কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ২৬। শোভন সরকার

গত পর্বে: বুধোয়া মঙ্গলের বর্ণময় ইতিহাসের ওঠা-পড়া চলেছে বারবার। তবে ব্যাপক পরিবর্তিত ও ক্ষীণ আধুনিক ধারা রয়ে গেছে আজও।

‘যাবি? নৌকা করে?’ — চন্দ্রাবলীর কথায় চটক ভাঙল। দেখি সামনেই গামছা গলায় এক লোক দাঁড়িয়ে আছে, তারও চোখেমুখে প্রশ্ন। চন্দ্রাবলী আর সেই লোক আমার দিকে তাকিয়ে আমার উত্তরের অপেক্ষা করছে।

আমি কিছু বলার আগেই পাশ থেকে অঙ্কিতা বলে উঠল, ‘যাবে না কেন? ওকে ধরে তুলে নিয়ে যাব না হলে। কী রে, যাবি না?’ 

আমাদের সেমিস্টার ব্রেক শুরু হচ্ছে। সেদিন বিকেল থেকেই সবাই যার যার বাড়ি যাওয়ার ট্রেন ধরবে। তার আগে আমরা তিনজন এসেছি ঘাটে। বাড়িতে গেলে বেশ কয়েকদিন ঘাটে আসা হবে না, সবার সাথে দেখাও হবে না। বাড়ি ফেরার আগে ঘাটে আসাটা আমাদের, মানে বিএইচইউ-এর ছাত্রছাত্রীদের যেন একটা রিচুয়াল, বাধ্যতামূলক আচার। 

চন্দ্রাবলীর চোখের ইশারায় বুঝলাম ওর খুব ইচ্ছে হচ্ছে। আমার তো বটেই। ভোর বেলায় নৌকা থেকে সূর্যোদয় দেখার দৃশ্য অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন, একবার দেখে মন ভরে না, প্রতিবারই নতুন লাগে। দরদাম করে একটা বোঝাপড়ায় এসে মাঝির পেছনে পেছনে তুলসী ঘাটে গিয়ে এক নৌকায় চড়ে বসলাম। বেশি দেরি করা চলবে না, সূর্য প্রায় উঠল বলে। আলো দেখা যাচ্ছে, পূর্বদিকে রঙ লেগেছে। ঠিক হয়েছে মাঝি আমাদের দশাশ্বমেধ ঘাটে গিয়ে নামিয়ে দেবে। 

নৌকাটা বিশেষ বড় নয়, আমাদের ক’জনের জন্য একদম ঠিকঠাক। আমরা ঘাট থেকে এগিয়ে গঙ্গার আরও ভিতরের দিকে যেতেই ঘাটের সমস্ত আওয়াজ যেন তরল হয়ে গলে পড়ল। সেই শব্দ শোনা যায় ঠিকই, তবে মনে হয় যেন তা স্বপ্নপুরীর ওপার থেকে বয়ে আসছে গঙ্গাস্রোত বেয়ে। বাইরের শব্দের বাহুল্য ও বাতুলতা যখন মনের মধ্যে প্রবেশ করার রাস্তা খুঁজে পায় না, তখন কল্পনা জেগে ওঠে। মনের বিস্তার বেড়ে যায়, ছোটখাটো জাগতিক বিষয় তখন আর ভাবনার স্রোতে নুড়িপাথরের মত বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। 

আমরা তিনজনেই চুপ করে বসে রয়েছি। কেউই কোনো কথা বলছি না। পূর্বদিকের আকাশ ধীরে ধীরে আলো হয়ে উঠছে, তারই সঙ্গে জেগে উঠছে একটা শহর — এই সেই শহর যার জীবনের সূর্য কত হাজার বছর ধরে কখনোই ডোবেনি। আশেপাশের দৃশ্য তখন প্রবল শীতে পুরু চাদরের উষ্ণতার মত আমাদের জড়িয়ে ধরতে শুরু করেছে। আমাদের উল্টোদিকে বসে মাঝি দাঁড় বেয়ে চলেছে। ছন্দ মিলিয়ে জলের উপর আছড়ে পড়ছে তার দাঁড় দুটি। তার পেশীবহুল শ্যামলা শরীরে ঘাম জমেছে — বাহুর উপর ক্ষণে ক্ষণে ঢেউ জাগছে আর সেই ঢেউয়ে ঊষার অমলিন আলো পিছলে যাচ্ছে। 

নৌকা থেকে ঘাটের দিকে তাকালে তুলসীদাস, মা আনন্দময়ী আশ্রমের সাদা বাড়িগুলো স্পষ্ট চোখে পড়ে। ঠিক তার পরেই রয়েছে বচ্ছরাজ ঘাট। ঘাটের শিখরে চোখে পড়ে সোনালি রঙের এক মন্দিরের চূড়া। মাঝিকে জিজ্ঞেস করতেই বলল এইটিই হল সপ্তম জৈন তীর্থঙ্কর শ্রী সুপার্শ্বনাথ ভগবানের জন্মস্থান। শ্বেতাম্বর জৈনদের একটি মন্দির রয়েছে ওখানে। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বেনারসের এক বিখ্যাত জৈন ব্যবসায়ী ও মহাজন লালা বৎসরাজ এই ঘাট নির্মাণ করান। স্পষ্টতই, তাঁরই নামে এই ঘাটের নাম। ঘাটের উপরে জৈন মন্দির ছাড়াও আছে মা আনন্দময়ীর গোপাল মন্দির ও অক্রুরেশ্বর মন্দির।

এর পাশেই রয়েছে জৈন ঘাট — ১৯৩১ সালের আগে পর্যন্ত বচ্ছরাজ ঘাটের থেকে এর আলাদা অস্তিত্ব ছিল না। পরবর্তীতে জৈন সম্প্রদায়ের মানুষ এই ঘাটটি তৈরি করেন। এই ঘাটের উপরে দিগম্বর জৈনদের তৈরি একটি সুপার্শ্বনাথ মন্দির রয়েছে। 

ঘাটে ঘাটে লোকজন এসে জড়ো হচ্ছে। তাদের বেশিরভাগেরই হাতে তামার ঘটি। ভোর বেলায় গঙ্গাস্নান করে তবেই তারা দিনের কাজ শুরু করবে। ঘটিতে জল ভরে তা গঙ্গায় ঢালতে ঢালতে পূর্বের আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে তারা মন্ত্র আওড়ে চলেছে, প্রার্থনা করছে যেন তাদের মনের সমস্ত অন্ধকার দূর হয়ে জ্ঞানের আলো উদিত হয়। 

জৈন ঘাট থেকে এগোলে দেখি তার পাশে নিষাদ অর্থাৎ মাঝিমাল্লাদের নিষাদরাজ ঘাট; তার পর এক বাঙালি বাবু নির্মল কুমারের প্রতিষ্ঠিত প্রভু ঘাট। কাশীর মহারাজা প্রভুনারায়ণ সিংহের নামে এই ঘাটের নাম। প্রভু ঘাটের পাশে পঞ্চকোট ঘাট। এই ঘাটটি বেশ চওড়া। ঘাটের ওপরে প্রায়ই চোখে পড়ে নতুন নৌকা তৈরির কাজ চলছে। সেও এক দেখার মত ব্যাপার। ঘাটের উপর যে সুবিশাল প্রাসাদ দেখা যায় তা ১৮০০ সাল নাগাদ বাংলার পঞ্চকোটের রাজা তৈরি করেন। এখানে শিব মন্দির ছাড়াও রাজার কুলদেবী কল্যাণেশ্বরী দেবীর মন্দির রয়েছে। প্রাসাদটি এখনও রাজার বংশধরদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। 

এরপরে চোখে পড়ে ইতিহাস প্রসিদ্ধ চৈত বা চেত সিং ঘাট। বেনারসে ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে এই ঘাট এক রোমাঞ্চকর নাটকীয় পরিস্থিতির পটভূমি হয়ে ওঠে।

‘উ দেখা চেত সিং ঘাট হউ। অউর উ হলা উনকর্‌ কিলা। কাশীনরেশ বলবন্ত সিংজি বনোইলে রহলন্‌।’ — আমাদের নৌকার মাঝি আমাদের চিনিয়ে দিল।

বানালো বলবন্ত সিংহ আর পরিচয় হল চৈত সিংহের নামে, কী ব্যাপার? মাঝিকেই জিজ্ঞেস করলাম। মাথা আরও গুলিয়ে দিয়ে সে হাসতে হাসতে ছড়া কেটে বলল, ‘ঘোড়ে পর হাওদা, হাথী পর জীন, জলদি সে ভাগা ওয়ারেন হেস্টিন!’ 

চন্দ্রাবলী বলল, ‘এ আবার কী?’

অঙ্কিতা হেসে বলে উঠল, ‘মাঝি তো বড্ড রহস্য করে। রসিক মানুষ বটে।’

একটু চেপে ধরতে সে ভাসা ভাসা করে একটা গল্প শোনাল — সে যেন কোনো এক সিনেমার দুর্ধর্ষ টিজার। কিন্তু তাতে কি আর মন ভরে আমার? চাই সম্পূর্ণ গল্প। আর সেই গল্প যদি ইতিহাসের গহ্বর থেকে তুলে আনা হয় তাহলে তো আর কথাই নেই। পরে অনেক খুঁজে-পেতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে কিছু বইতে সবিস্তারে ঘটনাটির বিবরণ পেলাম। আমি আমার মত করে বলছি। 

আজ থেকে বহু বছর আগের কথা। তখন ১৭৭০ সাল। রাজা বলবন্ত সিংহের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সিংহাসনে এবার কে বসবে? চৈত সিংহ রয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁর সিংহাসনে বসার ক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে। তাঁর মা রানি পান্না ছিলেন রাজপুত বংশের, ভূমিহার ব্রাহ্মণ বংশের নন। বিশুদ্ধ ভূমিহার রক্তের সন্তান ছাড়া সিংহাসনের উপর তাঁর দাবি এক অবৈধ সন্তানের দাবির সমান। 

ঠিক এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে রচিত শিবপ্রসাদ মিশ্র ওরফে রুদ্রের ‘বহতি গঙ্গা’ বইয়ের প্রথম কাহিনি ‘গাইয়ে গণপতি জগবন্দন’। এই গল্পে জানতে পারি রাজা বলবন্ত এক যুদ্ধে রানি পান্নার পিতাকে হত্যা করেন এবং জোর করে তাঁকে বিবাহ করেন। এই বিবাহ প্রেমের নয়, বরং এক রাজনৈতিক চাল, রানি পান্না সেই রাজনীতির সামান্য এক ঘুঁটি মাত্র। এই অন্যায় বিবাহে যে সন্তানের জন্ম হল, ঈশ্বরের চোখে তা বৈধ হলেও সমাজ তাকে অবৈধ বলেই মানল। অপমানিত, লাঞ্ছিত রানি পান্না রাগে-ঘৃণায় বলবন্তকে অভিশাপ দেন যে তাঁর বংশে বাতি দেওয়ার জন্য বার বার অন্যের সহায়তা প্রার্থনা করতে হবে, সন্তান দত্তক নিতে হবে, রাজরক্ত বিশুদ্ধ থাকবে না কোনো কালেই। তারপর এক সময় ধসে পড়বে এই বংশের অহংকার, ক্ষমতার জৌলুষ।

কাশীর ভূমিহার রাজবংশের ইতিহাস ঘাঁটলে এই অভিশাপ সত্যি প্রতীত হয় — বিভিন্ন সময়ে কাশীর রাজাগণ বংশরক্ষার জন্য পুত্র দত্তক নিতে বাধ্য হন।

যাই হোক, চৈত সিংহ ছাড়া রাজার দৌহিত্র মহীপ নারায়ণ সিংহ পরবর্তী যোগ্য উত্তরাধিকারী হতে পারতেন, কিন্তু তাঁর বয়স খুবই কম। রয়েছেন রাজার ভাইপো মনিয়ার সিংহ — তিনিও সিংহাসনের এক যোগ্য দাবিদার। পরিস্থিতি বড়োই গোলমেলে। আওধের নবাব এই সুযোগে কাশীর উপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চাইলেন। কিন্তু বাধ সাধল ইংরেজ সরকার। তাদের সমর্থনে কাশীর সিংহাসনে বসলেন চৈত সিংহ-ই। অবশ্য তাঁকে নানা রকম ছল-চাতুরির আশ্রয় নিতে হয়েছিল। ১৭৭৩ সালে নবাবকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এক রকম বাধ্য করল চৈত সিংহকে বেনারসের সনদ অর্থাৎ সিংহাসনে বসার অনুমতি প্রদান করতে।

(ক্রমশ)

পরবর্তী পর্ব

প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

Disclaimer
The views and opinions expressed in this series are solely those of the author and do not represent the views, policies, or positions of any organisation, institution or society of any kind or the government. The content of this series is written in the author’s personal capacity and does not reflect any official information or stance.

Author

Leave a Reply