অকূলের কাল। পর্ব ৪৯। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

(গত পর্বের পর)

আদালতের বাইরে

ইঁদুর কামড়ালে কোনো ইনজেকশন-টিঞ্জেকশন নিতে হয় কি? কে জানে! গাঁয়ে থাকলে এমন ভাবনা মাথায় আসত না। হাসপাতালের কাছাকাছি থাকার জন্যেই এসব মনে হচ্ছে। গ্রামের আটচালায় ঘুমোবার সময় কতবারই তো তার ফাটা পায়ের মরা চামড়া খেয়ে সাফ করে দিয়ে গেছে ইঁদুরে। মনে পড়তেই ইনজেকশনের কথা মাথা থেকে বের করে দিল ক্ষিতি। তারপর দিন তিনেক নিজের পুরনো হস্টেল আর গোলকের ওয়ান হস্টেলে পেন্ডুলামের মতো দুলতে দুলতে সময় কাটাল। কোর্টে মামলার চলন অনিশ্চিত। জামাইবাবু কী পারবেন না পারবেন সন্দেহ। পরীক্ষার খাঁড়া ঝুলছে মাথার উপর। নরজিতের কোয়ার্টারে তালা। উদভ্রান্তের মতো ঘুরতে ঘুরতে খিদের চোটে একদিন কলেজ স্ট্রিটে ফুটপাথের দোকান থেকে ঘুগনি দিয়ে পাউরুটি খেল পেট পুরে। কিছুক্ষণ পরেই সারা শরীরে অস্বস্তি। গা গুলোচ্ছে, মাথা থেকে ঝরনার মতো ঘাম ঝরছে। এই অবস্থায় একটা আশ্রয় দরকার, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। সামনে দেখতে পাওয়া প্রথম বাসটাতেই উঠে পড়ল ক্ষিতি, ভাবনাচিন্তা-রহিত তার মস্তিস্ক। সিটে এলিয়ে বসল। মনে ভয় – বাসের মধ্যেই বমি হয়ে যাবে না তো! ধর্মতলায় পৌঁছতেই বাস খালি। নামতে হলো ক্ষিতিকে। ঠিক তখনই তার সামনে এসে থামল বি এন আর, ডক লেবার বোর্ড হাসপাতালের পথগামী একটা বাস। যেন দৈবপ্রেরিত। গন্তব্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পেল সে। বাসের পথ আর শেষ হয় না যেন, শরীরের ভেতরে উথালপাথাল। চোখ বুজে সহ্য করে চলেছে বুক-পেটের যন্ত্রণা, চাপ বাড়ছে – কখনও ঊর্ধ্বগামী, কখনও নিম্নগামী। হাসপাতালের স্টপে বাস থামতে নেমেই ছুটল হাসপাতালের ভেতরে। একটাই আকুল প্রার্থনা  – নরজিত যেন ডিউটিতে থাকে। ব্যর্থ হলো না প্রার্থনা, তাকে করিডোরে দেখতে পেয়ে নরজিতই এগিয়ে এল তার দিকে, আর তাকে দেখে করিডোরেই লুটিয়ে পড়ল ক্ষিতি।

তারপর কী হলো আর মনে নেই তার। চেতনায় ফিরে দেখে সে শুয়ে আছে নরজিতের কোয়ার্টারের খাটে। সারা ঘর হাসপাতালের মতো ডেটল আর ফিনাইলের গন্ধে ভুরভুর। খাটের ছত্রিতে ঝুলছে স্যালাইনের বোতল, তার হাতে লাগানো নল। সারা দিন ধরেই স্যালাইন ঢুকল শরীরে। তারপরের রাত আর দিন ঘুমের ভেতরে। সুস্থ হয়ে নিজের কীর্তি নরজিতের কাছে শুনে লজ্জায় আধমরা ক্ষিতি। তার অবস্থা দেখে স্টোর ডিপার্টমেন্টে কোম্পানির ঘরে ছুটে গিয়েছিল সে। হাসপাতালে কেবল ডকের কর্মীরাই ভর্তি হতে পারে। অজ্ঞান ক্ষিতির জামাকাপড় থেকে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। তার চিকিৎসা শুরু করতে হবে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি। পুরনো আদেশ মুলতুবি রেখে কোম্পানিই ব্যবস্থা করতে বাধ্য হলেন। নরজিতের কোয়ার্টারের তালা খুলে একটা স্ট্রেচারে করে সেখানে ঢোকানো হলো তাকে। কোয়ার্টারের মেঝে আর একবার ভেসে গেল ক্ষিতির শরীর থেকে স্বতঃনির্গত তরলে। হাসপাতালের এক নার্স এসে স্যালাইন চালানোর ব্যবস্থা করল আর নরজিত লেগে পড়ল সাফাইকরণে।

বিবরণ শেষ করে নরজিত হাসতে হাসতে বলল, – গুসাঁই, ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্য। এইটা না হলে বেঘর হয়েই থাকতে হতো আমাদের সবাইকে।

কম্যুনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ সেবক নরজিতের ঈশ্বরবিশ্বাস ও ভক্তি নিখাদ, কেবলই কথার কথা নয়।

মামলার শুনানির দিন আসতে এক সপ্তাহ বাকি, অমরশঙ্কর ফোন করলেন কোম্পানিকে – ক্ষিতি যেন পরের দিন তাঁর অগিলভি হস্টেলের কোয়ার্টারে সকাল দশটার মধ্যে হাজির হয়। দোলনের জামাইবাবু তাঁর বড় শালাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে আসবেন। তিনি নাকি পঞ্চানন বসাককে বুঝিয়ে-সুজিয়ে অনেকটা নরম করেছেন। নিজেদের মধ্যে মামলা মিটিয়ে নেওয়ার একটা রাস্তা বেরিয়েছে।

কোম্পানি নরজিতকে দিয়ে সেই খবর ক্ষিতির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। সঙ্গে সাবধানবাণী – বেশি ওড়ার চেষ্টা না করে ওরা যা চাইছে সেটা ক্ষিতি যেন মেনে নেয়। নইলে তিনিও আর একবার এমন করে তার ডানা ছাঁটবেন যে খিদিরপুরের আশেপাশেও আশ্রয় জুটবে না।

অমরশঙ্করের বাইরের ঘরে পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসেছেন দোলনের জামাইবাবু আর বড়দা, অমরশঙ্করের সঙ্গে ক্ষিতি বসেছে তাঁদের উলটো দিকের সোফায়। জামাইবাবু একাই কথা বলে চলেছেন, তার শালাটি তোম্বা মুখে চুপটি করে বসে। ক্ষিতি মাথা নিচু করে শুনে যাচ্ছে। জামাইবাবু বলছেন, – আমাদের মেয়ে। আমরা তার মঙ্গলই চাই। দাদা বুঝতে পেরেছেন এই মামলা দীর্ঘদিন চললে কাগজে খবর হবে। আমাদের সমাজে সবাই জেনে যাবে। তারপর আমাদের পছন্দমতো পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়াটাও আমাদের পক্ষে সহজ হবে না। তাছাড়া এই ছেলে এবং আমাদের মেয়ে কেউ কাউকে ছেড়ে দিতে রাজি নয়, সেটাও বিবেচনার বিষয়। ওদের বিয়ে হোক – খানিক বাধ্য হয়েই আমরা চাইছি। তবে মেয়ের ভবিষ্যতের  কিছুটা নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে তা সম্ভব নয়। ছেলে কবে চাকরি পাবে তার তো ঠিক নেই। তাই আমাদের কয়েকটা শর্ত আছে। প্রথম কথা, ছেলের বাবাকে বিয়েটা মেনে নিতে হবে। সেই মর্মে তাঁর সই করা বয়ান চাই।

অমরশঙ্কর বললেন, – জ্যাঠাবাবু মেনে নেবেন বলে মনে হয় না।

ক্ষিতি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, – বাবা মেনে নেবেন। লিখে সই করে দেবেন। সেই দায়িত্ব আমার।

জামাইবাবু বললেন, – বেশ। পঞ্চুদা তুমি চুপ করে বসে থাকলে হবে! বাকি শর্তগুলো বলো।

এতক্ষণে তূষ্ণীভাব ছেড়ে মুখ খুললেন তাঁর পঞ্চুদা। গলায় কিন্তু থমথম করছে রাগ, – মামলা আমি তুলব না। মামলা ও করেছে, মামলা ওকেই তুলতে হবে। নিঃশর্তে। কোর্টের বাইরে যে মীমাংসা হয়েছে সেটা উল্লেখ করা যাবে না। আর, মামলা তুলে নেওয়ার পর বিয়েটা রেজিস্ট্রি হবে। আমি থাকব না, আমার এই ভগ্নিপতি ভোলানাথ থাকবে। তবে রেজিস্ট্রির দিন মেয়ে এক কাপড়ে আমার বাড়ি থেকে বিদায় নেবে। ভবিষ্যতে আর কোনোদিন আমার বাড়িতে সে কিংবা এই ছেলে ঢুকতে পারবে না।

অমরশঙ্কর অস্বস্তিতে পড়েছেন, সেই ছাপ তাঁর মুখে। ভোলানাথও বুঝেছেন সেটা। তাঁর শালার কথাবার্তা যে ভব্যতার সীমায় নেই সেটা তিনিও বুঝেছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্ষিতির দিকে তাকিয়ে বললেন, -রেজিস্ট্রির পরে কী হবে না হবে সেটা নিয়ে আমি তোর সঙ্গে কথা বলব পরে। চিন্তা করিস না।

এক কাপড়ে বউ বা শ্বশুরবাড়ির দরজা বন্ধ নিয়ে সমস্যা নেই ক্ষিতির। তার মনে কাঁটার মতো বিঁধছে নিঃশর্তে মামলা তুলে নেওয়ার বিষয়টা। মনসুর সাহেব কি রাজি হবেন? চাপাচাপি করলে হয়তো হবেন কিন্তু তাকে চাপাচাপি করতে হলে দোলনের সঙ্গে কথা বলা দরকার। জামাইবাবু লোক ভালো বলেই মনে হচ্ছে। তাও দোলন ছাড়া ওদিকের কোনো লোককেই সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারছে না ক্ষিতি। আগের বারও তো বলেছিল বিয়ে দেবে। তারপরে ঘরে আটকে রেখে দিল! মামলা তুলে নেওয়ার পর হয়তো বিয়ের বদলে পাল্টা মানহানির মামলা করে তাকে জেলেই পাঠিয়ে দিল! সেরকমই তো বলেছিলেন মনসুর সাহেব।

অমরশঙ্কর নিজে কী চান বোঝা মুশকিল। মনে হচ্ছে ক্ষিতির ইচ্ছের উপর তিনি নিজের মত চাপাবেন না। ঠিক হল, আগামী তিন দিনের মধ্যে ক্ষিতি বাড়ি গিয়ে বিয়েতে বাবার লিখিত সম্মতি নিয়ে আসবে। তারপর পরবর্তী বৈঠক হবে এখানেই।

হাতে সময় নেই বেশি। মামলা চললে বিয়ে প্রমাণ করা সহজ হবে না, সত্যকিঙ্কর যতই বলুক – ক্ষিতি কোর্টে একদিন পা রেখেই বুঝেছে আইনের সর্পিল গতি। মনসুর সাহেবের কাছে প্রস্তাব রাখার অস্বস্তি মাথা থেকে সরিয়ে রেখে প্রথম কাজটা আগে সেরে নিতে হবে। বাবার সম্মতিপত্র। সেদিনই দুপুর-সন্ধ্যা দাদার কোয়ার্টারে খাওয়াদাওয়া করে হাওড়া স্টেশনের দিকে রওয়ানা হলো ক্ষিতি। সরাসরি বাড়ি যাওয়ার একটাই ট্রেন। আদ্রা-চক্রধরপুর গোমো প্যাসেঞ্জার। সন্ধে ন’টায় ছাড়ে, রাত সাড়ে তিনটায় গড়বেতা স্টেশনে পৌঁছনোর কথা। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার আগে কোনোদিনই পৌঁছয় না।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply