অকূলের কাল। পর্ব ৫০। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
দুস্তর পথের প্রান্তে
আলোআঁধারির মধ্যেই এখন ক্ষিতির কপালের চলাচল। সেদিনই ট্রেনটা ঠিক সাড়ে তিনটের সময়ে পৌঁছে গেল গড়বেতা স্টেশনে। স্টেশনের বাইরে দেওয়াল ফাটা ওয়েটিং রুম। সিমেন্টের বেঞ্চি আছে দেওয়ালের সঙ্গে লাগা। কিন্তু সেখানে বসে থাকার জো নেই। ফাটল থেকে হাজারে হাজারে উপোসি ছারপোকা নেমে আসে মানুষের গন্ধ পেলেই। উঠবস করতে করতেই রাত কাটল ক্ষিতির। সকালে হতেই চা-সিগারেটে খানিক সময় পার করে সাড়ে ন’টার ডাকগাড়ি ধরে হুমগড়ে নামল প্রায় সাড়ে দশটায়। সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি।
কেবল বাড়িই নয়, গ্রামেও কারোর জানতে বাকি ছিল না ক্ষিতির কীর্তি। সরবই ছিল ছিছিক্কার। সে যে খুব বিপদের মধ্যে আছে – এমনই সব নানা উড়ো কথা শুনে মা তো অস্থির হয়ে পড়েছিলেন ছেলের নিরাপত্তা নিয়ে। তবু ক্ষিতি নিশ্চিত ছিল বাবার সম্মতি বিষয়ে। শরীর ও মনের দিক দিয়ে বাবা অনেকটাই ভালো এখন। মেজদার মৃত্যুর পর থেকে বাবা দিনের পর দিন জড়ভরতের মত বিছানাতেই শুয়ে থাকতেন। এইভাবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি প্রায় চলে গিয়েছিল। মেজবউদির দাদা ডাক্তার। জামসেদপুরে থাকেন। তিনি বাবাকে সঙ্গে করে সেখানে নিয়ে গিয়ে চোখের ছানি অপারেশন করে দিলেন। পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে পেয়ে উৎসাহে টগবগ করছিলেন বাবা। ক্ষিতির ঘটনা কি তাঁকে কিছুটা থমকে দিয়েছে? কিছু বোঝা গেল না। চিরকালই কম কথার মানুষ। বলা মাত্র দু-চার বাক্যে বিয়ের সম্মতি লিখে দিলেন। একটাই কথা খালি উচ্চারণ করলেন, – আপাতত কিছুদিনের জন্য বৌমাকে বাড়িতে আনার দরকার নেই।
বুঝতে অসুবেধে হলো না ক্ষিতির। একান্নবর্তী পরিবার। সংস্কার, গোঁড়ামি বাধা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা যথেষ্ট। বুঝেসুঝে এগোতে চান বাবা। বেশি দূরের কথা ক্ষিতি অবশ্য ভাবে না কখনও। আপাতত মামলার সুরাহা হলেই হয়। সেদিনই ফিরতে হবে তাকে। হুমগড়ে বিকেলের ফিরতি ডাকবাস ধরে স্টেশন, তারপর সেই রাতের ট্রেনে হাওড়া। বেশ কিছুটা আগেই পৌঁছেছিল হুমগড়ে। গুটি গুটি পায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল রাস্তার ধারের বড় পুকুরটার পাড়ে। বিকেলের মরা আলোয় অজানা কারণেই মনটা বিষণ্ণ। হঠাৎ দেখে কখন যেন চন্দ্রশেখর, তার বড়দা এসে দাঁড়িয়েছেন তার পিছনে। তিনি তো হরদমই সাইকেল নিয়ে হেথায় হোথায় ঘুরে বেড়ান। হুমগড়ে হাজির হওয়াটা কিছু আশ্চর্যের নয়। ক্ষিতি অবাক হলো তার কথা শুনে। বললেন, – মন খারাপ করিস না। আমি দেখছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোর একটা চাকরির ব্যবস্থা –
মনটা আরও খানিক ভিজে গেল ক্ষিতির।
পরের দিন ভোরে হাওড়া থেকে সরাসরি অমরশঙ্করের কোয়ার্টারে গিয়ে হাজির হলো ক্ষিতি। বাবার সম্মতিপত্র তাঁর হাতে তুলে দিল। পরের দিন তিনি ডেকে নিলেন দোলনের দাদা এবং জামাইবাবুকে। একটা সংশয়ের কথা তুললেন পঞ্চু বসাক – এটা যে ছেলের বাবাই লিখেছেন সে-ব্যাপারে অমরশঙ্কর পুরোপুরি নিশ্চিত তো?
ক্ষিতি বুঝতে পেরেছে জেঠাবাবুর চিঠি দেখে অমরশঙ্করও বেশ আশ্চর্য; ভাবতে পারেননি এতো সহজে সম্মতি দিয়ে দেবেন তিনি। কিন্তু তাঁর হাতের লেখা তাঁর অচেনা নয়। সেটাই বললেন তিনি – জেঠাবাবুর লেখা আমি চিনি, সন্দেহ নেই যে এটা তাঁরই হাতে লেখা, তাঁরই স্বাক্ষর।
এই ব্যাপারটা মিটলে কী হবে, ক্ষিতি যে-ভয়টা পাচ্ছিল সেটাই হলো। মনসুর সাহেব বেঁকে বললেন। যে-যুক্তি দিয়ে তিনি কোম্পানি-অমরশঙ্করকে নিরস্ত করেছিলেন সেই যুক্তিটাই তিনি গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে ব্যক্ত করলেন ক্ষিতির কাছে। বললেন, – এটা ওদের ট্র্যাপ – পরিষ্কার ফাঁদ পেতেছে। নিঃশর্তে মামলা তুলে নেওয়া মানে হার স্বীকার করা। যেই সেটা আমরা করব অমনি ওরা তোর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা রুজু করবে। বলবে, মিথ্যে বিয়ের মামলা সাজিয়ে তুই ওদের পরিবারের সম্ভ্রমহানি করেছিস।
হতোদ্যম হয়ে নরজিতের কোয়ার্টারে ফিরল ক্ষিতি। আর দু’দিন পরেই দ্বিতীয় শুনানি। মনে মনে ঠিক করল সেদিন যেভাবে হোক কোর্টের মধ্যেই দোলনের সঙ্গে কথা বলবে সে। সে যদি বলে মামলা তুলে নিতে তাহলে তা-ই করবে। তায় মনসুর সাহেব যতই রাগ করুন।
১৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দিনের শুনানি। সেদিন ক্ষিতির দল অনেক হালকা। তার সঙ্গে শুধু নরজিত আর অমিয়। আজ ফার্স্ট হাফেই ক্ষিতির মামলা। সময়ের আধ ঘণ্টা আগেই সবাই হাজির। ক্ষিতির চোখ জামাইবাবুকেই খুঁজছিল। তাঁকে দেখতে পেয়েই ছুটে গেল সেদিকে। বলল, – আমি দোলনের সঙ্গে একটু কথা বলব।
জামাইবাবু বললেন, – বল না, ওই তো বসে আছে।
ক্ষিতি আড়চোখে পঞ্চু বসাকের দিকে একবার তাকিয়েই এগিয়ে গেল দোলনের দিকে। সে যেন জানতই ক্ষিতি তার কাছে কেন আসছে। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলে উঠল, – তুমি মামলা তুলে নাও। জামাইবাবুর সঙ্গে দাদার কথা হয়ে গেছে – বিয়ে দিয়ে দেবে।
ক্ষিতি বলতে যাচ্ছিল, – পরে আবার –
তাকে শেষ করতে না দিয়ে দোলন জোর দিয়েই বলল, – না না আর অন্য রকম কিছু হবে না। তুলে নাও তুমি।
ক্ষিতি ছুটল মনসুর সাহেবের কাছে। বলল, – মেয়েও বলছে মামলা তুলে নিতে।
সহসা রেগে গেলেন তিনি। বললেন, আমি ব্রিফ ছেড়ে দিচ্ছি। তুই অন্য কোনো অ্যাডভোকেটকে দিয়ে মামলা তুলে নে। তারপরে বিপদে পড়লে আমার কাছে আসবি না।
মহা আতান্তরে পড়ল ক্ষিতি। মুক্তি পেতে মাথার মধ্যে একটা যুক্তি যেন আপনা থেকেই গড়ে উঠল। বলল, – মেয়ে চাইছিল বলেই তো মামলা করেছিলাম। এখন সে-ই চাইছে মামলা তুলে নিতে। সুড উই প্রসিড ফারদার উইদাউট হার কনসেন্ট অ্যান্ড কোঅপারেশন?
তৎক্ষণাৎ মনসুর সাহেবের মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত কয়েকটি শব্দ বেরিয়ে এল, – নো উই সুড’ন্ট।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচল ক্ষিতি। সেদিনের শুনানি অবশ্য বিধিমতই সম্পূর্ণ হলো। আগের দিন ওদের অ্যাডভোকেট মুখে যা বলেছিলেন সেটাই বিস্তৃত আকারে লিখে অ্যাফিডেভিট ইন অপোজিসন দাখিল করলেন। শুনানি শেষে মনসুর সাহেব ক্ষিতিকে দিয়ে একটা দরখাস্ত লিখিয়ে নিলেন। বক্তব্য – যার কথায় মামলা করেছিলাম, তার কথাতেই আমি এই মামলা প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।
মামলা তোলার পদ্ধতি সম্পূর্ণ হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে বলে জানা গেল। তার জন্য একদিন ক্ষিতিকে সঙ্গে করে নিয়ে দোলনের দাদা এবং জামাইবাবু যাবেন ওদের অ্যাডভোকেটের কাছে। তারপর বিয়ে রেজিস্ট্রি হবে। এই ব্যাপারটা নিয়েই ক্ষিতির বেশি মাথাব্যথা। সব কিছুই কথামতোই এগোচ্ছে। তবু আশংকা যেতে চায় না। ওয়েলিংটনের ম্যারেজ রেজিস্ট্রার, পি কে বাসুর অফিসে নোটিশ দেওয়া ছিল। তবে সে তো তিন মাস অতিক্রান্ত। আর কি কাজে লাগবে? দুই পক্ষের লোকই হাজির হলে হয়তো হতেও পারে। ওদের অ্যাডভোকেটের কাছে যেদিন যাওয়া হলো সেদিনই ক্ষিতি প্রস্তাবটা পেশ করল জামাইবাবুর কাছে। পঞ্চু বসাকের সামনেই। তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে তাদের নিয়ে গিয়েছিলেন। ক্ষিতি প্রথমটায় তাঁর গাড়িতে উঠতে চায়নি। বলেছিল, – আমি বাসে করেই চলে যাচ্ছি, ঠিকানা তো আছে।
তাতে কায়দা করে তিনি বলেছিলেন, – আরে এস, এই একদিনই তোমাকে খাতির করে নিয়ে যাচ্ছি। এই শেষ। সুযোগটা ছাড়লে পস্তাতে হবে পরে।
দোনোমনো করে উঠেই পড়েছিল ক্ষিতি জামাইবাবুর পাশে। তখনই তাঁকে কথাটা বলেছিল সে। তিনি বলেছিলেন, – ভালোই তো। আগের নোটিশটায় কাজ হলে তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। নইলে তো দেরি হবে।
পরের দিনই নরজিতকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে ছুটল ক্ষিতি। মামলা, মিটমাট ইত্যাদি এবং দুই পক্ষের লোকই সাক্ষী হিসাবে আসবেন শুনে রেজিস্ট্রার রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, আমি নোটিশটা রিনিউ করে রাখছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসুন। আসার আগের দিন আমার অফিসে ফোন করে জানিয়ে দেবেন।
সকলের সঙ্গে কথা বলে রেজিস্ট্রির দিন ঠিক হলো মে মাসের ২১ তারিখ।
(ক্রমশ)
