অকূলের কাল। পর্ব ৬০। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
গাঁয়ের বধূ
ফুলিয়ায় শিক্ষণ পর্বের পাট চুকিয়ে ক্ষিতি কলকাতায় ফিরে প্রথমে হাতিবাগানে না গিয়ে সোজা পৌঁছল রাধাবাজারে। এই ক’মাসে শদুয়েক টাকা জমিয়েছে সে। রাধাবাজারে পছন্দ করে ঘন কালো ডায়াল আর সোনালি কাঁটাওয়ালা ছোট্ট একটা হাতঘড়ি কিনল একশো পনেরো দিয়ে। সেই কবে দোলন মুখ ফুটে চেয়েছিল তার কাছে। ক্ষিতি এতদিন পারেনি কিন্তু ভুলেও যায়নি। গয়না-বাড়ির মেয়ে। অন্যদের কাছে পাওয়া নিজের পাঁচখানি আংটি লুকিয়ে নিয়ে এসেছিল। তার থেকে তিনটে বিক্রি করেছে ক্ষিতি, বাকি দুটো বাঁটু চোর নিয়েছে। ঘড়িটা কিনতে পেরে সেই ভার খানিক হালকা হলো। হাতিবাগানে ফিরে একান্তে যখন সে ঘড়িটা দোলনের হাতে বেঁধে দিচ্ছে, তখনও তারা জানে না অন্য এক উপহার এসে গেছে তাদের দাম্পত্যে। আবার যখন সে দোলনকে সঙ্গে নিয়ে শালবনীর দিকে যাত্রা করেছে তখনও জানে না তাদের দাম্পত্যের ঠিকানাও বদলাতে চলেছে।
শালবনীতে পৌঁছোতেই খবর এল, ক্ষিতিদের জন্য বাড়ির দরজা খুলেছে। দিদির বাড়ি ছেড়ে সে বউ নিয়ে ঘরে ফিরুক। বর্ষা নামতে চলেছে। এই সময় শালবনীর পাথুরে ডাঙ্গা দোলনের জন্য সুবিধেজনক। তার কপাল ভালো যে খর গ্রীষ্মে তাকে এখানে থাকতে হয়নি। কিন্তু এই যে বর্ষা আসছে, এখন ক্ষিতির এঁটেল মাটির গ্রাম দোলনের পক্ষে কতখানি ভয়াবহ হবে সে সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই বেচারার। মাঠ অধিকার করে নেবে ধানের কচি চারা, মাঠ সারার জন্যে পড়ে থাকবে কেবলই আল, কিংবা আধ মাইল দূরের ঝোপঝাড়ে ভরা খালের পাড়।
দোলন না-জানার স্বর্গে আছে। নিজের শ্বশুরবাড়িতে পা রাখবে, মনে তার খুশির হাওয়া। আগে থেকেই কু গাইতে ইচ্ছে করল না ক্ষিতির। দোলন সংসার গুছোচ্ছে। দিদির স্যুটকেস গেছে, সংসার হাওয়া হয়ে গিয়েছিল, এতদিনে কম হলেও কিছুটা ভরেছে। সেসব এঁটে গেল একটা ঝোলাতেই। শালবনী থেকে বাসে চেপে হুমগড়। সেখানে ছই দেওয়া গরুর গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন বাবা। নতুন বউ। যেমনই হোক, প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি আসছে – হেঁটে আসা ভালো দেখায় না।
নিচু জাতের শহুরে বউ। সেটা ঠিক কেমন হতে পারে – জানার জন্য কৌতূহল ধূমায়িত হয়েই ছিল। দোলন বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই সেই ধোঁয়া ঘিরে ফেলল তাকে। দিনের পর দিন যায় বধূ-দর্শন আর শেষ হয় না। গ্রাম থেকে, ভিন গ্রাম থেকে দল বেঁধে মেয়েরা আসছে বউ দেখতে। মাথায় ঘোমটা টেনে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে দোলন। তারা ঘোমটা সরিয়ে গায়ে হাত বুলিয়ে পরখ করে যাচ্ছে। ক্ষিতি বিরক্তি গিলে ফেলে দূরে দূরে থাকছে। অবশেষে রায় বেরোল। মিছামিছি নিন্দা কইরত্যে নাই। হল্যেই বা নিচু জাত, গায়ের রঙ টকটকে, গোলগাল হাত-পা, যাই বলো, লক্ষ্মীশ্রী আছে। খেতি ভালো বউই আন্যেছে ঘরে। রান্নাঘরে না ঢুকত্যে দিলেই হইল্য, আর বউয়ের থালাবাসন আলাদা রাইখবে মধ্যম গিন্নি। মধ্যম গিন্নি মানে ক্ষিতির মা। বউ দেখে রায় ঘোষণা করে বুড়িরা তাকে এই উপদেশ দিয়ে গেলেন।
অল্পবয়সি মেয়েবউদের রকমসকম আলাদা, তাদের চোখেমুখে বিস্ময়, মুগ্ধতা – দোলনকে ছেড়ে তারা উঠতেই চায় না। শহুরে বউ দেখার কৌতূহল পুরুষদেরও কম নয়। সোজাসুজি দেখার উপায় তো নেই, আড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি মারাই সার। ক্ষিতির বউদিরা ভালো মনেই দোলনকে শিখিয়েপড়িয়ে নিচ্ছেন। কারোর দিকে চোখ তুলে তাকাবে না, দুমদাম করে চলাফেরা করবে না, কথা বলবে আস্তে আস্তে; গাঁয়ে নইলে নিন্দে হবে। আর, ঘোমটা যেন খুলবে না কখনও।
বেচারা দোলন! এমনিতেই সে স্বভাবে নরম, উপদেশ শুনতে শুনতে মাটিতে মিশে যাওয়ার মতো অবস্থা। মাঝে মাঝে খিলখিল হাসিতে উচ্ছল হয়ে ওঠার স্বভাবটুকুও তার শুকিয়ে যেতে থাকল। একেবারে ভেঙ্গে যে পড়ল না, তার কারণ নিলু আর বুলগান, ক্ষিতির দুই ভাইঝি। বড়দার সেজ মেয়ে নিলু তারই সমবয়সি প্রায়, বছর দুয়েকের ছোট হয় কি না-হয়। আর আট-নয় বছরের বুলগান মেজদার ছোট মেয়ে। দুজনেই সব সময় এই নতুন পাওয়া কাকিমাটিকে ঘিরে রাখে। যতটা সম্ভব তার সুবিধে অসুবিধে দেখে। তার সঙ্গে গল্প করে, তাকে কথা বলায়। সকাল বিকেল সঙ্গে নিয়ে নির্জন খালের ধারে যায়। পুকুরে স্নান করার সময় দুজন দুপাশে থাকে।
দোতলা কাঁচাপাকা বাড়ি ক্ষিতিদের। বাড়ির মাঝের মাটির দেওয়াল তিরিশ ইঞ্চি পুরু। এদিকওদিক সরু ফাটল, গর্ত – ছারপোকা আর ইঁদুরের রাজত্ব। মেঝে অবশ্য সিমেন্টের, বাড়িকে ঘিরে পুবে-পশ্চিমে ইটের দেওয়ালঘেরা বারান্দা। উপর-নীচের চারখানি ঘেরা বারান্দাতেই সকলের শোয়ার ব্যবস্থা। মাঝখানের ঘরগুলিতে হাওয়া বাতাস তেমন ঢোকে না। মূল ঘরের বাইরে পূর্ব দিকে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা মাটির দেওয়াল, খড়ে ছাওয়া রান্নাঘর। উত্তরে টিনে ছাওয়া আরও একটি বড় ঘর। তার একদিকে ধান মজুত রাখার হামার, অন্যদিকে ভাঁড়ার ঘর। বাড়ির পশ্চিম দিকে বিরাট উঠোন। উঠোন পেরিয়ে একদিকে লম্বা লম্বা দুখানি গোয়াল চালা, অন্যদিকে একটি গোলাকার বারো ফুট উঁচু করোই। করোই হলো আসলে ধানের গোলা, হামারের বড় ভাই। পুরো বাখুলটিকে ঘিরে কাঁচা ইটের পাঁচিল। পাঁচিলের গায়ে ভেতর দিকে ঢেঁকিশাল। বাড়িতে নতুন সদস্যের আগমন ঘনিয়ে এলে এই ঢেঁকিশালটিই আঁতুড় ঘরে রূপান্তরিত হয়।
এই হামার-করোই সত্ত্বেও ঘরময় জুড়ে থাকে চালের বোরই। খড় আর খড় দিয়ে বোনা মোটা দড়ির পাকে বাঁধা চাল রাখার গোলা। ইতিউতি তিলের বস্তা, গুড়ের পায়া। মেঝেময় ঘুরে বেড়ায় কিরিপোকা আর পিঁপড়ের দল। দড়ির খাটে শোওয়া। রাত শেষ হলেই বিছানাপত্র তুলে রাখা হয় ঝুলন্ত বাঁশের আড়াতে। খাটিয়া সব চার পায়ের দুই পা উপরে তুলে বাকি দুই পায়ের উপর ভর দিয়ে দেওয়ালের গায়ে দাঁড়িয়ে যায়।
দোলন এক অদ্ভুত, নতুন জগৎ দেখছে। শালবনীতে ছোট মাপের মাটির বাড়ি আর গ্রাম দেখার প্রাথমিক অভিজ্ঞতা ছাড়িয়ে এ এক অকল্পনীয় সংসারে এসে পড়েছে সে। কতটা খারাপ লাগছে তার, ক্ষিতি আন্দাজও করতে পারে না। মুখ ফুটে বলেও না তো কিছু!
(ক্রমশ)
