রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ২৪। অনুবাদে অর্ণব রায়
জমিদার বা তার অধীনস্থ ভাড়াটে রায়তকে চাষ করার জন্য জমি দেয়। এই জমি দেওয়াটা পাট্টা বা চুক্তিপত্রের মাধ্যমে হতে পারে। বা অন্য যেকোনও উপায়ে, যা তাদের দুজনের মধ্যে স্থির হবে, সেই উপায়ে হতে পারে। রায়ত তার জন্য কত টাকা দেবে বা কীভাবে দেবে, সেটাও তারা নিজেদের মধ্যেই স্থির করে নেবে। এক্ষেত্রে দর রাখা হয় বিঘাপ্রতি ছয় থেকে আট আনা, কখনও বারো আনার মধ্যে (এক টাকার দুই তৃতীয়াংশ বা বলা যেতে পারে এক শিলিং আর চার পেন্স) ঘোরাফেরা করে। মোটামুটি তিন বিঘায় এক একর হয়।[1] স্বাভাবিক ভাবেই, রায়ত তার ক্ষমতা অনুযায়ী এই সব জমিগুলো চাষ করে। কেউ হয়ত মাত্র কুড়ি বিঘা নিল, কেউ নিল একেবারে তিন থেকে চারশো বিঘা।
এদিকে রায়ত এতই গরীব যে তার জমি পাওয়ার পরে প্রাথমিকভাবে চাষ শুরু করার জিনিস কেনার পয়সা অবধি বেই। এইবারে তাকে সুদখোর মহাজন বা স্থানীয় ঋণদাতার শরণাপন্ন হতে হয়। চাষের জন্য বীজ কেনা, ভাড়ার অগ্রিম দেওয়া বা চাষের আরও অন্যান্য খরচাপাতির জন্য পয়সা লাগে। আর সেই পয়সা দেয় মহাজন। সেই পয়সা কর্জ করার জন্য সে তৎক্ষনাৎ তার জমির ফসল মহাজনের কাছে বন্ধক রেখে দেয়। এইভাবে, তার জমিতে ফসল বোনার আগেই সে ফসল মহাজনের কাছে বাঁধা পড়ে যায়। এদিকে চাষ করার জন্য তার লাঙল লাগবে, বলদ লাগবে, আরও বেশ কিছু সহকারী চাষীর (বা মজদুরের) সাহায্য লাগবে। সবচেয়ে বড় কথা, যতদিন চাষ চলছে, ফসল পেকে কেটে ঘরে না উঠছে, তাকেও তো খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে! কিন্তু এত কিছু প্রয়োজন মেটানোর জন্য মহাজন তাকে যে সামান্য টাকা দেয় তাতে অগ্রিম ভাড়াটা দিয়ে আর প্রায় কিছুই তার হাতে বাঁচে না। আর এই পুরো সিস্টেমটা চলে বিনিময় প্রথায়। মহাজন করে কী, সে দরিদ্র রায়তকে প্ররোচিত করে, না আমি বলব বাধ্য করে তার কাছ থেকে জিনিসপত্র কিনতে। চাষীকে ফসল বুনতে হবে, মহাজন বীজ দেয়। তার বদলে তার কাছ থেকে নির্লজ্জভাবে সুদ নেয় ১০০ পার্সেন্ট। যদি চাষীকে ঘরে খাওয়ার জন্য চাল নিতে হয়, তার সুদের হার ৫০ পার্সেন্ট। আর যদি তার এরকম কোনও জিনিসের প্রয়োজন হয় যার ব্যবসা মহাজন করে না, যেমন কাপড় ইত্যাদি, তার জন্য মহাজন তাকে অগ্রিম টাকা দিয়ে দেয়। সেই টাকার সুদের হার ৩৫ পার্সেন্ট। কিন্তু যতরকম অগ্রিম চাষিকে দেওয়া হয়, ফেরত দেওয়ার সময় কিন্তু নগদে দেওয়া যাবে না, তখন ফসল দিয়ে বা অন্যান্য উপায়ে শোধ করতে হবে। কোনও কোনও জেলায় তো আমি শুনেছি মহাজনে সবকিছু সরবরাহ করে। [2]
ফসল কাটা হলে, স্বাভাবিকভাবেই, মহাজন সেসব নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে তোলে। এতদিন ধরে এতরকম ঋণ আর অগ্রিম রায়ত নিয়েছে, সেসব সুদসমেত শোধ হয়ে গিয়ে কিছু অতিরিক্ত ফসল থাকলে চাষী সেখান থেকে ধারে ফসল পায়। তখন তার দরও মহাজনই ঠিক করে দেয়। বাজারদরের সমান বা তার থেকে কিছু কম হয় তার দর। ব্যাপারটা বোঝাই, ধরা যাক চাষী এক বিঘা জমিতে ধান বুনেছে। একবিঘা জমিতে ধান বুনতে তার বীজ লাগবে আধমন বা তিনের চার মন[3]। জমি কতটা উর্বর বা সেখানে আগে কতবার চাষ হয়েছে ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। বিনিময়ে, আমি শুনেছি, সবচেয়ে ভালো মানের জমি তাকে সাত মন চাল ফলিয়ে দেয়। মাঝারি মানের জমি থেকে সাড়ে পাঁচ মন আর নিম্ন শ্রেণীর জমি থেকে তিন সাড়ে তিন মন চাল পাওয়া যায়। আমি এখানে কিন্তু ঢেঁকিতে ছাঁটা চালের কথা বলছি। ধানের কথা ধরতে গেলে পরিমানটা মোটামুটি দ্বিগুণ হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে ধরে গড় করলে মোটামুটি পাঁচ পূর্ণ একের তিন মন আসবে। এবার এখান থেকে চাষী গড়ে মহাজনের থেকে কত বীজ কর্জ নিয়েছে, সেটা তাকে ফেরত দিয়ে দিলে রায়তের কাছে পড়ে থাকে মোটামুটি তিন মন ছাব্বিশ সের চাল। মন প্রতি তার দাম চোদ্দ আনা থেকে এক টাকা হলে (ওই দুই শিলিং ধরতে পারো), সেটাই তার পরিশ্রমের পুরস্কার। এর থেকে আবার চাষী বছরভর খাওয়ার জন্য যে ধান কর্জ নিয়েছিল, সেটা সুদসমেত বাদ যাবে আর যে টাকাটা ভাড়া দেবার জন্য অগ্রিম নিয়েছিল, চাষীর টাকা থেকে সেই টাকাটাও সুদ সমেত মহাজনের কাছে ফেরত যাবে। এর পরে চাষীর কাছে কী থাকবে বলে আশা করতে পারি? মোদ্দা কথা, এইসব কারনেই এদিকে প্রবাদই আছে, ধান হল মহাজনের ফসল। এর থেকে চাষীর আক্ষরিক অর্থেই কিছু লাভ হয় না। তার একটা কুঁড়েঘর থাকে, সে বছরভর দুমুঠো খেতে পায়, ব্যাস্, এর বেশী কিচ্ছু না।
কিন্তু শুনলে অবাক হয়ে যাবে, মহাজনের কঠিন শর্ত সত্ত্বেও প্রচুর চাষী নিয়মিত মহাজনের কাছে যায় ধার করতে। অথচ আমি শুনেছি মহাজন কিন্তু খুব বেশী পয়সা করতে পারে না। কোথাও কোথাও তো এই শ্রেণীটাই শেষ হয়ে গেছে। বাস্তব হল, এই পুরো সিস্টেমটা এতটাই দমনমূলক যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চাষী তার জোয়ালের ভারে ভেঙে পড়ে। ক্রমে তার পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। রায়ত শেষ পর্যন্ত সম্ভবতঃ অসহায় হয়েই জমিজমা চাষবাস সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে সেই জায়গা থেকে একেবারে পালিয়ে যায়। মহাজনের কাছে তাকে ধরার বা খোঁজার বা অন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার সামান্যতম উপায়ও থাকে না। এরকম ঘটনা ঘোষিতভাবেই প্রচুর হয়েছে। এবং প্রতিদিন আরও নতুন নতুন উদাহরণ যোগ হচ্ছে যেখানে অসৎ রায়ত ঋণ তো নিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু তা চোকানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার থাকছে না। অন্ততঃ একবারের জন্যও সৎভাবে শোধ করার চেষ্টাও করছে না। ফলে হচ্ছে কী, এদের প্রতি সাধারণ মানুষের ধারণা উলটে যাচ্ছে। যে অন্যায় কারণগুলো এই শোষিত শ্রেণীকে সৃষ্টি করেছিল, সকলে সেই কারণগুলোকেই সমর্থন করতে শুরু করছে। খারাপ লোকেদের খারাপ কর্মের দাম চোকাতে গিয়ে ভালো লোকেরা অত্যাচারিত হচ্ছে। ফলে, একদিকে অসততা আর অন্যদিকে একগুচ্ছ অজ্ঞ, সংকীর্ণ, দমবন্ধকরা নিয়ম— এই দুইয়ের মাঝে পড়ে কোনও পক্ষেরই উপকার হচ্ছে না। আর অনুকূল জমি আবহাওয়া সবকিছু পাওয়া সত্ত্বেওএই শিল্পটি ক্রমে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। অন্যথায় এরকম পরিবেশকে অত্যন্ত অনুকূল বলেই ধরে নেওয়া হয়। মহাজনের তরফে আরও একটা কথা বলতে হবে, এরা কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে চাষীদের ঋণ দেওয়ার জন্য নিজেরাই অন্য জায়গা থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করে বসে থাকে। তাই এরকম চাষীদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে থাকলে পরবর্তীতে যে ঋণ নিতে যায়, তার ওপর গলাকাটা সুদের হার চেপে যায়, কেননা মহাজন নিজের ঝুঁকির দিকটাও সামলে রাখতে চায়।
আর জমিদারের কথা যদি বলতে হয়, তা সে প্রথমেই হোক বা শেষে, তার শোষনের উপায়ের আর বৈচিত্র্যের তো শেষই নেই। প্রথমতঃ, যখন তার জমিতে কোনও ইজারা নেই, তখন সে রায়তের কাছ থেকে যে ভাড়া দাবী করে, সেটাই তার অত্যাচারের প্রথম ধাপ। যদিও আমি ইতিমধ্যেই বলেছি, তার প্রভুরা কিন্তু তার ওপর দাবীর একটা সীমারেখা ইতিমধ্যেই টেনে দিয়েছেন। তারা তাদের তরফ থেকে করের একটা উর্ধসীমা বেঁধে দিয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ, বিশেষ করে দরিদ্র [4] রায়তের ওপরে জমিদারের বলপ্রয়োগের কোনও উর্ধসীমা (কেবলমাত্র, যেরকম একটু আগেই বলেছি, কিছু আইনী বিধিনিষেধ ছাড়া) কোথাও বেঁধে দেওয়া নেই। এমনকি, একই জমি বারবার করে মাপার নামেও শোষন চলতে পারে। অন্ততঃ বারবার জমি মাপার নাম করে ভাড়া বাড়ানোর একটা অজুহাত জমিদার খুঁজে পায়। চাষীও বারবার ঝামেলা ঝঞ্ঝাট এড়ানোর জন্য নিজের তরফ থেকে কিছু অতিরিক্ত পয়সাকড়ি দিতে রাজী হয়ে যায়, যাতে সে এবং তার শ্রমিকরা শান্তিতে চাষাবাদের কাজটা অন্ততঃ করতে পারে। কখনও কখনও রায়ত তার জমি মাপাতে চায় না কেননা সে জানে যে সে যে পরিমান জমির জন্য টাকা জমা দিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশী পরিমান জমিতে যে চাষ করছে। সেক্ষেত্রে জমি মাপাতে জমিদারের আগ্রহ থাকাটা স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত।
টীকা
[1] এই মাপ বাংলায় চলে। উত্তর পশ্চিমের প্রদেশগুলোয় এক বিঘা মানে এক একরের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ধরা হয়। সেখানে এই শব্দটিকে হামেশাই ‘বিগাহ’ লেখা হয়।
[2] মিঃ শোর (যার বই থেকে একটু আগেই উদ্ধৃতি দিলাম) কারিগর বা অন্যান্য পেশার মানুষদের অগ্রিম টাকা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে বলেছেন, “ জমিতে চাষ করার ক্ষেত্রেও সম্ভবতঃ ব্যাপারটা একই। জমি বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত। প্রতিটি অংশ তাদের মালিক চাষ করে। তাদের নিজেদের হালবলদ রয়েছে। কিন্তু তাদের কুড়ি জনের মধ্যে উনিশ জনই এতটাই গরীব যে ফসল কাটার জন্য, বীজ কেনার জন্য, ফসল পাকা পর্যন্ত খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য যদি তাদেরকে এই অগ্রিম টাকা না দেওয়া হয়, তারা চাষটাই করতে পারবে না।”
[3] কারখানার হিসেবে এক মন হচ্ছে ৭৪ ২/৩ পাউন্ড। আর এক সের (চল্লিশ ভাগের এক ভাগ) হল ১ পাউন্ড ১৩ আউন্স। কলকাতায় ১ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান মন হল ১০০ পাউন্ড, আর দেশী বাজারে মোটামুটি ৮২ পাউন্ড ২ আউন্স।
[4] “— রায়তের জন্য এরকম কোনও নিশ্চয়তা কোথাও নেই যে একবছর ভালো ফসল হলে পরের বছর আরও ভারী ভাড়ার বোঝা তার ওপর চেপে যাবে না।”— মেজর র্যালফ স্মিথ।
(ক্রমশ)
