অকূলের কাল। পর্ব ৫১। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
রবিবারের বউ
২১ মে যেন আর আসতেই চায় না। সময় ভীষণ লম্বা হয়ে গেছে ক্ষিতির কাছে। অনিশ্চয়তার ব্যাপারটা আর নেই অবশ্য। রেজিস্ট্রির দিন আসতে যখন দিন সাতেক বাকি, জামাইবাবু ডেকে পাঠিয়েছিলেন। বললেন, – তোর তো পরীক্ষা সামনে। বউ ঘাড়ে চাপলে পড়া পালিয়ে যাবে।
লজ্জার চোটে রসিকতাটা ঠিক করে নিতে পারল না ক্ষিতি। তাছাড়া আসল সমস্যা রসিকতায় কি ঢাকা যায়! বউ নিয়ে থাকবে কোথায়? বউ পাওয়ার আনন্দেও সমস্যা এসে মাথা গলাচ্ছে। এসব ভাবতে ভালো লাগে না ক্ষিতির। চালক কোথাও একটা লুকিয়ে আছে। সমস্যা দেখার দায় তার। সচেতন না হলেও পূর্ব-অভিজ্ঞতায় স্বতঃসিদ্ধ তার এ-চিন্তা। কাজেই সে কেবলই সুখের অভিলাষী। বাধা এলে সামান্য বিরক্তি। বিরক্তি গিলে নিয়ে মানিয়ে নিতেও দেরি হলো না জামাইবাবুর পরবর্তী প্রস্তাবটায়। তিনি বললেন, – রেজিস্ট্রির দিন থেকে পুতুল আমার বাড়িতেই থাকুক। তোর পরীক্ষা হয়ে গেলে ছোট করে একটা অনুষ্ঠান করে সামাজিক বিয়ে দেওয়ার দায়িত্বটা আমিই নিচ্ছি। তারপর বউ নিয়ে না-হয় তোর গ্রামের বাড়িতেই চলে যাবি। চাকরি পেলে অন্য ব্যবস্থা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা পেছোতে পেছোতে সেপ্টেম্বরে চলে গেছে। এখনও চার মাস। সেই পর্যন্ত ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে চলতে হবে ক্ষিতিকে। জামাইবাবুর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে তাঁর রসিকতায় একটু ছাড়ের আভাস পাওয়া গেল, – প্রেম জমিয়ে রাখলে স্বাদ বাড়ে। এই সময়টায় রোববারগুলো আমার এখানে এসে না-হয় সই করা বউয়ের দিদির আদর খেয়ে যাবি। তবে সে-আদর তো কেবল পেটে যাবে। নিরিবিলিতে যেটুকু ফাঁক পাবি তাতে চুমুর বেশি এগোতে পারবি না।
রেজিস্ট্রারের অফিসে ওদিক থেকে জামাইবাবু ছাড়া বড়দের কেউ আসেনি। নেটকি আর জলি এসেছিল দোলনের সঙ্গে। এদিক থেকে ছিলেন অমরশঙ্কর। তবে তিনি সাক্ষী হিসেবে সই করলেন না। তিন সাক্ষী জামাইবাবু, অমিয় আর নরজিত। বর কনে সাক্ষীদের সইসাবুদ সম্পন্ন হতেই রেজিস্ট্রার দু-লাইন করে শপথবাক্য পড়ালেন ক্ষিতি আর দোলনকে। বললেন, – এই হলো এই বিয়ের আইনি মন্ত্র। জলিরা দুটো রজনীগন্ধার মালা এনেছিল সঙ্গে করে। রেজিস্ট্রারের সম্মতি নিয়ে মালাবদলও হয়ে গেল দুজনের। আধ ঘণ্টার মধ্যেই বিয়ে শেষ। বিয়ের সার্টিফিকেট বর কনে – দুজনকেই একটা করে দেওয়া হলো। জামাইবাবু অতিরিক্ত ফি দিয়ে নিজের কাছে রাখার জন্য একটা বাড়তি সার্টিফিকেট নিয়ে রাখলেন, তারপর একটা মিষ্টির দোকানে সকলকে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে বসালেন। বললেন, – আপাতত মিষ্টিমুখ হোক। বাকিটা ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাক।
একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল ক্ষিতির। এই সামান্য সময়ের মধ্যেই জীবনটা কেমন বদলে গেল। সে আর একা নয়, তার একটা বউ আছে – ভাবতেই কেমন একটা ঘোর লাগছিল মাথায়। দোলন তো চলে গেল জামাইবাবু, জলি আর নেটকির সঙ্গে। অমরশঙ্করকেও তারা তুলে নিল তাদের ট্যাক্সিতে। তাঁকে তাঁর কোয়ার্টারে নামিয়ে দেবে। ক্ষিতি অমিয় আর নরজিত উলটো দিকের বাসে যখন উঠে বসেছে তখনও তার মাথা থেকে বউ-ঘোর কাটেনি।
সেদিন থেকে ঘোরের মধ্যেই আছে ক্ষিতি। আনমনা হয়ে খাচ্ছেদাচ্ছে, টিউশন সারতে যাচ্ছে, ঘুমের মধ্যেও একা হতে পারছে না। রেজিস্ট্রির দিনটা ছিল সোমবার। রবিবার দোলনের সঙ্গে দেখা হবে। সে তো প্রায় এক যুগ দূরে বলে মনে হচ্ছে। পরীক্ষার কথা মনে এলে নোটপত্তর নিয়ে বসছে কিন্তু তার যে একটা বউ হয়েছে সেটা মাথা থেকে সরছে না। দোলনও কি এমনই ভাবছে? শনিবার এলো অবশেষে। ঘুম থেকে উঠলেই রবিবার। ঘুমই এলো না সে-রাতে! প্রতীক্ষা এমনই জ্বালায় মানুষকে? প্রেমপর্বেও প্রতীক্ষা ছিল কিন্তু একটা স্বীকৃতি পেয়ে সেই প্রতীক্ষা যেন আর অধীরতার বাঁধ মানতে চাইছে না।
ভেবেছিল একরকম, কিন্তু শুরুতেই বেহাল অবস্থা দাঁড়াল ক্ষিতির। শ্বশুরবাড়িতে জামাই আদর জোটার সম্ভাবনা নেই, সেজন্যেই বোধহয় দোলনের দিদি-জামাইবাবু সেই খামতি পূর্ণ করার ব্রত নিয়েছিলেন। তাঁদের ভাবনায় আদরের মাপকাঠির নাম ইলিশ। দোলন একবার বলেছিল বটে, তাঁদের জামাই নিরামিষ খায়। সেই কথাটাকে তাঁরা পাত্তাই দেননি। যতই নিরামিষ খাক ইলিশের রকমারি ব্যঞ্জন পাতে পড়লে চেটে না খাওয়ার উপায় থাকে কি! অতএব ক্ষিতি ভাত খেতে গিয়ে সভয়ে দেখে ভাতের সঙ্গে ইলিশের এগারো রকমের পদ। কী-সব ভয়ংকর নাম তাদের, পাতুড়ি, ভর্তা, মুইঠ্যা…,মনে হচ্ছে এগারো জন বর্মি খেলুড়ে ভাতের থালাকে ঘিরে ধরেছে। কাব্যের ‘জলের রূপালি শস্য’ ক্ষিতির কাছে বিভীষিকায় রূপান্তরিত। কী খাবে, কেমন করে খাবে? ইলিশের গন্ধে পাক দিয়ে উঠছে তার শরীর। দিদি ভাবছেন, জামাই ভাতের থালার সামনে নিশ্চুপ বসে আছে লজ্জায়। ক্ষিতি বলল, কোনোদিন খাইনি তো!
জামাইবাবু বললেন, খাওনি তো কী – একবার খেয়ে দেখলেই আর ভুলতে পারবে না।
দিদি ততোক্ষণে সক্রিয় হয়ে কলাপাতার ভেতর থেকে সরষে মাখানো ইলিশখণ্ডের ভেতর থেকে কাঁটা বেছে ভাতের উপর রেখে বললেন, – নাও এবার খাও তো দেখি।
চোখ বুজে এক দলা মুখে ভরতেই এতক্ষণের পাক খাওয়া ভাবটা সবেগে উপরের দিকে উঠে এল। লাফ দিয়ে সে বাথরুমের ভেতরে ঢুকে পড়ে বমি করতে শুরু করল। ইলিশ খেলে বমি আসে এমন অত্যাশ্চর্য প্রাণীও জগতে আছে! চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল তাঁদের। পুতুল বিয়ে করার জন্যে আর ছেলে পেল না! কী আর করবেন, নেমন্তন্ন করেছেন যখন খাওয়াতে তো হবে। এক ভাঁড় দই নিয়ে এসে দইভাতে সম্পন্ন করতে হলো জামাইবরণ।
দিদি-জামাইবাবুর দুই মেয়ে, দুই ছেলে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন সকাল সকাল। ইলিশের বিলাস-ভোজন সেরে ছুটির দিনে সকলে মিলে একটু গড়িয়ে নেওয়ার অভ্যেস। ছেলে দুটো এখনও ছোট, সুযোগ বুঝে টুক করে হাওয়া হয়ে যায়। গলিতে খেলাধুলার ব্যাপার থাকে। শোয়ার বড় ঘর একটাই। শোয়ার ঘর আর রান্নাঘরের মাঝে একটা ছোট ঘর আছে। সেখানে সরু তক্তপোশের উপর বিছানা পাতা। জামাইবাবু কথিত ‘নিরিবিলি’ হিসাবে সেই ঘরে বিকেল পর্যন্ত ঘণ্টা দুয়েক সময় বরাদ্দ হলো দোলন-ক্ষিতির। দুই ঘরের মাঝের দরজা ভেজানো। অধরোষ্ঠদের বাগ মানানো যাচ্ছে না। লালাসিক্ত জিহ্বাতেও এমন মধুর উত্তাপ কে জানত! দম নেওয়ার জন্যে একটু থেমে ক্ষিতি ফিসফিস করে বলল, – ছিটকিনি তুলে দাও।
দোলন তার ঠোঁটে নিষেধের তর্জনী রেখে বুঝিয়ে দিল যে ছিটকিনি বন্ধ করা বারণ। হুম, লক্ষ্মণরেখা। ক্ষিতি বুঝল তাদের অগ্রগতি আটকাতেই এমন বিধান দিদি দিয়ে রেখেছেন তাঁর বোনকে। বাকি সময় সামান্য কিছু ভবিষ্যত-কল্পনায় আর সান্নিধ্যের উত্তাপেই কেটে গেল, যেন নিমেষের মধ্যেই।
লক্ষ্মণরেখা মানার জন্য নয়। সীতা মানেননি, দোলন-ক্ষিতিও পেরিয়ে গেল তাদের তৃতীয় দিনে। যতই অবিশ্বাস্য ঠেকুক, ইলিশ অথবা যেকোনো ধরনের আমিষেই যে বিবমিষা বাস্তবিক কোনো কোনো মানুষের ক্ষেত্রে, তা প্রথম দিনের অভিজ্ঞতায় বুঝেছেন দিদি-জামাইবাবু। পরের রবিবার থেকে ডাল-পোস্ততেই ক্ষিতিকে খাতির করা ধরেছেন তাঁরা। ক্ষিতি সন্তুষ্ট হলেও ক্ষিতির থালার পাশে বসে দিদি প্রতিদিনই তাঁর নিজের অসন্তুষ্টির কথা একই বাক্যে ব্যক্ত করে চলেন – তোমাকে খাইয়ে কোনো সুখ নেই।
তাঁর না থাক ক্ষিতির সুখের কিছু অভাব হচ্ছে না। ভেজানো দরজায় যেটুকু অভাব পড়ছিল, তৃতীয় দিনে সেটুকুও রইল না। তার চোখের আকুতিতে গলে গিয়ে দোলন অতি সন্তর্পণে প্রায় বিনা আওয়াজেই ছিটকিনি তুলে দিল। তারপরেই দুজনে দুজনকে আবিষ্কার করে চলল দু-চোখ ভরে। দিদি-জামাইবাবুর প্রকৃত নিষেধের বেড়া অবশ্য টপকাতে পারল না দুই আনাড়ি। চোখের গভীরে জমাট বাঁধা রভসই যেন তাদের চরম তৃপ্তির ঠিকানা।
(ক্রমশ)
