রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্‌ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ২২। অনুবাদে অর্ণব রায়

গত পর্বের পর

যাই হোক, এতদিনে আমরা বাইরে যেখানে যেখানে ঘোরার ঘুরে নিয়েছি, প্রাথমিকভাবে যা যা দেখার দেখে ফুরিয়ে দিয়েছি। তোমাদের দেখিয়েছি এখানে কীভাবে আসতে হয়, কীভাবে থাকতে হয়, কীভাবে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ভ্রমণ করতে হয়, কীভাবে এখানে সময় কাটে আর এই মরশুমে কীভাবে মানুষ ব্যস্ত থাকে। এখন সময় এসেছে এই মফঃস্বল জীবনের যে বিষয়ে আমি তোমাদের পরিচিত করাব বলে কথা দিয়েছি, সেই বিষয়ে আরও কাছ থেকে নজর দেওয়ার— নীল চাষ ও নীল উৎপাদন। কিন্তু এত ঘোড়ায় চড়া হল, এত ঘুরে বেড়ানো হল, এমনকি আমাদের ভ্রমণ আমাদের আদালত ও জেলখানায় অবধি টেনে নিয়ে গেল, আমার বিশ্বাস তোমরা পরের চিঠি পাওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম নিতে আপত্তি করবে না।

 

চতুর্থ চিঠি

 

হাল কাঁধে চাষী

                                                                                  মূলনাথ,  ফেব্রুয়ারী ১৪

 

  চাষের মরশুম এসে গেছে। এদেশে চাষের প্রাথমিক প্রস্তুতি (চাষের জন্য খেত তৈরি  করা) শুরু হয় সেই ফেব্রুয়ারী মাসে। আর যেহেতু আমি সব ব্যাপারেই শুরু থেকে শুরু করতে পছন্দ করি, এখানকার জমি সম্পর্কে কিছু কথা বলে রাখার এটাই সঠিক সময়। কেননা, জমিই আমার এখনকার বিষয়ের কেন্দ্রবিন্দু।

আমি জানি, মহিলাদের এই সব জমিজমা ইজারা, রাজস্ব, ভূমিরাজস্ব, মালিকানা হস্তান্তর, বাজেয়াপ্তকরণ— এসব নিয়ে একেবারেই আগ্রহ থাকার কথা নয়। আজ থেকে তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে হলে আমি এসবের নামোল্লেখমাত্র করতে দ্বিধাবোধ করতাম। কিন্তু বর্তমানে এসব কথা বললে আমার মনে হয় না কোনওরকম ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন ওঠে কেননা এসমস্ত জিনিস যেমন সকলের জেনে রাখা দরকার, তেমনি বুঝতেও অসুবিধে হওয়ার কথা না। বিশেষ করে যাদের সাথে ব্যাপারটা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, তাদের পক্ষে।

১৮২৯ সালের আগে ভারতে ইউরোপীয়রা জমি ইজারা নিতে পারত না। ব্যাপারটাকে বিপজ্জনক মনে করা হত। শুধুমাত্র সরকারের নিরাপত্তা ও ভালোভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে নয়, সাধারণ মানুষের স্বার্থের জন্যও নিরাপদ নয় বলেই মনে করা হত। মনে করা হত, এই ইউরোপীয়রা জমি নিয়ে সাধারন মানুষের সঙ্গে মিলে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করবে। কিন্তু পরবর্তীকালে স্পষ্ট বোঝা গেল, শয়তান তো উল্টোদিকে রয়েছে। ইউরোপীয় প্ল্যান্টাররা নিজের নামে জমি না রাখতে পারায় যে সমস্যা হয়, সেটা তারা সরকারকে দেওয়া স্মারকলিপিতেও বলেছেন। সেখানে তারা জানিয়েছেন, এই নিষেধাজ্ঞার জন্য  তাদের ব্যবসা এমন মার খেয়েছে যে যতই উর্বর জমি তাদের দেওয়া হোক বা সস্তার শ্রমিক দেওয়া হোক, সে ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। এর ফলে তারা নানারকম মনগড়া নাম দেওয়া বা নাম লুকোনোর ব্যবস্থার আশ্রয় নিয়েছেন (বেশ কিছু ক্ষেত্রে ইউরোপীয় মালিকরা তাদের চাকরদের নামে বেনামে জমি নিয়ে রেখেছেন)। এর ফলে দেখা গেল এমনকি বড়লাট পর্যন্ত মন্তব্য করতে বাধ্য হচ্ছেন যে ‘জোচ্চুরি, অসুবিধে, মোকদ্দমা ইত্যাদি এত বেড়ে গেছে যে ব্যবসার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সমাজের শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে, আমাদের দেশের লোকের নৈতিক চরিত্রের পতন হচ্ছে।’ [1] সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই নিষেধাজ্ঞা কোনও ক্ষতি তো করতে পারলই না বরং বিচ্ছিরিভাবে ব্যার্থ হল। আমাদের দেশের অন্যতম সেরা বুদ্ধিমান দেশসেবক-এর (স্যার চার্লস মেটকাফ) মতে, ‘এই নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমাদের ভারতীয় সাম্রাজ্যের উন্নতিতে বাধা পড়েছে। এদেশে কর আদায়ের পরিমানে সামগ্রিক উন্নতি চাইলে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া অত্যন্ত জরুরী। এদেশে বসবাসকারী আমাদের দেশের প্রতিটি লোকের ভালোর জন্য খুঁটিনাটি হিসেব করে যে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে বাধা দেয় এরকম সমস্ত কিছুকে আমাদের সরিয়ে ফেলতে হবে। যাতে এদেশের যে সমস্ত মানুষগুলোর ভালোমন্দ আমাদের হাতে রয়েছে, তাদের ওপর আমাদের শাসন একটা স্থায়ী রূপ পায়।’[2] অতএব নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।

ব্যবসার মূলধনের দিক থেকে দেখতে গেলে অবশ্য জমি কিনে নেওয়ার বেশ কিছু অসুবিধে রয়েছে। যেমন, জমির প্রথম দাবীদার সরকার, যাকে তিন মাস অন্তর ভূমি রাজস্ব দেওয়া হয়। আর এই রাজস্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি কঠিনতম সময়ানুবর্তীতা মেনে না চলা হয়, কোনওরকম নাটক না করে সম্পত্তিটির নিলামের বিজ্ঞপ্তি সরকারী গেজেটে বেরিয়ে যাবে ও যে সর্বোচ্চ দর দেবে তার হাতে বিক্রি হয়ে যাবে। সুতরাং, রাজস্ব জমা করে যে দালাল (আর প্রায় সব ক্ষেত্রেই দালাল একজন থাকবেই) তার তরফ থেকে রাজস্ব জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সামান্য অসাবধানতা হলেই বিপুল পরিমান সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাবে। তখন প্রকৃত মালিকের কোনও দাবীই শোনা হবে না। আবার সরকারের কাছ থেকে এককভাবে এই বিপুল পরিমান জমি ভাড়া নিয়ে চাষ করার ক্ষমতা বা ইচ্ছে কোনও  ইউরোপীয় মালিকের নেই। ফলে সাধারণতঃ ব্যবসাদার, প্ল্যান্টার এরা সকলে মিলে সমিতি গড়ে জমি নেয়। আর এখুনি যে বিপদের কথা বললাম, তা এদের এক এক জনের কাছে এক এক রূপে দেখা দেয়। সময়ে খাজনা জমা দেওয়াটা সন্দেহের আর ঝুঁকিপূর্ণ হতে থাকে। হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুসারে পিতার সম্পত্তি তার সব সন্তানের মধ্যে সমান ভাবে ভাগ হয়। ফলে খাতায় কলমে শ্রমিক ও অন্যান্য আয়োজনের খরচ কয়েকগুন বেড়ে যায়। এই কারনেও বটে আবার কখনও কখনও নানা অভিনব উপায়ে কর ফাঁকি দেওয়ার কারণেও বটে, সরকার সম্পত্তির বাঁটোয়ারা বা ভাগ করার অনুমতি দেওয়া একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে প্রতিটি ভাগীদারের দায়িত্ব শুধুমাত্র প্রকৃতপক্ষে তার মালিকানাধীনে থাকা জমির ব্যাপারেই থাকে। এইভাবেই যখন সরকারের ত্রৈমাসিক সম্পত্তি নিলামের সময় আসে, এই সমস্ত সম্পত্তিগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। একটা সম্পত্তির যত ভাগীদার রয়েছে, তারা সকলেই উৎকন্ঠায় পড়ে যায় যে সম্পত্তির অপর ভাগীদার তার অংশের বকেয়া খাজনা সময়ে মেটাতে পারবে তো! কেননা একজন যদি খাজনা সময়ে দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সমস্ত সম্পত্তি সরকারী গেজেটে উঠে যাবে এবং অন্যান্য ভাগীদাররা, যারা একে অপরের ওপর নির্ভর করে আছে, তারা কোনও সতর্কবার্তা পাবে না। পেলেও এত সামান্য ও এত দেরীতে পাবে যে তাদের জমি বাঁচানোর কোনও সুযোগই তারা পাবে না। ফলে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জমির মালিকেরা তাদের বকেয়া খাজনার থেকে অনেকটা বেশী টাকাই আগেভাগে পাঠিয়ে রাখে। যাতে পরবর্তীতে তাদের অন্যান্য ভাগীদেরদের দেওয়া খাজনায় কোথাও কম পড়লে তা  পূরণ করে দেওয়া যায়। বেশি করে দিয়ে রাখা টাকা অবশ্য তারা সরকারের ঘর থেকে ফেরত পাবে কি না তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। বা হয়ত এটাই আইনের গতি, এই ভেবেও তারা স্বান্তনা পায়। গোপন বা জাল জমি বিক্রি আর একটি বিপদের উৎস যার থেকে বিবাদ মামলা এবং এমনকি শেষ পর্যন্ত সমস্ত শ্রম পন্ড হয়ে যেতে পারে।

জমি কিনে রাখা তো পরের কথা, জমি পাওয়াই আর এক সমস্যা। একটু পরেই দেখতে পাবে, ইউরোপীয়দের কর্মোদ্যোগের

কারণে যে সমস্ত জেলায় নীল উৎপাদন হয়, সেসব জেলায় জমির দাম এত বেড়ে গেছে যে তা বিক্রি হয়ই না বলতে গেলে। আর যদি খুব কালেভদ্রে কখনও বিক্রিবাট্টা হয়, তার দাম এত চড়া থাকে যে ইউরোপীয় প্ল্যান্টাররা উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। দেশীয় পুঁজিপতিদের ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপারটা উল্টো। তারা যে শুধুমাত্র জমিদার বা জমির মালিক হওয়ার সম্মান পায় বা দেশীয় লোকেদের চোখে তাদের স্থান খুব উঁচু হয় তা-ই নয়, তারা এই জমি নিজেরা ব্যাবহার করে। আর এদেশেই জন্ম ও বেড়ে ওঠার জন্য স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় লোকেদের সাথে পরিচিতি ও তাদের নিয়ে অভিজ্ঞতা এতটাই বেশী যে কোনও ইউরোপীয় কখনোই ভাবতে পারবে না। উল্টোদিকে এই দ্বিতীয় ব্যাক্তিটির (ইউরোপীয় ব্যাক্তিটি) জমির প্রতি কোনও টান নেই। জমিদারির সম্মান গর্ব ইত্যাদির সে একবিন্দু পরোয়া করে না। তার নাইট-অফ-দ্য-শায়ার (১) বা প্যারিশ-বিডল (২) হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। তার জমি দরকার চাষ করার জন্য, শ্রমিক দরকার হাল চালানোর আর ফসল বোনার জন্য। কিন্তু সব ধরণের জমি আবার তার কাজে লাগবে না। ফলে একটা বিশাল প্রান্তর থেকে তাকে কিছু কিছু জমি বেছে নিতে হবে, যেগুলো তার নির্দিষ্ট ফসল চাষের কাজে লাগবে। এই কারনেও বটে, তাছাড়া আরও একটা ব্যাপার হল, একই জমিতে বারবার একই ফসল লাগানো উচিৎ নয়। ফলে খানিকটা জমি এখানে কাজে লাগবে খানিকটা জমি ওখানে কাজে লাগবে, তা-ও লাগবে হয়ত বছর দুই পরে, এই ভেবে একলপ্তে অনেকটা জমি কিনে নেওয়া বা ভাড়া নেওয়া তার পক্ষে খুব একটা লাভজনক নয়। আর যে চাষী তার জমিতে চাষ করছে, অর্থাৎ রায়ত, তার পক্ষেও লাভজনক নয়। এদিকে সরকারের থেকে সরাসরি জমি নেওয়ার অসুবিধে এবং ক্ষতিটা হল, নিতে হলে একসাথে অনেকটা জমিই নিতে হবে। ফলে দেখা যায়, সরকারের থেকে জমি না নিয়ে স্থানীয় জমিদারের কাছ থেকে অল্প পরিমানে জমি নিয়ে চাষ করছে, এরকম ইউরোপীয় প্ল্যান্টারের সংখ্যা অনেক বেশী।

 

লেখকের টীকা

[1] রেজোলিউশন অফ দ্য গভর্নমেন্ট অফ বেঙ্গল। রেভিনিউ ডিপার্টমেন্ট। ১৭ ফেব্রুয়ারী। ১৮২৯।

[2] স্যার চার্লস মেটকাফের মিনিট। ১৯ ফেব্রুয়ারী। ১৮২৯।

 

অনুবাদকের টীকা

১। নাইট অফ দ্য শায়ারঃ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট মেম্বারদের পূর্বতন নাম। মধ্যযুগ থেকে ১৮৮৫ সালের ‘রিডিস্ট্রিবিউশন অফ সিট আক্ট’ চালু হওয়ার আগে পর্যন্ত এই নাম চালু ছিল। এখানে সাহসী বীর বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

২।  প্যারিশ-বিডলঃ অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের চার্চের সাধারণ মানের কর্মচারী যারা খুব নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করত। যেমন গরীব মানুষদের দেখাশোনা করা, চার্চের দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করা ইত্যাদি।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply