? তখন ভোলানাথ কি সারা জীবনের জন্যে শালির বোঝা ঘাড়ে নেবে!

ক্ষিতি বুঝল তাদের ছিটকিনি বন্ধ করারও কিছুটা অন্তত ভূমিকা আছে ভোলাবাবুর সিদ্ধান্তে। বেধে যাওয়ার মতো কিছু যে তারা করতে পারেনি সেটা কে আর বোঝাবে তাকে!

দোলন খানিক বিষণ্ণ। অনুষ্ঠান হলে তার ভালো লাগত। বিয়েটা শুদ্ধ হতো। কিছু গয়না-টয়না উপহারও পেত। জামাইবাবু নিজেই তো দু’ভরির দুটো বালা দেবে বলেছিল। এখন আর টুঁ শব্দ নেই। দোলন একটু চটেছে। বলল, – লোকের কথা শুনে জামাইবাবু বিশ্বাসঘাতকতা করল। তুমি দাদার কথামতো সেই এককাপড়ে বউ-ই পেলে! এই এক কাপড়টাও খুলে আমি ফেরত পাঠিয়ে দেব।

ক্ষিতি বলল, – তোমাদের বাড়িঘর গয়নাময় আর তুমি একটাও গয়না পাচ্ছো না। খারাপ লাগছে, বলো। আমার তো মুরোদ নেই গয়না কেনার।

দোলন সদর্পে বলল, – কোনো দরকার নেই গয়নার। ঘেন্না ধরে গেছে। তুমি শুধু কোনো একদিন একটা ঘড়ি কিনে দিও আমায়। খালি হাতে বেরোতে খারাপ লাগে।

এই ঘড়ির কথাটা অমোচনীয় থেকে গেল ক্ষিতির মাথায়।

সব শুনে নরজিত বলল, জামাইবাবু না করলে আমরা আছি। আমাদের কালীঘাট আছে। মামিকে শাঁখা-সিঁদুর পরিয়ে আনব সেখান থেকেই। কালীঘাট শুনেই মল্লিকার কথা মনে পড়ে গেল ক্ষিতির। পরের দিনই সে ছুটল তার বাড়িতে। মামুর বিয়ে বলে কথা! সব ব্যবস্থার ভার নিলেন মল্লিকার বাবা-মা। পরের দিনই ক্ষিতি নরজিত আর অমিয়কে সঙ্গে নিয়ে জামাইবাবুর বাড়ি থেকে দোলনকে ট্যাক্সিতে চাপিয়ে সোজা কালীঘাটে। মন্ত্রসহযোগে ক্ষিতিকে দিয়ে সিঁদুরদান করালেন মল্লিকার বাবা। তাকে শাঁখা পরালেন তার মা। সংক্ষিপ্ত বধূবরণও সমাধা করলেন তিনি। সব শেষ হতে সন্ধে। কচুরি-জিলিপি দিয়ে বিয়ের ভোজ সাঙ্গ করে ফেরা হলো নরজিতের কোয়ার্টারে।

দোলনের সঙ্গে হাতে ঝোলানো রঙিন কাপড়ের ছোট একটা ব্যাগ। বাপের বাড়ির শাড়ি সত্যি সত্যিই সে-বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে সে। দিদি তাকে তিন প্রস্থ শাড়ি-ব্লাউজ দিয়েছেন। ভালো শাড়ি একপ্রস্থ, সিল্কের – সেটা পরেই বিয়ে হলো। বাকি দু-প্রস্থ আটপৌরে শাড়ি তার ব্যাগে। সেই সঙ্গে ছোটখাটো দু-চারটে মেয়েলি ব্যবহারের জিনিস। একটা রুমালে বাঁধা পাঁচখানা সোনার আংটি দেখে ক্ষিতি হতবাক।

ঘরের মধ্যে তক্তপোশের বিছানা তাদের ফুলশয্যার জন্য ছেড়ে দিয়ে অমিয় আর নরজিত শুয়েছে বাইরের দিকের এক ফালি বারান্দায়। নামেই ফুলশয্যা, ফুলের কোনো চিহ্ন নেই কোথাও। তেমন প্রত্যাশা দোলনের ছিল কিনা কে জানে, ক্ষিতির মাথায় ছিল না। এখন ফুলেরই মতো পাঁচখানা হলুদ আংটি ছড়িয়ে আছে বিছানায়। ক্ষিতি বলল, – এক কাপড়ে আসার কথা – সেটাও ফেরত দিলে, আর আংটিগুলো নিয়ে এলে যে বড়ো!

দোলন বলল, – এগুলো আমাদের বাড়ির নয়। মামা আর মাসিদের দেওয়া। রেজিস্ট্রির আগেই এগুলো রুমালে বেঁধে জলির হাতে দিয়ে দিয়েছিলাম। আমার কাছে থাকলে হয়তো কেড়েই নিত।

ফুলশয্যার রাতটা কথা বলতে বলতেই কেটে গেল। আদর-টাদর কম। দোলন কেমন যেন আনমনা। মন খারাপ হলেও হতে পারে। বা ভবিষ্যতের আশংকা। ক্ষিতি ঠিক বুঝতে পারছে না। দিদির বাড়িতে সাক্ষাৎ নিশ্চিন্ত ছিল না। যেকেউ এসে দরজায় টোকা দিতে পারত। তবুও তারা উত্তাল হয়ে উঠত। অথচ এই নিশ্চিন্ত বিছানায় তাল কেটে গেছে কোথাও। না-বোঝা অস্বস্তি। নিদ্রাহীন কাটিয়ে ভোরবেলাতেই দোলন বাথরুমে ঢুকে একেবারে চান সেরে বেরিয়ে এল।

কেবল ওই ফুলশয্যার রাতটুকুই। পরের দিনেই ঠাঁই নড়ে গেল ক্ষিতির নবদাম্পত্যের। সে বউ নিয়ে কোয়ার্টারে শুনেই কোম্পানি নিজের হাতে হাল ধরে নিলেন। তাঁর হিটলারি-গোঁফের নড়বড়ে ছোট ভাইটির খিদিরপুর বস্তিতে একটি ভাড়ায় নেওয়া ঘর আছে। দেওয়ালের নীচের দিকটা ইটের, উপরের দিকটা চাঁচের, মাথায় টিন; মেঝে সিমেন্টের। বারোয়ারি পায়খানা-বাথরুম। ভাইকে বললেন, তুই আজ থেকে আমার বাড়িতে এসে থাক। নরজিতকে বললেন, – তুমি ক্ষিতিকে বউসহ বস্তির ঘরে তুলে দিয়ে এস। আপাতত এই ব্যবস্থা চলুক। ওরা অন্তত রান্নাবাড়া করে খেতে শিখুক নিজেরা। পরের ব্যবস্থা অবস্থা অনুসারে হবে।

দোলনের নিজের সংসার। বরের রোজগার ছেলে পড়িয়ে মাসে ষাট টাকা। চাল ডাল আলু দিব্যি কেনা যাবে। কিছু অসুবিধে হলে কাছেই থাকছে তার হুঁশিয়ার ভাগনে অমিয়। সে ক্ষিতির চাইতে এক বছরের ছোট হলেও নিজেকে মামার অনেক অভিভাবকের মধ্যে প্রধান ভাবে। কারণ, সে মাতৃভক্ত ছেলে আর তার মা তাকে কবেই বলে রেখেছেন, আমার ভাইটার খেয়াল রাখবি।

সংসার শুরু করতে গিয়ে প্রথমেই হোঁচট। দোলন জানে না কেমন করে রান্না করতে হয়। তাতে কী? ক্ষিতি তো জানে। সে বলল, আমি শিখিয়ে দিচ্ছি। এক বেলার ব্যাপার।

এই ঘরের আসল ভাড়াটিয়ার তো বউ নেই। নিজেই রান্না করে খান। মজবুত একটি রান্নাঘরও তৈরি করে রেখেছেন। তক্তপোশের চারটি পায়ার প্রত্যেকটির নীচে এক ডজন করে ইট বসিয়ে একতলা দোতলা করেছেন। উপরে বিছানাপাতা শোয়ার ঘর সিলিং ছুঁইছুঁই। নীচে একতলায় রান্নার স্টোভ, কেরোসিনে জ্বলা জনতা কুকার। ক্ষিতি মহা উৎসাহে দোলনকে রান্না শেখাচ্ছে। হাঁড়িতে জল দিয়ে স্টোভের উপর বসিয়ে দাও। একটা বাটিতে চাল ধুয়ে নাও। জল যেই ফুটতে শুরু করবে অমনি ফুটন্ত জলে চাল ফেলে দাও। রান্নার আসল কায়দা এই চাল ফেলার মধ্যেই। হাঁড়ির ঠিক কতটা উপর থেকে চাল ফেলবে সেইটা ঠিকঠাক রপ্ত না করতে পারলেই বিপদ। হাঁড়ির বেশি নীচে হাত নেমে গেলে গরম জলে আঙুল পুড়তে পারে, আবার বেশি উপর থেকে চাল ফেললে গরম জল ছিটকে এসে হাতে লাগতে পারে। অবধারিত ফল হাতে ফোসকা। শেখাতে গিয়ে শিক্ষক ছাত্রী দুজনের হাতেই ফোসকা পড়ে। তাতে অবশ্য রান্না আটকায় না। চালের সঙ্গে আলুও সেদ্ধ হয় ফুটন্ত জলে। আলু সেদ্ধ তেল-নুন দিয়ে মাখলেই চমৎকার তরকারি। একই থালায় তৃপ্তি করে খায় দুজনে। বাসন যত কম হয় ততই কম হয় ধোয়ার খাটুনি। বেড়ে যায় দোতলায় কাজ করার সময়। সারা দুপুর বিকেল রাত পালা করে পরস্পরকে স্পর্শে-গন্ধে-ঘর্ষণে সুখক্লান্ত করা এবং ঘুমিয়ে নেওয়া চলতে থাকে।

দিব্যি চলছে সংসার। একটাই অসুবিধে। সকালবেলার বারোয়ারি বর্জ্যপুরিতে ঢোকা খুবই কষ্টকর ঠেকছে দুজনেরই। দোলন তো ভাবতেই পারছে না তাদের সাধের কলকাতার মধ্যেই এমন নরক থাকতে পারে! ক্ষিতিরও মনে হচ্ছে তার গ্রামের খোলা মাঠ অনেক উদার এই বারোয়ারি খট্টপুরীষখানা থেকে।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply