অভিমানভূম। পর্ব ১৪। প্রাপ্তি। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

“লদীর ধারে চাষে বধূ মিছাই করো আশ, ঝিরিঝিরি বাঁকা লদী বইছে বারো মাস”

বর্ষা পেরিয়ে ভাদ্র মাসও চলে গেছে কবেই। আশ্বিনের মাস কেমন টলটলে এখন। আচমকা ভাসা মেঘে বৃষ্টি, আর তারপরেই আবার ঝকঝকে আকাশ। মাঠের থেকে ধান তোলার সময়ও এগিয়ে আসে। মাস পেরোলেই কার্তিকে বড় পরব ‘হড়’দের। ভারী বর্ষা এখন আর কই! তবু ভরা যৌবন এখানকার নদীগুলোর। বরাবাজারের কাছে ওই যে নদীটা, নাম, ‘কুমারী’। কুমারী নাকি আবার কাঁসাই নদীরই শাখা একটা। যদিও নদী দেখে ভাল লাগাটা টেঁকে না বেশিক্ষণ। বরং ভয়ই লাগে বেশ। কেমন অকাতরে বালি তুলে ফেলা হচ্ছে নদীগুলো থেকে! সেটা কতটা সরকারি অনুমতি নিয়ে আর কতটা বেআইনি ভাবে, সেসব জানা হয়নি কখনও। তবে এইভাবে নদীগুলোকে অন্তঃসারশূন্য করে দিতে থাকলে আর কতদিন যে বারো মাস ঝিরিঝিরি নদী বইবে, সেটা নিয়ে আশঙ্কা হওয়া খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়!

তবে সেইসব আশঙ্কাকে কয়েক মুহুর্তের জন্য যেন দূর করে দিল সাদা একটা প্রান্তর। রুক্ষ পাথুরে জমি যেন সেই সাদার দাপটে কাশের দেশ। হাওয়ায় দোল তাদের এদিক-ওদিক। যেন জীবনানন্দের কবিতা থেকে উড়ে এসে ধবল বক তার ভেজা ডানা শুকানোর জন্য মেলে দিয়েছে রোদ্দুরে। মাঝেমাঝেই একটু জলদি বাইরের কাজ মিটিয়ে নিতে পারলে, দিনের আলো থাকতে থাকতে ঘুরে আসতে ইচ্ছা করে এই কাশফুলের সাম্রাজ্যে থেকে। পাশে পাথরের বুক চিরে কল কল করে বয়ে যাচ্ছে জল। নদীর ওই পাড় দিয়ে ছোট বোনের মাথার ফিতে ঠিক করে দিতে দিতে ঢালু জমির ওপাশে মিলিয়ে যাচ্ছে পায়ের কাছে ছিঁড়ে যাওয়া নীল সালোয়ার-কামিজের বড় বোন। একা একা বসে থাকতে দেখে, সন্ধেও কখন যেন নেমে এসে বসে পাশে, আর দূরের গাছপালা সিলুয়েট হয়ে যায় কেমন। হঠাৎ মনে হয়, দূরে একটা রেললাইন থাকলে কী ভালই না হত, তাই না?

বৈশাখ আর শ্রাবনের পর আশ্বিনই মনে হয় একমাত্র মাস যেটা এখনও মনে রাখার প্রয়োজন থাকে গড়পড়তা বাঙালিদের কাছে। এদিকে দুর্গা পুজোর দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই তাড়াহুড়ো বাড়ছে বাকি থাকা কাজ শেষ করার। ছুটি পড়ে যাবে সরকারি অফিসে। তার আগে গাদাগুচ্ছের রিভিউ মিটিং ফেলে দেওয়া হল পুরুলিয়া শহরে। সকালে বেরিয়ে মিটিং আর প্রেজেন্টেশন সেরে ফিরতে ফিরতে পেরিয়ে যায় সন্ধে। সারাদিনের মিটিং ডিটেলস পাঠাতে হয় কলকাতা অফিসে। সেই অনুযায়ী পরের দিন আবার প্রোজেক্টের ছেলেমেয়েদেরকে ডেকে বুঝিয়ে দিতে হয় কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে বাকি কাজকর্ম। ভগবানদা খাবার দিয়ে যায়। রাতে হালকা কুয়াশা জমাট বাঁধে মাঠের ধানের শীষের উপর। শালের গাছে ঘষা লেগে শিরশির। তারই মাঝে একেকটা পাখির ডাক আচমকা রাতের বুক চিরে যেন একলা করে দেয় বেশি আরও।

এদিকে বেতন নিয়েও একটা অসন্তোষ জমা হচ্ছে এখানকার কর্মীদের মধ্যে। ব্যাপারটা কিছুদিন লক্ষ্য করে বুঝতে পারলাম, এবার নিজেকেই একটা সাঁকোর কাজ করতে হবে পুরুলিয়া অফিস আর কলকাতা অফিসের মধ্যে। এই ধরনের পরিস্থিতি দু-ধারি করাতের মতো। কোনদিকে যে নিজেকেই ফালা ফালা হয়ে যেতে হবে, কে জানে! এইরকম পরিস্থিতি সামলানোর মতো অভিজ্ঞতা নেই তখনও। তবে অস্বীকার করে লাভ নেই, সেই সময় প্রাথমিকভাবে স্থানীয় বেতন যা ছিল, সেটা সময়ের নিরিখে শুধু কমই নয়, অপ্রতুলও বটে। মাঝে মাঝে নিজেই আশ্চর্য হয়ে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে কাউকে জিজ্ঞেসও করে ফেলতাম, কীভাবে চালায় তারা সারা মাসের সংসার? কাউকে কাউকে বুঝিয়েও দিতাম ব্যাংকের ফিক্সড বা রেকারিং ডিপোজিটের সুবিধা।

বেতনের সমস্যা, কলকাতা অফিস আর পুরুলিয়া অফিসের মধ্যে টানাপোড়েন এবং কাজে তার প্রভাব পড়া, এসব সত্যিই কতোটা সামলাতে পেরেছিলাম, সেটা জানা নেই। তবে বিশ্বাস, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি করা গিয়েছিল অবশ্যই। পুরুলিয়া অফিসের এই হিউম্যান রিসোর্স অবশ্যই ধরে রাখা উচিৎ, এটা মনে হয় বুঝিয়ে উঠতে পেরেছিলাম কলকাতা অফিসকে। এদিকে পুরুলিয়ার সমস্ত সহকর্মীদের কাছেও পরিষ্কার করে জানানো গিয়েছিল যে, একদিনের জন্যেও যদি কাজ বন্ধ থাকে, তাহলে সেই ক্ষতিটা মারাত্মক এবং সেই ক্ষতিটা সবার। জীবনে ‘ধন্যবাদ’ দিয়ে ওঠা হয়নি যাদের যাদেরকে, সেখানে তাই তাদের সবার নামই জুড়ে দেওয়া যায় নিঃসন্দেহে এবং অবলীলায়।

এই করতে করতেই পুজো। বাড়ি ফিরতে হবে পুজোতে। পুজোর সময় আমাদের এই নদীর ধারের ছোট্ট মফস্বলটার বাইরে অন্য কোথাও থাকবো, সেটা অসম্ভব। এযাবৎকালের মধ্যে একবারই পুজোর সময় থাকতে হয়েছিল বাইরে। মুম্বই হয়ে গোয়া যেতে হয়েছিল কাজের জন্য একটা। এদিকে ফেসবুক খুললেই টাইমলাইনে একের পর এক বাংলার দুর্গাপুজোর ছবি। চূড়ান্ত মনখারাপে কাটে অষ্টমী, নবমী। গোয়াতে বসেও এত মনমরা হয়ে থাকতে পারে কেউ, সেটা নিজেকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না আগে। সুতরাং পুজোর সময়টায় ‘নো বাইরে’। মানবাজারের রঞ্জনা, সুদীপ্তা বারবার করে বলতো একটা দুর্গাপুজো পুরুলিয়াতে থেকে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এই একটা কথা কখনোই রাখা যায়নি ওদের। “এখানেও তো অনেক বড় বড় পুজো হয়!” কিন্তু বিষয়টা তো বড় আর ছোটর নয়। কলকাতার দুর্গাপুজো আর তার ভিড়ের জন্য নয়, ফিরে যাওয়া শুধু মফস্বলটার টানে। বহু বহু দিন দেখা না হওয়া বন্ধুদের টানে। আর, বহুদিন না হওয়া আড্ডাগুলোর টানে।

প্রত্যেকবারই তাই অগত্যা পুজোর আগে পুরুলিয়া ছেড়ে, চল মন নিজ নিকেতন…

 

কোজাগরী পূর্ণিমা পেরিয়ে গেলে তারপর আমিও ফের একবার কেটে নিই পুরুলিয়ার টিকিট। পুজোর পরে গ্রামের দিকে রাতের বেলায় হিম পড়া বেড়ে যায় আচমকাই অনেকটা বেশি। সকালে রোদ ওঠার আগে কিংবা বিকেলে সূর্য নেমে গেলেই, শরীর হিমের নাগালে চলে যায় অনেকটা। পুজোর হ্যাংওভার কাটে না হঠাৎ করে। ঝুপ করে সন্ধে নেমে গেলে তাই, মনখারাপ হয় আচমকা অযথাই। এক কামরার ঘরটাতে ফিরেও কিছু করতে ইচ্ছে করে না সেসব দিন। ভ্যাবলা এসে নিজের মতো খুটখাট করে; গান শোনে। তারপর জল রেখে চলে যায় কখন। ভগবানদাও এসে খাবার দিয়ে ফিরে গেলে, বাইরের শালগাছের পাতা থেকে টিপটিপ ঝরতে থাকে শিশির। কী যে হয় রাতগুলোতে, বই পেয়ে বসে। কিংবা, ছাদ।

কী যে হয়, আর ঠিক কেনই যে হয়, তার কার্যকারণের সূত্র মেলাতে পারা যায় না কিছুতেই। যেমন কোনও একদিন হঠাৎ সিনেমা দেখতে ইচ্ছে হলে, কী দেখব কী দেখব ভাবতে-ভাবতে চালিয়ে ফেলি বেশ কয়েক বছর আগে দেখা ‘চিটাগং’। কী দরকার থাকতে পারে একটা নাসার বিজ্ঞানীর এরকম একটা সিনেমা বানানোর, যার নামের পিছনে মনে হয় তখনও অবধি তিনটে পেটেন্ট এবং সেই সিনেমার বিষয় কোনও আধুনিক কাল্পনিক সায়েন্স-ফিকশন নয়, বরং, বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামীকে নিয়ে কবিতার মতো একটা সিনেমা! কী মানে থাকতে পারে এর?

এসব দিনে আরও লম্বা হয়ে ওঠে ঘরের পিছনের ফাঁকা ধুধু মাঠটা। তার পিছনের টিমটিমে পাহাড়টাও ঠাকুরমার ঝুলি একটা খুব। ঘুম না আসা রাতগুলোতে নেটওয়ার্ক থাকে না মোবাইলেরও। অগত্যা বই আর ছাদ আর ধোঁয়াদের মাঝে যাতায়াত চলে অবিরাম। তারপর কখন যে ঘুম, খেয়াল থাকে না কিছুই। চোখ লেগে আসবার সময় পিছনের বাড়ির গুণাদাদের মোরগটা ডেকে উঠেছিল কি?

 

ঘুম ভেঙে উঠেই সামনের চা’য়ের দোকান। বেশ বেলা। আড্ডাও জমে উঠেছে বেশ। আমার গায়ে হালকা একটা চাদর। স্থানীয় পরিচিতরা হাসাহাসি শুরু করে। “দাদা এখনই এত ঠান্ডা লাগলে হবেক?” ভগবানদার চায়ের দোকানের পাশেই এক ডাক্তার থাকতেন। তাঁর কথা ছিল, অন্তর থেকে দুর্বল থাকলে ঠান্ডা লাগে বেশি। ব্যাপারটার মধ্যে ডুয়াল-মিনিং খোঁজা উচিৎ কিনা ভাবছি সবে, হঠাৎ এদিকে খানিকটা দূরে একটা কোণে কিছু নিয়ে চাপা উত্তেজিত আলোচনা। কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে জানতে চাইবো, তখনই শ্যামলীদি। আমাদের কমিউনিটি রেডিয়ো স্টেশনের কর্মী শ্যমলীদি একজন চলতা-ফিরতা অনুপ্রেরণা। দেবারুণদা, দ্য গ্রেট দেবারুণ দত্ত দারুণ একটা কথা বলেছিল একবার। “তোমাদের সামনেই এত ‘ক্যারেক্টার’, এদের গল্পগুলো কী করে বলতে পারো ভাবো। কন্টেন্ট তোমাদের সামনেই…” চোখ খুলে দিয়ে গিয়েছিলেন আমদাবাদের ‘দৃষ্টি মিডিয়া’র মাথা, দ্য গ্রেট ডিডি।

শ্যামলীদির স্বামী নেই। সেই কবে থেকেই নেই। একার হাতে টানছেন সংসার। বয়স্কা শ্বাশুড়ি, দুই মেয়ের পড়াশোনা। মেয়েদের হোস্টেলের রান্না। আর সেইসঙ্গে কমিউনিটি রেডিওর জন্য লাগাতার একের পর এক দারুণ প্রোগ্রাম। এবং, সেটা একদম মাঠঘাট ঘুরে। সেই শ্যামলীদিই সামনে এসে রীতিমতো উত্তেজিত।

— দাদা, এতদিন ধরে গাঁয়ে-মাঠে অনেক কাজ করেছি। কিন্তু এতদিনে নিজের গ্রামে কিছু করতে পারল্যম।

এ এক আজব সম্পর্ক। শ্যামলীদি’র মেয়েগুলোও ‘দাদা’ বলে আমাকে! অবশ্য তার থেকেও আজব আছে। যেমন, ভ্যাবলা আমাকে ডাকে দাদা। আবার ভ্যাবলার বাবা আমার ‘মেঘা দা’। আর ভ্যাবলার দিদি শম্পা আমাকে ডাকে, ‘আঙ্কেল’। শেষে সেক্রেটারি স্যার একদিন বাধ্য হয়ে রবীন্দ্র রচনাবলী থেকে মুখ তুলে বলেছিলেন, “তোমরা একদিন একটু ক্যালকুলেশন করে আমাকে বুঝিয়ে দিও, তোমরা সম্পর্কে কে কার ঠিক কী হও!”

অবশ্য কে যে কার ঠিক কী হয়… যাইহোক! উত্তেজিত শ্যামলীদিকে দেখে চা হাতে উঠে আসি। “কী হল?”

— একটা মেয়ে। বাপ-মা বিয়ে ঠিক করে দিয়েছিল। কিন্তু মেয়েটা কী করে বিয়েটা আটকাল সেটা না শুনলে বিশ্বাসই করবেন না আপনি।

— কী করল? কোন মেয়ে?

— ওই আমাদের গ্রামের পিছনে মুদিডি গ্রাম। ওই গ্রামেরই, যমুনা মুদি।

 

তারপরের গল্পটা লড়াইয়ের। গল্পটা একটা গ্রাম্য তেরো কী চোদ্দ বছরের মেয়ের হাজারটা বাঁধা-বিপত্তি ঠেলে এগিয়ে আসবার। নিজের কথা জোর গলায় বলতে পারবার। পরিবারকে সম্মান করেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকবার। যে জোর দেখলে তথাকথিত ‘এগিয়ে থাকা’ বা ‘উন্নত’ শহুরে আমাদেরও থমকে দাঁড়াতে হয় খানিক।

তেরো-চোদ্দ বছরের মেয়েটার পড়াশোনা গ্রামেই। মেয়েদের স্কুলে। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে বাবা-মাকে সাহায্য করা ক্ষেতের কাজে, ঘরের কাজে। কিন্তু গ্রামবাংলার সেই চিরাচরিত রীতি মেনেই মেয়ে একটু বড় হলেই বিয়ে দেওয়ার তাড়না যেন কুড়ে কুড়ে খায় অভাবের সংসারগুলোকে। অগত্যা যমুনার বাবা যমুনার জন্যেও দেখেশুনে খুঁজে আনল পাত্র। কিন্তু বাড়ি বা পাড়ার সবাইকে চমকে দিয়ে, বেঁকে বসল যমুনা নিজে।

ওই প্রত্যন্ত গ্রামে পরিবারের সবার বিপরীতে গিয়ে একটা বাচ্চা মেয়ের এই কথা বলার জন্য যে কী পরিমান সাহস আর মানসিক শক্তি লাগে, সেটা বুঝতে পেরেছিলাম পরে যমুনাদের বাড়ি গিয়ে। জানতে চেয়েছিলাম, কীভাবে পারল এটা করতে ও? যে উত্তর দিয়েছিল যমুনা সেদিন, সেটাতেই বুঝেছিলাম কেন ‘ফিল্ড রিপোর্টার’ হিসেবে আবেগে-উত্তেজনায় গলা ধরে এসেছিল শ্যামলীদির সেদিন।

গ্রামে রেডিয়োর দিদিদের বলতে শুনেছিল যমুনা, ‘আঠেরোর আগে বিয়ে নয়’। বলতে শুনেছিল, কী কী ক্ষতি হতে পারে এই কম বয়সে বিয়ের জন্য। শুনেছিল তো ওর বাবা-মায়েরাও! তাহলে… হিসাব মেলে না যমুনার। বাবার জামার পকেট থেকে কাগজপত্র ঘেঁটে বের করে ফেলে ছেলের বাড়ির মোবাইল নাম্বার। তারপর বাবার গার্ডার দিয়ে বাঁধা রং ওঠা মোবাইলটা নিয়ে চলে যায় ক্ষেতে। ছেলের বাড়িতে ফোন করে বলে যে, বিয়ে করবে না সে। ওদের বাড়িতে যেন না আসেন ওনারা!

এতটা সাহস দেখালেও গ্রাম বাংলার মেয়েকে ‘সিরিয়াসলি’ কেই বা নেওয়ার কথা ভেবেছে এই সব প্রেক্ষিতে? বালিকার ‘চঞ্চলমতি’ ভেবেই এখানেও সেই কথায় পাত্তা দেয় না ছেলের বাড়ির লোক। উল্টে বোধহয় জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছিল, তার আর ‘অন্য কেউ’ আছে কিনা? মেয়ের জেদ দেখে ফুঁসে উঠেছিল যমুনার বাড়ির বড়রাও। বিয়ে করতেই হবে! বাপ-মায়ের থেকে মেয়ে কি নিজের ভাল বেশি বোঝে?

সেই রাতেই বাড়ি ছাড়ে যমুনা। গিয়ে ওঠে স্থানীয় মেয়েদের হোস্টেলে। সব কিছু খুলে বলে হোস্টেল সুপার দিদিকে। তারপর পঞ্চায়েত। ব্লক অফিস। বড়বাবুরা আসেন সব যমুনার পরিবারকে বোঝাতে। আবার বাড়ি ফিরে আসে যমুনা। পড়াশোনা শুরু করে। ধীরে ধীরে যমুনার এই নাছোড়বান্দা জেদের গল্প ছড়িয়ে পড়ে গোটা জেলায়। প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে নিজের গল্প বলতে শুরু করে যমুনাও।

সেই গল্পটাই ডকুমেন্ট করতে কয়েকদিন পর শ্যামলীদি আর মঞ্জুরকে নিয়ে কাঁধে গলায় ক্যামেরা-ট্রাইপড ঝুলিয়ে যাওয়া গেল মুদিডির দিকে। মঞ্জুর তো ততদিনে খুব ভাল বন্ধু থেকে কোনও কোনও ক্ষেত্রে গাইডও। টাঁড়-বহালের পার্থক্য কিংবা কোন সময়ে কোন জমিতে কোন ধান, মঞ্জুরই বুঝিয়ে দেয় দায়িত্ব নিয়ে সব।

কালীপুজোর আগের সময়। বেশ শীত লাগছে তখনই। হু হু হিমেল ভিতর অবধি ছুঁয়ে যাচ্ছে হাওয়া দিলেই। একটা সরু রাস্তা দিয়ে এগোতে হয় মুদিডি গ্রামের দিকে। দু’পাশে ধুধু মাঠ। বাইক আসতে দেখলে উল্টোদিক থেকে আসা সাইকেল চালককে নেমে দাঁড়াতে হয় আলপথের ধারে।

কিন্তু এত কিছু করে পৌঁছেও প্রথম দিন যমুনাকে পাওয়া গেল না বাড়িতে। দ্বিতীয় দিন গিয়ে জানা গেল, ধান ঝাড়াইয়ের কাজ করছে পাশের কোনও গ্রামে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল সাড়ে চার ফুটের একটা মেয়ে এক নাগাড়ে ধান ঝেড়ে চলেছে মেশিনে। কথা তো বলা হবেই। কিন্তু কাজে মশগুল মানুষগুলোকে দেখে হঠাৎ কী মনে হল, বললাম, “আমি একটু করবো?”

গ্রামের লোক অবাক। এ বলে কী! “আপনি পারবেন না।” একটু হলেও ইগোতে লাগা স্বাভাবিক। জবাব আসে পাল্টা, “আমার বাবা গ্রামে লাঙল দিয়ে জমি চষতো গো! দাও করে দেখাচ্ছি!” তার আগে খেয়াল করা গিয়েছিল পদ্ধতিটা। পা দিয়ে চাপ দিতে থাকলে ঘুরতে থাকবে কাঁটা লাগানো মেশিন। তাতে ধানের গোছা ধরলেই ধান খুলে খুলে জড়ো হবে নীচে। একগাছি ধান হাতে ধরে যমুনার মেশিনেই শুরু করা গেল ধান ঝাড়াই। পরে দেখেছিলাম, তার একটা ছবিও তুলেছিল মঞ্জুর। সেটাই রয়ে গেছে। কারণ একটুও খারাপ লাগেনি আমার কাজটা করতে গিয়ে। এবং, পরে আরও কয়েকবার করেছিলাম।

আর হ্যাঁ, ভালই করেছিলাম। …যে ভাবে যমুনার থেকেও শিখেছিলাম যে, সব ইনহিবিশন ঝেড়ে ফেললে, লড়াইটাও কেমন একটা জায়গায় পৌঁছে সহজ হয়ে যায় অনেক। সোনা সোনা হয়ে যায় আকাশ। আগত সোহরায়ের বাজনা বাজতে থাকে ক্রমশ বদলাতে থাকা একটা মনে।

(ক্রমশ)

শুভদীপ চক্রবর্তী
+ posts

পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহর বাটানগরে। নঙ্গী হাই স্কুল সাক্ষী এইসব দিনের। পরবর্তীতে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে পড়ার পর জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে ঘোরাঘুরি গ্রাম বাংলার নানান প্রান্তে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। পরে কিছুদিন জনসংযোগের কাজ; কিছুদিন সাংবাদিকতা।

প্রথম কবিতার বই 'ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া সব ঢেউগুলো' ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে। পরের বছর 'নিবিড়' থেকে ব্যক্তিগত গদ্য সংকলন 'যতটুকু দৃশ্যে ছিল'। শখ বলতে খেলা দেখা, সিনেমা দেখা, কাছে বা দূরে যেখানেই হোক ঘুরে বেড়ানো। বিকেল বেলা স্টিমারে চেপে গঙ্গা পারাপার। আলমারিতে বই গোছানো নিয়ে খিটখিটে আজীবন। না-পারার তালিকা লম্বা ভীষণ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *