আহাম্মকের খুদকুড়ো। পর্ব ৬। জলখাবার । লিখছেন দুর্লভ সূত্রধর

আর্থিক ওঠা-পড়ার ঝড় আমরা ততটা বুঝতে পারতাম না। শুধু জলখাবারে রুটির সঙ্গে তরকারি কম পড়ত, তখন গরম রুটির উপর দু-তিন ফোঁটা সরষের তেল ফেলে তার ওপর আর একটা রুটি দিয়ে ঘষে একটু নুন ছড়িয়ে কাঁচালঙ্কা ডলে পাকিয়ে খাওয়া হতো। সেটা এতই স্বাদিষ্ট ছিল যে, আমরা তো শখ করেই তেল-লঙ্কা দিয়ে মাঝে মাঝে গোটা কয়েক রুটি মেরে দিতাম।

গরমের শুরুতে মাঝে-মধ্যে ছাতু খেতে হতো — আমাদের পছন্দ ছিল ছোলার ছাতু আর মায়ের স্বাস্থ্যবিধির তালিকায় ছিল বিস্বাদ যবের ছাতু। আখের গুড় দিয়ে যবের ছাতু-মাখা খাওয়াটা একটা দুঃখজনক অভিজ্ঞতা। অবশ্য আমাদের দাবি মেনে মাঝে মাঝে ফুটপাথের ছাতু-বিক্রেতাদের স্টাইলে ছোলার ছাতু নুন-তেল-কাঁচালঙ্কা-পিঁয়াজ দিয়ে মেখে দিতে মেজদি — প্রফেশন্যালদের থেকে তার স্বাদ ভালো হতো কী না তা অবশ্য ঐ বয়সে তুলনা করা আমাদের পক্ষে ছিল অসম্ভব।

এছাড়াও আর-এক ধরনের জলখাবার ছিল, যাকে কী না অঙ্গুলিগণ্য দিনের সুখ বলা যায়। তা বাড়িতে তৈরি হতো না, আসতো প্যাকা ঘোষের দোকান থেকে। এই বস্তুটি অন্য কোথাও পাওয়া যেত না। নামে কচুরি হলেও তার সাইজ ছিল সেকালের এক টাকার কয়েনের থেকে সামান্য বড়ো। দাম ছিল প্রথম দিকে এক পয়সা, পরে পাঁচ পয়সা, তারপর মূল্য বৃদ্ধি হয়ে হয দশ পয়সা, চার আনা, আট আনা। এটি পেতেও খেতে হলে বেশ পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং পরিশ্রম করতে হতো। আগের দিন রাত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর যথেষ্ট সকাল সকাল হওনা দিতে হতো প্যাকা ঘোষের দোকানের দিকে।

দোকানে পৌঁছে প্রথমে দোকানের গদিতে আসীন প্যাকা ঘোষ বা তাঁর ভাইয়ের কাছে গিয়ে কচুরির সংখ্যা জানিয়ে দোকানের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হতো – কখন কচুরির খোলা নামে। দোকানের বাইরে তখন বেশ ভালো সংখ্যায় অপেক্ষারত মানুষ হাজির। তাদের মধ্যে সংখ্যাধিক্য মিউনিসিপ্যালিটির সাফাই কর্মীদের।

তখন ভোর হওয়ার আগেই মেয়ে-পুরুষ সাফাই কর্মীরা মোটা মোটা শলার ঝাঁটা হাতে রাস্তা ঝাঁট দিতে শুরু করত। আর আলো ফোটার পর পরই তাদের অনেকেইে নিয়মিত প্যাকা ঘোষের দোকানের সামনে সিকি-কচুরি খাওয়ার জন্য ভিড় লাগাতো। এখানে কচুরি খেয়ে তারা যেতো নরেশদার চায়ের দোকানে চা খেতে। এরা নিয়মিত খরিদ্দার ছিল বলে আর চেঁচামেচির ভয়ে প্যাকা ঘোষই হোক আর নরেশদাই হোক, খরিদ্দার হিসেবে এদের যত্ন করতেন খুব। বিজুরিয়ার মতো বনেদি সাফাইকর্মীরা আবার কচুরির পরে প্যাকা ঘোষের বিখ্যাত রসগোল্লা দু-চারটে উড়িয়ে দিত। কচুরির কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বিজুরিয়ার কথা বলতেই হবে। নামের সঙ্গে তার চাল-চলনের বিলক্ষণ মিল ছিল!

বিজুরিয়া ছিল যাকে বলে একটা কাল্টিভেট করার মতো  ক্যারেক্‌টার। মুখে দু-চারটি বসন্তের দাগ, বাংলা মদ বেসনের কারণে চোখ সদাই লাল, পরনে তার রঙ্‌দার জামা, সম্বৎসর গলায় একটা লাল-রুমাল। সমগ্র ধাঙড় বস্তির মধ্যে একমাত্র সেই-ই রীতিমতো সই দিয়ে ‘মিনিসিপাল্‌টি’ থেকে বেতন নিতো। তার গানের গলাটি ছিল মিঠে। মেজাজে থাকলে রামায়ণের কোনো কোনো অংশ গেয়ে দিতো। বোধহয় তুলসিদাসের রামায়ণ। তা ছাড়াও সে ছিল গানের সমঝদার। রাতের রাস্তায় কোনা মদ্যরসিক ভুলসুরে গান গাইলে বিজুরিয়ার লাঞ্ছনার হাত থেকে তার আর নিষ্কৃতি ছিল না। মদ খেলেও সে কাজেকর্মে ছিল দুরন্ত। সকালে দ্রুত হাতে ঝাঁটা চালাতে চালাতে সে গান গেয়ে চলত:

‘কুন্দ ইন্দু সম দেহ উমা রমণ করুণা অয়ন।
জাহি দীন পর নেহ করও কৃপা মর্দন ময়ন।।’

তার মিষ্টি কন্ঠের গান শুনে ঘুম ভাঙতো অনেকেরই। বিশেষ করে তাঁদের, যাঁরা ভোরের আলো ফোটার আগে ঊষাচর চায়ের দোকানে দোকানে হানা দিয়ে দিনের প্রথম কাপ চায়ের স্বাদ গৌর বেকারির বাখরখানি বিস্কুট আর স্বাস্থ্যসেবীদের সঙ্গে গুলতানি করতে করতে গ্রহণ করতেন। এছাড়াও বাংলা লঘু সংগীতে ছিল বিজুরিয়ার অসাধারণ দক্ষতা — বিশেষ করে স্পষ্ট বাংলা উচ্চারণে সে মান্না দে, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখের গান গাইতো তার দরদী গলায়।

তুলসীদাসের রামায়ণ গান করলেও বিজুরিয়া প্রকৃত অর্থেই ছিল ‘তন্‌খাইয়া’। ঠাকুর-দেবতাকে সে বিশেষ  রেয়াৎ করত না। সক্কালবেলা তার প্রাত্যহিক প্রথম কচুরিটা মুখে তোলার আগে সে কপালে ছুঁইয়ে নিতো। তা দেখে কেউ যদি তাকে জিজ্ঞেস করে বসতেন – ‘ওরে বিজুরিয়া, কোন্‌ ঠাকুরকে প্রণাম করলি?’ বিজুরিয়া তৎক্ষণাৎ সপাটে জবাব দিতো – ‘পরনাম! ও সে তো কচৌরি দেব্‌তাকে। খানার থেকে বড়ো ঠাকুর কোই না আছে!’

— ‘তবে যে রামগান করিস!’

— ‘উ তো গানা আছে।’

ঊষাকালে অল্প সময়ের মধ্যেই বিজুরিয়া কিলোমিটার-কয়েক রাস্তা ঝাঁট-পাট দিয়ে রাস্তার পাশের ‘টিউকলে’ হাত-পা ধুয়ে হাজির হতো প্যাকা ঘোষের দোকানে। কোন জানা নেই আমাদের সে জাত-পাত-বর্ণ-পেশা-অভিজাত-অনভিজাত বর্গে বিভাজিত শহরে বিজুরিয়াকে সকলেই সমঝে চলতেন, একটু যেন ভালোওবাসতেন। সম্ভবত সে তার ‘খেটে খা ষোলোআনা তৃপ্তি চাই’-গোছের শাহী-মেজাজের কারণে।

যখন প্যাকা ঘোষের দোকানের হালুইকরের কোনো সহকারি কচুরির প্রথম খোলা ভেজে ঝুড়িতে করে নিয়ে ভিয়ান ঘর থেকে দোকান ঘরের মধ্যে পা দিত তখন অপেক্ষমান কচুরিসেবীদের মধ্যে হর্ষোল্লাসের ধ্বনিসহ তৎপরতা দেখা দিতো। সেই আধা-জনতার মাঝখান থেকে নিজের দাবি মতো কচুরি সংগ্রহ করা রীতিমতো কসরৎ-এর ব্যাপার ছিল। কেননা, এই কচুরি ভাজা আর বিক্রির মেয়াদ ছিল মাত্র মিনিট পনেরো, ফুরিয়ে গেলে ফিরে আসতে হতো শূন্যহাতে, ভগ্নহৃদয়ে।

প্যাকা ঘোষ প্রায়ই বলতেন – ‘এসব বেচে শুধু লস হয়, নেহাৎ ঠাকুদ্দার আমল থেকে চলে আসছে, বাবাও বলে গেছেন — তাই এখনও খেতে পাচ্চ, নইলে লস আর লস।’

শালপাতার ঠোঙায় তলায় তরকারি, তার ওপর আর একটা শালপাতার টুকরো বিছিয়ে কচুরি। কী জাদু ছিল এই কচুরিতে কে জানে! হিং তো দেওয়া থাকতোই, ঐটুকু কচুরির মধ্যে কীভাবে পুর দেওয়া হতো – সেও এক আশ্চর্য করণকৌশল। সামান্য একটু তরকারি ছুঁইয়ে গোটা কচুরিটাই একবারে মুখে পুরে দিতে হতো। প্রতিদিনই প্রথম কচুরি পেতো বিজুরিয়া। প্যাকা ঘোষ তাকে স্বাদ-সমঝদার বলে মনে করতেন। প্রত্যেকদিনই প্রথম কচুরিটা মুখে দেবার পর প্যাকা ঘোষ বা তাঁর ভাই বিজুরিয়াকে জিজ্ঞেস করতেন – ‘কী রে বিজুরিয়া, ঠিক আছে তো?’

কচুরি মুখে দিয়েই আবেশে চোখ বন্ধ রেখেই বিজুরিয়া উত্তর দিতো – ‘হাঁ, হাঁ। একদম ফাস্‌ কাস।’

এই জিজ্ঞাসা বা উত্তরের পৌনপুনিকতায় কোনো পক্ষেরই কোনো ক্লান্তি ছিল না। অতি দ্রুত কচুরি সেবনের পর শুরু হতো দ্বিতীয় পর্ব। বিজুরিয়ার বাড়িয়ে দেওয়া শালপাতার ঠোঙায় প্যাকা ঘোষ তাদের চিমটে দিয়ে দুটি রসগোল্লা ফেলে দিতেন। রসগোল্লায় কামড় দেবার পর আবার সেই একই জিজ্ঞাসা ও সেই একই উত্তর।

কিন্তু একদিন, প্রবল গ্রীষ্মকালের সকালে ছন্দপতন ঘটল। সেদিন কোনো কারণে দোকানের এক কর্মচারি বিজুরিয়ার শালপাতায় রসগোল্লা নিক্ষেপ করার পর বিজুরিয়া রসগোল্লায় কামড় বসাতেই প্যাকা ঘোষ যথারীতি জিজ্ঞেস করলেন – ‘কী রে বিজুরিয়া, ঠিক আছে তো?

বিজুরিয়া চোখ খুলে ফেলল, বলল – ‘এ পেকাবাবু, কী দিন এলো হায়! — সোনো মেখে কিরিম দিয়ে কালো মেয়ের রূপ খুলে যায়!’

প্যাকাবাবু খুবই মানী মানুষ ছিলেন, তিনি ইঙ্গিতটা ঠিকই বুঝলেন। রসগোল্লা, যাতে বেলার দিকে বিকেলে বিক্রির জন্য সেন্ট দিয়ে রাখা হয়, আর সারাদিনে বিক্রি না হলে তার পরের দিন বাতিল করে দেওয়া হয় – সকালবেলা কাজকর্মের মধ্যে আজ এখনও সেটা পরীক্ষা করে ফেলে দেওয়া হয়নি। সকালের প্রথম ধাক্কাটা সামলে তবে তো প্যাকাবাবু বা তাঁর ভাই পরীক্ষা করে দেখবেন। দোকানের ছেলেটা না-বুঝে সেখান থেকেই বিজুরিয়াকে রসগোল্লা দিয়ে দিয়েছে! বিজুরিয়ার কথায় গম্ভীর হয়ে গেলেন প্যাকা ঘোষ, বললেন – ‘ও রসগোল্লা খেতে হবে না, তুই ঠোঙাসুদ্ধু ফেলে দে।’ বলে তিনি নিজে হাতে নতুন একটা শালপাতার ঠোঙা গেঁথে সবিশেষ যত্ন করে দুটি রসগোল্লাসহ তা বিজুরিয়ার হাতে তুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন – ‘কী, কেমন?’

এবার বিজুরিয়া রসগোল্লায় কামড় দিয়ে চোখ বন্ধ করে বলে উঠল – ‘রসগুল্লা লয় গো, এ যে রসের সমুন্দর।’

বিজুরিয়া রসগোল্লা খেয়ে শালপাতার ঠোঙার কাঠির বাঁধন খুলে পাতার রসটুকু চেটে নিজের লোটায় জল নিয়ে জল-টল খেয়ে দোকান ছেড়ে যাবার সময় প্যাকা ঘোষকে পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করে গেল – ‘এ পেকাবাবু, তুমার লোকটা বাচ্চা ছেলে আছে, উকে বকাবকি কোরো না, ওকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিও না। নাইলে আর তুমার দুকানে আসবো নাই।’

আশ্চর্যের কথা, প্যাকাবাবু বিজুরিয়ার অনুরোধ রেখেছিলেন!

প্যাকা ঘোষের সিকি-কচুরির দিন গিয়েছে, বিজুরিয়া বা প্যাকাবাবুরাও নেই – যে কী না অপরকে পীড়ন থেকে বাঁচাতে চাইবে।

তা এই কচুরি আনা হতো কদাচিৎ, বছরে এক-আধদিন।

বাড়িতে স্বজন-পরিজন কেউ এলে আনা হতো বাজারের বিশু-ময়রার ডালপুরি। বিশু-ময়রার ডালপুরি এতটাই খ্যাতি অর্জন করেছিল যে বিশুবাবুর নামই হয়ে গিয়েছিল বিশু-ডালপুরি। মানুষের পেশার সঙ্গে তার নামটি জড়িয়ে দেওয়াটা ছিল আমাদের শহরের এক কদভ্যাস। কিন্তু আমাদের বাড়িতে কঠোর অনুশাসন থাকায় মানুষকে বিব্রত করার মতো অবমাননাকর অভিধাগুলিকে আমরা সাধারণভাবে এড়িয়ে চলতাম।

তা বিশুবাবুর সেই ডালপুরির দাম ছিল সেকালের বিচারে অনেক বেশি। সকালে মাত্র ঘন্টা-দুয়েক ডালপুরি ভেজে, শুধুমাত্র ডালপুরি আর রসগোল্লা বেচে এবং মাত্র একবেলা দোকানদারি করেই বিশুবাবু একটা গোটা সংসার অনায়াসে প্রতিপালন করতেন।

এরও পর আছে! – যে ডালপুরিগুলো সাইজে একটু ছোটো হতো বা একটু বেশি ভাজা হয়ে গাঢ় বাদামি বর্ণ ধারণ করতো সেগুলোকে বিশুবাবু পর্যাপ্ত আলুর তরকারি আর একটা করে রসগোল্লা সহযোগে বাজারে জল-বওয়া বাচ্চা ছেলেগুলোকে বিনা-মাগনায় খাওয়াতেন। ছেলেগুলো যতক্ষণ খেতো তিনি নিজে ডালপুরি ভাজার খোলা ছেড়ে উঠে এসে তাদের খাওয়া তদারকি করতেন—যেন উৎসববাড়িতে বালকভোজন চলছে!

কেন জানি না, বিশুবাবুর ডালপুরি কিনলেই শান্তিবাবুর দোকান থেকে আনা হতো গরম জিলিপি। সে-সময় শহরের এই পূর্বাঞ্চলে একমাত্র তাঁর দোকানেই সকালে বিকেলে জিলিপি ভাজা হতো। নাহলে অন্যান্য দোকানে জিলিপি ভাজার সময় ছিল শুধুমাত্র বিকেল আর সন্ধ্যের সংযোগ-স্থল। যাকে সাপে কামড়ায়নি তাকে যেমন বিষের জ্বালা বোঝানো যায় না, তেমনি যিনি শান্তির কচুরি জিলিপি আর নতুন গুড়ের মণ্ডা খাননি, তাঁকে সেই স্বাদের কথা বলে বেদনা-বৃদ্ধি করা অনুচিত কাজ হবে।

জিলিপির  স্বাদ বিশেষভাবে পাওয়া যেতো রবিবার দিন। কেননা ঐ দিনই শান্তিবাবু দোকানে থাকতেন ও প্রতিটি খাবারের তদারকি নিজে করতেন।

আসলে তিনি ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষক। ফর্সা অভিজাত সৌখিন চেহারা ছিল তাঁর, ঘাড় ছাড়িয়ে চুল নামতো, টানা টানা চোখদুটি ছিল স্বপ্নিল – অনেকটা বইয়ে দেখা শ্রীচৈতন্যের ছবিটির মতো। এমন মেদহীন মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী ভূভারতে পাওয়া যেতো বলে মনে হয না। বাড়িতে কাচা সাদা ধুতি আর দু-পাশে পকেটওয়ালা সাদা লঙ্‌ক্লথের সার্ট গায়ে তিনি তাঁদের দোকানের ভাঙা চেয়ারটায় আসীন থাকতেন। কথা বলতেন খুব আস্তে-ধীরে, নিজে ছিলেন অকৃতদার। ছোটোরা দোকানে গেলে তিনি থাকলে তাদের হাতে মণ্ডা বা ছানার মুড়কি-জাতীয় কিচু একটা দিতেনই—সঙ্গে তাঁর মিষ্টি হাসি।

বড়োরা খুবই সম্মান করতেন শান্তিবাবুকে। রবিবার আর সোমবার সকালে তাঁর দোকানে রসগোল্লা বিক্রি হতো খুব। কেননা শনিবার আর রবিবার রাত্রেই তিনি নিজের হাতে বানাতেন রসগোল্লা আর বাদামি বরফি।

মেজদি প্রথম টিউশানের টাকা পেয়ে এক রবিবারের সকালে বিশুবাবুর ডালপুরি, শান্তিবাবুর জিলিপি আর প্যাকাবাবুর রসগোল্লা (তা-ও পার-হেড দুটো করে – ওরে বাবা!) আনিয়েছিল – সে-এক স্মরণীয় সকাল!

শহরে হাতের কাছে ছুট্‌কো-ছাট্‌কা আরও অনেক ধরনের খাবার পাওয়া যেতো। কিন্তু গদ পয়সা দিয়ে বাইরে থেকে জলখাবার আনাটাকে গৃহিণীরা গার্হস্থ্য-সংস্কৃতির পক্ষে হানিকর বলে মনে করতেন।

বিকেলে আমরা জলখাবার খেতাম শুধু স্কুল ছুটির দিনে। কেননা স্কুল থেকে ফিরে আমরা মাছের টুকরোটা পাতের পাশে সাজিয়ে রেখে ডাল-তরকারি দিয়ে একপেট ভাত খেয়ে নয়, প্রায় গিলে মাঠে খেলতে যেতাম। অধিকাংশ দিন মাছটা থালার পাশে সাজানোই থাকত। অত কাঁটা-বেছে মাছ খাওয়ার তখন সময় ছিল না। দৌড়ে মাঠে না গেলে মাঠই পাওয়া যাবে না!

রাতেও মাছ খাওয়া হয়ে উঠত না, ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে মাছ-খাওয়া খুবই ঝুঁকির ব্যাপার ছিল বলে ছোটোদের পাতে রাত্রে মা মাছ প্রায় দিতেনই না।

অবশ্য সন্ধ্যেবেলা খেলে ফিরবার পর আমরা কোনো কোনো দিন মেজদির হাতের মুড়ি-মাখা পেতাম দু-চার মুঠ। তেল বা আম-তেল দিয়ে বাড়িতে সেদ্ধ করা নুন-ছোলা দিয়ে সেই মুড়ি-মাখার স্বাদ বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকা ভালো। শুধু এটুকু বলাই ভালো যে, রাতের খিদে নষ্ট হবার ভয়ে তা পরিমাণে এত অল্প দেওয়া হতো যে, খেয়ে কোনোদিনই আশ মেটেনি। হয়তো আশ মেটেনি বলেই আজও জিভে তার স্বাদ-বিভা বা দীপ্তি, সাহেবরা যাকে সাদা বাংলায় বলেন ফ্লেভার, তা লেগে আছে।

সন্ধ্যেবেলা আমরা কখনও কখনও টানা কয়েকদিন পেতাম এক কাপ করে ঈষদুষ্ণ টেংরির স্যুপ। মায়ের হাজারো কাজের মধ্যে মাঝে মাঝে মনে হতো আমরা রোগা হয়ে যাচ্ছি বা আমাদের স্যামিনায় টানাটানির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তখনই পর পর কয়েকদিন এই স্বাদু জলীয় পদার্থটি খেতে হতো। প্রায় এক হাঁড়ি জলে কয়েকটা টেংরি সেদ্ধ হতে হতে সেটা তিন-চার কাপ জলে পরিণত হতো, তার মধ্যে সামান্য নুন আর গোলমরিচ ছড়িয়ে দিতেন মা। জলের সঙ্গে কয়েকটা টেংরির হাড়ও পাওয়া যেতো। সুতরাং সেটার জন্য আমাদের মধ্যে একটা অপেক্ষা তৈরি হয়ে থাকতো।

গরমকালে সন্ধ্যেবেলা একটুকরো আম আমরা সকলেই পেতাম।

ছুটির দিনগুলোতে বিকেলের ভাত বাদ যেতো, তার জায়গা নিতো বিকেলের জলখাবার। তখন ছুটির দিন তো কম ছিল না, এক মাসের গরমের ছুটি আর একমাসের পুজোর ছুটি তো ছিলই। দিনে বিকালের জলখাবারে মুড়ির সঙ্গে বাড়িতে ভাজা বেগুনি, ডালের বড়া পাওয়া যেতো। মাঝে মাঝে দিদিদের হোম সায়েন্সের প্র্যাক্‌টিক্যাল প্র্যাক্‌টিশের জন্য করা সিঙারা বা চ্যাটালো নিমকি পাওয়া যেতো – আমরা সর্বভুক ছিলাম তাই বাঁচোয়া। নইলে সিঙারা বলে যে বস্তু তৈরি হতো তাকে সিঙারা বাদ দিয়ে অন্য কোনো নাম দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তাই-ই মুড়ির সঙ্গে কিংবা শুধু সোনা-মুখ করে আমরা খেয়ে নিতাম। এই ধরনের ‘অকেশনাল’ খাবারের সমালোচনা করা থেকে আমরা প্রায় ‘স্ট্র্যাটেজিক্যালি’ বিরত থাকতাম। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে লাভের কথা ভেবে সেই কঠিন সিঙারার ভূয়সি প্রশংসা করে দিদিদের উৎসাহিতও করতাম। দিদিরা সংখ্যায় বেশি ছিল বলে অনুশীলিত সিঙারা আর নিমকির একটা ধারাবাহিকতা ছিল।

কদাচিৎ ছুটির দিনে চিঁড়ের পোলাও বিকেলেও বানানো হতো, মুড়ি-মাখাতেও আনা হতো কিছু বৈচিত্র্য – তার মধ্যে একটা খুব ভাই-প্রিয়তা পেয়েছিল। সেটা হলো ভাজা মশলার ব্যবহার আর শীতকালে পেঁয়াজ কুচোর বদলে কচি-মুলোর কুচির ব্যবহার।

শুধুমাত্র জ্বর-জ্বারি হলে তার মুড়ি মা নিজে-হাতে মাখতেন, সেই মুড়ি মাখা হতো ঘি আর চিনি দিয়ে। পড়াশোনার ঝঞ্ঝাট, পোড়ের ভাতের নিমন্ত্রণ, কিংবা ঘি-চিনি-মুড়ির জন্যই মাঝে মাঝে জ্বর হওয়াটা ততটা কষ্টকর ছিল না।

জলখাবারের হই হই সমারোহে একবার রীতিমতো মন্বন্তর দেখা দিয়েছিল।

সে-প্রসঙ্গ যথাস্থানে।

(ক্রমশ)

দুর্লভ সূত্রধর
লেখক | + posts

লেখক ছদ্মনামের আড়ালেই থাকতে চান, তাই ছবি কিংবা পরিচিতি কিছুই দেওয়া গেল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *