অকূলের কাল। পর্ব ৪৬। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
গাড্ডায় ক্ষিতি
সত্যকিঙ্কর বাড়ি গেছে। ফিরতে ফিরতে আরও দিন চারেক। মামলার দিন পড়েছে তারও এক সপ্তাহ পরে। আজ সকালেই ক্ষিতি গিয়েছিল ভবানীপুরের পুলিস হাসপাতালে। হাসপাতাল চত্বরেরই এক কোয়ার্টারে সপরিবার থাকেন সেখানকার মেডিক্যাল বিভাগের স্টোরকিপার। তার ক্লাস নাইনে পড়া ছেলেকে পড়াতে গিয়েছিল সে। এই টিউশন কোম্পানিই জোগাড় করে দিয়েছেন। মাইনে তিরিশ টাকা। খিদিরপুরের ভাইবোন দেয় পঁচিশ টাকা। চাকরি ছাড়ার পর এই পঞ্চান্ন টাকাই সম্বল। মামলার জন্যে মনসুর সাহেবকে মোট দুশো টাকা দিতে হবে। সাহেবের আসল ফিজ এর তিন গুণ। তবে পার্টির কেসে এই দুশো টাকাই নেন তিনি। ক্ষিতির কেসটা পার্টির দরেই করে দিচ্ছেন। কমরেড মোহিনী পন্ডার সৌজন্যে। এছাড়া যেদিন যেদিন মামলার তারিখ পড়বে প্রতিদিন তিরিশ টাকা দিতে হবে। এটাও কনসেসন রেট। অন্যদের দিতে হয় দেড়শ টাকা। হাইকোর্টের উকিলদের ফিজ আগে নাকি ছিল মোহরের হিসাবে। এখনও নাকি তাই আছে। কেবল মোহরের টাকায় রূপান্তরিত পরিমাণ হিসেব করে নেওয়া হয়। এক মোহর সমান এক ভরি সোনা হলে তার দাম এখন তিনশো টাকা। এই হিসেবে মনসুর সাহেবের ফিজ দুই মোহর। ক্ষিতি আপাতত মনসুর সাহেবকে একশো টাকা মাত্র দিয়েছে। বাকি ফিজ আর মামলার দিনের খরচ মিলিয়ে সেদিনই একশো তিরিশ টাকা তাঁকে দিয়ে দেবে বলা আছে। অমিয় সেই টাকার ব্যবস্থা করবে বলেছে।
ভবানীপুর থেকে ফিরে নরজিতের কোয়ার্টারে ঢুকতে গিয়ে ক্ষিতি দেখে দরজা হাঁ করে খোলা। দরজায় বহুদিন হলো তালা লাগানো হয় না। কে কখন আসবে তার তো ঠিক নেই। তালা লাগালে তার চাবি রাখবে কোথায়! তার থেকে এই ভালো। যে-ই আসুক বাইরের ছিটকিনি খুলে ঢুকে পড়তে পারবে সটান। কিন্তু আজ এই সময়ে কারোর থাকার কথা নয়, নরজিতের মর্নিং ডিউটি – তাহলে কে আবার এল?
ঘরে ঢুকে অবাক ক্ষিতি। জলি বসে আছে খাটের উপরে। মুখে একরাশ উদ্বেগ। ক্ষিতিকে দেখেই হাসি ফুটল মুখে। কলকল করে বলে উঠল, – যাক বাবা! কোথায় গেছেন, কখন আসবেন ভেবে মরছিলুম। কী কাণ্ডই না করেছেন ক্ষিতিদা! পঞ্চু বসাক তো ক্ষেপে উঠেছে একেবারে। কালকে কোর্টের সমন এসেছে বাড়িতে। সেটা পড়ে তার মুখের অবস্থা দেখেই ভয় পেয়ে পুতুলের বড়বৌদি বুদ্ধি করে তাকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে চাবিটা লুকিয়ে ফেলেছে। ভাগ্যিস! নইলে ওই অবস্থায় পুতুলকে হাতের কাছে পেলে মেরেই ফেলত বোধ হয় একেবারে! সমনে না-কি লেখা আছে মেয়েকে কোর্টে নিয়ে গিয়ে জজসাহেবের কাছে হাজির করাতে হবে?
ক্ষিতি বলল, – সেরকমই তো হওয়ার কথা।
জলি বলল, – পুতুলকে না পেয়ে ওর পোষা একটা উকিল আছে, তাকে ডেকে পাঠিয়েছিল বাড়িতে। তার সঙ্গে কী কথা হয়েছে জানি না। তারপরে আবার পুতুলের খোঁজ করছিল। বৌদি বলেছে, ঘরেই আছে তবে তালাবন্ধ, চাবিটা কোথায় রেখেছে মনে পড়ছে না। তারপরে সন্ধেবেলায় উকিলটাকে সঙ্গে নিয়ে আপনার দাদার হস্টেলে গিয়েছিল। সেখানে কী হয়েছে জানি না। আপনি কোনো খবর পাননি?
না তো।
ক্ষিতি সামান্য ভাবনায় পড়ে। বেশিক্ষণের জন্য নয়। জলি চলে যাওয়ার পরে সে চানখাওয়া শেষ করতে না করতেই নরজিত ফিরল হাসপাতাল থেকে। এসেই বলল, – মামা, কোম্পানি তলব করেছে। কাল তো রবিবার। সকালেই চলে যাবে তার বাড়ি। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে তোমার দাদা, অমরবাবুর হস্টেলে। উনি আজ সকালেই কোম্পানিকে ফোন করে মামলার কথা ফাঁস করে দিয়েছেন। কাল রাতে দোলনের দাদা নাকি অমরবাবুর কোয়ার্টারে গিয়ে তাঁকে কী-সব হুমকি দিয়েছে।
সামান্য ভাবনাটা নিমেষেই অসামান্য হয়ে উঠল। জিজ্ঞেস করল, – কোম্পানির হাবভাব কেমন দেখলে? কিছু বলছিলেন?
-সে আর বলতে! ক্ষেপে লাল একেবারে। পড়াশুনা লাটে তুলে দিয়ে উচ্ছন্নে যাওয়ার ধান্দা! আবার মামলা করতে গেছে! শেষে বলে সব দোষ না-কি আমার। আমার আশকারাতেই নাকি তুমি প্রেম করছ। আর মামলার পিছনে আমার পার্টির লোকরা যে আছে সেটা পরিষ্কার বুঝে গেছেন মনসুর সাহেবের নাম শুনেই। তুমি বিয়ে করবে মামা আর কোম্পানির বাঁশ আমাকেই খেতে হবে।
বলেই হো হো করে হাসতে শুরু করল নরজিত। তার হাসি দেখে ভাবনা ভুলে বুকে বল এল ক্ষিতির। লড়াইয়ে যখন নেমেই পড়েছে তখন ভয়ভাবনাকে শিকেয় তুলে রাখতেই হবে। দেখা যাক কাল কী হয়!
কোম্পানি তৈরি হয়েই বসে ছিলেন। ক্ষিতি হাজির হওয়া মাত্র বেরিয়ে পড়লেন। মুখে থমথম করছে রাগ, একটাও কথা বলছেন না। তিনি হাঁটছেন আগে আগে, ক্ষিতি তাঁর পিছুপিছু। খিদিরপুরের মোড় থেকে এসপ্ল্যানেডের বাস। রবিবার। প্রায় খালি বাস। কোম্পানি বসেছেন সামনের দিকে, তাঁর থেকে বহুদূরে পিছনের দিকের একটা সিটে গিয়ে বসল ক্ষিতি। এসপ্ল্যানেড থেকে ট্রাম। হেদোতে নেমে হাঁটতে হাঁটতে অগিলভি হস্টেল। এবার ক্ষিতি আগে আগে, কোম্পানি পিছে। তিনি অগিলভির হদিশ জানেন না।
ক্ষিতি জানত না বৌদিও হাজির কোয়ার্টারে। বিষ্ণুপুর কলেজের হস্টেলে ছিল। ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেছে, বেশ কিছুদিন হলো সংসারে মন দিয়েছে। অতএব সম্ভাষণ, প্রণাম ইত্যাদি। তারপর চা-মিষ্টি যোগে আপ্যায়ন এবং কুশল-জিজ্ঞাসা শেষ হতেই ক্ষিতিকে নিয়ে পড়লেন দুজন দুভাবে। অমরশঙ্করের গলায় অসহায়তা এবং যুক্তিযোগ আর কোম্পানির গলায় শাসন এবং অভিযোগ। অমরশঙ্কর বলছেন, – ক্ষিতি, এরা সাংঘাতিক লোক। এদের সঙ্গে টক্কর দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। পরশু সন্ধেবেলায় আমাকে শাসিয়ে গেছে। হুমকি দিয়েছে, ভাইকে নিঃশর্তে মামলা তুলে নিতে বলুন। নইলে আপনার ভাইয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট তো করবই, আপনাকেও ছাড়ব না। দ্যাখ – তোর মনে কী হচ্ছে সবই বুঝছি। কিন্তু যত কষ্টই হোক সব ভুলে গিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কোনো উপায় নেই রে।
কোম্পানি বলছেন, – আমাদের গুরু-বংশের ছেলে তুমি – সেটা ভুলে গিয়ে শেষে এসব গুন্ডা বাড়ির মেয়ের খপ্পরে গিয়ে পড়লে! টাকা থাকলেই সব হয় না, বংশ-মর্যাদা দেখতে হয়। বাড়ির লোক কষ্ট করে টাকাপয়সা খরচ করে তোমাকে কলকাতায় পাঠিয়েছে পড়াশুনা করে মানুষ হবার জন্যে – আর তুমি কী কচ্ছ – পড়াশুনা লাটে তুলে নিজে উচ্ছন্নে তো যাচ্ছই, সেই সঙ্গে আর সবাইকেও বিপদে ফেলে দিয়েছ! রঞ্জিতটাও হয়েছে একটা আস্ত শয়তান। নিজের কোয়ার্টারটাকে লুচ্চা পার্টির ডেরা বানিয়ে রেখেছে। তারাই তো তোমাকে এই রাস্তা দেখিয়েছে। ওর ব্যবস্থা আমি করছি পরে। তুমি যাও, আজই যাও তোমার ওই পার্টি-উকিলের কাছে। গিয়ে বোলো কেস তুলে নিক।
বড়দের মুখের উপর কথা বলার অভ্যাস নেই ক্ষিতির। তাদের বাড়ির ধারাটাই এরকম। সে মিনমিন করে দাদাকে বলল, – আমি বললে উনি শুনবেন না, অনেক খাটুনি গেছে তাঁর আমার জন্যে। বরং তোমরা গিয়ে ওঁর সঙ্গে কথা বল। তাতে কাজ হবে। আমি ঠিকানা বলে দিচ্ছি।
অগত্যা সেটাই ঠিক হলো। এখানেই দুপুরের খাওয়া সেরে বিকেলের দিকে দাদা কোম্পানিকে সঙ্গে নিয়ে মনসুর সাহেবের সঙ্গে দেখা করে কেস তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। ক্ষিতি উঠে পড়ল তখনই। বলল, তার টিউশন পড়ানো আছে খিদিরপুরে। সেটা সেরে রঞ্জিতের ওখানে ফিরে গিয়ে খাবে। সিঁড়িতে দেখা হয়ে গেল পুলকের সঙ্গে। পুলক মণ্ডল। গড়বেতা স্কুলে ক্ষিতির সহপাঠী ছিল। এখন ল পড়তে কলকাতায় এসেছে। এই হস্টেলেই থাকছে। ক্ষিতিকে দেখেই জড়িয়ে ধরল একেবারে। বলল – আরে তুই তো বিশাল ব্যাপার করেছিস! শ্যামলের কাছে সব শুনেছি। হরি ঘোষ স্ট্রিটের একটা ছেলে আমার সঙ্গে ল পড়ছে। সে যা বলল, শুনে কিন্তু আমার ভয় লাগছে। পঞ্চানন বসাকের নাম করতেই বলল, সে তো সাংঘাতিক লোক। সাট্টার পেন্সিলার। গুন্ডা পোষে, থানার সঙ্গেও দহরম মহরম, মাইনে করা উকিলও আছে। এই সময় তোর এ-পাড়ায় না আসাই ভালো।
ক্ষিতি মুচকি হেসে বেরিয়ে গেল হস্টেল থেকে। লজ্জা ভয় বিসর্জন দিয়েই সে এই রাস্তায় নেমেছে। কোনো কিছুই তাকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে আপাতত মনসুর সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে হবে। কপাল ভালো চেম্বারেই তাঁর দেখা মিলে গেল। ছুটির দিন বলে বেলা পর্যন্ত কাজ করছিলেন। ক্ষিতিকে দেখে একটু অবাক হলেন। দাদাকে হুমকি দেওয়ার খবর জানিয়ে সে বলল, – আজ বিকেলেই দাদা আর একজন আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসছে। মামলা তুলে নেওয়ার কথা বলবে। আপনি রাজি হবেন না। ওদের বুঝিয়ে দেবেন এই অবস্থায় কেস তুলে নেওয়া সম্ভব নয়।
মনসুর সাহেব বললেন, – তুই যা। চিন্তা করতে হবে না। যা বলার বলব, ওঁরা আর ভুলেও কেস তোলার অনুরোধ করবেন না।
সেই সাক্ষাতের ফলাফল ক্ষিতি জানতে পারল রাতে, নরজিত খিদিরপুর থেকে ফেরার পর। কোম্পানি বলেছেন, – ক্ষিতি এমন গাড্ডায় পড়েছে যে ওঠার কোনো রাস্তা নেই। কেস তুলতে পারলে সব দিক রক্ষা হতো কিন্তু নিঃশর্তে কেস তুলে নিলে মিথ্যা মামলা করে পরিবারের সম্ভ্রমহানি করার অভিযোগে মানহানির মামলা করবেই মেয়ের দাদা। তখন ক্ষিতিকে জেলে যাওয়ার রাস্তা থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।
(ক্রমশ)
