অকূলের কাল। পর্ব ১৮। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
মলয়ের সিদ্ধিলাভ
সাত দিন ধরে জমতে জমতে ক্ষিতির বিষাদ যখন পাথর হওয়ার জোগাড়, তখন এক রবিবার সকাল দশটায় ফোন ধরে মাধোদা হাঁকল, – খিতিদাদার ফোন।
যে-ফোনের জন্য অহল্যার প্রতীক্ষা, সে-ফোন তো হতেই পারে না। রবিবার বড়বাজার বন্ধ। দোলনের দাদারা সবাই বাড়িতে। তাহলে কে হতে পারে! আর কেউ তো তাকে ফোন করে না। হ্যাঁ, অমিয় করে, আলেকালে। তাহলে কি অমিয় করেছে? অশোকের কোনো খবর আছে? কিন্তু আজ ছুটির দিনে অমিয় ফোন পাবে কোথায়! সে তো অফিসের ফোন থেকে করে, যখন মালিকদের কেউ অফিসে থাকে না।
রিসিভারে কান লাগিয়ে মুখ খুলতেই হৃদয়ে হিল্লোল। আজ হাসি নয়, বিরক্তি – উঃ, এত দেরি হয় কেন ফোন ধরতে! শোনো, সালকিয়া এসেছি মাসির বাড়িতে। মাসির বাড়ি ফোন নেই, তাই করতে পারিনি। আজ মাসতুতো দিদির সঙ্গে বাজারে এসেছি। বুথ থেকে ফোন করছি। বেশিক্ষণ কথা বলা যাবে না। অনেক টাকা উঠে যাচ্ছে। খবরটা দেওয়ার জন্যেই ফোন করা।
ক্ষিতি বলে, – কবে বাড়ি ফিরবে?
–পাঁচদিন পরে। পরের শুক্রবার বাড়ি ফিরে ঠিক সময়ে ফোন করব।
–একটা কথা ছিল –
–সেদিন শুনব।
তারপরেই ফিরে এল জলতরঙ্গ হাসি। বলল, – শান্ত নামে কাউকে চেনো?
হতভম্ব ক্ষিতি বলে, -শান্ত? মানে আমাদের হস্টেলের শান্ত?
আবার হাসি। -না তো এই সালকিয়ায় শান্ত খুঁজতে বেরিয়েছি নাকি!
-ধুস্। মনটা দপ করে নিভে গেল ক্ষিতির। বড়লোকের লালটুস ছেলে মাকাল শান্তকে দোলন চিনল কীকরে! সে ছেলে যেমনই হোক, দেখতে খুব সুন্দর। ক্ষিতির মতো চাষাড়ে নয়। মুখে ক্রিম মাখে রোজ, গায়ে সুগন্ধি ছড়ায়। তার সঙ্গে দোলনের কীসের সম্পর্ক!
কথা নেই ক্ষিতির মুখে। ওপ্রান্ত বলে, – ফোন রাখছি। শুক্রবার মজার খবর দেব একটা।
ফোন রেখে প্রায় টলতে টলতে উপরে উঠল ক্ষিতি। শান্তর খবর আর মজা – এই দুটো শব্দ তাকে পোড়াতে লাগল। তেতো মেজাজ নিয়েই কোনোরকমে চানখাওয়া সারল। দুপুরে তাসের আসর বসানোর কথা একবারও না বলে বিছানায় পড়ে পড়ে ঘুমাল। শ্রী সিনেমায় তরুণ মজুমদারের ‘নিমন্ত্রণ’ চলছে। কাকুর কথাতেই অভীক ব্র্যাকেটের জন্য ইভনিং শোতে ছটা টিকিট কেটে রেখেছিল। হাত ধরে টানাটানি করা সত্ত্বেও কাকু গেল না। শরীর নাকি তার ভালো লাগছে না। ওরা বাধ্য হয়ে কাকুর টিকিট দুলালকে গছিয়ে দিল।
রবিবারের সন্ধেয় সারা হস্টেল শুনশান। কাকু চিত হয়ে শুয়ে কড়ি বর্গার দিকে তাকিয়ে আছে। অনেক উঁচু ছাদ। কড়িবর্গার ফাঁকে দড়ি গলাতে গেলে খাটের উপর চেয়ার পেতে তার উপরে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করতে হবে। উঠব উঠব করেও উঠতে পারছে না কাকু, সারা গায়ে আলস্য জুড়ে বসেছে। এমন সময় মলয় ঘরে ঢুকে এল।
মলয় ইদানীং ইতিহাস ছেড়ে ভারতীয় দর্শন পড়ছে। পার্ট ওয়ান পরীক্ষার আর দেরি নেই বেশি। এখনও পদার্থবিজ্ঞান তার দুয়োরানি। ঘরে ঢুকে তাকে শুয়ে থাকতে দেখে বলল, – এমন অসময়ে শুয়ে আছো? মন খারাপ না-কি?
ক্ষিতির গলা ভিজে এল, বলল, – ভীষণ।
–ওঠো ওঠো। আমার কাছে মন-খারাপের ওষুধ আছে। প্যান্টশার্টটা গলিয়ে নাও।
আলস্য ছাড়তে চাইছে না ক্ষিতিকে। সে নিশ্চেষ্ট, শুয়ে শুয়েই বলল, – কদ্দুর যেতে হবে?
–এই তো সামনেই। বিবেকানন্দ রোডে।
ক্ষিতি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। কী ওষুধ, কেমন ওষুধ। মলয়ের সমবেদনায় ভিতরে ভিতরে সে বিগলিত। উঠে প্যান্টশার্ট পরল, তারপর মলয়ের পিছন পিছন সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। হস্টেলের গেট পেরিয়ে রাস্তায় নেমে মলয় ক্ষিতিকে পাশে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওষুধের গল্প শুরু করল, – বুঝলে ক্ষিতি, সব নেশা আমার দেখা হয়ে গেছে। তোমাদের সঙ্গেই শুরু করেছিলাম মদ দিয়ে। তারপর গাঁজা, ভাঙ, আফিম – শেষ পর্যন্ত হেরোইন, এল এস ডি-র স্বাদও আমার নেওয়া হয়ে গেছে। প্রতিটি মাদকেরই বিশেষ বিশেষ প্রতিক্রিয়া আছে। খুব ইন্টারেস্টিং।
ক্ষিতি বলল, – এল এস ডি, হেরোইন পেলে কোথায়?
মলয় বলল, – সে অনেক গল্প। আমাকে একজন বলেছিল, মার্কুইস স্ট্রিটে পাওয়া যায়। তো দিনের পর দিন আমি মার্কুইস স্ট্রিটে ঘোরাঘুরি করেছি। রাস্তায় সন্দেহজনক নেশাড়ুদের জিজ্ঞেস করেছি। কেউ কিছু বলতে চায় না। একদিন একটা লোক এল এস ডি বলে এক পুরিয়া পাউডার গছিয়ে দিল। কীভাবে টানতে হয় আগেই জেনেছিলাম অভিজ্ঞ একজনের কাছে। লোকটাও সেই একই পদ্ধতি বলল। কিছুই হলো না, বুঝলে। গাঁজা টানলে যেটুকু হয় সেটুকুও না। বুঝলাম জালি মাল গছিয়েছে। তারপরে একদিন ওখানেরই একটা গাঁজার ঠেকে গিয়ে বসেছি। একটা লোক আমাকে ডেকে নিয়ে একটা সরু গলির মধ্যে ঢুকল। বলল, পাতা চাহিয়ে না? শ রুপিয়া দো। আসলি মাল মিলেগা। মেরা সাথ বইঠ কর ফুঁকেগা। খুদ মালুম হো যায়গা মাল আসলি হ্যায় কি নেহি।
আসলে অনেক দিন ধরেই ওরা আমাকে লক্ষ করে চলেছিল। কিন্তু আমি সত্যিই এল এস ডি খুঁজছি, না কি পুলিসের ইনফরমার – সেটা যাচাই করছিল এতদিন। যে আমাকে জালি মাল দিয়েছিল সে ওই একই দলের লোক। নিশ্চিত হয়ে তবে আসল মাল দিল। ওদের ঠেকেই জিনিসটা ফুঁকলাম। একটা রাংতার মধ্যে পাউডারটা রেখে জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে লম্বা টান দিতেই বুঝে গেলাম এ একেবারে আসল জিনিস। ওরাই একটা ট্যাক্সি ডেকে আমাকে ট্যাক্সিতে তুলে দিল। ড্রাইভার ঠিকানা জেনে নিয়ে আমাকে হস্টেলের গেটে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। ভাড়া পর্যন্ত চাইল না। বুঝলাম আমি নতুন বুঝে পাউডারের দামের সঙ্গে ট্যাক্সি ভাড়াও ধরে নিয়েছিল।
ক্ষিতি ভাবছিল মলয়ের বাবা তাকে কত টাকা পাঠান – এক পুরিয়া নেশার জন্য একশো টাকা! মলয় বলছে, – বুঝলে ক্ষিতি, আমি তো কোনোরকমে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়েছি – সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথার মধ্যে আমার নিজের শরীরের ভেতরের ক্রিয়াকর্ম স্পষ্ট ছবির মতো ভেসে উঠেছে। আমি দেখতে পাচ্ছি আমার হার্ট একবার প্রসারিত হচ্ছে একবার সংকুচিত হচ্ছে আর আমার শিরা উপশিরা দিয়ে রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে। দেখতে পাচ্ছি আমার লিভার কিডনি প্যানক্রিয়াস ফুসফুস স্টমাক ইন্টেসটাইন কেমন করে নিজের নিজের কাজ করে চলেছে। বুঝলে ক্ষিতি পয়সা উশুল। নেশা একেবারে এ ওয়ান। তবে সব দিক বিবেচনা করলে – খরচ, শরীরে চনমনে ভাব, লাস্টিং এফেক্ট – সিদ্ধি ইজ দ্য বেস্ট। এর ধারেকাছে কেউ নেই। মনখারাপের যম। এল এস ডি তারপরে আর একদিন মাত্র নিতে পেরেছিলাম। অত টাকা রোজ জুটবে কোথায়! দ্বিতীয় বার পঁচাত্তর নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমি এই দোকানের এক গ্লাস শিবশক্তি শরবতে স্টিক করেছি। রোজ এক গ্লাস স্পেশাল শরবত খেয়ে নিই। জব্বর নেশা, খরচ মাত্র আট আনা।
তারা ততক্ষণে বিবেকানন্দ রোডের ফুটপাথের গায়ে একটা সাজানো গোছানো গুমটির কাছে পৌঁছে গেছে। গুমটির ভেতরে মাথার দিকে বিশাল একটা ত্রিশূলধারী শিবের বাঁধানো ছবি। সামনের দিকে বিভিন্ন আকারের তিনটি মাটির ভাঁড়। একটি দইয়ের, অন্য দুটিতে মন্থনী দিয়ে শরবত গোলা হচ্ছে। বড় ভাঁড়ে সাধারণ শরবত, ছোট ভাঁড়ে স্পেশাল। মলয়কে দেখেই শিবভক্ত দোকানির এক গাল হাসিভরা অভ্যর্থনা – আইয়ে সাব আইয়ে।
মলয় বলল, – দুটো বড় স্পেশাল। এই ‘বড়’ গ্লাসের মাপ। বড় গ্লাস সবাই হজম করতে পারে না বোধহয়। মলয়ের সঙ্গে ক্ষিতিও চোঁ চোঁ করে বড় গ্লাস খালি করে ফেলল। চমৎকার স্বাদ! মলয় বলল, – চলো এবার হস্টেলে ফিরি। একটু পরেই দেখবে সব মন খারাপ হাওয়া হয়ে গেছে।
আহা, সিদ্ধির সঙ্গে হাওয়া একেবারে নির্ঘাত, মোক্ষম। কয়েক পা এগিয়েই ক্ষিতির মনে হলো সে হাওয়ায় ভাসছে। আনন্দধারা বহিছে হৃদয়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যেন সে হস্টেলে পৌঁছে গেল। মলয়ের কথা ভুলে গেছে, নিজের বিছানায় নিজেকে শুয়ে থাকতে দেখল। হরি ঘোষ স্ট্রিটের ওপারে, হস্টেলের ঠিক উল্টো দিকে সিইএসসি-র একটা জেনারেটার হাউস আছে। সেখান থেকে অষ্টপ্রহর মৌমাছির গুঞ্জরণের মতো একটা আওয়াজ ভেসে আসে। দিনের বেলায় শোনা যায় না, অন্যান্য আওয়াজে চাপা পড়ে থাকে। কিন্তু রাত বাড়লে সেই আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যায়। কী-আশ্চর্য, সিদ্ধির গুণে সেই গুনগুনানি অন্য সব আওয়াজকে ছাপিয়ে ক্ষিতির মাথার মধ্যে ঢুকে পড়ল। প্রথমটা বেশ মজার। ক্ষিতির মনে হলো সেই গুঞ্জরণ তার মাথার মধ্যে পাক খেতে খেতে তাকেও বনবন করে ঘুরিয়ে চলেছে। ক্রমশ বেড়ে চলেছে তার গতি। এবার ভয় পেল সে, এইভাবে গতি বাড়তে থাকলে তার মাথা ফেটে বেরিয়ে যাবে এই গুঞ্জরণ! নিমেষে সেই ভয় তাকে স্বর্গ থেকে নরকে আছড়ে ফেলল। সারা শরীর পাক দিয়ে বমির বেগ উথলে উঠল। কোনোরকমে বিছানা থেকে উঠে সে দক্ষিণের বারান্দায় বেরিয়ে উবু হয়ে বসে বমি করতে শুরু করল। বিকট আওয়াজের সঙ্গে দমকের পর দমক উঠে আসছে বমি। একটু পরেই দেখে, মলয়, হয়তো তার ঘর থেকেই এসে তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। বলল, – কী হলো ক্ষিতি?
ক্ষিতি বলে, – আমার অবস্থা খুবই খারাপ।
মলয় তাকে ধরে তুলতে তুলতে বলল, – আমার অবস্থাও তদ্রূপ।
ভয়ানক সেই পরিস্থিতির মধ্যেও মলয়ের সাধুভাষা প্রয়োগে আবছা হাসি খেলল ঠোঁটে। তাছাড়া, মলয়ের শরীরে, কথায় ‘তদ্রূপ অবস্থা’র কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। সে একটা জলের জগ নিয়ে এসে ক্ষিতির মুখ ধুইয়ে দিল। বলল, হস্টেলে তুমি আমি ছাড়া কেউ নেই। ফিরুক সবাই, তারপর কিছু একটা করা যাবে। ততক্ষণে ক্ষিতির মাথা থেকে গুনগুনানি বেরিয়ে গেছে, আবার সেই ফুরফুরে ভাব ফিরে এসেছে। বিছানায় শুয়ে পড়ল সে। যেই শুয়েছে ফিরে এল গুঞ্জরণ। প্রথমে মৃদু, মনোহর। তারপরে গতি বাড়িয়ে আবার মাথা ফেটে বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। আবার শরীর গুলিয়ে বমি। এইভাবে কতবার যে পর্যায়ক্রমে একই জিনিস ঘুরেফিরে যাওয়া-আসা করল খেয়াল করতে পারল না ক্ষিতি। এক সময় মনে হলো তার পাকস্থলির পুরোটাই বমির সঙ্গে বেরিয়ে গেছে। মাঝরাতে ঘুম এল। টানা আটচল্লিশ ঘণ্টা খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে ঘুমিয়ে কাটাল সে। দুদিন পরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেতে প্রতিজ্ঞা করল, মলয়ের সিদ্ধি মলয়েরই থাক, বাকিটা জীবন সে শিবশক্তির ধারেকাছে আসবে না।
(ক্রমশ)
