অকূলের কাল। পর্ব ৪৮। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
মূষিকের দাঁতে বরাসন
অশোক বলল, – মামা, রঞ্জিতের বেঢপ ধুতি-পাঞ্জাবিটাই গণ্ডগোলের মূলে। তোর পরনে ওগুলো দেখেই জজসাহেব ভরসা করে তোর হাতে মামিকে তুলে দিতে পারেনি।
নরজিত সেইমাত্র অশোকের হাত থেকে গাঁজাভরা সিগারেটটা নিয়ে একটা সুখটান দিয়েছে, প্রতিবাদ করতে গিয়ে ধোঁয়া শ্বাসনালীতে বেমক্কা ঢুকে পড়ল। বিষম খেয়ে কাশতে কাশতে চোখে জল। অমিয় তার মাথা চাপড়ে কাশি বন্ধ করার চেষ্টা করছে।
হাইকোর্ট পর্বের পরের দিনের বিকেল। অশোক কলকাতায় এলে দুটো দিন অন্তত থেকেই যায়। সত্যকিঙ্করকে সে তেমন পছন্দ করে না। সম্ভবত সেটা আন্দাজ করেই সে অশোক আসার আগেই বাড়ি চলে গেছে। তবে সে এলে অমিয় চেষ্টা করে অফিস সামলে, কলেজ কামাই করে নরজিতের কোয়ার্টারে যতটা বেশি সম্ভব কাটিয়ে যেতে। অশোকের প্রেমপর্ব মিটে যায় সকালেই। মেয়েটা সবে ভর্তি হয়েছে বিদ্যাসাগর কলেজের মর্নিং সেশনে। কলেজের গেট থেকেই অশোক তাকে পাকড়াও করে এদিক ওদিক ঘুরেটুরে হাওড়ার রেলকোয়ার্টারের কাছাকাছি ছেড়ে দিয়ে ফিরে আসে। পুরো বিকেল আর সন্ধে মামা আর দুই ভাগ্নের গঞ্জিকাসহ আলাপন চলে। নরজিত তার হাজার কাজের ফাঁকে ফাঁকে বসে যায় কিছুক্ষণের জন্যে। একটু সতর্ক থাকতে হয় – কোম্পানি যাতে ঘুণাক্ষরেও অশোকের উপস্থিতি টের না পান। কোয়ার্টারের পাশ দিয়েই হাসপাতালে ঢোকার রাস্তা। অতএব সকাল সাড়ে নটা আর বিকেল সাড়েপাঁচটার আশেপাশে অশোককে হয় চৌহদ্দির বাইরে, নয় তো কোয়ার্টারের ভেতরে আবদ্ধ থাকতে হয়।
সব সতর্কতার ভেতরে ফাঁক থেকে যায়, তাদের অজান্তেই সেই ফাঁক দিয়ে পালে বাঘ পড়ল সেই বিকেলেই। কোয়ার্টারের দরজা ঠেলে গাঁজার ধোঁয়া সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন কোম্পানি। অশোক ছাড়া বাকি সবাই সন্ত্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কোম্পানি খাটে বসলেন। প্রথমেই নরজিতের দিকে ছুটল মিসাইল, – কোয়ার্টারটাকে অপোগণ্ডদের আখড়া বানিয়ে ছেড়েছ! হচ্ছে ব্যবস্থা। সব কটাকে তাড়াব এবার। আজই তুমি তালা লাগাও কোয়ার্টারে। চাবি থাকবে আমার কাছে। তুমি খিদিরপুর থেকে অফিস যাওয়া-আসা করবে।
তারপর নজর গেল অমিয়র দিকে, – তুমি! অফিস যাওনি?
কোনো উত্তর নেই, মেঝের দিকে চোখ নামিয়ে নিশ্চল অমিয়।
–এখন কি কলেজ কামাই করে গাঁজা টানতে এসেছ!
ক্ষিতিকে দেখেও যেন দেখলেন না তিনি। অশোককে নিয়ে পড়লেন। –না বলেকয়ে হস্টেল থেকে চলে এসে এখানে লুকিয়ে থেকে কী করছিস? বিপ্লবের শখ মেটেনি এখনও! লজ্জা লাগে না। বাপ সর্বস্ব দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছে একবার। বার বার তো পারবে না। বেহায়া, নির্লজ্জ –
অশোক বলল, –প্রাণভরে গালাগালি দাও, মনের ক্ষোভ বের করে দাও। তারপরে শান্তিতে থাকো। কিন্তু আশা করো না তুমি যা চাইবে সেটাই আমি করব। বাবা, আমার বয়স একুশ হতে চলল। আমার পছন্দের জীবন কাটানো আমার অধিকার। আমার যদি মনে হয় বিপ্লব করাই কর্তব্য, তাহলে সেটা আমি করবই। তুমি আটকাতে চাইলেও পারবে না।
কোম্পানির মুখ আগুনের মতো গনগনে হয়ে উঠল। উত্তেজনায় খাট থেকে নেমে দাঁড়ালেন তিনি। বললেন, – অধিকার! অধিকার দেখাচ্ছু আমাকে? হারামজাদা! কার পয়সায় খাচ্ছু? তোর হস্টেলের খরচ কে যোগাচ্ছে? অধিকার বুঝলে কর্তব্যটাও বুঝতে হয়। – বলেই তিনি অন্ধের মতো অশোকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এলোমেলো দুই হাত চালাতে লাগলেন তার শরীরের উপর।
অশোক স্থির হয়ে বাবার দু-হাতের আঘাত সারা শরীরে গ্রহণ করতে করতে হাসছে। তিনি হাঁপিয়ে পড়তেই তাঁকে ধরে সযত্নে খাটে বসিয়ে দিল। বলল, – তোমার ভেতরে যে-কষ্টটা হচ্ছে, যার জেরে তুমি আমাকে মারধর করছ – সেটা আমি বুঝতে পারছি। এই করে যদি তুমি শান্তি পাও তাহলেই আমি খুশি। আমাকে নিয়ে তোমার বাকি সব আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা ভুলে যাও।
কোম্পানি খাটে বসে অশোককে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বললেন, – আজ থেকে তোকে আমি ত্যাজ্যপুত্র করলাম। মনে রাখবি।
অশোক আবারও হাসল। বলল, – বেশ করেছ। এবার অন্তত শান্ত হও। শান্তিতে থাকো।
কোম্পানি শান্ত হলেন না বিশেষ। একটু দম নিয়েই উঠে পড়লেন। নরজিতকে বললেন, – সব কটাকে ঘর থেকে বের করো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে। আমি বারান্দায় অপেক্ষা করছি। তালা লাগিয়ে চাবি আমার হাতে দেবে।
আদেশের নড়চড় হবে না বোঝাই যাচ্ছে। অমিয় প্রথমেই বেরিয়ে গেল। নরজিত করুণ চোখে তাকিয়ে আছে অশোকের দিকে। অশোক বলল, – চল মামা। দেরি করলে রঞ্জিত হয়তো অজ্ঞানই হয়ে যাবে। ব্যাগ-ট্যাগ কিছু সঙ্গে নেওয়ার হলে নিয়ে নে। ক’দিন পরে তালা খোলার আদেশ হবে কে জানে! সেই ক’দিন এদিক ওদিক ঘুরে কাটিয়ে দে। বাড়ি যে যাবি তারও তো উপায় নেই। মামলা ঝুলিয়ে রেখেছিস গলায়।
বই-টই দু-একটা নেবে কি-না ভাবছিল ক্ষিতি। পড়ার ইচ্ছে বা সুযোগ কোনোটাই হবে না ভেবে সে-চেষ্টা আর করল না। অশোকের সঙ্গে তো কখনোই কোনো ব্যাগপত্তর থাকে না। অতএব পাঁচ মিনিটও লাগল না খালি হাতে বেরিয়ে এল দুজনে। বারান্দায় অপেক্ষারত কোম্পানি তাদের দিকে ঘুরেও তাকালেন না।
রাস্তায় ততোক্ষণে আলো জ্বলে গেছে। ক্ষিতি অশোককে বলল, – তুই কোথায় যাবি? আজ তো আর নন্দীগ্রামে ফিরতে পারবি না।
–তুই নিজের চিন্তা কর মামা। আমার কিচ্ছু সমস্যা নেই। আজকের রাতটা হাওড়া স্টেশনের কুলিদের সঙ্গেই বিড়ি ফুঁকে কাটিয়ে দেব।
তা অবশ্য পারবে অশোক, ভালমতোই জানে ক্ষিতি। দুজনে এক বাসে উঠেই ধর্মতলায় নামল। সেখান থেকে অশোক উঠল হাওড়ার বাসে, ক্ষিতি হাতিবাগানের। পুরনো হস্টেলেই তাকে আপাতত আশ্রয় নিতে হবে। মনোজিৎদার গেস্ট হিসাবে থাকা যাবে কিন্তু শোবে কোথায়? খাট-বিছানার কী ব্যবস্থা হবে? তারও একটা যেমনতেমন সমাধান হয়ে গেল। গরমের দিন। তিনতলার দক্ষিণ দিকের বারান্দায় একটা শতরঞ্চি পেতে ঘুমনোর তোফা ব্যবস্থা হয়ে গেল। তৃতীয় দিনে একটা ভালো ঘটনা ঘটল। জলির সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল। সে খবর দিল পুতুলের বড় জামাইবাবু তার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন। তিনি নাকি চেষ্টা করছেন তাঁর মাথা-গরম শালাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মামলার মিটমাট করে দুজনের বিয়ে রেজিস্ট্রি করে দিতে। এইসব নিয়ে তিনি ক্ষিতির সঙ্গে কথা বলতে চান। তাঁর বাড়ি কাছেই। দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটের একটা ভাড়া বাড়িতে থাকেন। হরি ঘোষ স্ট্রিটের একেবারে লাগোয়া। নীচ তলায় গয়নার কারখানা। দোতলায় বসবাস। ক্ষিতি জানত না সোনা-রূপার গয়না তৈরি হয় যেখানে সেটাকে কারখানা বলে। দোলনের পরিবার সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানছে সে। তাদের অধিকাংশ আত্মীয়-স্বজনই বসাক পদবি-ধারী। আর বেশির ভাগেরই সোনা-রূপার কারবার। কেউ কারিগর, কেউ বা মালিক। দোলনের মামাবাড়ি ব্যতিক্রম। এক প্রজন্ম আগে থেকেই বাড়িতে উচ্চ-শিক্ষার চল। রেলে চাকরি অথবা ঠিকাদারি ব্যাবসায় যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত। দোলনের দাদারা অলংকার ব্যাবসা ছাড়াও আরও বহু ধরনের ব্যাবসায় যুক্ত। তাদের তুলনায় জামাইবাবু নেহাতই চুনোপুঁটি। তাঁর দোকানে দু-একজন বেতনভুক কর্মচারী থাকলেও তিনি নিজেও মূলত গয়না তৈরির কারিগর। তাঁর কথা পঞ্চানন বসাক শুনবে বলে ক্ষিতির বিশ্বাস হচ্ছে না। জলি বলল, – সেদিন কোর্টে আপনাকে দেখেই জামাইবাবু খুব পছন্দ করে ফেলেছে। আপনার ধুতি পরা আর ব্যারিস্টারের সঙ্গে আপনার ইংরাজিতে কথা বলা দেখেই মনে হয় মুগ্ধ হয়ে গেছে।
বলেই হাসতে লাগল জলি। ক্ষিতি জামাইবাবুকে সেদিন কোর্টে খেয়ালই করেনি। দোলনের দুই দাদাকেই কেবল চিনতে পেরেছিল। তা হোক, কিন্তু তিনি তাকে পছন্দ করেছেন শুনে বেশ আনন্দ হলো তার। তিনি কিছু করতে পারুন বা না পারুন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ক্ষতি কী!
বেশ মানুষটি দোলনের জামাইবাবু। কালো রঙের ছোটোখাটো মানুষটি। মুখের ডৌলটি বেশ মিষ্টি। দোকানেই বসালেন ক্ষিতিকে। প্রথমেই ‘তুই’ বলে সম্বোধন। ঘনিষ্ঠতার ছোঁয়া লাগল ক্ষিতির মনেও। জোর করে মিষ্টি-টিস্টি খাওয়ালেন। যা বুঝল ক্ষিতি, জামাইবাবু স্বর্ণকার পরিবারের ছেলে। পড়াশোনা সামান্য। স্বাধীনতার বহু আগে এ দেশে এলেও নিজের বাঙাল বেশ ও বাকবিন্যাস সযতনে ধরে রেখেছেন। ধুতি আর গেঞ্জি পরে দোকানে কাজ করছিলেন। এক খণ্ড সোনাকে চিমটে দিয়ে ধরে আগুনের মধ্যে সরু একটা পাইপে ফুঁ দিয়ে দিয়ে কী-যেন করছিলেন। এমন দৃশ্য সেই প্রথম দেখল ক্ষিতি। তিনি বললেন, – ভাবিস না। আমি চেষ্টা করছি। বড্ড গোঁ হালার। দেখা যাক, মামলার দিন পড়তে দেরি আছে তো। তার মধ্যে ফয়সালা একটা করতেই হবে। যদি হয়, তুই চালাবি কেমন কইরা? পাশ কইরা চাকরি পেতে তো সময় লেগে যাবে অনেক। কিছু টাকাপয়সা দিলে কাম-কারবার কিছু করতে পারবি?
ব্যাবসা করার কথা বলছেন বোধহয়। ক্ষিতি মস্ত বড় হাঁ করে দিল। ব্যাবসার ‘ব’ না জানলে কী হবে, দোলনকে পেতে অন্ধের মতো যেকোনো গহ্বরে ঝাঁপ দিতে সে প্রস্তুত।
সেদিন রাতেই হস্টেলের বারান্দায় শতরঞ্চি পেতে ঘুমুতে গিয়ে তাকে ইঁদুরে কামড়াল।
(ক্রমশ)
