অভিমানভূম। পর্ব ১০। একটা নিখাদ মশকরা। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’

 

গ্রাম থেকে বাড়ি ফেরা মানে, ভোর। স্টেশনে নামতেই হঠাৎ গাড়িঘোড়া মানুষ ব্যস্ততার ক্যাকোফনিতে পিছনে ফিরে দেখা অজান্তেই, কোথায় ফেলে আসা সেই নিস্তব্ধতা নিঃসীম? কোথায় ফেলে আসা রাতচরা পাখির ডাক? গোর্গাবুরু, মুররাবুরু পেরিয়ে এসে শ্যাওলা জমা উঠোনের উপর ছিটকে আসা ল্যাটেরাইট কাদায় ফেলে যাওয়া জোহারের অভিবাদন? অথচ এই যাতায়াত চিরন্তন। এক মেঘ থেকে ভেসে যাওয়া অন্য মেঘের বৃষ্টিতে। ভোরের আগের হাওড়া স্টেশনের কোণঠাসা একটা প্ল্যাটফর্ম ধরে হাঁটতে হাঁটতেই বোঝা গেল, কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে আগেই। ভেজা ভেজা চারিদিক। বৃষ্টি ছিল আগের রাতেও। রাতের রাস্তায় মলয়দার গাড়ির উইন্ডস্ক্রীনে আছড়ে পড়া বৃষ্টি ফোঁটাগুলোর মতোই লাগাতার ঝাপটা ছিল অনেকগুলো প্রশ্ন আর একটা আশঙ্কার। খুব বৃষ্টি বলেই, সেই যাত্রায় সঙ্গে নেই কেউ আর। সময়ে পৌঁছতে পারবো তো স্টেশনে? কলকাতায় দরকার খুবই একটা। পকেট থেকে সিগারেট বের করলেই খেয়াল হয়, বাইরে যা বৃষ্টি, জানালা খোলা যাবে না। ডাক দিই, “মলয়দা..” উত্তর আসে কিছু না বলতেই। “জ্বালাও। এ জল সহজে বন্ধ হবে না!”

 

অথচ, বছর তিনেক চলার পর ‘জঙ্গলনামা’ সাপ্তাহিক পত্রিকাটা হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেল একদিন। তার আগের তিন বছর একটা সপ্তাহও বাদ না দিয়ে নিয়মিত একটা আদিবাসী ভাষার পত্রিকা প্রকাশ হয়ে চলেছে, এরকম ঘটনা মনে হয় এই দেশে খুব বেশি ছিল না। তবু পুরুলিয়া থাকতেই, ইমেলটা এল আচমকা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পত্রিকার রেজিস্ট্রেশন ডিটেইলস আর যাবতীয় কাগজপত্র পাঠাতে হবে। ল্যাপটপ ঘেঁটে পাঠিয়ে দিলাম যাবতীয় চাহিদা কেন্দ্রীয় সংস্থাকে। সঙ্গে ডিসক্লেইমার: সমস্ত নিয়ম মেনেই পত্রিকা প্রকাশ করা হচ্ছে আমাদের তরফে। কিন্তু স্বাধীন, নিরপেক্ষ আর ছোট ছোট সুবিধা-অসুবিধার কথা বলা মাধ্যমগুলোর মুখ বন্ধ করতে না পারলে, ফ্যাসিবাদের চলবে কেমন করে?

 

পত্রিকা বন্ধ করতে বলা হল না। বরং বলা হল, আমরা পত্রিকা চালাতেই পারি, শুধু আমরা যে সমস্ত নিয়ম মেনে চলেছি তার সাক্ষ্য হিসেবে কয়েকটা জিনিস কেবল তার আগে পাঠাতে হবে কেন্দ্রীয় দফতরে। কী জিনিস? না, তেমন কিছুই না। এতদিন যত পত্রিকা বেরিয়েছে, সেগুলোর সমস্ত আর্টিকেলের ইংরাজি (অথবা সম্ভবত হিন্দিতে হলেও চলত) অনুবাদ করে মূল খবরের সঙ্গে মার্কিং করে পাঠাতে হবে। কারণটা সামনে আনা এই পরিসরে একটু মুশকিল। এমন সব দাবীতে হাসি ছাড়া আর কীই বা আসতে পারে? তবু, এটা বেশ বোধগম্য হচ্ছিল, গা জোয়ারি করে তখন এটা বের করে যাওয়ার বা সংঘাতে যাওয়ার আর কোনও মানেই হয় না। কারণ, যে ধরণের সংস্থার হয়ে কাজ, সরকারের রোষানলে পড়লে তাদের বাদবাকি কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা হবে খুবই।

 

বলাই বাহুল্য, যাঁদের ভাবনায় বা হাত ধরে ‘জঙ্গলনামা’ শুরু হয়েছিল, স্বাভাবিকভাবেই সকলেরই মন খারাপ হয়েছিল খুব। এই একটা উদ্যোগ থেকে বিন্দুমাত্র লাভ ছিল না সংস্থার। একদম প্রথমেই ঠিক করা হয়েছিল, যে সকল শিল্প বা শিল্পপতি আদিবাসী মানুষদের জীবন-জীবিকার বিরুদ্ধে, তাদের থেকে কোনও রকম বিজ্ঞাপন বা সাহায্য নেওয়া হবে না। বিজ্ঞাপন নেওয়া হবে না তামাক বা মদ তৈরি করা কোনও সংস্থার থেকেও। ব্যক্তিগত জীবনে যে যাই করুক, কখনোই স্টুডিওর ভিতরে কিংবা বাইরে ক্যাম্পাসের মধ্যে এসব ব্যবহার করতে দেওয়া হত না কাউকেই। একবার একটা ওয়ার্কশপের জন্য প্রখ্যাত লোকগায়ক এবং শিক্ষক অভিজিৎ বসুকে নিয়ে যেতে হয়েছিল ওখানে। একদিন দুপুর রোদে হোটেল থেকে খেয়ে ফেরার পথে দেখি, তিনি কলেজের মেন গেটের বাইরের রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন একটা সরু গাছের নীচে দাঁড়িয়ে। দেখতে পেয়েই হলুদ পাঞ্জাবী পরা হাত উপরে তুলে স্যারেন্ডার করার মতো ভঙ্গীতে বলে উঠলেন, “দ্যাখো, ক্যাম্পাস থেকে অনেক বাইরে বেরিয়ে এসেছি কিন্তু!”

 

আসলে কম বয়সে যা হয় আর কী। মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে সবসময় দুনিয়া বদলে দেওয়ার ভাবনা। যদিও নিজের মধ্যে বিপ্লব কতটা ছিল কে জানে; শুধু একটা ভাবনা ছিল নিরন্তর। মনে হয়েছিল, আমাদের এই কাজটা জরুরী। বেশ জরুরী।

 

‘জঙ্গলনামা’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার দিনটায় আর কথা বলা সম্ভব হয়নি কারুর সঙ্গে। বিকেল বেলায় কলকাতা আপিস ছুটি হয়ে যাওয়ার সময় বুঝে নিয়ে নিজেও বেরিয়ে গিয়েছিলাম স্টুডিও থেকে ল্যাপটপ বন্ধ করে। স্টুডিওর সামনের বেদিটায় বসে মনে পড়ছিল ‘জঙ্গলনামা’র জন্য ঘুরে বেড়ানো সময়গুলো। কলকাতায় ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কের স্মরণসভায়, অল ইন্ডিয়া রেডিওর অফিসে সাঁওতালি বিভাগে পরিমল হেমব্রমের সঙ্গে আলাপ কিংবা বরো বাস্কের সঙ্গে দেখা করতে বীরভুমের ঘোষালডাঙায়।

 

বীরভূমের কথাটা আলাদা করে বলার দাবি রাখে। সহদেবদার উপর চাপ বাড়তে থাকায় আর বাঁকুড়া থেকেও আদিবাসী মানুষদের অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে, সেখানকার একজনকে নিয়োগ করা হয়েছিল বাড়তি কিছু দায়িত্ব দিয়ে। ‘জঙ্গলনামা’র সহসম্পাদকও ছিলেন তিনি। নামটা এখন আর মনে নেই। সুশীল বা সুনীল, কিছু একটা এরকম। আমার সঙ্গে বীরভূমে সেইবারে গিয়েছিলেন তিনিই। যতদূর মনে হয়েছিল, সম্পাদক সহদেব হেমব্রমের উপর একটু যেন হিংসাই ছিল ভদ্রলোকের। তবে, পুরো ব্যাপারটাই মজার। পুরুলিয়া নিয়ে কিছু কথা বললেই তিনি বলে উঠতেন, “আমাদের বাঁকুড়ায় আসুন, আপনাকে দেখাবো!” মানে, থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল বোলপুরের একটা ছোট লজে। সকালে বিশ্বভারতীতে একটা কাজে যাওয়ার সময় হাঁটতে হাঁটতে বললাম, “এখানে আর আগের মতো পলাশ ফোটে না, পুরুলিয়ায় যেমন ভরে থাকে দেখেছি।” সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে উঠলেন, “পুরুলিয়াতে কী পলাশ দেখেছেন? রানীবাঁধ আসুন। আপনাকে দেখাবো পলাশ!” আমি একদিন বললাম, “মহুয়াতে যা নেশা হয়, বাপরে! আমি খেতেই পারি না।” তিনি বলে উঠলেন, “কোথাকার মহুল খায়েছেন? বাঁকুড়া আসেন একবার!” ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, উনি সামনে থাকলে যে কোনও কিছুকেই ‘ভাল’ বলা ছেড়েই দিতে হয়েছিল পারতপক্ষে।

 

ঘোষালডাঙায় গিয়ে দেখা হয়েছিল অদ্ভুত কিছু মানুষের সঙ্গে। যেমন, বরো বাস্কে স্বয়ং। আনন্দবাজারের সম্পাদকীয় কলামে লেখা বেরোয় যে লোকটার। আদিবাসী উন্নয়ন নিয়ে যাঁর আর্টিকেল ছাপে দেশ-বিদেশের নানা পত্রিকায় বা জার্নাল। শোনা হয়েছিল রথীন কিস্কুর গান। পরে দেখা বা কথা হয়েছে আরও অনেকবার। দেখা হয়েছিল মার্টিনদার সঙ্গেও। জার্মান ভদ্রলোক মার্টিন কাম্পশেনের সঙ্গে যখন নিজের হাস্যকর ভাঙা ভাঙা ইংরাজিতে কথা বলার চেষ্টা করে যাচ্ছি, তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখলাম মিটিমিটি হাসছেন তিনি। হাতে ধরা বাইসাইকেল। হঠাৎ একজন সাঁওতাল মহিলা এসে কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন, “মার্টিনদা, জঁহার!” বলেই দু’জনে নিজেদের মধ্যে কথা চালাতে থাকলেন ঝাড়া মিনিট পাঁচেক।

 

বীরভূমে সেটা ছিল সর্বভারতীয় পর্যায়ের আদিবাসী উন্নয়ন নিয়ে একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার। দেখা হয়েছিল ফেলিক্স প্যাডেল সাহেবের সঙ্গেও। ঘোষালডাঙা থেকে ফেরার পথে অদ্ভুত রঙের সূর্য ডুবছিল একটা। আমি আর বাঁকুড়ার ভদ্রলোক ফিরছি মাঠের পাশের একটা ধুলো ওড়া রাস্তা দিয়ে। ধুলো উড়ছে, কারণ, সামনে ঢিমেতালে এগোচ্ছে গরুর গাড়ি একটা। হাঁটতে হাঁটতে এমনিই বলে ফেলেছিলাম, “সাঁওতালদের মতো এই আদিম উপজাতিদের জীবনদর্শন কত সহজ, অথচ একটু খুঁজলেই বিজ্ঞান বা দর্শনটা বোঝা যাবে। বেশ ভালই কিন্তু, তাই না?” উনি একটা বিড়ি ধরাতে ধরাতে বললেন, “হুঃ, বাঁকুড়া আসুন, সাঁওতাল দেখাবো আপনাকে!”

 

সেদিন আর থাকা যায়নি। ঘুরে দাঁড়াতেই, হঠাৎ থমকে গিয়েছিলেন তিনি। তারপর হেসে ফেলেছিলাম দু’জনেই। এতদিনের সেই সব স্মৃতি ভিড় করে এল হঠাৎ একসঙ্গে। একা একা হেঁটে গেলাম মাঠের দিকে। মাঠ অবধি না গিয়ে বাঁধের পাশে উঁচু মতো জায়গাটাতেই বসে পড়লাম ধুলোয়। বাঁধ মানে অনেক গভীর আর বড় পুকুর বা ঝিলের মতো জলাশয়। কলকাতায় জয়িতাকে মেসেজ করলাম, “জঙ্গলনামা বের হবে না আর।” উল্টোদিক থেকে উত্তর এল, “জানি। তুমি ফ্রী হলে ফোন করো…” জয়িতা এই সংস্থার অফিসেই আমার জুনিয়র কলিগ, পরে যে আমার বোন হয়ে যায়। আমি পুরুলিয়া থাকলে কলকাতার দিকটা সামলাতো ওই। মোবাইলটা রেখে বসে থাকি চুপচাপ। বাঁধের জলের উপর জলফড়িং। জলের উপর শালুক ফুল। গোল গোল পাতার বুকে টলমল জলের ফোঁটা। হাওয়া দিলে ছুঁয়ে আসছে এ ওর শরীর। জল গড়িয়ে যাচ্ছে খানিকটা। আবার ফিরে আসছে তারপর ভারসাম্যে। যেন জীবন এমনই, এলোমেলো হতে হতে বারবার খুঁজে নেওয়া সামলে নেওয়া অবশেষে।

 

কতক্ষণ বসে আছি কী জানি, পিছন থেকে ডাক শুনি হঠাৎ, “শুভদীপ বাবু…” দেখি, পিছনে সহদেবদা আর অঞ্জনদা। সহদেবদাকে দু’রকম পরিস্থিতিতে নামের শেষে ‘বাবু’ জুড়তে দেখেছি। খুব মজার কিছু বলার সময়, কিংবা, খুব সিরিয়াস কিছু বলার সময়। কিন্তু এখন কিছুই বলল না দু’জনের কেউই। ধুলোয় বসে পড়ল দু’পাশে। এরাও একটু অনিশ্চিত। হঠাৎ কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার চিন্তা না যতটা, তার থেকে অনেক বেশি এতদিনের একটা অভ্যেসে টান পড়ায় আচমকাই। সহদেবদা আমাকেই যেন সান্ত্বনা দেওয়ার মতো করে বলে ওঠে, “আমার মনে হয় অফিস নিশ্চই কিছু একটা ব্যবস্থা করবে।” শুকনো হাসি। ভালই জানি, এটা শুধু অফিসের ব্যাপার নয়। অবাক হই একটা জিনিস ভেবেই, নিজেদের ভাঙা রাস্তাঘাট, কম বৃষ্টিতে না হওয়া ফসল বা অচেনা সাঁওতালি কবি-সাহিত্যিকের কবিতা বা গল্প ছাড়া তো কখনোই কোনও রাজনৈতিক কথা লেখা হয়নি এতে। লেখা হয়নি, কারণ, প্রথম থেকেই ঠিক করা ছিল যে গঠনমূলক খবর ছাড়া কিছুই থাকবে না চারপাতার এই কাগজে। কোনও রকম রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের আশপাশ দিয়েও না হেঁটে বলা হবে শুধু একদম নিজেদের স্থানীয় কথাগুলোই, শহুরে মিডিয়ার চোখ, কান, পা, কলম বা ক্যামেরা— কিছুই পৌঁছয় না যেখানে। সেটা কী এমন ক্ষতি করছিল?

 

বসে বসে রাষ্ট্রকে গাল পেড়ে যাচ্ছি নিজের মনে, অঞ্জনদা বলল, “শোনো, বসে থাকলে খারাপ লাগবে আরও। আমারও তো হাত থেকে টাইপের কাজটা চলে গেল। কিন্তু ভেবে তো কিছু হবে না। চলো তার থেকে একটা জায়গা দেখিয়ে আনি। সহদেবদা, আপনিও চলুন।”

 

সেই ভাল বরং! উঠে পড়ে হাঁটতে থাকি তিনজনে। মরে আসা রাঙা রঙের আলোয় কলেজের গেট পেরিয়ে শেখরদার চায়ের দোকানকে পিছনে ফেলে তিনজনে হাঁটতে থাকি পুঞ্চার দিকে। খানিকটা হাঁটার পরেই ডানদিকের মোরাম ফেলা একটা রাস্তায় বাঁক নিয়ে নিতে বলে অঞ্জনদা। সম্ভাব্য গন্তব্য আন্দাজ করেই বোধহয় সহদেবদাও বলে ওঠেন, “ও, ক্ষ্যাপা ঠাকুরের আশ্রমে যাবেন?” “ক্ষ্যাপা ঠাকুরের আশ্রম?” আমি অবাক হই। আগে শুনিনি তো এটা! অঞ্জনদা অভয় দেয়, “চলোই না। দাঁদড় আশ্রম তো এখনও একদিনও নিয়ে যাওয়াই হয়নি তোমাকে।”

 

মোরামের রাস্তা দিয়ে বেশ খানিকটা চলার পর বাড়িঘর কমে আসে চারপাশে। গাছপালা বাড়তে থাকে অনেকটাই। তারপর শুরু হয় একটা জংলা মতো জায়গা। জংলা জায়গাটার মধ্যে দিয়ে খানিকক্ষণ চলার পরেই সামনে দেখা যায় একটা আশ্রম। আশ্রমের দেওয়াল লাল রংয়ের। চারপাশে শাল-সেগুন গাছপালায় ভর্তি। নিম, মেহগনি, সোনাঝুরিতেও। কোনও কোনও প্রাচীন বৃক্ষের উপর থেকে মোটা কান্ডের মতো ঝুরি নেমে এসে আবার আশ্রয় নিয়েছে মাটিতেই। এদিক-সেদিক জঙ্গলের মধ্যে উঁচু উঁই মাটির ঢিপি। মন্দিরের বাইরে একটা মার্বেলের ফলকের উপর লেখা:

“শ্রীশ্রী দাঁদড় গোপাল আশ্রম”

“শ্রী শ্রী রাধামাধবজিউ শ্রীপাদপদ্ম মন্দির”

জানা গেল যে, আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নাকি স্বামী বিরজানন্দ ভারতী, যিনি বেশি পরিচিত ছিলেন ক্ষ্যাপা মনোহর ঠাকুর বা ক্ষ্যাপা ঠাকুর বলে। কিন্তু তাঁর নামের আগে ‘১০৮’ লেখা কেন? উত্তর এল, ওনার আগে নাকি আরও ১০৭ জন সাধক সাধনা করেছিলেন এই জায়গায় বসে। মন্দিরের ভিতরে দেবীর ছোট সাধারণ মূর্তি। আরও বেশ কয়েকটি মূর্তি আছে যেগুলো কালো পাথরে খোদাই করে বানানো। ফলক থেকেই জানা যাচ্ছে যে, এই আশ্রমের প্রধান আরাধ্যা দেবী হলেন, ‘শ্রীশ্রী মা রাধারানী দেবী’।

 

তবে মন্দিরের ভিতরে যেটা চোখ টানলো সবথেকে বেশি, সেটা হল পোড়ামাটি দিয়ে ঘেরা ডিম্বাকৃতির বড় একটা জায়গা। তাতে সিঁদুর ফুল বেলপাতা দিয়ে পুজোর চিহ্ন দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। এখানে কীসের পুজো হয়? যেন প্রশ্নটার জন্য অপেক্ষাই করছিল আমার থেকে বয়সে বড় দু’জন সঙ্গী। জিজ্ঞেস করতেই, ঈশ্বর চেতনা আর বিশ্বাস নিয়ে আরও বেশ কিছু কাহিনী শোনা গেল এই অরণ্য দিয়ে ঘেরা নির্জন আশ্রম প্রান্তরে বসে।

 

বহু বছর ধরে এখানে সাধনা করেছিলেন ‘গোপাল বাবা’ নামে এক সন্ন্যাসী। শোনা যায় বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের দিনে পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে সাধনা করতেন তিনি। এতটাই জোর ছিল তাঁর সাধনায় যে, স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু তাঁকে দেখা দিয়েছিলেন এই স্থানে এসে। ভক্তের প্রার্থনা ফেলতে না পেরে, নিজের পায়ের চিহ্নও রেখে গিয়েছিলেন এই স্থানে স্বয়ং ভগবান।

 

বারবার আশ্চর্য হই। একটা ছোট্ট অঞ্চলেই এত রকম লোককথা, উপকথা বা মিথ ছড়িয়ে আছে বাতাসে, এই পুরো মানভূম অঞ্চলটাতে কত কত গল্প তাহলে থাকতে পারে এরকম! অঞ্জনদা বলে, এই মন্দির চত্বরে নাকি বড় কয়েকটা সাপ ঘোরাফেরা করে। শুনেই লাফিয়ে উঠে পড়ি। এই একটা জিনিসে মারাত্মক ভয়! অঞ্জনদা বলল ভয় পাওয়ার কিছু নেই; ওরা নাকি এই আশ্রম পাহারা দেয়। তবুও! অন্য কিছুতে ভয় না থাকলেও, বিশেষ এই একটা জিনিসে ঝুঁকি নিতে পারি না। উঠেই যখন পড়েছি একবার, বসা হয় না আর। তিনজনে বেরিয়ে আসি নিঝুম আশ্রম পিছনে ফেলে।

 

সন্ধে নামার মুখে দূরে শাঁখ বেজে ওঠে গ্রামের গৃহস্থবাড়িতে কোনও। কেন কী জানি, আনমনেই কপালে উঠে আসে হাত। জংলা রাস্তায় শুকনো পাতার উপর দিয়ে চলার পথ। অঞ্জনদার হাতে টর্চ। জ্বালার প্রয়োজন হয় না যদিও। সারাটা দিনের পর, বেশ লাগে এই আধো-অন্ধকার। আলোহীন ছায়াহীন গল্পেরা আসে আর সরে যায় মাথার মধ্যে। ভাবি, এই পুরো হেঁটে চলাটা যদি খুব হাল্কা প্যানে ধরা যেত… ওয়াইড লং শট… তিনটে ছায়া ফেড আউট হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ…

 

দূর দূর করে তাড়াতে যাব এসব ভাবনা, আবার শাঁখ বেজে ওঠে কোথাও। আবারও হাত উঠে আসে কপালে। অজান্তেই। আর শালপাতা মোড়ানো রাস্তাও যেন অসীম হয়ে ওঠে তখনই। অসীম হয়ে ওঠে অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্বের মাঝের দোলাচল।

 

মনে হয়, ঈশ্বর আছেন কিনা জানি না। যদি থাকেন, তিনি যেন মায়াবী আলোয় আজ এই আচমকা কপাল ছোঁয়া হাতের সামান্য স্বীকৃতিটুকু স্বীকার করে নেন…

 

(ক্রমশ)

শুভদীপ চক্রবর্তী
+ posts

পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠা মফস্বল শহর বাটানগরে। নঙ্গী হাই স্কুল সাক্ষী এইসব দিনের। পরবর্তীতে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে পড়ার পর জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে ঘোরাঘুরি গ্রাম বাংলার নানান প্রান্তে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। পরে কিছুদিন জনসংযোগের কাজ; কিছুদিন সাংবাদিকতা।

প্রথম কবিতার বই 'ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া সব ঢেউগুলো' ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে। পরের বছর 'নিবিড়' থেকে ব্যক্তিগত গদ্য সংকলন 'যতটুকু দৃশ্যে ছিল'। শখ বলতে খেলা দেখা, সিনেমা দেখা, কাছে বা দূরে যেখানেই হোক ঘুরে বেড়ানো। বিকেল বেলা স্টিমারে চেপে গঙ্গা পারাপার। আলমারিতে বই গোছানো নিয়ে খিটখিটে আজীবন। না-পারার তালিকা লম্বা ভীষণ...

1 thought on “অভিমানভূম। পর্ব ১০। একটা নিখাদ মশকরা। লিখছেন শুভদীপ চক্রবর্তী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *