আহাম্মকের খুদকুড়ো। পর্ব ৭। মা অন্নপূর্ণা । লিখছেন দুর্লভ সূত্রধর

মা অন্নপূর্ণা

আজকে ভাবতে গেলে এ বিস্ময় বাধা মানে না যে, মা এতসব করতেন কী করে – কী করেই বা বাবার একার রোজগারের অর্থে এতগুলি সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দিতেন! প্রথমে শুধু অন্নের কথাই বললাম, কেননা জীবনের হাঙরের ঢেউয়ের লুটোপুটি খেতে খেতে আমাদের বিজুরিয়ার মতো কাউকে কাউকে একথা বুঝে নিতেই হয় যে, জীবনের সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার হলো দু-বেলা দু-থালা ভাতের গল্প – বাকি সব বাজে বকোয়াস্‌!

মা কীভাবে সেই আসল গল্পটাকে জীবন্ত রাখতেন, এখনও তা বোঝার ক্ষমতা নেই আমাদের।

আমাদের চারপাশে যে-সময়ে যতরকমের তরকারি পাওয়া যেত – সবই আমাদের খেতে হতো। খাব না বললে ছাড়ান ছিল না। সুতরাং তেঁতো থেকে কালো কালো শাক, অখাদ্য ডুমুর, ঝিঙে-পটল থেকে গোখাদ্য কুমড়োর তরকারি পর্যন্ত সবই নিয়মিত শোভা পেত আমাদের খাদ্য-তালিকায়। শুধু তরকারি নয়, তরকারির খোসা-ডাঁটা-পাতা সবই আমাদের খেতে হতো।

ডাঁটার তালিকায় লাউ, চালকুমড়ো, সজনে (নেতানো-কচি থেকে হাফ-কচি হয়ে মোটা বিচিসার পর্যন্ত), কাটোয়ার লাল ডাঁটা, পুঁই ইত্যাদি ছিল। কিন্তু খোসার তালিকাটি ছিল অতি দীর্ঘ: লাউ-চালকুমড়ো-র খোসা অল্প তেল দিয়ে ভাজা বা ছেঁচ্‌কি, কাঁচাকলার খোসা ভাজা বা বাটা, ফুলকপির পাতা রসুন দিয়ে বাটা, ফুলকপির ডাঁটা থেঁতো করে সরষে বাটা দিয়ে চচ্চরি। বহু তরকারিতে খোসাসুদ্ধ আলু দেওয়া হতো, কুমড়ো একটু কচি হলেই তা খোসাসমতে তরকারি বা ঘ্যাঁটে দেওয়া হতো।

শুধু খোসা খাওয়ার তালিকায় ছিল এমন-কী আলুর খোসা! যেদিন আলুর খোসা খাওয়া হতো সেদিন বাড়িতে একটা উৎসব উৎসব ভাব বিরাজ করতো। সেদিন খোসা ছাড়ানো হতো একটু মোটা করে, তারপর তা সামান্য চালের গুঁড়ো বা বেসন দিয়ে গায়ে গায়ে মাখা হতো, তেলে দিয়ে ভাজার সময় ছড়িয়ে দেওয়া হতো পোস্ত দানা। পেঁয়াজ ফোড়ন মুসুরির ডাল দিয়ে সেই খোসা-ভাজা গরম গরম খাওয়া হতো।

সংসারের সাশ্রয় করার চেষ্টা তখন সম্ভবত সব সংসারে ছিল। শীতের শেষের দিকে বাঁধাকপি যখন গোরুতে খেতো, দাম কমে যেত ভীষণভাবে, তখন বেশি করে বাঁধাকপি কিনে আনা হতো, মা সেগুলোকে কুচিয়ে রোদে শুকোতে দিতেন। বেশ কড়কড়ে শুকনো হলে তা কৌটোবন্দী করে তুলে রাখা হতো। মাঝে-মাঝে রোদে দিয়ে বর্ষাকাল পর্যন্ত সংরক্ষণের পর বর্ষার বাজারে তরকারির দাম বাড়লে ঐ শুকনো বাঁধাপকপি গরম জলে ভিজিয়ে কিঞ্চিৎ তাজা করে তুলে তরকারি রান্না হতো। স্বাদে-গন্ধে তা ছিল লা-জবাব। একইভাবে নতুন আলু ওঠার ঠিক আগে, পুরোনো আলুর দাম খুব কমে গেলে অনেক আলু কিনে তা গোল গোল করে কেটে হালকা নুন আর গরম জলে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে আলুর চিপস্‌ তৈরি হতো। বর্ষার দিনে ডালের সঙ্গে বা খিচুড়ির সঙ্গে সেই ‘হোমমেড’ চিপস্‌ খাওয়া হতো।

মাছের ব্যাপারেও আমরা ছিলাম সর্বভুক্‌। তখন অজস্র ধরনের মাছ পাওয়া যেতো। আকারে ছোটো, পরিমাণে স্বল্প বা সংখ্যায় গণনার অযোগ্য। আমরা এক-একদিন মায়ের কান বাঁচিয়ে মাছের টুকরোর সঙ্গে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের একাদশী পিসেমশাইয়ের দাড়ি-কাটা ব্লেড দিয়ে জিইয়ে রাখা শিখিমাছের লেজের দিক থেকে এক ইঞ্চির দশভাগের একভাগ কেটে নিয়ে তাই দিয়ে পিসিমার ঝোল রান্নার সঙ্গে তুলনা করতাম।

মনে হয় আঁশ ছাড়া মাছের কোনো অংশই খাবার তালিকার বাইরে ছিল না। একটু বড়ো মাছ হলেই তার তেল-পটকা ইত্যাদি পিত্তিটা বাদ দিয়ে পরিষ্কার করে নিয়ে সামান্য পিঁয়াজ দিয়ে ভাজা করা হতো। এমন-কী ছোটো বড়ো সব ধরনের ট্যাংরা বা শিঙি মাছেরই কন্ঠার শক্ত কাঁটাটা ফেলে না দিয়ে সেগুলো আলাদা করে কড়কড়ে করে ভেজে পিঁয়াজ দিয়ে তরকারি মতো করা হতো।

মাঝে মাঝে মাছহীন দিন।

সেদিন খাবার সময় একটু আরোপিত নৈঃশব্দ বিরাজ করতো।

এতো উদ্ভাবনী খাবারের সমাবেশ সত্ত্বেও সেসব দিনে বাড়ির ছোটোদের কতো রাগ-অভিমান, কত অনুযোগ, খাবারে কতো হতচ্ছেদ্দা। শুধু খাবার নিয়ে নয় – অল্পে খুশি থাকার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের সব দিকেই হয়তো ছিল আমাদের তখন কত অন্তর্গত ছোটো-বড়ো নালিশ!

বাবা ছিলেন মফস্বল শহরের গরীবের ডাক্তার। মানে সেই শহর-বাজারে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য – নিজের কাজে বাবা ছিলেন অপ্রতিহত। বহু দূরবর্তী অঞ্চল ও গ্রাম-গঞ্জ থেকে ছই-ঢাকা গরুর গাড়ি করে রোগীরা আসতেন। সকালবেলায় চেম্বারের সামনের রাস্তায় বেশকিছু গরুর গাড়ির সার লেগে যেত। গাড়োয়ানেরা গরুগুলিকে জোয়াল থেকে খুলে তাদের রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে দিতো, আর ছইওয়ালা গাড়িগুলি পেছন উঁচু করে মাটিতে নামানো থাকতো। শহরের বিশিষ্টজনেদের অনেকে গভীর সন্ধ্যায় বাবার চেম্বারে আড্ডা জমাতেন ও চিকিৎসিত হতেন। এঁদের মধ্যে স্থানীয় পৌরসভার চেয়ারম্যান বা দু-পাঁচজন শিক্ষক ও প্রধানশিক্ষক, শহর-খ্যাত রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। নিম্ন-আয়ের জনসমাজের একাংশও বাবার রোগী ছিলেন। সস্তার চিকিৎসা এঁদের অনেকের ক্ষেত্রে সময়বিশেষে নিখরচার ছিল। এমন-কী শহরের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসকদের পরিবারের লোকেদের চিকিৎসাও বাবা করতেন। কিন্তু ভদ্রেতর বা বিশিষ্টজন নির্বিশেষে এঁরা কেউ ছিলেন বাবার বান্ধব বা পারিবারিক সূত্রে আমাদের আত্মীয়স্বজনের মতো।

বাবা ডিস্পেন্সারি থেকে ফিরে দু-বেলা মায়ের হাতে টাকা দেওয়া ছাড়া সংসারের আর কোনোদিকে নজর দেওয়ার সময় পেতেন না – আমাদের পড়াশুনো, চাল-চলন, মতিগতি, খাওয়া-পড়া, বাবাসহ সকলের শরীর-স্বাস্থ্য, প্রয়োজন-অপ্রয়োজন, আত্মীয়-স্বজন, এসোজন-বসোজন, লোক-লৌকিকতা, সকলের খেয়ালখুশি, এতগুলি ছেলেমেয়ের নানান কিসিমের বজ্জাতি-বদমায়েশি – স-অ-ব দিকে মাকেই নজর রাখতে হতো।

মা এই বৃহৎ সংসারের আবশ্যিক দাবিগুলি মিটিয়ে সবদিকে তাল সামলে কীভাবে চলতেন তা সেদিন ভাববার অবকাশ ছিল না আমাদের। কিন্তু আমরা নিয়মিত মরশুমি ফল খেতে পেতাম। আমের দিনে আমাদের আম খাওয়া শুরু হতো পেয়ারাফুলি, মধুকুলকুলি (এ দুই-ই ছিল ছোটো সাইজের এক্কেবারে দেশী ও প্রতিবেশী-ভ্যারাইটি), আঁটির আম দিয়ে। তারপর বোম্বাই, হিমসাগর, গোপালভোগ, ল্যাংড়া ছুঁয়ে ফজলি, তারপর কালো হয়ে যাওয়া চালানি ফজলি পর্যন্ত আম খাওয়া চলতেই থাকতো।

বাবা একদা একটি বাড়ি বানিয়েছিলেন। আমাদের সেই ‘নিজেদের বাড়ি’-তে যে লিচুগাছ ছিল তাতে প্রতিবছর দেদার লিচু হতো। ছোট্টো আঁটি আর পুরু শাঁস। সেই লিচুর খানিকটা আসত আমাদের কাছেও। সুতরাং স্বল্পমেয়াদি ফল হলেও লিচু পাকার সময় কয়েকদিন আমরা দেদার লিচু খেতাম। আমরা বলতাম ‘বোম্বাই লিচু’। ‘বোম্বাই’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হতো। কিন্তু বোম্বাই-এর নাম মুম্বাই হওয়ার পরে কিছুটা ছন্দ-বিপর্যয় ঘটে এবং এই অভ্যাসে কিছুটা মান্দ্য দেখা দিয়েছে।

ছেঁড়া এবং কলার-ফাটা জামা, রঙ-চটা প্যান্ট, বাড়িতে বানানো ঈষৎ-বেঢপ ধরনের সস্তার মার্কিন কাপড়ের পাজামা, বড়োদের ছেড়ে-দেওয়া জামা-টামা পরতাম আমরা। একটি দুটির বেশি কাপড়-জামাও ছিল না আমাদের। কিন্তু জাম পাকলে বাটিভরা কাসন্দ দিয়ে মাখা জাম, জামরুল, আতা ও নোনা, পাকা পেপে, নুন-কাঁচালঙ্কা দিয়ে মাখা পাকা টম্যাটো, তালশাঁস, আঁটির খেজুর, কয়েৎবেল-চালতা-করমচা মাখা – এসব ছিল ফলের তালিকা আলো করে। সারা বছর আমরা দিনে একটা বা দু-টো করে কমলালেবু খেতাম। সঙ্গে ন্যাসপাতি, পাকা খেজুর, শাকাঁলু, পানিফল –মাঝে মধ্যে আঙুর আর আপেলও জুটে যেত। মরশুম-অনুযায়ী নানা জাতের ফুটি ও তরমুজশ্রেণীর ফলও মরশুমের সময় আমরা পেতাম। রাঙা আলু আমরা পেতাম সিদ্ধ অবস্থায়। রাঙা আলু দিয়ে তৈরি হতো লেডিকেনি ধরনের ‘হোমমেড’ খাবার। সেটা অবশ্য জলখাবারেই পরিবেশিত হতো।

প্রত্যেকদিন বিকেলবেলায় মা গা ধুয়ে পাটভাঙা শাড়ি সাধারণভাবে পরে চাবির গোছা আঁচলে বেঁধে পিঠে ফেলে ঝুড়ি ব্যাগ (যার ডাকনাম ছিল বাস্কেট) নিয়ে ফল কিনতে যেতেন। এটা ছিল কর্মক্লান্ত প্রাত্যহিকতায় মায়ের সুখযাত্রা – এ সময় আমাদের কাউকে নিয়ে বেরোনো ছিল তাঁর না-পছন্দ।

সারদিনের পরিশ্রম-করা বাবার এবং আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য কী না করতেন মা -– গেলাস-ভরা ফলের রস, বোর্ণভিটা বা হরলিক্সের মতো গরম পানীয় নিয়মিত দু-বেলা আমাদের ডিস্পেন্সারিতে দিয়ে আসতে হতো। শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী কখনও কখনও আমাদেরও বোর্ণভিটা-হরলিক্স বা ঐ-জাতীয় ব্রাণ্ডেড পানীয় জুটতো। এছাড়া দিনের পর দিন খাসির টেংরির স্যুপের কথা তো পরে বলেইছি।

কাসন্দ দিয়ে যে শুধু জাম মাখা হতো তা নয়, গোটা গরমকালে পাতে দু-চক্ষের বিষ উচ্ছে বা করলা-বেগুন বা উচ্চে-মিষ্টি কুমড়ো ভাজা তো থাকতোই, তাতে কাসন্দ দেওয়া হতো বলেই তা আমরা খেতে পারতাম। তাছাড়া লাল নটে বা ধূলা-নটে শাকে কাসন্দ দিয়ে পুরো একথালা ভাত উড়িয়ে দেওয়ার উদাহরণ কম ছিল না। কিন্তু যেদিন নিম-বেগুন ভাজা হতো সেদিন তা বাধ্যতামূলকভাবে খেতে হতো চোখের জলের সঙ্গে মেখে। পরে, সেয়ানা হবার পর, যখন শুধু রসনা নয়, বুদ্ধি দিয়ে খেতে শিখলাম তখন নিম-বেগুন ভাজা আমাদের ফেভারিট আইটেম-এ পরিমত হয়েছিল। কাসন্দ দিয়ে কাঁচা কুসি-আমও মাখা হতো, সামান্য রোদে শুকিয়ে তা খাওয়া হতো।

আসলে গোটা গরমকাল ধরে আমরা সকালের পান্তাভাতে তো বটেই – নানাভাবে কাসন্দ খেতাম। কাসন্দ মা কিনতেন বাড়িতেই। কাসন্দ যিনি দিতে আসতেন তাঁর চেহারাটি ছিল দেখবার মতো। রোগা, অস্থিসার চেহারা। গায়ের রঙ ছিল একবারে উজ্জ্বল আভাযুক্ত কালো – পরে বুঝেছি এটাকেই সম্ভবত উজ্জ্বল-শ্যামবর্ণ বলে। তিনি রাস্তায় কাসন্দ হেঁকে যেতেন। সেই হাঁকের লিপ্যন্তর করা অসম্ভব। প্রথমে সামান্য টেনে কা…, তারপর আরও সামান্য টানে সন্…, তারপর সহসা একটি শ্বাসঘাতে দঃহ্‌। তারপর পুরাবৃত্তির সময় – ‘কাসন্দ নেবে নাকি গো-ও, কা…, সন্‌…, দঃহ্‌।’

তাঁর মাথায় থাকতো আগাপাশতলা গোবর-মাটিতে নিপুণভাবে নিকোনো একটি বেতের ধামার মধ্যে বসানো কাসন্দর মাটির হাঁড়ি। হাঁড়িটির বহিঃগাত্র একেবারে যাকে বলে তৈলচিক্কণ, তা-ই। পরনে অতি-সাদা খেটো-ধুতি আর হাতাওয়ালা অতীব ফর্সা গেঞ্জি। তাঁর কোমরটি বয়সের ভারে সামান্য ঝুঁকে এসেছে সামনের দিকে। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় তাঁকে কখনও ধামা সামলানোর জন্য হাতদুটিকে ব্যবহার করতে দেখা যেতো না। হাঁড়িসহ ধামাটি মাথায় গামছার বিড়ের ওপর অবিচলিতভাবে শোভা পেতো। বাড়ির দরজায় এসে তিনি হাঁক দিতেন –‘কৈ গো মা!’

মা হয় একটি কলাই-করা কাঁসি (এখানে কলাই-করা বাসনের একটু পরিচয় দিয়ে রাখা দরকার। কেননা এমন আশঙ্কা করার সংগত কারণ আছে যে এই কিসিমের বাসনটি অচিরেই বিলুপ্ত হতে চলেছে। আসলে এই বাসন ছিল লোহার তৈরি। তাতে থাকতো সাধারণভাবে সাদা কলাইয়ের প্রলেপ। এ বাসনগুলি সংসারে সব কাজে – বিশেষ করে টক-জাতীয় খাদ্যদ্রব্য রাখার জন্য ব্যবহৃত হতো। আমাদের বাড়িতে যেহেতু গরমকালভর ভাতের শেষে পাতলা কাঁচা আমের মিষ্টিহীন প্রকৃত টক খাওয়ার রেওয়াজ ছিল, সেহেতু এমন বাটির যোগানও ছিল যথেষ্ট) বা চিনামাটির বাটি নিয়ে হাজির হতেন দরজায়।

সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে ধীরেসুস্থে মাথা থেকে হাঁড়িসহ ধামাটি নামিয়ে তিনি জুৎ করে বসতেন, তারপর আরও ধীর লয়ে শুরু হতো বিকিকিনি। তাঁর চরিত্রে কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো, তর্ক-বিতর্ক, কোলাহল ছিল না। মায়ের আনা পাত্রে তিনি নারকেলের খোলার মাঝখানে দিয়ে একটি বেতের কাঠি ঢোকানো হাতা দিয়ে হাঁড়ি থেকে মেপে কাসন্দ দিতেন। মায়ের কাছ থেকে পয়সা নিয়ে নিজের কোমরের ধুতির বাঁধন থেকে গেঁজেটাকে মুক্ত করে তার মধ্যে পয়সাটা রাখতেন, তারপর গেঁজেটা যথাস্থানে গুঁজে এবার আমাদের, মানে তাঁকে ঘিরে-ধরা ছোটোদের দিকে মন দিতেন। তখন আমাদের তিন-চারটি ডানহাত তাঁর দিকে প্রসারিত। আবার হাঁড়ির মুখের মাটির সরার ঢাকনাটা খুলে তাঁর ঐ হাতা দিয়ে হাঁড়ি ঘুঁটিয়ে খুঁজে-পেতে তুলে আনতেন ছোটো ছোটো আমসির টুকরো। সামান্য কাসন্দ-মাখানো সেই আমসি দিতেন আমাদের প্রসারিত হাতের তালুর গর্তে। আর মুখে বলতেন – ‘হাত-টাত পয়ঃপোষ্কার তো’?

আমরা প্রায়ই তাঁকে একটা প্রশ্ন করতাম, উত্তরটা জেনেও – ‘এমন কাসন্দ কে বানিয়ে দিল গো?’

বিস্ময়জনক হলেও উত্তরটা একই ছিল – ‘আমার মা গো। এমন কাসন্দ আমার মা ছাড়া এ ‘পৃথিমী’তে আর কেউ কি বানাতে পারে গো!’

তাঁর নিজেরই বয়স আন্দাজ করা যেতো না, বছরের পর বছর আমাদের চোখে তাঁর বয়স বাড়তোও না – তবু চমক লাগতো আমাদের – এই মানুষটিরও মা! তাঁর আবার কত বয়স কে জানে! তিনি অনন্তকাল ধরে তাঁর সন্তানদের জন্য অতুলনীয় কাসন্দ বানিয়ে চলেছেন!

এমনটা মনে করবার কারণ নেই যে, বেচাকেনা শেষ হতেই তিনি ব্যবসার তাড়ায় রওনা দিতেন। ছোটোদের আমসি-পর্ব শেষ হলে নিজের হাতদুটোকে কোলের কাছে জড়ো করে তিনি মায়ের সঙ্গে নিমাই পণ্ডিতের ধীবর পল্লীতে গিয়ে মাছ-ধরা খেলা, কৃষ্ণের দুষ্টুমিতে মা যশোদার জ্বালাতন থেকে শুরু করে কলমি শাকের তরকারি, রসুন দিয়ে পাট পাতার ঝোল ইত্যাদি নিয়ে গল্প করে চলতেন। শেষ পর্যন্ত মায়ের কাছে রবি ঠাকুরের একটা কবিতার আবৃত্তি শুনে তবে ‘জয় হরি’ বলে উঠে দাঁড়াতেন।

অমন একশো কবিতা মায়ের কন্ঠস্থ ছিল।

বড়দির বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সে, আমি তখন বছর চারেক। কিন্তু তারপরেও ছয় ভাইবোনের পড়াশুনো (বিগত শতকের ষাটের দশকের প্রথমার্ধে যখন আমি আর মেজদাদা স্কুলে ভর্তি হই তখন স্কুলের মাস মাইনে ছিল এক টাকা! তখন তিন পয়সায় একটা সাধারণ ও পাঁচ পয়সায় একটা মোটাসোটা ভালো আইসক্রিম পাওয়া যেত; মাংসের কেজি ছিল চার টাকা) সঙ্গে বইপত্র, খাতা-পেন্সিল সবই কিনতে হতো। উঁচু ক্লাসের এবং কলেজে পড়ার খরচা ছিল আরও বেশি; আমি প্রাইমারির গণ্ডি পেরোবার আগেই মেজদি-সেজদিরা কলেজে গিয়ে পৌঁছেছিল, দিদিদের বিয়ের প্রস্তুতিসহ প্রত্যেক বেলা দশ-এগারোটা পাত-পড়া একটি বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের খরচের বায়নাক্কা মিটিয়ে মাকেই সবটা করতে হতো।

তবু কোনো অন্ধ-আতুর, বিপন্ন মানুষকে আমরা মায়ের কাছ থেকে খালি হাতে ফিরে যেতে দেখিনি। তখন প্রত্যেকদিন ভিক্ষা করতে আসতেন অজস্র মানুষ। কেউ গায়ক, কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধী, কেউ বয়স্ক নাচার, কেউ বাউল, কেউ সাধক, কেউ বৈষ্ণব বা বৈষ্ণবী। বাড়ির দরজায় একতারা করতাল খোল বা খঞ্জনি বেজে উঠলেই মা আমাদের কারোর হাত দিয়ে বাটিতে চাল আর একটা আলু বা ঐ-জাতীয় কিছু পাঠিয়ে দিতেন – কিছু না থাকলে পাঁচটা বা দশটা পয়সা। এঁদের কেউ জল খেতে চাইলে জলের সঙ্গে এক দলা আখের গুড়, শীতকাল হলে এক টুকরো পাটালি, নিদেনপক্ষে দুটো বাতাসা। অনেকেই নিয়মিত আসতেন বলে তাঁদের সঙ্গে মায়ের বেশ সখ্য হয়ে গিয়েছিল – ভিক্ষা নিয়ে আমাদের বাড়ির দরজায় বসে বিশ্রাম নিতে নিতে দিব্যি তাঁদের সুখ-দুখের কথা বিনিময় হতো মায়ের সঙ্গে। এইভাবে গাঁ-গঞ্জের কত খবর জানা হয়ে যেত – কত বিচিত্র জীবনযাপনের ধরনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন মা, যা তাঁকে বহুত্বে বিশ্বাসী করে তুলেছিল – মানুষের প্রতি, জীবনের প্রতি করে তুলেছিল শ্রদ্ধাশীল।

মায়ের এমনই সখ্য ছিল শাকউলি মাসিদের সঙ্গেও।

আমাদের বাসাবাড়িটি রাস্তার ওপরে হওয়ায় বাড়ির রোয়াকে দাঁড়িয়েই মা জনসংযোগের যাবতীয় কাজ সেরে ফেলতেন। শহরতলি থেকে সকালবেলায় এই রাস্তা দিয়েই তরিতরকারি যেত শহরের বড়োবাজারে। শাকউলি মাসিরা কাঁখে ঝুড়ি নিয়ে এ পথেই যেত বাজারে। আর যাওয়ার পথে নিয়ম করে মাকে ডেকে শাক দিয়ে যেত – কলমি, হেলেঞ্চা, কুমড়ো বা লাউয়ের ডগা, চার-ছটা কুমড়ো ফুল, বকফুল, একভাগা ডুমুর, কচুর শাক, পুঁইশাক ও ডাঁটা, ওলের ডাঁটা – যেদিন যে সওদা আনত তারা, মাঝে-মাঝে শাকের সঙ্গে পদ্মপাতায় মোড়ানো গুগলি। চোখের পক্ষে ভালো বলে আমাদের মতো ডাক্তারবাড়িতে গুগলির কদর ছিল খুব। এছাড়া শীতকালে পুকুর ডোবায় জলে টান ধরবার দিনে কচুর পাতায় মোড়ানো পুঁটিমাছের ভাগা – মাকে কিছু-না-কিছু দিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে শাকউলি মাসিদের কখনও ভুল হতো না। ফলে একই দিনে একাধিক শাকের বোঝাও মাকে সইতে হতো। সকালে সওদা বাড়ির দরজায় নামিয়ে দিয়ে শাকউলি মাসিরা ঊর্ধ্বশ্বাসে বাজারের দিকে দৌড়াতো – পয়সা নেওয়ারও সময় থাকতো না তাদের হাতে। সেসব কয় পয়সারই বা সওদা – পাঁচ পয়সা, দশ পয়সা – বড়োজোর সব মিলিয়ে চার আনা! এই শাকউলি মাসিদেরই একজন প্রতি বছর মাকে গোটা দুই করে কাঁঠাল দিয়ে যেতো। খাজা আর গোলা কাঁঠালের মিশ্রণ ছিল সেই কাঁঠালের জাতে। নিজের বাড়ির উঠোনের গাছের সে কাঁঠাল ছিল মাসির উপহার। মা দামের কথা বললে মাসি বলতো – ‘না গো দিদি, সবকিছুর কি আর বিকিকিনি হয়? তুমায় না দিলি তো এ কাঁঠাল আমাদের মুকে রোচবে না গো!’

বাজার থেকে অনেক বেলায় বাড়ি ফেরার পথে মাসিরা আবার মায়ের কাছে আসত। শুধু পয়সা নিতে নয় – খালি ঝুড়িটাকে সদর দরজার পাশে রেখে তারা হাঁক পাড়ত – ‘কৈ গো দিদি!’

বোনের আহ্বানে মা হাজির হতেন তেলের শিশি নিয়ে; মাসিদের প্রসারিত হাতের তালুতে মা ঢেলে দিতেন একটুখানি তেল। দরজার পাশে বসে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তেলটুকু তরিজুৎ করে হাতে পায়ের রোদের দাঁত-বসানো কর্কশ চামড়ায় ঘষে ঘষে মেখে নিয়ে মাসিরা রাস্তার ‘মিনিসিপাল’ কল থেকে ‘ছ্যান’ করে আসত। মশারির মতো জ্যালজ্যালে শতছিন্ন শাড়িটাকে ভিজিয়ে শুকিয়ে বাঁচিয়ে প্রকাশ্যে স্নান করার সে-এক অসামান্য প্রযুক্তি!

স্নান সেরে খালি ঝুড়ির মধ্যে রাখা বড়ো কচুপাতা বা পদ্মপাতা জলে ধুয়ে পেতে তারা দ্বিতীয়বার হাঁক পাড়ত – ‘কৈ গো দিদি!’

মা এবার আসতেন বড়ো কাঁসিতে ওপচানো ভাত নিয়ে। কচুর পাতায় পড়ত ভাত, ডাল, তরকারি – যে-দিন যা রান্না হতো। দু-একদিন এক-টুকরো মাছ। সে ভাত কাঁচালঙ্কা ডলে নিমেষে উধাও। তারপর পিতলের ঘটি থেকে এক-পেট জল খেযে উদ্‌গার তুলে মাসিরা বলত – ‘ওঃ! কী খ্যালাম দিদি, একেবারে অমেত্ত। দিদি আমাদের অন্নপূন্না!’

মা চেয়েথাকতেন স্মিত-উজ্জ্বল মুখে – যেন এক ব্রত উদ্‌যাপন করা হলো। ব্রত উদ্‌যাপনই বটে!

ছোটো ঘরের দেওয়ালের তাকে কয়েকটি দেবদেবীর ফটো নিয়ে মায়ের ঠাকুরেরা ছিলেন দিব্যি, নির্বিঘ্নে। সকালে ব্যস্ততার মধ্যে মায়ের হাত খালি হলে তবে ঠাকুরেরা জল পেতেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যেবেলা লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়তে যতটুকু সময় লাগত সেটুকুই ছিল দেবীর বরাদ্দ। আমাদের কাছে বিশেষ দিন, কেননা সেদিনই শুধু প্রসাদে থাকত শান্তিবাবুর দোকান থেকে আনা রসগোল্লা।

ব্যাস্‌ ঐ পর্যন্ত। আমরা মাকে কখনও উপোস ব্রত নিয়ম আচার বিচার পালন করতে দেখিনি। মায়ের সোজা যুক্তি ছিল – নিত্যি উপোস করে মানত করে ঘটা করে পুজো-আচ্চা করে শরীর খারাপ করলে আমার এতবড়ো সংসোর কে দেখবে! ঠাকুর তো সবই জানেন – কিছুমাত্র দোষ ধরবেন না।

অন্নপূর্ণা মায়ের দোষ আর কে ধরবে!

মায়ের হাঁড়িতে কখনও ভাতের অভাব হতো না। যদি-বা কখনও হতো তা আমরা টের পেতাম না – তার চোটটা হয়তো মায়ের পাতের ওপর দিয়েই যেত! মায়ের হাতে টাকা জমলেই মা চাল কিনে রাখতেন। রীতিমতো মুটে নিয়ে আসত বিরাট চালের বস্তা – একশো কেজি বা এক কুইন্টাল চাল। একটা বড়ো কালো ড্রামে (তদানীন্তনকালের কেরেসিন তেলের ড্রাম) তা ভর্তি করা হতো। তাতে না ধরলে বড়ো বড়ো হাঁড়িতে চাল রাখা হতো। এইভাবে যথেষ্ট পরিমাণে গমও মজুত থাকত। চাল ফুরোবার আগেই আবার নতুন চাল কেনা হতো। সস্তার সময়ে কয়েক বস্তা আলু কিনে রাখতেন মা। চৌকির তলায় সাদা বালির আস্তরণের ওপর আলু বিছিয়ে ছিল মায়ের নিজস্ব হিমঘর!

মজুতের প্রক্রিয়াটা শুনতে যতটা সহজ, কাজে ততটাই কঠিন ছিল। চাল বা গমে পোকা লেগে যেত বলে নিম পাতা বা পরতে পরতে চুন ছড়িয়ে রাখা হতো এবং নিয়মিত তদারকি করত হতো। আর প্রত্যেকদিন চৌকির তলায় ঢুকে আলুগুলোকে উল্টে পাল্টে দিতে হতো, বেছে বেছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল আলুগুলোকে সেদিনের রান্নার জন্য বের করতে হতো।

এত হ্যাপা পুইয়েও বাবার প্রণোদনায় মা চাল-গম-আলু ঘরে রাখতেন – যেন এতগুলি সন্তানের দুধ-ভাত নয় শুধু ভাতের জোগাড়টুকু অন্তত থাকে। ভারতচন্দ্রের অন্নপূর্ণা ভবানন্দকে অতুল ঐশ্বর্য দিয়েছিলেন।

কিন্তু আমাদের অন্নপূর্ণা মায়ের আত্যন্তিক চেষ্টা সত্ত্বেও অন্তত একদা দু-বেলা দু-থালা ভাতের গল্পটি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।

বিগত শতকের ষাটের দশকের মধ্যান্তিক সময়ে আমাদের সমগ্র রাজ্যেই তীব্র খাদ্য-সংকট দেখা দেয়। চালের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়, তারও চেয়ে বড়ো কথা – পয়সা থাকলেও চাল ছিল অমিল। উৎপাদন হ্রাস, সরকারি স্তরে বাধা, কালোবাজারিদের দাপট সমাজজীবনকে একেবারে দিশেহারা করে দেয়। চাল পাওয়া যায় না, গম পাওয়া যায় না খোলাবাজারে – চারিদিকে নেই নেই ভাব। সহসা একটা ভয় সব গৃহস্থকে গ্রাস করল যেন। চাল পাওয়া না যাওয়ায় আমাদের মতো পরিবারগুলিতে দু-বেলা ভাত খাওয়া তো দূরের কথা এক বেলা ভাত জোগানোও কঠিন হয়ে পড়ল। এমন-কী গমও অমিল হলো। বিদেশি-সাহায্য বাবদ পাওয়া যেতো গমের বদলে ভুট্টা ও মাইলো।

কোথাও মাথাপিছু এক-দু কেজি চাল দেওয়া হবে শুনলে আমাদেরও পড়াশুনো ফেলে থলি হাতে দৌড়তে হতো। আমাদের মতো পরিবারে রেশনের অখাদ্য চালের ভাতই হোক কিংবা খুদের ফেনা ভাতই হোক একবেলা ভাত জুটত, কিন্তু আরও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলিতে অর্ধাহার ও অনাহার ঘনিয়ে এসেছিল। এই সংকটকালে রাজ্যজুড়ে, এই শহরেরও স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল।

(ক্রমশ)

দুর্লভ সূত্রধর
লেখক | + posts

লেখক ছদ্মনামের আড়ালেই থাকতে চান, তাই ছবি কিংবা পরিচিতি কিছুই দেওয়া গেল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *