অভিমানভূম। পর্ব ১৩। কাঁচা বাঁশে ভ্রমর বসেছে…। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

হোঁঠো সে জানে ক্যায়া কাহা, ফির ভি দিল কি বাতে হে দিল মে,
যো রাহা তেরা হাম সফর, কিস কো ঢুন্ডে দিল কি মেহফিল মে

রোজ রোজ ‘প্রিয় বন্ধু’? রোজ রোজ ‘জানে তু ইয়ে জানে না’? ‘আজ হোক না রং ফ্যাকাশে’ থেকে ‘কভি কভি অদিতি’… এ কেমন চলন? কিন্তু একলা রাতের রঙই এমন, বার বার ফিরতে ইচ্ছা হয় তাদের কাছেই। কে জেতে শেষ অবধি? বুঝতে না পারা প্রেম? নাকি, হঠাৎ কথা হারিয়ে ফেলা বন্ধুত্ব? নাকি একটা যাতায়াত অনন্ত সেই, যেখানে আসলে ফেরে না কেউ… যেখানে পৌঁছানো হয় না কারুর। শুধু একটা অপেক্ষা অসীম হয়ে বসে থাকে দিনের পর দিন আলপথ, বাসস্ট্যান্ড কিংবা মাঝরাতের এয়ারপোর্টের বাইরে। ‘জানে তু ইয়ে জানে না’র শেষ দৃশ্যে যেমন জয় আর অদিতি হাসতে হাসতে ফিরে যায় বন্ধুদের সঙ্গে, এবং ঠিক তখনই যেন গল্পটা শেষ হয়ে যায় তাদের। আর সব কিছুর পরে থেকে যায় শুধু বৃদ্ধ এয়ারপোর্টের চাতালে বসে থাকা ভবঘুরে উলোঝুলো লোক এক— যার হাতে সাইনবোর্ড। তাতে লেখা, ‘গোডো’। মানে? গোডোর জন্য অপেক্ষা করছে সে? কবে থেকে? কোথা থেকে চলে আসেন স্যামুয়েল বেকেট? কী নাম সেই উলোঝুলো মানুষের? ভ্লাদিমির? নাকি, এস্ট্রাগন? এবং মনে হয়, জয়-অদিতি-প্রেম-বন্ধুত্ব-ঝগড়া— এই সব কিছুই বাতুলতা আসলে। আসল দৃশ্যটা তো ওই শেষ সিনে। না দেখতে পাওয়া শেষ সিনে। যেখানে অপেক্ষা নিরন্তর জেনেই হাত ধরা তার। নিরন্তর, কারণ, এই যে অনন্ত বা ঈশ্বর, চির অধরা জেনেও তার সঙ্গে মোলাকাতের জন্য কতটা হাঁটা, কে জানে! তারপরে ফুলস্টপ তো বসবে না তাই কোনোদিনই। জয়িতার কাছে ফেরা হবে না অর্ণবের। গোডোর (Godot) জন্য অপেক্ষাও তাই হয়ে যাবে একটা উপনিষদের মতোই। অব্যাখ্যাত। অসীম। এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে অনন্ত চরাচর এক…

তখনই দূরের কোনও মাঠের পরের জঙ্গলে মন্ত্রণায় মাতছে বাঁশের ঝাড়। তাদের কচি সবুজ শরীরে মাতলামো কেমন। এই নেশা-ঘোর প্রকৃতির সহজাত রহস্যময়। অজানাকে আবিষ্কারের মতো হিলহিলে শব্দের বাতাস। দূর পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে সেই বাতাস ছড়িয়ে পড়ে কষা চোখের কিশোরীর চাউনির মতো। ভাদর মাসে ভরা লদী, আর সাঁতারে পার দিবে যদি…’ কে পার হবে তাকে? কার এত সাধ্য? এই কিশোরী ঢেউয়ে যে বিদ্যুৎ, তাকে সামাল দেবে কোন কিশোর? ভাদ্রের বিকেলের খর উষ্ণতা শরীরে নিয়ে ক্ষেতের ধারে ছাগল-বকরি ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। লালচে চুল ওড়ে অনেকক্ষন পর স্বস্তির হাওয়ায়। সন্ধে নামে সর্ষে ক্ষেতে। ওর প্রেমিকের ঘর কোথায়? এত আঁচ সহ্য হয় তার? দু’জনে মিলে খোয়াব দেখে তারা আরও বড় অগ্নিকুণ্ডের, যে হাহাকার আগুনের নাম— সংসার?

ঘর-সংসার থেকে দূরে, সর্ষে ক্ষেতের সন্ধে নিয়ে মানভূমের ঘরের পথ। সেই ঘরের জানালা খোলা হয়নি দু’দিন। ভীষণ ক্লান্তিকর কিছু যাতায়াতের পর যেটা হয়, মাথা বোধহয় মনকে মানা করতে থাকে। কোনও কাজেই মন থাকে না তাই আর। সেই ফাঁকে তার যাবতীয় আগুন-সন্ততি নিয়ে সর্ষে ক্ষেত, রুখা কিশোরী, ধানের ডগা আর সাঁওতাল গাঁয়ের পিছনে ডুবতে থাকা সূর্য ঢুকে আসে আনমনায়। সিংবোঙার বিদায় বেলায় জাহের থানে ধূপ জ্বালিয়ে ফিরে আসে কেউ কেউ। সন্ধের আগে ‘মাঠের কাজ’ সেরে স্নানের পর ভেজা কাপড়েই ঘরে ফিরতে থাকে মেয়েদের দল। আর এইসব দেখেও না-দেখার মতো আলের ধারে দাঁড়িয়ে আছে যে, তার মাথা আর মনের মধ্যে মিল নেই অনেকদিন। এই এত এত দৃশ্য তার চেক জামার খোপে খোপে ঢুকে আসলেও, সম্পূর্ণ মোটিফটা তাই তৈরি হয় না কিছুতেই। আদৌ কি কিছু হয়েছে আজ অবধি? আদৌ কি কিছু করে ওঠা গেছে? অথচ, কারা যেন বলে, সংযুক্তি বিহীন হতে? আসক্তি সব ছুঁড়ে ফেলতে দূরে? কি-ই বা সঙ্গে নিয়ে এসেছো? কি-ই বা সঙ্গে নিয়ে যাবে?

জোনাকি আর ঝিঁঝিঁ পোকা সঙ্গত দিতে শুরু করেছে সবে এই অলস অকাজের ভাবনায় সমস্ত, তখনই প্রাগৈতিহাসিক এক দু’চাকা তার মাথার আলো সর্বস্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই আলো-আঁধারে। “ঘর যাবেক লাই গ্য?” গ্রামের মাঝির ছেলে। মাঝি মানে গ্রাম প্রধান। ক’দিন আগে গ্রামপুজোর পর মাঝি নতুন একটা বাহন নেওয়ায়, বাপের প্রাচীন বয়স্য এখন তার আয়ত্তেই। “তুমি কোথায়?” পাল্টা প্রশ্নে মাথা নামিয়ে নেয় ছেলে। এদিক-সেদিক কেউ নেই। হঠাৎ লজ্জা কাটানোর মতো, বাইকে বসেই বিড়ি জ্বালায় একটা। “প্রেম করছো নাকি?” হেসে ফেলে এবার। মাথা তুলে বলে, “প্রাণডা হাতের মুঠোয় লিয়ে লাচাচ্ছে দাদা!” “কী বলো! বিষম ব্যাপার তো! জলদি এগিয়ে পড়ো তবে!” “চলেন, আপনাকে নামায় দিই…”

তার প্রেমের গন্তব্য ওই ঘরের পথেই। এটাও কি লেখা ছিল আগে? নিয়তি? এই যে, রাগী প্রেমিকার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে অন্য এক ভূগোলের মানুষকে নিজের ভয়ের কথা শোনাবে সে? আর তখন বৃষ্টি হয়ে চলেছে খুব শহরে। অভিজিৎ বসু ফোন করছেন বারবার। “সব ঠিক আছে তো?” ভীষণ চেষ্টার পরেও কি সব কিছু আদৌ ঠিক রাখতে পারে কেউ? প্রান্তিক লোকগানের ওয়ার্কশপ শুরু হবে ক’দিন পর থেকেই। ঝুমুর গানের ওয়ার্কশপ নেবেন প্রখ্যাত লোকশিল্পী। খানিক পাগলও মানুষটা। “শোনো, বিজয়দা, বিজয় মাহাতো চলে আসবেন। গাড়ি পাঠানোর দায়িত্ব তোমার। আর, সুনীলদার সঙ্গে কবে কথা বলতে যাচ্ছো?” সুনীল মাহাতো, ‘পিঁদাড়ে পলাশের বন’ যে মানুষটার লেখা আসলে, সেই সুনীল মাহাতো সেই মুহূর্তে নেই পুরুলিয়ায়। ইটালির কিছু গবেষকের সঙ্গে কী বেশ একটা কাজে তিনি তখন ঝাড়খন্ড। বাড়ি গিয়ে কথা বলে আসি আত্মজার সঙ্গে ওনার। “বাবার ফিরতে ফিরতে পরশু…” আবার আসবো! এবং, সেই আবার না এলে শোনাই তো হত না দুরন্ত মেয়ে কোলে সেও আত্মজার গলাতেও একদিনও উড়ি চলি যাব গিয়া হায় রে হায়/সুন্দর কায়া মাটিতে মিল যাবে গিয়া হায় রে হায়…’

“আসলে কয়লা খনি অঞ্চলের গান তো! মৃত্যুর কথা বারবার, সর্বত্র…” বুঝিয়ে দেন সুনীল মাহাতো। বুঝিয়ে দেন আরও কত গান। সব কি আর ঢোকে মাথায়? তবু, চা আসে। গল্প শুনি। খানিক দূরে হরিপদ সাহিত্য মন্দির। তার পাশেই সাহেব বাঁধ। নকশাল পর্যায়ে হুজ্জোত কম হয়নি এসব এলাকায়। চোখের সামনে একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। মুখে দু’দিনের না কাটা সাদা দাড়ি। “দমে ঘুরতে হল!” তাঁকে ডাকি, ‘স্যার’ বলে। তিনি বলেন লোকগবেষণার কথা। ‘ফোক রিসার্চ’ হেতু বাইরে থেকে কীভাবে আগ্রহ দেখানো হচ্ছে, আর সেখানে নিজের দেশ বা রাজ্য কীভাবে মুখ ঘুরিয়ে থাকছে সবসময়, ধরা পড়ে কথায় কথায়। অথচ মোটা ঘষা কাঁচের মতো ধূসর চশমার ফাঁকে জ্বল জ্বল করতে থাকে অদ্ভুত উজ্বল দুটো চোখ। দুরন্ত নাতনিকে কোলে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করেন জামবনির বিজয় মাহাতোর কথা। ‘পিঁদাড়ে পলাশের বন’ প্রথম রেকর্ড করেন তো তিনিই। কত সাল হবে সেটা? চুরাশি? স্মৃতি সঙ্গ দেয় না। খুঁজতেও ইচ্ছা হয় না মুঠোফোন বের করে। বিজয় মাহাতো তো গাইলেন তারপর ভবতোষ শতপথীর গানও। একটা ধমসা বনাই দে, একটা মাদল কিনে দেহামি গাইব বাজাব, মইচ্ছা পড়া জীবনটাকে বেদম পাজাব!’

এবং ডাকতে হবে কুচিল মুখার্জ্জীকেও। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের একাধিক ছবিতে অভিনয় করা দোহারা চেহারার প্রৌঢ়ের কাছ থেকে শুনে নেওয়া যায় প্রবাদপ্রতিম পরিচালকের না জানা কথা কত কত। এবং এদের নিয়ে শুরু হয় যায় ওয়ার্কশপ। খুব বৃষ্টির দিনে ভেজা ভেজা মেঝেতে বয়ে যাওয়া হয় ঝুমুরের এক থেকে অন্য প্রকারভেদে। সে ঝুমুরের হাওয়ার নাম কখনও দরবারি তো আবার কখনও ভাদরিয়া। কখনও টপ্পা তার অঙ্গে তো কখনও কীর্তন। তোর কুজন সুজন ধনি, তুই কেমন করে চিনবি? রসগোল্লা বলে গুড়ের মিঠাই ধনি কিনবি!’ বলা হয় ইতিহাস। কীভাবে খুশির ঝুমুর বদলে যায় মনখারাপের ঝুমুরে। মানভূমের মানুষদের আসামের চা-শ্রমিক বানিয়ে দিলে, এক সন্ধের তাদের কেউ চা-বাগানের অন্ধকার গায়ে নিয়ে ধোঁয়াটে আকাশের তারা দেখতে দেখতে গেয়ে ওঠে, ওহে যদুরাম, ফাঁকি দিয়ে চলাইলি আসাম!’ সেই চা বাগান থেকে রুখাসুখা মানভূম অবধি ভেসে আসে এই কান্না। কৃষ্ণলীলা থেকে একদা ব্রজভূমই বা বাদ যায় কী করে? কঁড় ফুলে তে কিষ্ট আছেন, কঁড় ফুলে তে রাধা?’ আচমকা গুলিয়ে যায় সবকিছু। তাহলে কে কোন পক্ষে? কোন দলে কেই বা? ঈশ্বর বেছে নিতে বলা হলে, কোন রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবে তুমি? বাইরে ঝরঝর বারিষ। প্রথম দিনের ওয়ার্কশপ শেষে গান ধরেন অভিজিৎ বাবু নিজেই। আর গাছের মধ্যে তুলসী, পাতার মধ্যে পান হে / নারীর মধ্যে রাধিকা, পুরুষে ভগবান হে!’

মরচে পড়া জীবনটাকে বেদম বাজানোর অভিলাষেই প্রায় শেষ ওয়ে আসে ঝুমুরের ওয়ার্কশপ ‘প্রান্তরাগ’-এর একটা সপ্তাহ। হঠাৎ একদিন রাতে খাবার ব্যবস্থা করে ফেরার পথে আচমকা চেপে ধরলেন অভিজিৎ বাবু। “এই তুমি শুধু সব কাজ করে যাচ্ছো, কোথায় এটা নেই, কোথায় সেটা নেই… কিন্তু তোমার তো গান শেখা হল না একটাও?” মহাবিপদ! যার যেটা কাজ। হাসি মুখে সাফাই আসে, “আমার তো গান শেখার কথা নয়। দেখাশোনা করার কথা…” একে খানিক পাগল শিল্পী, তার উপর চোখও লাল। চেপে ধরেন হাত। “অভিজিৎ বসুর ওয়ার্কশপে কেউ গান না শিখে থাকবে, সেটা কী করে সম্ভব! এক্ষুনি গান শেখাবো, কাল তুমি গাইবে বাকিদের সঙ্গে!” হে ধরিত্রী, দ্বিধা হও!

কিন্তু ধরিত্রী দ্বিধা না হলে, আদতে ঝেড়েই ফেলতে হয় সব দ্বিধা। এদিকে ওই মুখর বাদল দিনে সারাদিন হেঁটে হেঁটে পায়ের বারোটা। সেই নিয়েই শিখতে হয় গান!

আসো কুটুম, বসো কুটুম
খায়ে লাও হে পানের টাকুন
কুটুম, মিষ্টি পানের খিলি খায়ে
মিষ্টি হাসেছে
আর ভাদর মাসে কুটুম আসেছে

বেরনোর সময় বলি, “তবে কাল কিন্তু বাকিদের সঙ্গে ভুলেও গাইতে-টাইতে বলবেন না। বিব্রতর এক শেষ!” বৃষ্টি ধরেছে। বেরিয়ে পড়ি। কেউ একজন বাসন ধুতে ধুতে বলে ওঠে, আলোটা জ্বালিয়ে রাখতে রাস্তায়। অথচ আলো তো জ্বলতেই থাকে ভিতরে। গান শেখা হয় কিনা জানি না, কিন্তু গানের আত্মাটা থেকে যায় সঙ্গে। পুঞ্চা বাজারের অঞ্জু সুইটস থেকে ফিরতে ফিরতে মাথায় বাজতে থাকে, আত্মা অবিনশ্বর।

অঞ্জু সুইটস একটা আজব মিষ্টির দোকান। অন্যান্য প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন ভান্ডারের মতোই মিষ্টি আর দৈনন্দিন চা-সিঙাড়া ছাড়াও এর আসল মজাটা অন্য জায়গায়। মিষ্টির দোকানের উপরের তলায় একটা থাকার হোটেল। দুটো ডাবল বেডরুম আর একটা ডরমেটরি। এই গোটা পুঞ্চা এলাকায় আর কোনও থাকার জায়গা নেই এরকম তখনও আর। সুতরাং কোনও উৎসব অনুষ্ঠানে বিশেষ কোনও শিল্পী এলে, থাকার ব্যবস্থা বলতে এখানেই। এবং তাতেই মিটিমিটি হাসির মিষ্টান্ন ভান্ডার কাম হোটেল মালিকের ছোটখাট চেহারার ছাতি ফুলে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি। তাতে সঙ্গত দিয়েই বোধহয় ভদ্রলোকের মাথার পিছনের টিভিতে চলতে থাকে মিঠুন চক্রবর্ত্তীর ‘বারুদ’।

তবে টিভিতে সিনেমার বারুদ থাকলেও, ভাবতে অবাক লাগে, গোটা এলাকাটায় কোনও সিনেমা হল নেই! হুড়া, লালপুর, পুঞ্চা, মানবাজার, বরাবাজার হয়ে প্রায় পুরুলিয়া টাউনের আগে অবধি কোনও ব্যবস্থাই নেই বড়পর্দায় ছবি চালানোর। সিনেমা হল বলতে সেই পুরুলিয়া শহরেই। এই নাকি তাহলে গ্রামে-গঞ্জে ‘মায়ের আঁচল’ বা ‘প্রতিবাদ’ ব্যাপক হিট? এটা কি তাহলে তার থেকেও অজ?

কথায় কথায় একদিন সেই কথাই উঠলে, ওঠে একটা ভিডিয়ো পার্লারের কথাও। এই তল্লাটে পার্লার? কবে? “সে আপনার অঞ্জু সুইটস হওয়ার আগে ওই জায়গায় তো ছিল বই দেখার জায়গা!” মানে? “ও মালিক পাক্কা ব্যবসাদার। এই পুরো তল্লাটে কোনও বই দেখার জায়গা ছিল না। তখন টিকিট কেটে ওখানে ভিডিয়ো দেখা যেত। কম কামায়নি। সেই লাভেই তো নাকি…”

অবাক হতে হয়। কারণ স্বয়ং সেই মালিকের সঙ্গে বহুদিন বহুবার কথা হলেও কখনও ওই প্রসঙ্গটা ওঠেনি। তার থেকেও বেশি অবাক করে, সেই তখন থেকে শুরু করে এখনও অবধি একটা সিনেমা হলের প্রয়োজনীয়তা বা চাহিদা এখানে তৈরি হল না দেখে। কৃত্রিম বিনোদন এতটাই পিছনের সারিতে সহজ-সাধারণ মানুষগুলোর কাছে, স্থানীয় সংস্কৃতি হয়তো সেই কারণেই হারিয়ে যায়নি এই আকালের মাঝেও। অথবা সত্যি হয়তো সেই এক বিকালে চায়ের দোকানে শোনা কথাগুলোই। “এই সমস্ত বিনোদনের মধ্যে আমরা কই? আমাদের কথা কই?”

নেই তো। নেই বলেই ঝুমুর নিয়ে ‘প্রান্তরাগ’ ওয়ার্কশপের পর আবার সাঁওতালি বাহা, দং, লাগড়ে সেরেঞ নিয়ে নতুন ওয়ার্কশপ। ‘আদিরাগ’। এবার ওয়ার্কশপ করাবেন কল্পনা হাঁসদা। গোটা জঙ্গলমহল অঞ্চলে কল্পনা হাঁসদাকে চিনবেন না, এমন কাউকে মনে হয় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সঙ্গে থাকবেন নরেন হাঁসদাও। এতটাই সপ্রতিভ এই জাতিটা, জমে গেল ওয়ার্কশপ প্রথম দিন থেকেই। শেষের দিন ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করা সবাই মিলে রেডিও স্টেশনের বাইরেই বসিয়ে ফেলল গানের আসর। ধামসা, মাদল, সিন্দরিতে হিল্লোল অশোক গাছের ডালে-পাতায়। ঝুমুর ওয়ার্কশপের সময় যে টানা বৃষ্টিটা হচ্ছিল, ‘আদিরাগ’-এর সময় ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না তার। রোদ ঝলমল ভীষণ। মানুষগুলোর মতোই। রাঙা হাসি, রাশি রাশি।

দূরে একটা হলুদ দেওয়ালে হেলান দিয়ে শুনতে থাকি গান। আর এইসব কিছুর মধ্যে থেকেও আলাদা হয়ে যেতে পারার যে শেখা, সেটা যেন শিখিয়ে যায় কেউ চুপচাপ পাশে বসে। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে শিখিয়ে দেওয়া গান, বোলপুর থেকে পৌঁছে গিয়ে ভীষণ ক্লান্ত রথীন কিস্কুর মাতিয়ে দেওয়া লোকগান— সেই সব কিছুর পরে থেকে যায় কিছু সুর শুধু। অক্ষর ধুয়ে যায় কোথায় তবে? ভাদরের অকাল বারিষেই কি? জঙ্গলের ভিতর থেকে ডাক আসে কার? কাকে ডাকে কিশোরী? “আয় না কুড়োই মহুয়া ফুল…” সেই ডাকে কিশোরীর জামায় আটকে যায় কল্পনাদির গানের সেঁওয়া কুলের কাঁটা। আবার একটা একলা হওয়ার হাতছানি ডাক দিয়ে যায় খুব।

সেই একলা হতে গিয়েই কি দেখা কারুর সঙ্গে আবার? নিজের পাশে এসে নিজেরই বসা কি? সাঁওতাল গ্রামের কোল ঘেঁষে সন্ধে নামলে, পরিচিত দাওয়ায় এসে বসি। হ্যারিকেন জ্বলে টিমটিম। তিরতির ছায়া কাঁপলে মনে পড়ে কার্যকারণের যাবতীয় সম্পর্কসমূহ। মনে পড়ে অপেক্ষা। কোথায় দাঁড়িয়ে? কার জন্য? কতক্ষণের? দুনিয়ার সমস্ত অর্ণব আর জয়িতাদের সেই সব অপেক্ষাদের পাশে কোনও ‘ডট’ কি বসবে কোনোদিন?

(ক্রমশ)

শুভদীপ চক্রবর্তী
+ posts

পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহর বাটানগরে। নঙ্গী হাই স্কুল সাক্ষী এইসব দিনের। পরবর্তীতে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে পড়ার পর জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে ঘোরাঘুরি গ্রাম বাংলার নানান প্রান্তে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। পরে কিছুদিন জনসংযোগের কাজ; কিছুদিন সাংবাদিকতা।

প্রথম কবিতার বই 'ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া সব ঢেউগুলো' ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে। পরের বছর 'নিবিড়' থেকে ব্যক্তিগত গদ্য সংকলন 'যতটুকু দৃশ্যে ছিল'। শখ বলতে খেলা দেখা, সিনেমা দেখা, কাছে বা দূরে যেখানেই হোক ঘুরে বেড়ানো। বিকেল বেলা স্টিমারে চেপে গঙ্গা পারাপার। আলমারিতে বই গোছানো নিয়ে খিটখিটে আজীবন। না-পারার তালিকা লম্বা ভীষণ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *