অকূলের কাল। পর্ব ৫৮। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

(গত পর্বের পর)

 খোয়াযাওয়া সংসার

একটু ভাবতেই চমৎকার সমাধান বেরিয়ে এল ক্ষিতির মাথা থেকে। দোলনকে হাতিবাগানে তার দিদির বাড়িতে রেখে দিয়ে সে ফুলিয়া যাবে। রবিবার ছাড়াও দু-চারটে ছুটির দিন পড়বে নিশ্চয়। নাও যদি পড়ে, মাসে চার বা পাঁচটা দিন সে ফুলিয়া থেকে কলকাতায় এসে দোলনের সঙ্গে মিলতে পারবে। শ্রীরামপুরের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের জানা হয়ে গেছে, কয়েকদিনের বিরহ অভিসারের রোমাঞ্চে মিলনকে কেমন উত্তাল মাধুর্যে ভরিয়ে দিতে পারে! সেই কথা ভেবেই দোলন তার জামাইবাবুর প্রতি অভিমানকে সরিয়ে রেখে রাজি হয়ে গেল ক্ষিতির প্রস্তাবে।

পরের দিন সকালে রওয়ানা দেবে তারা। সন্ধে থেকেই দিদি শুরু করেছে পিঠে বানানোর তোড়জোড়। কুটুমবাড়ি যাচ্ছে ভাই, ভালোমন্দ কিছু নিয়ে যেতে হবে তো সঙ্গে। ক্ষীরের পুর ভরা কাখরা পিঠে, আর আতপ চালের তুলতুলে নরম গড়্গড়্যা – তার ভেতরেও ভরা আছে ক্ষীর কিংবা নারকেলের পুর। মুখে দিলেই গলে যাবে। এসব পিঠে কলকাতার লোক চাখা তো দূরের কথা, চোখেও দেখেনি কখনও।

দোলন গুছিয়ে নিল তার সমূহ সংসার। নিজের পাঁচ প্রস্থ শাড়ি-সায়া-ব্রা-ব্লাউজ – সবই এর তার কাছ থেকে পাওয়া; ক্ষিতির একজোড়া প্যান্ট-সার্ট, লুঙির মতো করে ঘরে পরার ধুতি গোটা দুয়েক, দু-একটা জাঙ্গিয়া-গেঞ্জি আর তার এপর্যন্ত অর্জন করা বিদ্যার সার্টিফিকেট; দোলনের সেই পাঁচ আঙটির মধ্যে এখনও বিক্রি না হওয়া দুটি আংটি, টুকটাক কিছু সাজের জিনিস। বাসন-টাসন কিছু আসেনি এখনও সংসারে। গোছানো তো হলো, নেবে কেমন করে? দিদি নামিয়ে দিল একখানা নতুন চামড়ার স্যুটকেস। কেনা হয়েছে বেশ কিছুদিন। ব্যবহার হয়নি, যত্ন করে তুলে রেখেছিল দিদি। তার ভেতরেই ভাইয়ের সংসার যাক আপাতত, ছ’মাস পরে তো এখানেই ফিরে আসবে। কাঁচা শালপাতায় মুড়ে পিঠে ভরা হলো একটা হাতে ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগে।

সরকারি চিঠিটি কেবল থাকল ক্ষিতির প্যান্টের পকেটে। ফুলিয়ায় থাকাকালীন স্টাইপেন্ডের একশো টাকা ছাড়াও অতিরিক্ত ভাতা পাওয়া যাবে ষাট টাকা। তার থেকে হস্টেলের থাকা-খাওয়ার খরচ দিতে হবে চল্লিশ টাকা। সেসব ভেবে বেরোবার সময় বেশ একটা ’বড়লোক বড়োলোক’ অনুভূতি হচ্ছিল ক্ষিতির। মনে মনে ঠিক করল, পরের মাসে টাকা পেয়েই সে রাধাবাজার থেকে দোলনকে খুব সুন্দর দেখতে একটা হাতঘড়ি কিনে দেবে। গয়নার বদলে ঘড়ি – দোলনের সেই আবদার সযত্নে বুকের মধ্যে পুষে রেখেছে ক্ষিতি। এতদিন পরে সময় এসেছে সেই আবদার পূর্ণ করার।

পরের দিন শালবনি থেকে বাস-ট্রেন মারফত বেলা দশটায় তারা নামল হাওড়া স্টেশনে। সঙ্গে হাতে ঝোলানো পিঠে-ভরতি ব্যাগ আর দিদির নতুন লেদার স্যুটকেস। স্যুটকেসের ভিতর তাদের পুরো সংসার। পৌষ-সংক্রান্তির মরশুম। গঙ্গাসাগরের যাত্রীদের ভিড়ে হাওড়া স্টেশন সরগরম। স্যুটকেস আর ব্যাগ হাতে ক্ষিতি, পাশে দোলন। ভিড় ঠেলে একটু এগোতে না এগোতেই কোত্থেকে একটা বেঁটে মত দুঃখী চেহারার লোক এসে জুটল ক্ষিতির পিছনে। স্যুটকেসটা দেখিয়ে কেবলই বলে,  ‘দিন-না বাবু দিন-না বাবু, বাসে তুলে দেব, দু-এক টাকা দিবেন, দুদিন কিছু খাইনি বাবু – দিন-না বাবু – ’

স্যুটকেসের ওজন ক্ষিতির কাছে নস্যি। কিন্তু লোকটা দু’দিন কিছু খায়নি। তার মনে তখনও সেই বড়লোকি ভাব। এমাস থেকে ষাট টাকা অতিরিক্ত ভাতা। হোস্টেল খরচ বাবদ চল্লিশ টাকা কেটে নিয়েও হাতে থাকবে একশো কুড়ি টাকা। গত মাসের স্টাইপেন্ডের টাকা থেকে এখনও বিশ-ত্রিশ মজুত আছে পকেটে। ক্ষুধার্তকে সাহায্য করলে মন্দ কী! মন বেশ ফুরফুরে থাকবে খানিকক্ষণ।

অতএব তার হাত থেকে বাঁটুর মাথায় উঠে গেল দিদির দামি চামড়ার স্যুটকেস। সে চলল আগে আগে, তার মাথার উপর চোখ রেখে পেছন পেছন দোলনের হাত ধরে ক্ষিতি। সাবওয়ের কাজ শুরু হয়েছে হাওড়া স্টেশনে। সেই সবে পাতাল একটুখানি নেমেই আবার উঠে গেছে বাসস্ট্যান্ডে। পাতালে নামার ঠিক আগেই বাঁটু হারিয়ে গেল ক্ষিতির নজর থেকে। অসহায়ের মতো চারদিকে ক্ষিতির চোখ তাকে যখন খুঁজে বেড়াচ্ছে, ঠিক তখনই তাকে আশ্বস্ত করে খোলা ছাদের সাবওয়ে থেকে হাত নেড়ে বাঁটু তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। স্যুটকেসটি তার পায়ের কাছে নামানো। লোকটির সততা বিষয়ে নিঃসংশয় হয়ে ক্ষিতি দোলনের হাত ধরে সাবওয়েতে নামল। বাঁটু স্যুটকেসটিকে আবার মাথায় তুলে সাবওয়ের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করল। তার পেছন পেছন বাস-স্ট্যান্ডে উঠে এল তারাও। কিন্তু উঠেই দেখে বাঁটু উধাও। আবার কোথায় গেল! মিনিট দুয়েক দোলনকে পাশে নিয়ে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে থাকল ক্ষিতি। বাঁটু নিশ্চয়ই প্রথম বারের মতো হাত নেড়ে তাকে ডাকবে। কিন্তু দু-মিনিট দশ মিনিটে গড়িয়ে গেল, তার দেখা নেই। উদ্বিগ্ন ক্ষিতি এদিক ওদিক এলোমেলোভাবে ছোটাছুটি করল বেশ কিছুক্ষণ। নাঃ! বাঁটু হারিয়েই গেল। সঙ্গে দিদির দামি স্যুটকেসটাও।

দোলন বাস-স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভেউ ভেউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল। বেচারার সংসারটাই উধাও হয়ে গেল! পরনে যেটুকু আছে তা বাদে সব শূন্য! অবিলম্বে তাদেরকে ঘিরে লোকজন জড়ো হয়ে গেল। হরেক রকম উপদেশ-বৃষ্টি – ঝরেই চলেছে। ক্ষিতি প্রথমটায় তেমন বিচলিত হয়নি। স্যুটকেস দিদির। সংসার দোলনের। শূন্য সংসার ভরে উঠতে সময় লাগবে না। এই চাকরিটা হলে ভালো। না হলেই বা কী! তার জন্যে আরও বড় চাকরি অপেক্ষা করছে। রেজাল্ট বেরোক। গ্র্যাজুয়েট হলেই সে বড় চাকরির পরীক্ষায় বসার ছাড়পত্র পেয়ে যাবে। এইসব বলে শান্ত মাথায় দোলনকে সান্ত্বনা দিতে গিয়েই চিড়িক করে বিদ্যুৎ চমকাল মাথায়। তার সার্টিফিকেট! আগে একবার হারিয়েছিল। ডুপ্লিকেট বার করার হ্যাপা সামলাতে একটা বছর জলে গেছে। এবার কী হবে? উপদেশের বৃষ্টি থেকে একটি মাত্র – থানায় জিডি করতে হবে – এইটা বেছে নিয়ে দোলনকে পিঠের ব্যাগসহ হাতিবাগানের বাসে তুলে দিয়ে সে ছুটল গোলাবাড়ি থানায়। সেখানে চরাচরের যাবতীয় ঘটনা-দুর্ঘটনা বিষয়ে সন্ন্যাসী-প্রতিম উদাসীন মেজবাবু অথবা ছোটবাবুর হাত থেকে জিডিআর-এর কপি নিয়ে যখন বেলা চারটের সময় হাতিবাগানে পৌঁছে পেটভরা খিদে নিয়ে ভাত খেতে বসল ক্ষিতি, তখন সে বাঁটুর চৌর্যকলার গূঢ় কৌশলটি আবিষ্কার করল। বাঁটু একবার মাথার থেকে স্যুটকেস নামিয়েই বুঝে যায় ক্ষিতি তার স্যুটকেসসহ মাথাটাকেই কেবল লক্ষ্য করে এগোচ্ছে, মাথা থেকে স্যুটকেস নামিয়ে দিলেই সে তার নজর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। অতএব সাবওয়ে থেকে উঠেই সে ওই কৌশলেই তার নজর থেকে হারিয়ে যায় এবং সম্ভবত সেখানে মজুত থাকা তার অন্য শাগরেদের হাতে মাল চালান করে দেয়।

সে রাতে দিদির বাড়িতে ক্ষিতির বুক দোলনের চোখের জলে কেবলই ভিজতে থাকল। সে দিদির শাড়ি-ব্লাউজ পরে কতদিন কাটাবে! ক্ষিতির মাথায় থাকা সমীকরণটা বদলে গেল বাধ্য হয়ে। ঘড়ির জন্য পড়ে থাক ভবিষ্যৎ, বর্তমান বরাদ্দ থাক কেবলই জামাকাপড়ের জন্য। ফুলিয়া তাঁতের শাড়ির জন্য বিখ্যাত, এমাসের স্টাইপেন্ড দিয়ে দোলনের জন্য একজোড়া শাড়ি কিনবে আগে, তারপরে বাঁচে যদি কিছু, নিজের জন্যে একটা পাজামা-পাঞ্জাবি। পরনের প্যান্ট-শার্টটা দিয়েই আপাতত চলুক। নতুন একজোড়ার অনেক দাম। পাজামা-পাঞ্জাবি অতি সস্তায় তার সম্মানজনক বিকল্প।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply