সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ২৬। বরুণদেব
উনবিংশ শতাব্দীর ইংরাজি শিক্ষার প্রাবল্য তৈরী করেছিল এক চাকুরিজীবি শ্রেণির যারা গোরাদের প্রতি মোহাবিষ্ট হয়ে অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে দেশীয় সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা অবহেলা করত। আবার দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত রাজনারায়ণ বসু, মদনমোহন বসু, নবগোপাল মিত্র এই ইংরেজি শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে জাতীয়তাবাদের মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন। বাঙালির প্রাতিষ্ঠানিক শরীরচর্চা সেই জাতীয়তাবাদের ফসল যেমন, তেমনি ব্রিটিশ শরীরচর্চার ধারাও এসে তাকে পুষ্ট করেছিল। বাঙালির নিজস্ব কুস্তি বা লাঠিখেলা জমিদার, রাজা, বাদশা, নীলকর প্রভুদের লেঠেল বাহিনী হয়ে, কলকাত্তাই বাবুসমাজে শৌখিন চর্চার হাততালি কুড়িয়ে, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে, ছড়িয়ে পড়ে হিন্দুমেলা থেকে। নবাব সিরাজদৌল্লার পতনের পর থেকে ব্রিটিশের এ দেশে পাকাপাকিভাবে শাসক হয়ে বসার পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত যে অরাজক বঙ্গ, যেখানে দুর্বল নবাব ও রাজস্ব আদায়ের নামে লুঠেপুটে খাওয়া ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি, সে বঙ্গে চোর ডাকাত, গুণ্ডাদের হাত থেকে বাঁচতে বাঙালিকে আপন বাহুবলের ওপর ভরসা করে থাকতে হত। লাঠির ওপর ভরসা করা আমজনতার সে দিনযাপন, দেশীয় ও বিদেশীয় অত্যাচারের চাবুক ও লাঠির ঘা খেতে খেতে, সমাজপতি আর শিব ঠাকুরের আপন দেশের আইনপতিদের রক্তচক্ষু ও লালসার হাত থেকে আপন জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচাতে কখনো কখনো প্রতিরোধ গড়ে তুললেও, ধীরে ধীরে বাঙালি মানসিক ও শারীরিকভাবে কুঁকড়ে যেতে বাধ্য হয়। ইংরেজরা শাসন ক্ষমতা হাতে নিয়ে ল এন্ড অর্ডার ঠিক করতে এবং আপন হিস্যা ঠিকঠাক বুঝে নিয়ে এ দেশের জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ বাহিনীর সৃষ্টি করলে গ্রাম পাহরার লাঠিগুলি তেলবিহীন হয়ে পড়ল। নিয়মিত শরীরচর্চার স্পৃহা প্রাতিষ্ঠানিকতার অভাবে চর্চা হয়ে উঠতে পারে নি যেমন, তেমনি জীবিকার সন্ধানও দেয় নি। জাতীয়তাবোধ দূরের কথা, দাসত্ব করাই যেন বাঙালির বিধিলিপি। সে মানসিকতা শিকড় গেঁড়ে বসে দিন আনি দিন খাই, ঝড়ে বন্যায় মহামারিতে ভিক্ষা করে বাঁচি, জনতার মধ্যে। আর কলকাত্তাই বাবুসমাজে কুস্তি বা লাঠিখেলা নেহাৎই সৌখিন মজদুরি আর বাবু সম্প্রদায়ের অলঙ্কার। দেশীয় বা গোরাদের আত্মরক্ষার্থে এক আয়ুধও। জাতীয়তাবাদের হাওয়ায় বাঙালি সাহস পেল ভাবতে- আমরা কোথায় হীনবল? সে ভাবনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে একজন গৌরমোহন মুখোপাধ্যায়।
আহিরিটোলার জমিদার অবনিশ চন্দ্র ঘোষ হিন্দু মেলার এক আসরে দশ জন জাঠ ও পাঠানকে হারিয়ে দশ খানা মেডেল পাওয়া এক পালোয়ান। তাঁর আহিরিটোলার ডালপটির বসতাবাড়িটি জঙ্গলে পরিণত। সেখানে ছেলেরা তীর ধনুক লাঠি নিয়ে খেলা করে। গৌরমোহন মুখোপাধ্যায় ছোটো থেকেই ডানপিটে। গৌরমোহন গেলেন কুস্তি শিখতে। বেনেটোলায় বটকৃষ্ণ দত্তের আখড়াটি বাঙালির কুস্তি ও জিমন্যাস্টিক্সের প্রথম আখড়া। সেখানেই গৌরমোহনের হাতেখড়ি। সেখান থেকে হরচন্দ্র লেনের এক আখড়ায় কুস্তি। বাঁশ নিয়ে প্যারালাল বারের জিম্ন্যাস্টিক্স। ক্রমে ক্রমে গৌরমোহন আহিরিটোলা থেকে কুস্তি ও জিমন্যাস্টিক্স চর্চার আখড়া ছড়িয়ে দেন কলকাতার বহু অঞ্চলে। সংখ্যায় প্রায় পঁচিশ ত্রিশ। ছড়িয়ে পড়ে কলকাতার তৎকালীন সীমানা ছাড়িয়ে শহরতলীতে। স্কুলের নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা নিয়ে এইসব আখড়াগুলো চলে। এতগুলি আখড়ায় নিজে গুরুগিরি করা গৌরমোহনের পক্ষে সম্ভব নয়। কাজে কাজেই এক একজন সুযোগ্য ও পারদর্শী ছাত্রকে ভার দিলেন এক-একেকটি আখড়ায় শিক্ষকতার। এইসব ছাত্ররা আবার তাঁদের প্রচেষ্টায় নতুন নতুন আখড়া গড়ে তুললেন। গড়ে উঠল বেশ কয়েকটি জিমন্যস্টিক্স ক্লাব। প্রিয়নাথ বসু, ভোলানাথ মিশ্র, আউলচারু, গৌরমোহনের অতি প্রিয় ছাত্রেরা গড়ে তুললেন জিমন্যাস্টিক্স ক্লাব। প্রিয়নাথদের সিমলের আখড়া পরে দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। নয়নচাঁদ দত্ত স্ট্রীটে লালচাঁদ দত্তের বাড়িতে ভোলানাথ তাঁর আখড়া নিয়ে আসেন আর প্রিয়নাথ সিমলা স্ট্রীটে। প্রিয়নাথের সিমলের এই আখড়া থেকে বহু জিমন্যাস্টিক্সের আখড়ার সৃষ্টি হলো। শুধু সিমলে থেকে নেবুতলা পর্যন্তই প্রায় পঞ্চাশটি আখড়া। আগরপাড়া, পানিহাটি, প্রিয়নাথের শিকড় জাগুলিয়া গ্রামেও গড়ে উঠল আখড়া। গুরু গৌরমোহনের মতে, প্রিয়নাথই প্রথম বাঙালি যিনি পিরামিড ও জাগলিং অ্যাক্টে দারুণ পারদর্শী ছিলেন। পারদর্শী ছিলেন প্যারালাল বার, হরাইজন্টাল বার, অশ্বারোহণের খেলায়ও। কিন্তু প্রিয়নাথ একজন ব্যায়ামবীরের থেকেও বেশি ছিলেন একজন ব্যায়াম শিক্ষক। আর তাঁর এই সহজাত ক্ষমতাই বাঙালিকে এনে দিয়েছিল বাঙালির প্রথম উল্লেখযোগ্য সার্কাস।
গুরু গৌরমোহনের সঙ্গে তাঁর প্রিয় ছাত্র প্রিয়নাথের মতান্তর বাঁধে জিমন্যাস্টিক্সকে পেশাদারী করার ব্যাপারে। গৌরমোহনের মত ছিল, এ শিল্পকে ব্যবসায় পরিণত করলে ছাত্রদের নৈতিক চরিত্রের অবনতি হয়। আর সেই জিমন্যাস্টিক্সের হাত ধরেই প্রিয়নাথ বাঙালির প্রথম পেশাদারী সার্কাস খোলার পথে পা বাড়ালেন। তবে গুরুর মতের বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য শিষ্য এতটাই লজ্জিত হয়ে পড়েছিলেন যে গুরুর সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতেও লজ্জা পেতেন।
১৮৬৫তে চব্বিশ পরগণা জেলার জাগুলিয়াতে প্রিয়নাথ বসুর জন্ম। বাবা কবি নাট্যকার প্রাবন্ধিক মনোমোহন বসু, হিন্দু মেলার অন্যতম পথিকৃৎ। ছোটোবেলা থেকেই প্রিয়নাথের পড়াশুনার থেকে শরীরচর্চায় আগ্রহ বেশি। গ্রামের স্কুল থেকে নিয়ে এসে বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটান স্কুলে ভর্তি করে দিলেন বাবা। প্রিয়নাথের আর একটি বিষয়ে খুব আগ্রহ। অঙ্কন। মনোমোহন ছেলেকে ভর্তি করে দিলেন গবর্ণমেন্ট স্কুল অব আর্টে। ব্যায়ামচর্চার পাশাপাশি চলল অঙ্কনবিদ্যা আয়ত্ত করাও। সেই শিক্ষা প্রিয়নাথের ভবিষ্যৎ সার্কাস শিল্পের সহায়ক হলো।
কলকাতায় তখন গ্যাসলাইটের আলোয় আলোআঁধারি নগরপথ। পথঘাটের অবস্থা করুণ। যানবাহন বলতে পালকি, কেরাঞ্চি, ফিটন। এ শহরে রেল চালু হয়েছে। সেখানে ফার্স্ট ক্লাস গোরাদের জন্য। সেকেণ্ড ক্লাসে গাদাগাদি করে নেটিভরা। প্ল্যাটফর্মে উঁকি দিয়ে রেলকোম্পানির নজরদাররা দেখে নেয় সেকেণ্ড ক্লাসের ভেতরে আর পা রাখার জায়গা আছে কিনা, থাকলে লাঠি দিয়ে ঠেলে ঠেলে নেটিভদের ভরে দেয়, যেন মুড়ির টিন! ভোর হলে রাস্তা ঝাঁট দিতে বেড়োয় এ শহরের মেথররা। ভিস্তিওয়ালারা চামড়ার ব্যাগে জল ভরে ঘরে ঘরে দেয়। হাতপাখা আরাম দেয় ঘর্মাক্ত শরীরে। সিনেমা কালচার সেভাবে আসে নি এ শহরে। বিকেল হলে ফিটন গাড়ি চেপে শহরের বাবুরা, ফিরিঙ্গিরা, গঙ্গার হাওয়া খেতে যায়। আর শীতকাল হলে গড়ের মাঠে সার্কাস আসে বাৎসরিক বিনোদন নিয়ে । সবই বিদেশী সার্কাস। ১৮৮০ সালে উইলসনস গ্রেট ওয়ার্ল্ড সার্কাস আসে কলকাতায়। পরের বছর চিয়ারিনির রয়্যাল ইটালিয়ান সার্কাস। ১৯১১ পর্যন্ত কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী থাকায় ভারতে ইউরোপিয়ান সার্কাসের প্রধান কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে কলকাতা। প্রিয়নাথ তাঁবুর গ্যালারিতে খেলা দেখতে দেখতে স্বপ্ন দেখে, সে-ও একদিন…। আর্ট কলেজের বিদ্যা কাজে লাগায় প্রিয়নাথ। দর্শকাসনে বসে এঁকে নেয় খেলার বিশেষ অঙ্গভঙ্গি, যন্ত্রপাতির ছবি।
সার্কাসের ইতিবৃত্তে ঘোড়া সার্কাস-সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। প্রাচীন রোম থেকে অ্যাস্টলের আধুনিক সার্কাসের ইংলণ্ড বা বিশ্বভ্রামনিক সার্কাস-নাগরিক চিয়ারিনি বা ফাদার অফ ইণ্ডিয়ান সার্কাস বিষ্ণুপন্থ ছত্রে, ঘোড়ার জিনেই এসেছে সার্কাস সংস্কৃতি। প্রিয়নাথ টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে, মায়ের কাছে পয়সা নিয়ে, তার শিকড় জাগুলিয়া গ্রামে খোলে ব্যায়ামশালা। একদিন সে গ্রামে কোথা থেকে এক জরাজীর্ণ কঙ্কালসার দাবিদাওয়াহীন এক ঘোড়া ঘোরাফেরা করতে থাকে। প্রিয়নাথের আখড়ার ছেলেরা তাকে ধরেবেঁধে নিয়ে আসে আখড়ায়। সার্কাসের স্বপ্ন দেখা প্রিয়নাথ সে ঘোড়াটিকে নানা খেলা শেখাতে শুরু করেন। নবগোপাল মিত্র যখন তাঁর বসতবাড়িতে ন্যাশনাল সার্কাস খুলে বাঙালির সার্কাসের প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন তখন তাঁরও সম্বল ছিল দু’চারটি ঘোড়া। শিল্পীরা ছিলেন প্রিয়নাথের আখড়ার ছাত্র। নবগোপাল মিত্রের মৃত্যুর পর ন্যাশনাল সার্কাস উঠে গেলে প্রিয়নাথ ন্যাশনাল সার্কাসের ঘোড়াগুলি কিনে নিলেন।
আর্ট স্কুল থেকে বেরিয়ে পঁচাত্তর টাকা বেতনের চাকরি জুটে যায় প্রিয়নাথের। যে ছেলের শয়নে স্বপনে সার্কাসের তাঁবু, সে অফিসযাত্রীর রোজনামচায় আটকে থাকে কি করে! চাকরিকে বিদায় জানিয়ে সার্কাসের দল খোলার আয়োজন শুরু করে দেন প্রিয়নাথ। ১৮৮৫ সালে ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সামনে খেলা দেখান। ভাইসরয় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে উপাধি দেন প্রফেসর। কিন্তু পিতা মনোমোহন বা বাড়ির অন্য সদস্যরা প্রিয়নাথের সার্কাসদল খোলার সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী। প্রিয়নাথ তাতে কান না দিয়ে শুরু করে দেয় সার্কাস সংগঠনের কাজ।
কিন্তু এ কাজে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। বাড়ির মেয়েরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। হাত বাড়ালেন অন্যেরাও। মনোমোহন বসুর বন্ধু গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় বিখ্যাত পুস্তকবিক্রেতা, প্রিয়নাথদের সিমলের বাড়ির ঠিক পাশের বাড়ি, নিকট প্রতিবেশী। বন্ধুকে কিছু না জানিয়ে গোপনে অর্থ তুলে দিলেন প্রিয়নাথের হাতে, সার্কাসের জন্য। ১৮৮৭তে তৈরী হলো বাঙালির প্রথম সফল সার্কাস কোম্পানি- দ্য গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস।
এস ও আবেল ছিলেন মার্কিন দেশের লোক। বাড়ি থেকে পালিয়ে নানা কাজে যুক্ত থেকে শেষে সার্কাসের দলে ভিড়ে যান। উইলসন সার্কাসে ছিলেন হাতির প্রশিক্ষক। দেখাতেন হাতির খেলা। এই সার্কাসটি কলকাতায় আসার আগেই আবেল উইলসন সার্কাস ছেড়ে কলকাতা চলে আসেন। থিয়েটারে থিয়েটারে, ধনী সম্ভ্রান্ত লোকেদের বাড়িতে, দু’একজন সাহেবকে সঙ্গী করে খেলা দেখিয়ে জীবিকা অর্জন করতে থাকেন।
নবগোপাল মিত্র কলকাতার বাঙালিকে সার্কাসের নেশাটা ধরিয়ে দিতে পেরেছিলেন। ন্যাশনাল সার্কাসের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে নবগোপাল মিত্রর জামাতা হিন্দু স্কুলের ব্যায়ামশিক্ষক রাজেন্দ্রলাল সিংহ, হুগলী কলেজের ব্যায়ামশিক্ষক শ্যামাচরণ ঘোষ, জাতীয় বিদ্যালয়ের ব্যায়ামশিক্ষক যোগীন্দ্র পাল, আবেল সাহেবকে দলে টেনে নিলেন। জনসাধারণের কাছে চাঁদা তুললেন। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ স্থাপনের জন্য যিনি আর্থিক সাহায্য দিয়ছিলেন, সেই ব্যারিষ্টার টি. পালিত এবং কলকাতার কয়েকজন সম্ভ্রান্ত মানুষ, বি এল গুপ্ত, স্যার রাসবিহারী বসু, ডবলিউ সি ব্যানার্জী, চাঁদা দিলেন সার্কাসের জন্য। রাজাবাজার অঞ্চলে চালা বেঁধে খুলে গেল গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাস। সেখানে আবেল সাহেব যেমন ঘোড়ার খেলা দেখাতেন, তেমনি ঘোড়সওয়ারের প্রশিক্ষণও দিতেন। মতভেদ আছে নবগোপাল মিত্রের কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীটের ন্যাশনাল সার্কাস না রাজাবাজারের গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাস , কোনটি আগে, কোনটি পরে।
রাজাবাজারের গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাস চালু হওয়ার কয়েক মাস পরে রাজা রামমোহন রায়ের প্রৌত্র হরিমোহন রায়ের সখ হয় একটি সার্কাসদল খোলার। তিনি কিনে নিলেন গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাস। তাঁর আমহার্স্ট স্টীটের বাসভবন সংলগ্ন পশুশালার প্রাঙ্গনে সার্কাসের খেলা দেখানো শুরু হলে লোকের মুখে মুখে সে সার্কাসের নাম হয়ে গেল হরিমোহন রায়ের সার্কাস।
ওদিকে আবেল সাহেব গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাস ছেড়ে চলে গেলেন চট্টগ্রাম। ক্লায়ের ওলম্যান নামে এক জার্মানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চট্টগ্রামে শুরু করলেন আবেল ক্লায়ের ওলমান সার্কাস, ওলম্যান সার্কাসের ম্যানেজার, মূলধন তাঁরই। চট্টগ্রামে বারো দিনের ক্যাম্প শেষে আবেলের সার্কাস চলল বিদেশে। যবদ্বীপ, পিনাং, সিঙ্গাপুর, জাভা, অস্ট্রেলিয়া সফর শেষে কলকাতায় প্রত্যাবর্তন। প্যারিসের একজিবিশনে অংশগ্রহণ করে কলকাতায় ফিরে কৃষ্ণলাল বসাক যোগ দিলেন দলে। দলের নাম হলো আবেল’স গ্রেট ইস্টার্ন সার্কাস। বাঙলার বুকে তৈরী হওয়া এই সাহেবী সার্কাস জনপ্রিয় হলো।
আবেল চট্টগ্রাম যাবার সময় নিয়ে যান গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাসের খগেন্দ্রলাল সিং, ভূতনাথ বসু ও আরও কয়েকজনকে। খগেন্দ্রলাল ছিলেন একজন দক্ষ অশ্বারোহী। ভারত তথা এশিয়াতেও তাঁর মতো অশ্বারোহী খুব কমই ছিল। সুপুরুষ খগেন্দ্রনাথ গোঁফ দাড়ি কামিয়ে মেম সাহেবের পোশাকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে নাচতেন। সার্কাসদল যখন বাটাভিয়ায়, বসন্ত রোগে মৃত্যু হলো খগেন্দ্রনাথের। সেখানকার গভর্নরের অনুমতি নিয়ে কবর থেকে তাঁর দেহ তুলে শবদাহ করা হলো। সে শহরে শবদাহ চালু ছিল না। হিন্দুর শবদাহ দেখতে শহর সুদ্ধ লোক ভেঙে পড়ল শ্মশান ঘাটে।
আবেল গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাস ছেড়ে চলে যাবার কিছু দিন পর যোগীন্দ্রনাথ পাল সে সার্কাসের সত্ত্বাধিকারী হন। প্রিয়নাথ তাঁর সার্কাসদল নিয়ে সারা ভারত ঘুরে ১৮৯৯ সালে এলেন কলকাতায়। যোগীন্দ্রনাথ প্রিয়নাথকে বিক্রি করে দিলেন গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস। আমৃত্যু সেখানে রয়ে গেলেন প্রিয়নাথ বসুর সার্কাসে একজন প্রশিক্ষক হিসেবে।
(ক্রমশ)
